পৃথিবীর সবচেয়ে জটিল ও নিপুণ সৃষ্টি মানবদেহ। ৩৭ ট্রিলিয়নেরও বেশী কোষের সমন্বয়ে গঠিত মানবদেহের দক্ষতার তুলনা সে নিজেই। আপনি হয়তো স্টেডিয়ামের পাশে বসে মনোযোগ দিয়ে ক্রিকেট খেলা দেখছেন, এমন সময় হঠাৎ করে আপনার দিকে ছুটে এলো একটি বল। আপনি বুঝে ওঠার আগেই দেখবেন স্বয়ংক্রিয়ভাবে মাথা সরিয়ে নিয়েছেন সচেতন হওয়ার পূর্বেই। সত্যি বলতে কি, আমরা আমাদের শরীরের অনেক কিছু সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করি না। আমাদের অবচেতনে কৌশলী দেহ নিজের মতো কাজ করে যায়। আজ তেমন কিছু অসাধারণ দেহ কৌশলের উপর আলোকপাত করা হবে।

হাসি

আমরা কখন হাসি? আনন্দ পেলে, তাই না? কিন্তু যদি বলি আজ থেকে ব্যথা পেলে হাসবেন! নিশ্চিত আমাকে পাগল ঠাওরাবেন। বিজ্ঞান কিন্তু ভিন্ন কথাই বলছে। আমরা যখন হাসি তখন স্নায়ুতন্ত্র এবং পিটুইটারি গ্রন্থি থেকে একটি হরমোন নিঃসৃত হয়। এর নাম এন্ডরফিন। এই এন্ডরফিনই দেখায় সব কারিশমা। মরফিন বা কোডেইনের কথা আমরা কমবেশি সবাই জানি। একে অবশ্য চিনি ড্রাগ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। কিন্তু এদের মূল ব্যবহার ছিল ব্যথানাশক ঔষধ হিসেবে।

তবে মরফিন এবং কোডেইনের সবচেয়ে খারাপ দিক হচ্ছে, এটি আসক্তি তৈরি করে। সে যা-ই হোক, মরফিন কোডেইন যে কাজ করে এন্ডরফিন সেই কাজই করে। এমনকি সে একই রিসেপ্টরে গৃহীত হয়। আর এন্ডরফিনে কোনো আসক্তিও হয় না! হবেই বা কেন? নিজের শরীর থেকেই তো এটা তৈরি হয়, মানে ঘরের জিনিস আর কি!

ওদিকে কাজের বেলায় মরফিনের চেয়ে সে আরো এক ধাপ এগিয়ে। এটা শরীরে ব্যথা সহ্য করার ক্ষমতাও বৃদ্ধি করে। তার মানে এরা শুধু প্রতিষেধক নয়, প্রতিরোধকও বটে।

অতএব হাসুন! source: Huffington post

শুধু এখানেই এন্ডরফিনের কেরামতি শেষ নয়। এন্ডরফিনের প্রবাহ আমাদের মনে তীব্র আনন্দের অনুভূতি তৈরি করে। এমনকি শরীরে ইম্যুনিটিকেও শক্তিশালী করে! আর এই সবকিছু হচ্ছে শুধুমাত্র হাসির মাধ্যমে! সুতরাং প্রাণ খুলে হাসুন।

লজ্জায় লাল হয়ে যাওয়া

আমরা যখন খুব পছন্দের কাউকে দেখি, লজ্জায় লাল হয়ে যাই! আর তীব্র ভয়ের কোনো বস্তু বা ব্যক্তিকে দেখি তখন ভয়ে শ্বেতবর্ণ ধারণ করি। এ তো সবাই জানি। কিন্তু কেন? প্রিয় মানুষকে দেখলে আমাদের মনে তীব্র সুখের অনুভুতি হয়। ফলে আমাদের দেহে কিছু রাসায়নিক পদার্থ, যেমন- এড্রেনালিন ক্ষরিত হয়। এগুলো আমাদের দেহের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রক্তনালীকে প্রসারিত করে তোলে। ফলে রক্তপ্রবাহ বৃদ্ধি পায়। এই রক্তনালীগুলো, যাদেরকে ক্যাপিলারি বা কৈশিক জালক বলা হয়, এগুলো ঠিক ত্বকের নিচে অবস্থান করে। ফলে একটি লাল আভা ফুটে ওঠে মুখে।

আর যখন আমরা তীব্র ভয় পাই, ঠিক বিপরীত কারণে আমাদের কৈশিক জালিকা সংকুচিত হয়ে যায়। ফলে রক্ত সরবরাহ কমে যায়। আর মুখ সাদাটে হয়ে যায়। কিন্তু প্রশ্ন উঠতে পারে, শুধু মুখের রঙই পরিবর্তন হয় কেন? এর কারণ খুব সহজ। মুখের ত্বক অপেক্ষাকৃত পাতলা এবং আমাদের দেহের অন্যান্য অংশের তুলনায় মুখে বেশি পরিমাণে কৈশিক জালিকা বিদ্যমান। তাছাড়া অন্যান্য অংশের তুলনায় মুখ একটু বেশি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকে। তাই রঙের পরিবর্তন সহজে ধরা পড়ে।

প্রিয় মানুষকে দেখলে অনেকেই লজ্জায় লাল হয়ে যান! source: todays news

কানের ময়লা

আমাদের কানের ভেতরে বাদামী বা হলুদাভ মোমের মতো একটি পদার্থ ক্ষরিত হয়। কানের ময়লা হিসেবেই একে চিনি আমরা। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে সেরুমেন। এই সেরুমেন বা কানের ময়লা আমাদের দু’চোখের বিষ। সৌন্দর্য সচেতন আর ফিটফাট মানুষেরা এই জিনিসটাকে দু’চোখে দেখতে পারেন না। কানে সেরুমেন জমতে না জমতে ঝেটিয়ে বিদেয় করেন। তবে অভ্যেসটা একদমই ভালো নয়। Staphylococcus aureas আর E. coli নামে দুটো ব্যাক্টেরিয়া আছে। হেন খারাপ কাজ নেই যা এরা করে না। ফোঁড়া থেকে শুরু করে মেনিনজাইটিস, হাড়ের ব্যারাম, নিউমোনিয়া, আরথ্রাইটিস, ফুড পয়জনিং সহ আরো অনেক রোগের জন্য দায়ী এরা।

ওদিকে দুই নাম্বার ব্যাক্টেরিয়া ই-কোলাই স্ট্যাফাইলো কক্কাসকেও পেছনে ফেলেছে। মূত্রথলির বারোটা বাজাতে খুবই ওস্তাদ এটি। পাশাপাশি ডায়রিয়া, আমাশয় থেকে শুরু করে নিউমোনিয়া, সেপ্টিসেমিয়া, ফোঁড়া, আঘাতপ্রাপ্ত জায়গায় সংক্রমণ সহ আরো অনেক মারাত্মক রোগ ঘটাতে তার জুড়ি নেই। ভারী ভারী এন্টিবায়োটিক লাগে এদের দূর করতে। তবে যতই ভয়ানক হোক না কেন, কানে এরা সহজে মাতব্বরি ফলাতে পারে না। কারণ এই সেরুমন বা কানের ময়লার শক্তিশালী এন্টি-বায়োটিক ক্ষমতা রয়েছে। ফলে কানের সেরুমেনের উপস্থিতিতে ব্যাক্টেরিয়ার সংক্রমণ ঘটে না।

কানের ময়লা ফেলনা নয়। source: labmedica

তাই বলে আপনি আবার আপনার কানের ময়লা পুষে রাখবেন না। অতিরিক্ত জমাট বাঁধা সেরুমেন আবার ফাঙ্গাসের খুবই প্রিয়। সুতরাং নিয়মিত বিরতি দিয়ে কান পরিষ্কার করাই বুদ্ধিমানের কাজ।

ওষুধ ফ্যাক্টরি

আপনি কি জানেন আপনার শরীর একটি ঔষধ কারখানা? কী? বিশ্বাস হচ্ছে না? যে সমস্ত মানুষ বেনজয়িক এসিড এবং স্যালিসাইক্লিক এসিডে পরিপূর্ণ খাবার খান, একবার তাদের প্রস্রাব পরীক্ষা করা হয়। ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা গেলো তাতে এসপিরিনের অবশেষ রয়েছে। অথচ তারা শরীরে কোনো এসপিরিন গ্রহণ করেননি।

এসপিরিন জ্বর কমানোর পাশাপাশি মাংসপেশির ব্যথা, দাঁতের ব্যথা, সর্দি, কাশি, মাথার যন্ত্রণা কমাতে ওস্তাদ! বেনজয়িক এসিড আর স্যালিসাইক্লিক এসিড সবেচেয়ে বেশি পাওয়া যায় শাকসবজিতে। সুতরাং যারা শাক সবজি বেশি খায় তাদের নিজেদের শরীরেই তৈরি হয় এসপিরিন। গোটা ব্যাপারটি তুলে ধরা হয় Journal of Agricultural and Food Chemistry এর একটি আর্টিকেলে। এমন আরো সেলফ মেডিকেশন সিস্টেম শরীরে সবসময় কাজ করছে।

শরীর যখন নিজেই রাজা

আমাদের মস্তিষ্ক আমাদের সমস্ত কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ করে- এ কথা আমরা সবাই জানি। কিন্তু মস্তিষ্ক কি সবসময় আমাদের শরীর নিয়ন্ত্রণ করে? না, সবসময় নয়। ঘুমের REM ধাপে আমরা সবাই স্বপ্ন দেখি। এই সময় কয়েকটি বিষয়, যেমন রক্তচাপ, হার্ট রেট, তাপমাত্রা, শ্বাস-প্রশ্বাস প্রভৃতির উপর মস্তিষ্কের নিয়ন্ত্রণ থাকে না।

পিয়ের লুইগি পারমেগিয়ানি’র Systemic Homeostasis and Poikilostasis in Sleep এ এমনটাই তুলে ধরা হয়েছে। তাহলে এর মানে কি এমন যে, এই সময়ে শরীর তার ইচ্ছেমতো চলে? তা-ও পুরোপুরি নয়। বরং মস্তিষ্ক খানিকটা ইঁদুর-বিড়াল খেলে বলা যায়, মানে খানিকটা ঢিলা দেয়। আর এই সুযোগে শরীর নিজেই নিজের দায়িত্ব নেয়।

আলোকিত মানব

রাতের আঁধারে জোনাকি কী সুন্দর মিটমিট করে জ্বলতে থাকে বাগান জুড়ে। দেখে আমাদের মনেও কখনো ইচ্ছা উঁকি দেয়, “ইশ, আমার শরীর থেকেও যদি এমন আলোর বিচ্ছুরণ হতো!” অথচ মানুষের শরীর থেকে কিন্তু সত্যিই আলোক বিচ্ছুরণ হয়। বিশ্বাস হচ্ছে না?

source: Ibgnews.com

বিশ্বাস হওয়ার কথাও নয়, কারণ আমাদের চোখে এই আলো কখনো ধরা পড়েনি। পড়বেই বা কী করে! এই আলো এতই ক্ষীণ যে মানুষের চোখের রড এবং কোণ কোষে তারা কোনো রকম উদ্দীপনা তৈরি করতে পারে না। তাই মানবদেহের এই অনন্য বৈশিষ্ট্য রয়ে গেছে আমাদের অগোচরে। ব্যাপারটি প্রথম আমাদের সামনে তুলে ধরেন জাপানি বিজ্ঞানীরা। তারা অতি আলোক সংবেদী ক্যামেরা ব্যবহার করে মানবদেহের ছবি তোলেন। তাতে ধরা পড়ে জ্যোতি বিচ্ছুরণের এই কেরামতি। গোটা বিষয়টি প্রকাশিত হয় বিখ্যাত পত্রিকা গার্ডিয়ানের পাতায়।

দিনের শেষে আমরা খাটো হয়ে যাই!

আমাদের দেহের দৈর্ঘ্য মূলত নির্ভর করে পায়ের দুই জোড়া লম্বা হাড় আর মেরুদন্ডের উপরে। মেরুদন্ড কোনো একক হাড় নয়। অনেকগুলো ভার্টিব্রা পরস্পরের উপর বসে তৈরি করেছে এই সম্পূর্ণ মেরুদন্ডটি। পরপর দুটি ভার্টিব্রার মাঝে বসে থাকে একটি ভার্টিব্রাল ডিস্ক বা চাকতি। কার্টিলেজ দিয়ে তৈরি এই চাকতিটি বিভিন্ন ঝাঁকুনিতে চাপ সহ্য করে মেরুদন্ডকে সুরক্ষিত রাখে।

কিন্তু এই ঝক্কিতে ভার্টিব্রাল ডিস্ক থেকে তরল পদার্থ বেরিয়ে যায়। ফলে এগুলো সংকুচিত হয়ে যায়। আর ফলাফল? দিন শেষে আমাদের উচ্চতা কমে যায়! পরীক্ষা করে দেখে গেছে, উচ্চতা কমার পরিমাণ এক সেন্টিমিটার থেকে এক ইঞ্চি পর্যন্ত হতে পারে! তবে চিন্তিত হওয়ার কারণ নেই! আপনি যখন ঘুমান, মেরুদন্ড আবার নিজের জায়গায় চলে আসে।