বেঁচে থাকার তাগিদে প্রাণীকুল বেছে নিয়েছে নানাবিধ উপায়। কেউ বাস করে জলে, কেউ স্থলে আর কেউ তো ভেসে বেড়ায় আকাশে। খাদ্য সংগ্রহ আর আত্মরক্ষার তাগিদে এত বিচিত্র কৌশল তারা আবিষ্কার করেছে যে, সেগুলো ভূতুড়ে গল্পের সাথেই বেশি মানায়। কী বিশ্বাস হচ্ছে না? তাহলে চলুন জেনে নেয়া যাক তাদের সেই ভূতুড়ে কর্মকাণ্ডগুলো সম্পর্কেই।

রক্ত নিক্ষেপ

লম্বায় টেনেটুনে পাঁচ ইঞ্চি লম্বা হবে ওটা। রোদের ওপর আলগোছে বসে রোদ পোহাচ্ছিলো সে। সারা শরীর ছোটবড় আঁচিলে ভর্তি। প্রকৃতির সাথে মিশে আছে। তবু একটি ক্ষুধার্ত কয়োটির নজরে পড়ে গেলো সে। সেটা মাটির দিকে মুখ করে শুঁকতে শুঁকতে এগিয়ে এলো লিজার্ডের দিকে। কয়েক মুহুর্ত তাকিয়ে রইল নিশ্চল প্রাণীটির দিকে। হিসেব করে নিলো এটি তার খাওয়ার উপযুক্ত কিনা! মনঃস্থির করে থাবা বসাতে যাবে, এমন সময় বিচ্ছিরি খানিকটা লাল তরল কয়োটির চোখে ঢুকে গেলো। ক্ষণিকের জন্য অন্ধ হয়ে গেলো সেটি। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে পালিয়ে গেলো ইঞ্চি পাঁচেক লম্বা প্রাণীটি।

এদের নাম টেক্সাসের শিংওয়ালা লিজার্ড, পাওয়া যায় কোথায় তা নাম থেকেই স্পষ্ট। যে তরলটি সে ছুঁড়ে দিয়েছিলো সেটা আর কিছুই নয়, তার নিজেরই রক্ত! চোখের কোনা থেকে উচ্চ চাপে রক্ত ছুঁড়ে দেয় এরা শত্রুকে লক্ষ্য করে। তবে আপনি তাকে একটু ভয় দেখালেই তারা আপনার দিকে রক্ত ছুঁড়ে দিবে ভেবেছেন? তাহলে ভুল করছেন। আপনার হাতে সেটি নিশ্চুপ বসে থাকবে। ভয় দেখালে হালকা হিস হিস করেও উঠতে পারে। কিন্তু রক্ত নিক্ষেপ করবে না। এটা তাদের ফার্স্ট লাইন ডিফেন্স নয়। তাদের ক্যামোফ্লেজ তাদের বাঁচার প্রধান উপায়। যখন সব উপায় বিফল হয়, তখনই একমাত্র তারা রক্ত নিক্ষেপ করে। হাজার হলেও রক্তের একটা দাম আছে তো!

টেক্সাস লিজার্ড; source:bbc.com

অমর জেলিফিশ

Turritopsis dohrnii একধরনের ক্ষুদ্র জেলিফিশের নাম। এরা দেখতে স্বচ্ছ এবং দেহের পঁচানব্বই শতাংশ জল আর বাকি পাঁচ শতাংশ প্রোটিন। ভূমধ্যসাগরে ১৮৩৩ সালে এদের প্রথম আবিষ্কার করা হয়। ১৯৯০ সালে এদের একটি আশ্চর্য ক্ষমতার কথা বিজ্ঞানীদের গোচরে আসে। তা হলো, এরা কখনো স্বাভাবিকভাবে মারা যায় না! ব্যাপারটা শুনতে ভূতুড়ে শোনাচ্ছে, তাই না?

সমুদ্রে ভাসমান ডিম্বাণু এবং শুক্রাণুর মিলনে জন্ম হয় লার্ভার। এদের জীবনের পরবর্তী ধাপের নাম পলিপ দশা, যা পূর্ণ মেডুসা অবস্থার জন্ম দেয়। পরিণত অবস্থায় এদের আকার থাকে ৪.৫ মিলিমিটারের মত। এরা যদি প্রতিকূল অবস্থার মুখোমুখি হয়, যেমন- শারীরিক আঘাত কিংবা খাদ্যাভাবের, তখন এরা এদের দেহের সমস্ত কার্যকলাপ বন্ধ করে দেয়। সেই সাথে শুঁড়গুলো গুটিয়ে নেয় এবং শরীর সংকুচিত হয়ে যায়।

অমর জেলিফিশ; source: universityobserver.ie

চুড়ান্ত অবস্থায় এরা একটি বুদবুদের ভেতরে বন্দী হয়ে যায়। সেখানে পুনরায় পলিপ দশায় রুপান্তরিত হয়। ব্যাপারটা পঞ্চাশ বছর বয়সে একটা ঘুম দিয়ে পনের বছর বয়সে জেগে ওঠার মতো। এরা এই চক্রটি অসংখ্যবার ঘটাতে পারে। সুতরাং বৃদ্ধ হয়ে তাদের কখনো মৃত্যু হয় না। শুধুমাত্র শিকারের ফলে কিংবা শারীরিক আঘাতেই তাদের মৃত্যু সম্ভব।

প্রকৃতির উলভ্যারিন

এক্স ম্যান সিরিজের হিউ জ্যাকম্যানকে মনে আছে নিশ্চয়ই, হাত থেকে যার বেরিয়ে আসে ধারালো ফলা! ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রার অধিবাসী লাল কালো ডোরাকাটা লোয়াচ ক্লাউন মাছ যেন প্রকৃতির উলভ্যারিন। তার চোখের নিচে আছে দুটো ধারালো স্পাইন বা কাঁটা, যা তারা স্বাভাবিক পরিবেশে লুকিয়ে রাখে। কিন্তু শত্রুর মুখোমুখি হলে তখন স্বমূর্তি ধারণ করে সে; মুহুর্তে বেরিয়ে আসে তার তীক্ষ্ণ কাঁটা, আঘাত হানে শত্রুকে।

ডুবুরি মাকড়শা

মধ্য ইউরোপে একধরনের মাকড়শা পাওয়া যায় যারা জীবনের অধিকাংশ সময় জলেই কাটিয়ে দেয়। জলে মানে জলের উপরে না, জলের গভীরে। সেখানে পাওয়া মশার লার্ভা, জলজ পোকামাকড়ের ডিম এদের অতি প্রিয়। তাই জলের উপরে আসতে এদের ভীষণ অনীহা। কিন্তু মাকড়শা তো বাতাস থেকে শ্বাস নেয়। জলের তলায় খাদ্য যতই পাওয়া যাক না কেন, এক ফোঁটা বাতাসও তো মিলবে না!

ডুবুরি মাকড়শা; source: bbc.co.uk

জলের গভীরে শ্বাস নেওয়ার জন্য এরা এক অনন্য উপায় বের করেছে। এদের পেটে এবং লেজে জলবিকর্ষী লোমের পুরু স্তর থাকে। যখন এরা জলের তলায় ডুব দেয় তখন বাতাসও শরীরের সাথে লেগে থেকে জলের তলায় চলে যায়। ফলে এদের দেহের চারিদিকে একটা বাতাসের বলয় তৈরি হয়। এই বাতাসেই এদের দিব্যি লম্বা সময় চলে যায়। এদের বৈজ্ঞানিক নাম Argyroneta aquatica। 

অনুকরণ

পৃথিবীতে এমন এক প্রাণী আছে যারা পনেরো রকমের ভিন্ন ভিন্ন প্রাণীর রুপ ধারণ করতে পারে! এদের নাম মিমিক অক্টোপাস। মিমিক শব্দটাই এদের পরিচয় বহন করছে, পাওয়া যায় ইন্দোনেশিয়ার উপকূলে।

ফুসফুসহীন ব্যাঙ

ইন্দোনেশিয়ায় একধরনের ব্যাঙ পাওয়া যায় যাদের দেহে ফুসফুসের বালাই নেই। এরা বাস করে বোর্নিওর জঙ্গলে ঠান্ডা, পরিষ্কার জল স্রোতে। তাহলে এরা কিভাবে শ্বাসকার্য চালায় এতক্ষণে আপনার মনে এই প্রশ্নটা জেগে উঠেছে তো? উত্তরটা সহজ। এদের প্রয়োজনীয় অক্সিজেনের পুরোটাই সিক্ত ত্বকের মাধ্যমে গ্রহণ করে। সেখান থেকে সরাসরি রক্তে চলে যায় সেগুলো। এদের বৈজ্ঞানিক নাম Barbourula kalimantanensis

পিস্তলওয়ালা চিংড়িমাছ

কোরালের প্রাচীরে গা বেয়ে বেয়ে সাঁতার কাটছিলো একটি কাঁকড়া। কিন্তু তার কপাল সেদিন খুবই খারাপ। সামনেই লুকিয়ে ছিল আততায়ী। বক্সিংয়ে মাস্টার সে। পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী এবং দ্রুত পাঞ্চের মালিক পাঁচ ইঞ্চি লম্বা প্রাণীটি। বেগুনী রঙয়ের মাঝে সাদা ছিটেয় সজ্জিত সে। হঠাৎ সে কাঙ্ক্ষিত শিকারের দেখা পেলো। এগিয়ে আসছে কাঁকড়াটি। কী ঘটতে যাচ্ছে সে বিষয়ে পুরোপুরি অজ্ঞ সে। প্রস্তুত আততায়ী। কয়েক মুহুর্ত পর ঘন্টায় ৫০ কিলোমিটার বেগে প্রচন্ড আঘাতে লুটিয়ে পড়লো কাঁকড়াটি। এবার বেরিয়ে এলো আততায়ী।

বক্সিং মাস্টার! source: web.forumacvarist.ro

প্রতি সেকেন্ডে ১৪ মিটার গতিতে আঘাত হানা প্রাণীটি আর কেউ নয়, তার নাম দ্য পিস্তল শ্রিম্প। শ্রিম্প মানে চিংড়ি। তিন থেকে পাঁচ ইঞ্চি লম্বা হয় এরা। এদের আঘাত এতই শক্তিশালী যে শামুক বা ঝিনুক যা-ই আসুক না কেন, তাদের শক্ত খোলসও চুরমার হয়ে যায় এদের আঘাতে।

চোর পাখি

ক্লেপ্টোম্যানিয়াক শব্দটা আমরা কম-বেশি সবাই জানি। অনেক বিখ্যাত মানুষের ভেতরে এই বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। এই স্বভাবে আক্রান্ত মানুষেরা আশেপাশের মানুষজনের কাছ থেকে ছোটখাটো জিনিস চুরি করে নিজের বাসায় সাজায়।

পাখি জগতেও এমন একটি পাখি আছে যারা এই সমস্যায় আক্রান্ত। এদের ডাকনাম বোয়ারবার্ড।  বৈজ্ঞানিক নাম Ptilonorhynchus violaceus। এদের চুরি করা জিনিসের ভেতরে ফুল, পালক এমনকি প্লাস্টিকের টুকরোও রয়েছে। এগুলোর বড় অংশ অন্য পাখির বাসা থেকে চুরি করা।

ফুলমার পাখি

আপনি যদি উত্তর আটলান্টিক কিংবা দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগর অঞ্চলে ঘুরতে যান, তাহলে একটি জিনিস লক্ষ্য রাখবেন। মাথার উপরে তাকালে দেখবেন ধূসর সাদা বর্ণের কিছু পাখি চক্কর দিচ্ছে আকাশের বুকে। আপনার কয়েক হাত দূরেই হয়ত উড়ে বেড়াচ্ছে ওগুলো। পাখিগুলোর নাম নর্দার্ন ফুলমার। বৈজ্ঞানিক নাম Fulmaris glacialis

ভয় পেলে বমি করে দেয়; source: wikimedia

চমৎকার পাখিগুলো দেখে আপনার হয়ত একটু দুষ্টুমি করতে মন চাইতে পারে। হয়ত এক টুকরো ঢিল ছুঁড়ে দেওয়ার জন্য হাত নিশপিশ করতে পারে আপনার। খবরদার এই কাজটি ভুলেও করবেন না। ভয় পেলে কিংবা শত্রুর মুখোমুখি হলে সরাসরি শত্রুর উপরে গিয়ে তার দিকে ছুঁড়ে দেয় বিচ্ছিরি দুর্গন্ধময় তরল বমি। বুঝতেই পারছেন, আপনার অবস্থা কী হব!

টিকটিকির লেজ

টিকটিকির এই অদ্ভুত গুণের কথা কম-বেশি সবাই জানে। ভয় পেলে বা বিপদে পড়লে তাদের লেজটিকে খসিয়ে দেয়। খসে যাওয়া লেজটি জীবন্ত কিছুর মত তিড়িং বিড়িং করে লাফাতে থাকে। আর শিকারীর মনোযোগ সেদিকে চলে যায়। সেই সুযোগে টিকটিকি পগার পার। ফলে টিকটিকি লেজ হারালেও প্রাণে বেঁচে যায়।

অন্যদিকে কিছু টিকটিকি আরো এককাঠি সরেস। তারা খাইয়েদাইয়ে লেজটিকে মোটা বানায়। মোটা হতে হতে সেটি তার মাথার মত হয়ে যায়। ফলে শিকারীরা আরো বেশি বিভ্রান্ত হয়।

ফিচার ইমেজ- funkidslive.com