হাঁস ছিল, সজারু, (ব্যাকরণ মানি না),
হয়ে গেল “হাঁসজারু” কেমনে তা জানি না।
বক কহে কচ্ছপে, “বাহবা কি ফুর্তি!
অতি খাসা আমাদের বকচ্ছপ মূর্তি।”

সুকুমার রায়ের ‘খিচুড়ি’ কবিতার মতো হাঁসজারু কিংবা বকচ্ছপ বাস্তবে না থাকলেও বিশাল এই প্রাণীজগতে অদ্ভুত সব প্রাণীর অভাব কিন্তু নেই। অমেরুদন্ডী প্রাণীগুলোকে বাদ দিলেও শুধু মেরুদন্ডী প্রাণীরই প্রায় কয়েক লক্ষ ভিন্ন ভিন্ন প্রজাতি বিচরণ করেছে পৃথিবীর বুকে। ডায়নোসোর, ম্যামথের মতো বিশাল প্রাণী হারিয়ে গেছে পৃথিবীর বুক থেকে, আবার তেলাপোকা কিংবা ইঁদুরের মতো প্রাণী টিকে আছে হাজার হাজার বছর ধরে। চলুন জেনে নেয়া যাক বিচিত্র এ জীবজগতের বিচিত্রদর্শন কিছু প্রাণী সম্পর্কে।

পান্ডা অ্যান্ট

নাম পিঁপড়া হলেও এগুলো আসলে এক ধরনের ভিমরুল। এই ভিমরুলগুলো মূলত দক্ষিণ আমেরিকার চিলিতে পাওয়া যায়। এদের পুরো শরীর বিভিন্ন রঙের পশমে ঢাকা থাকে। পশম বিভিন্ন রঙের হলেও সাদা-কালো রঙের পশমযুক্ত, পাখাবিহীন স্ত্রী ভিমরূলগুলোকে ‘পান্ডা অ্যান্ট’ নামে ডাকা হয়। পান্ডার মতোই সাদাকালো রঙের মিশ্রণের কারণে এদের এই নামে ডাকা হয়। স্থানীয়ভাবে এদের ‘কাউ কিলার’ বা গরু হত্যাকারী নামেও ডাকা হয়, কেননা এদের কামড়ে গরু পর্যন্ত মারা যেতে পারে! লম্বায় ৮ মিলিমিটার পর্যন্ত হতে পারে এরা। বর্তমানে প্রায় বিলুপ্ত প্রজাতির প্রাণীগুলোর মধ্যে একটি হিসেবে বিবেচিত পিঁপড়ারূপী এই ভিমরুলেরা।

পান্ডা অ্যান্ট; Source: borepanda

রেড লিপড ব্যাটফিস

সামুদ্রিক এই মাছটি মাছ হলেও দেখতে মোটেও মাছের মতো নয়। বাদুরের মতো দেখতে এই মাছটির ঠোঁট আবার টকটকে লাল রঙের, যেন লাল লিপস্টিক দিয়ে দিয়েছে কেউ! দক্ষিণ আমেরিকার পেরু এবং প্রশান্ত মহাসাগরের গ্যালাপ্যাগাস দ্বীপপুঞ্জের পানিতে এই কিম্ভূতকিমাকার মাছটি পাওয়া যায়। মাছ হলেও এরা সাঁতার কাটে না, বরং পায়ের মতো একধরনের অঙ্গ আছে যা দিয়ে তারা সমুদ্রের তলদেশে ‘হাঁটে’।

রেড লিপড ব্যাটফিশ; Source: The verge

গবলিন শার্ক

হলিউডের কল্যাণে সাধারণ হাঙর বেশ পরিচিত প্রাণী হলেও গবলিন শার্ক বেশ দুর্লভ প্রজাতির একটি হাঙর। মাথার সামনে শুঁড়ের মতো একটি বর্ধিত অংশ রয়েছে। এর পেছনেই রয়েছে চোখ আর নিচে রয়েছে ভয়ংকর দর্শন বিশাল চোয়াল। গোলাপী রঙের এই হাঙর থাকে পানির বেশ গভীরে। এদের সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায় জাপানের উপকূলে। গবলিন শার্ক নামটি এসেছে জাপানিজ নাম ‘টেনগুজামে’ থেকে। জাপানি ভাষায় এর টেনগু একটি কাল্পনিক প্রাণী যার লম্বা নাক আর লাল রঙের চামড়া রয়েছে। জাপান ছাড়াও প্রায় প্রতিটি মহাদেশেরই কোনো না কোনো জায়গায় এদের পাওয়া যায়।

গবলিন শার্ক; Source: Thinglink

উম্বোনিয়া স্পিনোসা

হ্যারি পটারের স্পেলের মতো নামের প্রাণীটি মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকার প্রায় সব দেশেই পাওয়া যায়। পিঠের ওপর শিংয়ের মতো একটি অংশ বের হয়ে থাকে এই প্রাণীর। বিভিন্ন গাছের কান্ডে বাসা বেঁধে গাছের ক্ষতি করে পোকার মতো এই প্রাণীটি। অদ্ভুতদর্শন এই প্রাণীটি এখনো বিজ্ঞানীদের হাজারো প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে, যেগুলোর সমাধান এখনো পাওয়া যায়নি।

উম্বোনিয়া স্পিনোসা; Source: Fortify my life

গ্ল্যাকাস অ্যাটলান্টিকাস

এই প্রাণীটিকে প্রথমে দেখলে মনে হবে হ্যারি পটার কিংবা লর্ড অব দ্য রিংসের জাদুর দুনিয়া থেকে উঠে আসা কোনো প্রাণী। নীল রঙের ছোট্ট সামুদ্রিক এই প্রাণীটিকে ডাকা হয় বিভিন্ন নামে- ব্লু অ্যাঞ্জেল, ব্লু ড্রাগন, ব্লু সী স্ল্যাগ কিংবা ব্লু ওশেন স্ল্যাগ। এরা পানিতে ভেসে থাকে পানির পৃষ্ঠটান ব্যবহার করে। প্রায় সকল উষ্ণ পানির সমুদ্রে এদের দেখতে পাওয়া যায়। সমুদ্রের নীল পানিতে ভেসে থাকার সময় এদের পিঠের দিক থাকে নীল। ঠিক একই সময়ে পানির নিচের অংশ থাকে রূপালি রঙের, যা সমুদ্রের নিচের শিকার থেকে তাদের লুকিয়ে থাকতে সাহায্য করে।

গ্ল্যাকাস অ্যাটলান্টিকাস; Source: Pinterest

গ্ল্যাকাস অ্যাটলান্টিকাস; Source: Alchaton

ম্যান্টিস শ্রিম্প

গ্রীষ্মপ্রধান অঞ্চলের সামুদ্রিক এই প্রাণীটি দেখতে যেমন বিচিত্র রঙের, ঠিক তেমনি এদের চোখও এখন পর্যন্ত মানুষের জানা প্রাণীদের মধ্যে অন্যতম উন্নত। মানুষের কালার রিসেপটিভ কোণ কোষ রয়েছে (কোনো রঙ বোঝার জন্য প্রাণীকে যা সাহায্য করে) তিনটি। কিন্তু এই প্রাণীটির রয়েছে ষোলটি কালার রিসেপটিভ কোণ। ফলে পানির নিচেও এরা সহজে অনেক সূক্ষ্ম জিনিস আলাদা করতে পারে। এদের এই ক্ষমতার কারণেই এরা বেশ ভালো শিকারি হয়ে থাকে। বেশিরভাগ সময়ে এরা নিজেদের গর্তে থাকে বলে এদের নিয়ে খুব বেশি জানা যায়নি।

ম্যান্টিস শ্রিম্প; Source: Mental floss

ভেনেজুয়েলান পডল মথ

লোমশ এই প্রাণীটির খোঁজ মানুষ পেয়েছে মাত্র আট বছর আগে, ২০০৯ সালে। ভেনেজুয়েলার কানাইমা জাতীয় উদ্যানে প্রাণীবিজ্ঞানী আর্থার অ্যাঙ্কার প্রথম এই প্রাণীর খোঁজ পান। একদম নতুন এ মথ সম্পর্কে এখনো খুব বেশি তথ্য জানা যায়নি।

ভেনেজুয়েলান পডল মথ; Source: meme center

ওকাপি

প্রথম দেখায় মনে হতে পারে কোন জেব্রার শরীরের উপরে রঙ করে দেয়া হয়েছে কিংবা জেব্রার সাথে অন্য কোনো প্রাণীর ক্রসিং করে জন্ম হয়েছে এই প্রাণীর। কেননা ওকাপির শরীরের নিচের অংশটুকু জেব্রার মতো সাদা-কালো ডোরাকাটা। তবে নিচের অংশ জেব্রার মতো দেখতে হলেও এরা মূলত জিরাফের কাছাকাছি গোত্রের একটি প্রাণী। জিরাফের মতো লম্বা না হলেও ঘাড় কিছুটা জিরাফের মতোই। মধ্য আফ্রিকার দেশ কঙ্গোতে দেখা মেলে এই প্রাণীর। আফ্রিকার জঙ্গলে পাওয়া এই প্রাণীটির কান বেশ খাড়া, তাই খুব সহজেই বিপদ আঁচ করে পালাতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র, জাপান সহ বেশ কয়েকটি দেশের চিড়িয়াখানা এবং সাফারি পার্কে রয়েছে দর্শনার্থীদের দেখার জন্য।

ওকাপি; Source: McMillan Dictionary

শুবিল

সারস পাখির মতো দেখতে এই পাখিটি প্রাচীনকালে মিশরীয় এবং আরবদের কাছেও পরিচিত ছিল। আফ্রিকার দক্ষিণ সুদান, কঙ্গো, উগান্ডা, রুয়ান্ডা, তানজানিয়া এবং জাম্বিয়ায় পাওয়া যায় এই অদ্ভুতদর্শন পাখিটি। মূলত জলাভূমিতেই দেখা যায় এদের। নীল রঙের এ পাখিটির রয়েছে বেশ বড় ঠোঁট যা শিকারে সাহায্য করে। মানুষের কারণে এদের আবাসস্থল ধ্বংস হওয়াতে দ্রুত এদের সংখ্যা কমছে। বর্তমানে এরা বিপন্ন প্রাণীর তালিকায় রয়েছে।

শুবিল; Source: National Audubon Society

শুবিল; Source: San Diego Safari Park

ভারতীয় বেগুনি ব্যাঙ

দক্ষিণ ভারতের এই ব্যাঙগুলো সাধারণ ব্যাঙ থেকে আকারে অনেক বড় হয়, যেন বাতাস দিয়ে বেলুনের মতো ফুলিয়ে দেয়া হয়েছে। এরা বছরের বেশিরভাগ সময় মাটির নিচে থাকায় এদের সহজে দেখা যায় না। বছরে মাত্র দু’সপ্তাহ এরা মাটির নিচ থেকে বের হয় প্রজননের জন্য। কফি, এলাচ, আদার চাষের জন্য বন কেটে ফেলায় এই ব্যাঙের বাসস্থান নষ্ট হচ্ছে। ফলে যেকোনো সময় এরা হারিয়ে যেতে পারে পৃথিবীর বুক থেকে।

ভারতীয় বেগুনী ব্যাঙ; Source: Indian wild life

নারহোয়াল

‘সমুদ্রের ইউনিকর্ন’ ডাকনামে পরিচিত এই সামুদ্রিক স্তন্যপায়ী প্রাণীটিই হয়তোবা ইউনিকর্নের রূপকথার জন্ম দিয়েছিল। উত্তর কানাডা, গ্রীনল্যান্ড, নরওয়ে এবং রাশিয়ার উত্তরে আর্কটিক সাগরে এদের বাস। কল্পিত ইউনিকর্নের মতোই এদের নাকের উপর রয়েছে শিংয়ের মতো একটি অঙ্গ। প্রায় এক হাজার বছর ধরেই উত্তরের বিভিন্ন জনপদের মানুষ এদের শিকার করে মাংসের জন্য। পরিবেশ দূষণ এবং গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের কারণে বর্তমানে নারহোয়াল বেশ বিপদজনক অবস্থায় রয়েছে।

দলবদ্ধ নারহোয়াল; Source: Wildlife.org

নারহোয়াল; Source: Wildlife.org

কাঁটাময় ড্রাগন

অস্ট্রেলিয়ার মরুভূমিতে বাস করা টিকটিকির মতো এই প্রাণীটির বৈজ্ঞানিক নাম Moloch horridus, যা জন মিল্টনের বিখ্যাত প্যারাডাইস লস্ট কবিতা থেকে নেয়া। ‘মলখ’ মানুষখেকো এক শয়তানের নাম, যার নামে মানুষের রক্ত উৎসর্গ করা হয়। শুধু নামেই নয়, দেখতেও ভয়ানক এই প্রাণীটি। একে কাঁটাময় শয়তান নামেও ডাকা হয়। পুরো শরীরে কাঁটাযুক্ত এ প্রাণীটি বিপদে পড়লে গায়ের রঙ পাল্টাতে পারে। শত্রুর হাত থেকে বাঁচার জন্য রয়েছে এদের ‘নকল মাথা’। বিপদে পড়লে আসল মাথা পায়ের মাঝে লুকিয়ে ঘাড়ের উপরের নকল মাথা বের করে শত্রুকে ধোঁকা দেয় এরা।

কাঁটাময় ড্রাগন; Source: Wikimedia commons

কাঁটাময় ড্রাগন; Source: Fun Animals wiki

ফিচার ইমেজ- Wikimedia commons