ব্যুরোক্রেসি বা আমলাতন্ত্রের আদ্যোপান্ত (পর্ব – ১)

‘আমলাতন্ত্র’ বা ‘ব্যুরোক্রেসি’ শব্দটি একটি গণতান্ত্রিক দেশের নাগরিক হিসেবে আমাদের হামেশাই শুনতে হয়। প্রজাতন্ত্র বা রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ শ্রেণির কর্মচারী এরা। রাষ্ট্রের নীতি, উদ্দেশ্য, পরিকল্পনা এদের দ্বারাই বাস্তবায়িত হয়। জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সাথে এদের একটি সুন্দর সমান্তরাল সম্পর্ক স্থাপিত হয়। জনপ্রতিনিধি এবং আমলাগোষ্ঠী মিলেমিশে কাজ করে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যায়। অনেকে আমলাদের বলেন ‘পর্দার পেছনের নায়ক’ আবার অনেকে এদের প্রতি হন যারপরনাই বীতশ্রদ্ধ।

সে যাক গে। কোনো রাষ্ট্রকে সূক্ষ্ম এবং সাবলীলভাবে পরিচালিত করার জন্য একটি সুসংগঠিত আমলাতন্ত্রের প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য- এ বিষয়ে সবাই একমত হয়েছেন। সমাজতত্ত্ববিদগণ আমলাতন্ত্রের ব্যাপারে তাদের স্ব স্ব মডেল উপস্থাপিত করেছেন।

কোত্থেকে এলো শব্দটি?

বাংলাদেশে ‘ব্যুরোক্রেসি’ শব্দটি ‘আমলাতন্ত্র’ নামে বাংলায় প্রতিশব্দরূপে প্রচলিত হয়েছে। বস্তুত, ‘আমলা’ একটি আরবি শব্দ। এর বাংলা অর্থ হচ্ছে আদেশ পালন এবং বাস্তবায়ন। সেই সূত্রে বলা হয়, যেসব কর্মকর্তা সরকার বা রাষ্ট্র প্রবর্তিত নীতির বাস্তবায়ন করে তারা আমলা। ইংরেজিতে আমলাতন্ত্রকে ডাকা হয় Bureaucracy নামে। শব্দটির সুলুকসন্ধান করলে যেতে হয় ফরাসি ও ল্যাটিনের দেশে। ফরাসি Bureau (ব্যুরো) ও ল্যাটিন κράτος (ক্র্যাটোস) শব্দ দুটি মিলে Bureaucracy শব্দের উৎপত্তি হয়েছে। Bureau মানে টেবিল বা ডেস্ক আর κράτος এর বাংলা অর্থ শাসন বা পরিচালনা। তাহলে, মোদ্দাকথা দাঁড়াল Bureaucracy দিয়ে বোঝানো হয় এমন একটি গোষ্ঠীকে যারা ডেস্ক বা অফিসে বসে শাসন করে। A Deskbased Governing body বা কার্যালয়কেন্দ্রিক প্রশাসক গোষ্ঠী।

বাংলাদেশি আমলাতন্ত্রের সর্বোচ্চ মহল বাংলাদেশ সচিবালয়; Image Source : prothomalo
বাংলাদেশি আমলাতন্ত্রের সর্বোচ্চ মহল বাংলাদেশ সচিবালয়; Image Source: prothomalo

অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি প্রথম Bureaucracy শব্দটির ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যায়। একজন ফরাসি অর্থনীতিবিদ তার একটি চিঠিতে অপ্রত্যক্ষভাবে রঙ্গরসাত্মক ভঙ্গিতে Bureaucracy শব্দটির প্রসঙ্গ টেনেছিলেন। সরাসরি শব্দটির ব্যবহার হয়েছিল ১৮১৮ সালে আইরিশ লেখিকা লেডি মরগানের লেখায়। তিনি আইরিশ কলোনিতে ব্রিটিশ উপনিবেশ পরিচালনাকারী শাসকগোষ্ঠীকে বোঝাতে ‘Bureaucratic’ শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন। পরের শতাব্দী থেকে ব্যুরোক্র্যাট বা ব্যুরোক্রেসি শব্দটি নিরপেক্ষভাবেই ব্যবহার হওয়া শুরু হয়।

সংজ্ঞা ও বৈশিষ্ট্য

আমলাতন্ত্র নিয়ে অনেক সংজ্ঞাই প্রচলিত আছে। আমলাতন্ত্রের কথা উঠলে একজন ব্যক্তির নাম আসবেই আসবে। জার্মান সমাজতত্ত্ববিদ ও ইতিহাসবিদ ম্যাক্সিমিলান কার্ল এমিল ওয়েবার। ম্যাক্স ওয়েবার নামেই সর্বাধিক পরিচিত তিনি। নিজেকে সমাজতত্ত্ববিদের চেয়ে ইতিহাসবিদ হিসেবে পরিচয় দিতেই তিনি বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন। তিনিই ১৯২০ এর দশকে আমলাতন্ত্রের ব্যাপারে একটি পরিষ্কার ও নিরপেক্ষ ধারণা দিয়েছিলেন। তার প্রণীত rational-legal bureaucratic model রাষ্ট্রায়ত্ত বা ব্যক্তিনিয়ন্ত্রিত আমলাতন্ত্রের ব্যাপারে সর্বাধিক লোকপ্রিয় মডেল। Economy and Society বইটিতে তিনি লোকপ্রশাসনের বিভিন্ন নীতিগত রূপ নিয়ে আলোচনা করেছেন। ম্যাক্স ওয়েবারের মতে,

“Bureaucracy is a system of administration characterised by expertness, impartiality and the absence of humanity.”

অর্থাৎ, আমলাতন্ত্র হচ্ছে একটি প্রশাসনিক ব্যবস্থা যার বৈশিষ্ট্য হচ্ছে দক্ষতা, পক্ষপাতহীনতা এবং মানবিকতার অনুপস্থিতি।

অ্যালমন্ড ও পাওয়েল এর মতানুসারে, আমলাতন্ত্র হলো প্রশাসনের সঙ্গে জড়িত এমন একটি সংগঠন, যে সংগঠনে সরকারের বিভিন্ন বিভাগ পরস্পর যুক্ত থাকে। ম্যাক্স ওয়েবার আমলাতন্ত্রের ছয়টি বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করেছেন- আনুষ্ঠানিক আধিপত্য কাঠামো, নিয়ম দ্বারা পরিচালন, শ্রম বিভাগ, আচমকাভিত্তিক অগ্রগতি, দক্ষ সংস্থা এবং অসচ্ছতা।

ম্যাক্স ওয়েবার যাকে বলা হয় আধুনিক আমলাতন্ত্রের জনক; Image Source : newyorker.com
ম্যাক্স ওয়েবার; Image Source: newyorker.com

আমলাতন্ত্রের মুখ্য বৈশিষ্ট্যেগুলো হচ্ছে- স্থায়িত্ব ও নিরপেক্ষতা, পরিবর্তনশীলতা, দ্বায়িত্বশীলতা, বিচ্ছিন্নতা, শৃঙ্খলাবোধ, স্তরবিন্যাস, পদসোপান এবং কার্যকাল। বৈশিষ্ট্যগুলো একটু ভেঙে বলা দরকার। আমলাতন্ত্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে স্থায়িত্ব। সমাজ ও রাষ্ট্রভেদে বিভিন্ন নিয়ম ও শর্ত মেনে আমলারা একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নিযুক্ত হন। আমলাতন্ত্র হলো স্থায়ী একটি প্রশাসকমণ্ডলী। আমলারা হন রাজনীতি নিরপেক্ষ। জনগণের ভোট নিয়ে রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় আসে, তারা তাদের এজেন্ডা বাস্তবায়িত করার চেষ্টা করে এবং সংসদের মেয়াদ শেষ হলে আবার তাদের চলে যেতে হয়। কিন্তু আমলারা জনগণের ভোটে নির্বাচিত হন না বা সংসদের ন্যায় তাদের মেয়াদ শেষ হয় না। আমলাগোষ্ঠীর হতে হয় দলনিরপেক্ষ। তারা হন প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী।

আমলাতন্ত্রের এ বৈশিষ্ট্যকে অবশ্য মার্কসবাদীরা অস্বীকার করেছে। তাদের মতে, আমলাতন্ত্র সর্বযুগেই কায়েমি স্বার্থগোষ্ঠীর সরাসরি বা অপ্রত্যক্ষ সংরক্ষক হিসেবে ভূমিকা পালন করে এসেছে। পরিবর্তনশীলতাও আমলাতন্ত্রের একটি বৈশিষ্ট্য। যে দলই আসুক রাষ্ট্রের নীতি-নৈতিকতা বিরুদ্ধ যেকোনো বিষয়ের ব্যাপারে শাসকগোষ্ঠীকে সচেতন করে দেওয়া তাদের ধর্ম। মানা বা না মানা সেটা শাসকবর্গের একান্ত বিষয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা পরবর্তী প্রেক্ষাপটগুলোর কথা বিবেচনা করলে বিষয়টি ভালোভাবে বোঝা যাবে। ’৭৫ এর ১৫ আগষ্ট সপরিবারে জাতির জনকের হত্যার পরে জেনারেল জিয়ার প্রতিষ্ঠিত সেনা সরকারের আমলেও আমলাতন্ত্র যেমন কোনো টু শব্দ করেনি, এরশাদের পতনের পরে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে গঠিত গণতান্ত্রিক সরকারের আমলেও করেনি আবার ২০০৭ এর ওয়ান ইলেভেনে সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপের সময়ও করেনি। রাষ্ট্রক্ষমতার লড়াইয়ের চেয়ে প্রশাসনে নিরবচ্ছিন্ন ভূমিকা পালন করাই আমলাতন্ত্রের বৈশিষ্ট্য।

সুনির্দিষ্ট পরীক্ষা পদ্ধতির মাধ্যমে আমলাগণের নিয়োগ হয়। কর্মজীবনে তারা প্রশাসক বা পালকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। সরকারকে রাষ্ট্র পরিচালনায় যাবতীয় সহযোগিতা করলেও সফলতা বা দুর্নামের ভাগীদার আমলাগণ হন না। কোনো মেগা প্রজেক্ট বাস্তবায়িত হলে সে আমলের সরকার বা মন্ত্রী বা সংসদ সদস্যের সুনাম হয়। পর্দার আড়ালের খসড়া ও খুচরো কাজ যে আমলারা করলেন তাদের কোনো সুনাম হয় না। এককথায়, আমলারা হন দায়মুক্ত।

শ্রেণিবিভাগ

আমলাতন্ত্রের সূচনা হওয়ার পরে যুগে যুগে দেশে দেশে এটি পরিবর্তিত, পরিবর্ধিত ও বিবর্তিত হয়েছে। রাষ্টবিজ্ঞানীরা প্রচলিত আমলাতন্ত্রগুলোকে পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে আমলাতন্ত্রের শ্রেণিবিন্যাস করেছেন। আমলাতন্ত্রের প্রকারভেদ বর্ণনা করার আগে অধ্যাপক গার্নারের আমলাতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার সংজ্ঞাটি তুলে দিচ্ছি,

যে শাসনব্যবস্থায় মন্ত্রীদের দপ্তরগুলোর দ্বারা শাসন পরিচালিত হয় এবং ঐ দপ্তরগুলোর প্রশাসকদের দ্বারা নীতি নির্ধারিত হয় সে শাসনব্যবস্থাকে আমলাতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা বলে।

সমাজতাত্ত্বিকগণ আমলাতন্ত্রকে বিভিন্ন শ্রেণিতে বিভক্ত করেছেন। মার্লি ফেনসড এমন পাঁচ ধরনের আমলাতন্ত্রের কথা বলেছেন। মার্কস বলেছেন চার ধরনের আমলাতন্ত্রের কথা। অন্যদিকে, আধুনিক সমাজতাত্ত্বিক আইজেনস্ট্যাট শাসকবর্গের সাথে সম্পর্কের ভিত্তিতে আমলাতন্ত্রকে চার ভাগে ভাগ করেছেন।

মার্লি-ফেনসড এর আমলাতন্ত্রগুলো হলো :

  • প্রতিনিধিত্বমূলক আমলাতন্ত্র
  • সামরিক শাসন ব্যবস্থার আমলাতন্ত্র
  • একদলীয় শাসনব্যবস্থার আমলাতন্ত্র
  • একনায়কতন্ত্রের আমলাতন্ত্র
  • আমলা-শাসিত আমলাতন্ত্র

যেসব রাজনৈতিক ব্যবস্থায় ক্ষমতা বা কর্তৃত্ব প্রতিযোগিতামূলক দলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা দ্বারা নির্ধারিত হয় তাকে প্রতিনিধিত্বমূলক আমলাতন্ত্র বলা হয়। এ ধরনের আমলাতন্ত্র দলীয় ব্যবস্থার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়ে থাকে। রাজনৈতিক ব্যবস্থার মূলনীতির সঙ্গে আমলাতন্ত্রের মূলনীতির সামঞ্জস্যতা প্রয়োজন হয় এখানে। কোনো দেশে সামরিক আইন জারি হলে দেখা যায় সামরিক আমলারাই ক্ষমতার কেন্দ্র চলে আসে। প্রশাসনে ব্যাপক সামরিকায়ন করা হয়। প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক একচ্ছত্র অধিপতি হিসেবে আবির্ভূত হন। তিনি সামরিক বাহিনীর অনেক অফিসারকে বেসামরিক প্রশাসনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করেন। তখন সামরিক আমলাতন্ত্রের ভিত প্রতিষ্ঠিত হয়।

একদলীয় শাসনব্যবস্থা যেদেশে প্রতিষ্ঠিত হয় সেখানকার আমলাতন্ত্রকে শাসকগোষ্ঠী তাদের নীতি বাস্তবায়নের কাজে সরাসরি ব্যবহার করেন। আমলাতন্ত্রকে আইন করে নির্দিষ্ট ক্ষমতা প্রদান করা হয়। গণচীনের আমলাতন্ত্র একদলীয় আমলাতন্ত্রের প্রকৃষ্ট উদাহরণ। অনেক বিশেষজ্ঞ ভারতে কংগ্রেস দলের দীর্ঘদিনের শাসনের ফলে প্রশাসনে একদলীয় আমলাতন্ত্রের উদ্ভবের লক্ষণ দেখেছিলেন। একনায়কতান্ত্রিক দেশে রাষ্ট্রের একমাত্র ভাগ্য নির্ধারক হন একজন ব্যক্তি। আমলারা তার কথাতেই রাষ্ট্র পরিচালনা করে। যোগ্যতা বা সিনিয়রিটির চেয়ে পদোন্নতি নির্ভর করে সুপ্রীম লিডারের সন্তুষ্টি উপর। হিটলার বা মুসোলিনির শাসনামলে জার্মানি ও ইতালিতে এ ধরনের আমলাতন্ত্রের উদ্ভব হয়েছিল। বর্তমানে উত্তর কোরিয়াতে এ ধরনের আমলাতন্ত্রের চল আছে।

সবশেষের প্রকারটি হলো আমলা-শাসিত আমলাতন্ত্র। এ ধরনের আমলাতন্ত্রে আমলারাই শাসনব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করে। তারাই আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করে। ঔপনিবেশিক আমলে বিভিন্ন দেশের উপনিবেশগুলোতে এ ধরনের আমলাতন্ত্র দেখা গিয়েছিল। প্রশিক্ষিত একটি আমলাগোষ্ঠীর দ্বারা কলোনি স্থাপনকারী দেশগুলো তাদের উপনিবেশের ভূখণ্ডগুলোতে শাসনব্যবস্থা পরিচালনা করে। ব্রিটিশরা ভারতীয় উপমহাদেশ শাসন করত মাত্র কয়েকশ বা হাজারখানেক আমলার দ্বারা। তৎকালীন এ উপমহাদেশীয় ভূখণ্ডে আমলা-শাসিত আমলাতন্ত্র দেখা গিয়েছিল।

মার্কস আধুনিক রাষ্ট্রগুলোকে আমলাতান্ত্রিক বলে উল্লেখ করেছিলেন; Image Source : socialisteconomist.com
মার্কস আধুনিক রাষ্ট্রগুলোকে আমলাতান্ত্রিক বলে উল্লেখ করেছিলেন; Image Source: socialisteconomist.com

মার্কস ইতিহাস বিশ্লেষণ করে চার ধরনের আমলাতন্ত্রের কথা উল্লেখ করেছেন-

  • অভিভাবক আমলাতন্ত্র
  • জাতভিত্তিক আমলাতন্ত্র
  • পৃষ্ঠপোষিত আমলাতন্ত্র
  • মেধাভিত্তিক আমলাতন্ত্র

আমলাতন্ত্র যেখানে অভিভাবকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয় তাকে অভিভাবক আমলাতন্ত্র হিসেবে উল্লেখ করেছেন মার্কস। প্রাচীন চীন ও রাশিয়া, মিশরের ফারাওদের আমলাতন্ত্র ছিল অভিভাবক আমলাতন্ত্র। জাতভিত্তিক আমলাতন্ত্রে আমলাগণ নিযুক্ত হতেন একটি বিশেষ গোষ্ঠী থেকে। উনবিংশ শতকের ইংল্যান্ডে পৃষ্ঠপোষিত আমলাতন্ত্রের প্রচলন ছিল। মেধাভিত্তিক আমলাতন্ত্র আধুনিক পশ্চিমা সমাজে দেখা যায়। আমলা নিয়োগের একমাত্র মাপকাঠি হিসেবে মেধাকে বিবেচনা করা হয় সেখানে।

১৮৮৫ সালের কার্টুনটিতে তৎকালীন আমেরিকায় মেধাভিত্তিক আমলাতন্ত্রের প্রবর্তনের ফলে স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর হতাশার দিকটি প্রকাশ পেয়েছে; Image Source : courses.lumenlearning.com
১৮৮৫ সালের কার্টুনটিতে তৎকালীন আমেরিকায় মেধাভিত্তিক আমলাতন্ত্রের প্রবর্তনের ফলে স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর হতাশার দিকটি প্রকাশ পেয়েছে; Image Source: courses.lumenlearning.com

আইজেনস্ট্যাট আমলাতন্ত্রের শ্রেণিবিন্যাস করেছিলেন শাসকশ্রেণীর সঙ্গে সম্পর্ক ও আনুগত্যের ওপর ভিত্তি করে। তাঁর চারটি আমলাতন্ত্র হচ্ছে –

  • শাসকশ্রেণীর সেবায় নিয়োজিত আমলাতন্ত্র
  • শাসকবর্গের অনুগত আমলাতন্ত্র
  • আত্মসেবায় নিয়োজিত স্বাতন্ত্র্যবোধসম্পন্ন আমলাতন্ত্র
  • সামগ্রিকভাবে রাষ্ট্রের সেবায় নিয়োজিত আমলাতন্ত্র

আমলাতন্ত্র নিয়ে মাও সে তুং এর বিশটি প্রকাশ

মাও সে তুং তার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক জীবনে সঞ্চিত অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে ১৯৭০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আমলাতন্ত্রের বিশটি বৈশিষ্ট্য বা প্রকাশ প্রকরণ তুলে ধরেন। এটি ‘Twenty Manifestations of Bureaucracy’ নামে পরিচিত। এখানে আমলাদের প্রতি মাও-এর মনোভাব বা দৃষ্টিভঙ্গি ফুটে উঠেছে। ম্যানিফেস্টেশনগুলোতে আমলাতন্ত্রের প্রতি মাও-এর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল একদমই বিষে ভরা। তিনি আমলাদের অহংকারী, জড়বুদ্ধিসম্পন্ন, অলস, নির্বোধ, কলহপ্রিয়, চাটুকার ইত্যাদি বিভিন্ন নির্গুণ বিশেষণে বিশেষায়িত করেছেন। গণচীনে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের পর কমিনিউস্ট পার্টির কংগ্রেসগুলোতে আমলাদের ক্ষমতা খর্ব করে যৌথ পরিচালনাকারী সংস্থা হিসেবে বিপ্লবী কমিটির ক্ষমতার বিস্তৃতি ঘটানো হয়েছিল। অনেকে মনে করেন, চীনে রাজবংশের শাসনামলে যে জটিল ও অংহকারী আমলাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা হয়েছিল সেই সিন্ডিকেট ও পরম্পরাকে ভাঙতেই সমাজতান্ত্রিক নেতারা আমলাতন্ত্রের সমালোচনা করে তাদের চাপে রাখতে চেয়েছেন।

মাও সে তুং আমলাতন্ত্রের বিশটি ম্যানিফেস্টেশন প্রকাশ করেছিলেন; Image Source : britanica.com
মাও সে তুং আমলাতন্ত্রের বিশটি ম্যানিফেস্টেশন প্রকাশ করেছিলেন; Image Source: britanica.com

আরেক সমাজতান্ত্রিক নেতা লেনিন তার ‘সমাজ ও রাষ্ট্র’ গ্রন্থটিতে শ্রমিক শাসিত রাষ্ট্রে আমলা ও শাসকদের নিয়ন্ত্রণে রাখার পরিকল্পনা পেশ করেছিলেন। সেটি ছিল এ রকম-

  • সকল কর্মচারী জনগণের ভোটে নির্বাচিত এবং প্রয়োজন হলে নির্বাসিত হবেন।
  • একজন দিনমজুরের চেয়ে কেউই বেশি মজুরি পাবে না।
  • সমগ্র জনতাই সরকারি ক্ষমতার অংশীদার হবেন। সবাই আমলার কাজ করলে প্রচলিত ধারার এলিট শ্রেণির আমলার উদ্ভব হওয়ার কোনো সম্ভাবনা থাকবে না।

আমলাতন্ত্র মূলত বর্তমানের ন্যায় প্রশাসকরূপে প্রকাশিত হয়েছিল সামন্তবাদী যুগে। পুঁজিবাদী যুগে শাসকবর্গ আমলাতন্ত্রকে ব্যবহার করেছেন শাসন পাকাপোক্ত ও বিস্তৃত করার জন্য। সাম্রাজ্যবাদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে আমলাতন্ত্রের হাত ধরে। আমলাতন্ত্রের অতিমাত্রায় শাসকরূপে আবির্ভাব ব্রাহ্মণ্যবাদেরও জন্ম দিয়েছে। এসব কারণে সমাজতান্ত্রিকগণ আমলাতন্ত্রকে কড়াভাবে সমালোচিত করেন। (এরপর দেখুন ২য় পর্বে)

Related Articles