মরুভূমির বুকে ঘোড়া ছুটিয়ে চলছেন আপনি, আপনার কাঁধের পোষা ঈগল পাখিটা মাঝে মাঝে আকাশে উড়াল দিয়ে ফেরত আসছে। ধুলো উড়িয়ে আপনি ছুটে চলেছেন প্রতিশোধের নেশায়। কখনো দেখা হচ্ছে অনিন্দ্য সুন্দরী ক্লিওপেট্রার সাথে, কখনোবা ফারাও টলেমি; জুলিয়াস সিজারই বা বাদ যাবে কেন? এ সবগুলোর সুযোগই পেয়ে যাবেন প্রায় ২,০৭০ বছর আগের পটভূমিতে বানানো ইউবিসফটের Assassin’s Creed: Origins গেমটিতে। সাথে এটাও জেনে যাবেন কীভাবে শুরু হলো এ গুপ্তঘাতক সঙ্ঘের সূচনা।

গেমের প্রচ্ছদ; Source: Wikimedia Commons

অ্যাসাসিন্স ক্রিড সিরিজের দশম বড় গেমটিতে আপনাকে খেলতে হবে বায়েক নামের একজন মেজায় এর ভূমিকায়। মেজায় (Medjay) বলতে বোঝায় মিশরের রক্ষক। প্রাচীন মিশরের নিউ কিংডম আমলে মেজায়দের দেখা যেত। তাদের কাজ ছিল অনেকটাই পুলিশের মতো, যেখানে অন্যায় সেখানে ছুটে গিয়ে প্রতিকার করা।

হায়ারোগ্লিফিকে মেজায়; Source: Wikimedia Commons

ঘটনার সূচনা বর্তমান অ্যাবস্টার্গোর হিস্টোরি রিসার্চ ডিভিশনের একজন গবেষক লায়লা হাসানকে দিয়ে। লায়লা দুটো মমি আবিষ্কার করেন, একটি বায়েকের, অপরটি তার স্ত্রী আয়ার। তাদের স্মৃতিই লায়লা হাসান নিজের তৈরি করা অ্যানিমাস দিয়ে ভ্রমণ করে, সবই আসলে অ্যাবস্টার্গোর উচ্চ মহলের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য। তবে ইউবিসফট ধীরে ধীরে বর্তমান দিনের কাহিনীতে জোর দেয়া একদমই কমিয়ে দিয়েছে, যেটা হতাশাজনক। ডেজমন্ড মাইলস চরিত্রের মৃত্যুর সাথে সাথে বর্তমানের কাহিনীরও কি ইতি ঘটেছে?

প্রাচীন মিসরের সিওয়া নামের মরুদ্যানের বাসিন্দা বায়েক। সময়টা খ্রিস্টের জন্মের ৪৯ বছর আগে। স্ত্রী আয়া আর শিশুপুত্র খেমুকে নিয়ে খুব সুখেই দিন কাটছিল মেজায় বায়েকের। সুখের নীড়ে একদিন হঠাৎ বাধ সাধে ক’জন মুখোশ পরা লোক। তারা অপহরণ করে নেয় বায়েক আর তার ছেলে খেমুকে। জ্ঞান ফিরলে বায়েক নিজেকে আবিষ্কার করে আমুন দেবতার মন্দিরের নিচে। কোনো একভাবে খেমু তার বাবাকে মুক্ত করে ফেলতে চেষ্টা করে, কিন্তু ধরা পড়ে যাওয়াতে ধ্বস্তাধস্তি শুরু হয়। হট্টগোলের মাঝে একজন মুখোশধারীকে মারতে গিয়ে হাতের ছোড়া দিয়ে ভুলক্রমে নিচের ছেলে খেমুকেই হত্যা করে ফেলে বায়েক।

গেমে খুঁজে পাবেন ক্লিওপেট্রাকে; Source: J Station X

এক বছর পরের কাহিনী। সেই মুখোশধারীদের হত্যা করে পুত্রহত্যার প্রতিশোধ নিতে মিশরের পথে প্রান্তরে ঘুরতে থাকে বায়েক। কখনো স্ত্রী আয়া হয় তার সঙ্গী। তখন চলছে টলেমির রাজত্বকাল। বায়েক কেবল প্রতিশোধস্পৃহায় থাকলেও আয়া ওদিকে টলেমির বোন ক্লিওপেট্রাকে সিংহাসনে বসাতে চায়। বায়েক আর আয়া কি পারবে তাদের আকাঙ্ক্ষাগুলো পূরণ করতে? এখানে জুলিয়াস সিজার, ব্রুটাসদের আগমনই বা কীভাবে? জানতে হলে খেলতে হবে গেমটি পুরোটা।

অন্যান্য অ্যাসাসিন্স ক্রিড গেমের মতো এখানে সেই পরিচিত ঈগল ভিশন নেই! এর বদলে আছে সেনু নামের এক পোষা ঈগল, যাকে আপনি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন ওপর থেকে, তার সাহায্যে দেখে নিতে পারবেন কোথায় কোথায় শত্রু আছে বা নেই। চাইলে তাকে দিয়ে শত্রুকে আক্রমণও করাতে পারবেন।

ঈগল সেনু আপনার নিয়ন্ত্রণে; Source: GameRevolution

কমব্যাট স্টাইল আগাগোড়া পরিবর্তন করা হয়েছে অন্য গেমগুলোর চেয়ে। কিছুটা কঠিনই বলা চলে। তবে আপনি যদি এ সিরিজের দীর্ঘ সময়ের ভক্ত হয়ে থাকেন, তবে আপনার বেশ সময়ই লাগবে নতুন কন্ট্রোলে অভ্যস্ত হতে, প্রথমদিকে কিছুটা অস্বস্তি অনুভব করলেও ধীরে ধীরে সয়ে যাবে।

গেমের গ্রাফিক্সের কথা তো নতুন করে বলবার কিছু নেই। সিরিজের সেরা গ্রাফিক্সই আপনি পাবেন এখানে। অসম্ভব নিখুঁত আর সুবিশাল প্রাচীন মিশর দেশ আপনাকে উপহার দিয়েছে ইউবিসফট এ গেমে। খেলতে গিয়ে আপনি মুগ্ধ নয়নে চেয়ে থাকবেন অনেক সময়, মরুর বুকে রাতের চাঁদ কিংবা পিরামিডের সুউচ্চ চূড়োয় উঠে চারদিকে তাকিয়ে থাকা- এ কাজগুলো প্রায়ই করতে ইচ্ছে করবে আপনার। আর এত বড় মানচিত্র আগে কোনো অ্যাসাসিন্স ক্রিড গেমে দেখা যায়নি। ব্ল্যাক ফ্ল্যাগের সামুদ্রিক অভিযানের সফলতা দেখে ইউবিসফট এ গেমেও বিশাল সমুদ্রের বুকে জাহাজ চালিয়ে নেবার মিশন রেখেছে, সামুদ্রিক যুদ্ধও আছে। আছে নদীর তলে গুপ্তধন অনুসন্ধানও।

চরণতলে বিশাল মরু দিগন্তে বিলীন; Source: Steam

অ্যাসাসিন্স ক্রিড ২ গেমে আমরা দেখেছিলাম এৎজিও গুপ্তহত্যাগুলো করবার পর ‘রেকুইস্কাৎ ইন পাচ্চে’ (Rest in Peace) বলে শেষ করত। পরের গেমগুলোতে অনেকটা এ ধাঁচেরই কিছু রাখার চেষ্টা করা হলেও, অরিজিন্স গেমে এসে প্রতিটি অ্যাসাসিনেশনের পর চমৎকার সব কাটসিন দেখানো হয়, যেগুলো আসলেই উপভোগ্য!

তবে গেমটি খুবই বড়, এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। এক বসাতে শেষ করবার মতো নয়। শুধু মেইন স্টোরিলাইন শেষ করাই যদি আপনার উদ্দেশ্য থাকে, তাহলেও আপনার লেগে যাবে ২৬-৩০ ঘণ্টা। এদিক-ওদিকের এক্সট্রা মিশনগুলোসহ শেষ করতে চাইলে প্রায় ৪৫ ঘণ্টা লাগবে। সত্যি বলতে, মেইন স্টোরি শেষ করতে হলেও আপনাকে আগে কিছু সাইড মিশন খেলে আসতে হবে। আর, একদম পুরো শতভাগ গেম শেষ করতে চাইলে আপনার প্রায় ৭৪-৭৫ ঘণ্টা লেগে যাবে!

কমব্যাট সিস্টেম এবার ব্যতিক্রমী; Source: Forbes

মিউজিকের কথাতে আসা যাক। জেস্পার কিডের করা অ্যাসাসিন্স ক্রিডের সেই মায়াবী এৎজিওস ফ্যামিলি সাউন্ডট্র্যাক এবারও আছে, তবে কিনা প্রাচীন মিশরীয় ধাঁচে। এছাড়াও মিশরীয় মিউজিকগুলো খেলবার সময় আপনাকে অপরিসীম আনন্দ না দিয়ে ছাড়বে না।

ব্ল্যাগ ফ্ল্যাগ গেম বানাবার পর ২০১৪ সালের শুরুর দিক থেকেই অরিজিন্স বানাতে শুরু করে ইউবিসফট। আগে এর নাম ছিল অ্যাসাসিন্স ক্রিড এম্পায়ার, এবং বেশ কিছু তথ্য ফাঁস হয়ে যায় গেমটি নিয়ে। পরে ২০১৭ সালের ১১ জুন অফিসিয়াল ঘোষণা দেয়া হয় গেমটি নিয়ে। কেন মিশর? কারণ, ইউবিসফট একটি জরিপ চালিয়ে দেখে যে, ভক্তরা এরপর প্রাচীন মিশরই সবচেয়ে বেশি চায়। এছাড়াও বিবেনায় ছিল ফিউডাল জাপান ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পটভূমিও। মিশর ঠিক করবার পর অনেক মিশর বিশেষজ্ঞকে এ প্রজেক্টে নেয়া হয় নিখুঁত ইতিহাস উপহার দেবার জন্য। গেম খেলতে খেলতে আপনার ধারণা হয়ে যাবে সে আমলের পরিস্থিতি আর ভাষা নিয়েও!

সামুদ্রিক অভিযানও বাদ যায়নি; Source: SegmentNext

আইজিএন গেমটিকে রেটিং দিয়েছে ৯/১০, মেটাক্রিটিক ৮৪/১০০, গেমস্পট ৭/১০, পলিগন ৮.৫/১০। গেমটিতে দু’স্তরের শক্তিশালী নিরাপত্তা রেখেছে ইউবিসফট, এজন্য এখনো ক্র্যাক করতে পারেনি পাইরেটরা। ডিসেম্বর ১৫, ২০১৭ তারিখ পর্যন্ত ১৫ লক্ষেরও বেশি কপি বিক্রি হয়েছে গেমটির।

গেমটি চালাতে আপনার অন্তত (Minimum Requirements) যা থাকা লাগবে:

Intel CPU: Core i5-2400S 2.5GHz
AMD CPU: FX-6350
Nvidia Graphics Card: GeForce GTX 660
AMD Graphics Card: Radeon R9 270
VRAM: 2 GB
RAM: 6 GB
OS: Windows 7 64 bit
Direct X: DX 11
HDD Space: 50 GB

তবে ঠিকঠাক চালাবার জন্য (Recommended Configuration) দরকার পড়বে ঠিক এরকম এর চেয়ে বেশি ভালো একটি কনফিগারেশন:

Intel CPU: Core i7-3770 4-Core 3.4GHz
AMD CPU: FX-8350
Nvidia Graphics Card: GeForce GTX 760
AMD Graphics Card: Radeon R9 280X
VRAM: 2 GB
RAM: 6 GB
OS: Windows 7 64 bit
Direct X: DX 11
HDD Space: 50 GB

পিরামিড বেয়ে নামছে বায়েক; Source: PS Wallpapers

অ্যাসাসিন্স ক্রিড ২ এর পর এ গেমটিকেই বলা হচ্ছে সিরিজের সেরা। ন্যায়-অন্যায়ের বাঁধাধরা নিয়ম যে সমাজে ছিল না, সেখানে সত্যের অবতার হিসেবে নিজেকে চালিয়ে নেবার দায়িত্ব এ গেমে আপনার। তবে আর দেরি কেন, বসে পড়ুন এখুনি খেলতে!

ফিচার ইমেজ: Wallpaper Abyss – Alpha Coders