ওয়ান ইন্ডিয়ান গার্ল: চেতন ভগতের নারীবাদী ও মুক্তচিন্তার প্রকাশক মাস্টারপিস

বিয়ের সময় “বরপক্ষ কেন মানিয়ে নেবে”, “কনেপক্ষ মানিয়ে নেবে, এটাই স্বাভাবিক” এ ধরনের কথাবার্তা নিজের পরিবারে কিংবা আশেপাশের সমাজের কারো বিয়েতে শোনেননি, এমন মানুষ উপমহাদেশে খুঁজে পাওয়া খুবই দুষ্কর। এই উপমহাদেশে বিয়ের সংস্কৃতিই কালের পরিক্রমায় এমন হয়ে গেছে যে, বিয়ে একটি মেয়ের জন্যই আশীর্বাদস্বরূপ, যা কিনা ছেলেটির থেকে মেয়ের জন্য উপহারস্বরূপ। অথচ বিয়ের ব্যাপারটির এমন হওয়ার কথা ছিল, পবিত্র একটি বন্ধন যা হবে ছেলে-মেয়ের উভয়ের একসাথে থেকে একে অপরের প্রতি দায়িত্ব পালনের অঙ্গীকার। যেখানে থাকবে ভালোবাসা, পারস্পরিক সমঝোতা। থাকবে না কোনো একপাক্ষিক কর্তৃত্ব। কিন্তু এই উপমহাদেশে বিয়ে ব্যাপারটি কর্তৃত্ব, শাসন এবং নারীদের প্রতি কিছু ভুল ধারণা ও বৈষম্যমূলক আচরণের উপরেই টিকে আছে।

ভারতীয় বিখ্যাত নারীবাদী লেখক চেতন ভগতের ‘ওয়ান ইন্ডিয়ান গার্ল’ উপন্যাসটির শুরুর দিকে পারিবারিক কিছু কথাবার্তার মাধ্যমে সুনিপুণভাবে দেখিয়ে দেওয়া হয়েছে ভারত তথা সমগ্র উপমহাদেশে বিরাজমান এই বৈষম্যটি।

চেতন ভগত; source: Times of India

উপন্যাসটি প্রথম পুরুষে বর্ণিত হয়েছে, একজন নারীর দৃষ্টিকোণ থেকে লেখা এটি লেখকের প্রথম উপন্যাস।

উপন্যাসটি রাধিকা মেহতা নামক স্বনির্ভর, কর্মজীবী, স্বাধীন এবং নারীবাদী চিন্তায় বিশ্বাসী একজন মানুষের গল্প। জীবনের ঘাত, প্রতিঘাত পেরিয়ে সাফল্যের চূড়ায় আরোহণ, শক্তভাবে নিজের নীতি ঠিক রেখে পরিবার, কর্মক্ষেত্র সকল জায়গায় দায়িত্ব পালন, কঠিন পরিস্থিতিতে ভেঙে পড়েও দৃঢ় মনোবলে প্রত্যয়ী হয়ে আবার সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া- এধরনের সকল প্রয়োজনীয় গুণের অধিকারী একজন নারী, রাধিকা মেহতা।

তার সহজাত মনোবলের দৃঢ়তার প্রকাশ দেখা যায় তার বিয়ের প্রস্তুতিকালীন সময়ে তার মাকে উদ্দেশ্য করে বলা এই কথাগুলোতে,

‘Do not use this “girl’s side” and “boy’s side” logic with me again. I don’t like it.’

-“ছেলেপক্ষ” ও “মেয়েপক্ষ” এসব যুক্তি আমাকে আর দিবে না। আমি এটি পছন্দ করি না।

বহুকাল আগে থেকেই ভারতবর্ষে কন্যাসন্তানের প্রতি অপ্রত্যাশিত দৃষ্টিভঙ্গি এবং গর্ভপাতের সংস্কৃতি বিরাজমান। প্রথম সন্তান যদি কন্যা হয়, তবে দ্বিতীয় সন্তান গর্ভে আসার পরেই দম্পতি আল্ট্রাসোনোগ্রাফি পরীক্ষার মাধ্যমে জেনে নেয় সন্তানটির লিঙ্গ, মেয়ে হলেই করানো হয় গর্ভপাত। এই ধরনের নিষ্ঠুর বাস্তব চিত্রের দেখা পাওয়া যায় উপন্যাসের মূল চরিত্র রাধিকার স্মৃতিচারণে,

‘My parents wanted a son for their firstborn. When Aditi came, they had to undo the damage as soon as possible. Hence, my father, SBI Naraina Vihar Branch Manager Sudarsan Mehta, decided to have another child with his homemaker wife Aparna Mehta. Sadly for them, the second was also a girl, which was me. It is rumoured that they tried again twice; both time my mother had an abortion because it was a girl.’ 

– আমার বাবা-মা তাদের প্রথম সন্তান হিসেবে পুত্রসন্তান আশা করেছিলেন। অদিতি জন্মানোর পর, তাদের প্রয়োজন ছিল যতো দ্রুত সম্ভব এই ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া। তারপর, আমার বাবা, এস বি আই নারায়ন বিহারের ব্রাঞ্চ ম্যানেজার, সুদর্শন মেহতা ও তার  স্ত্রী অপর্ণা মেহতা আরেকটি সন্তান জন্মদানের সিদ্ধান্ত নিলেন।তাদের জন্য দুঃখজনকভাবে, দ্বিতীয় সন্তানটিও কন্যা ছিলো, যে কিনা অামি। লোকে বলে, তারা নাকি আরো দু’বার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু উভয়বারই অামার মায়ের গর্ভপাত করানো হয়, কারণ সেটিও কন্যাসন্তান ছিলো।

ওয়ান ইন্ডিয়ান গার্ল বইয়ের প্রচ্ছদ; Source: NDTV.com

গর্ভপাত থেকে বেঁচে যাওয়া কন্যাসন্তানেরাও ভবিষ্যতে প্রতি পদে কত রকম বাধার সম্মুখীন হয়, সেটিও দেখা যায় রাধিকার  বেড়ে ওঠার সময়কার কিছু ঘটনার বর্ণনায়। বাবা-মা, বোন, সহপাঠী সকলের আচরণে দেখা যায় কিভাবে নারীকে একটি সীমাবদ্ধ গণ্ডির মধ্যে চিন্তা করা হয়। নারী মাত্রই যেন পুরুষতান্ত্রিক সমাজের নির্ধারণ করে দেওয়া নিয়ম মেনে চলা একটি যন্ত্র। গায়ের রঙ দিয়ে বিচার করা হয় সৌন্দর্য, গায়ের রঙের কারণে এমনকি অনেক সময় নিজ পরিবারের মানুষের কাছ থেকেও মেয়েরা কথা শোনে। রাধিকার বোন অদিতির তাকে বিয়ের ব্যাপারে দেয়া পরামর্শে এই দিকটি দেখা যায়।

“The younger the better. Especially for someone like you.”

– যত কম বয়সে হয়, তত ভাল। বিশেষত তোমার মতো কারো ক্ষেত্রে।

‘তার মতো’ বলে কী বোঝাতে চেয়েছে, তার সদুত্তর কখনো সে তার বোনের কাছ থেকে আর পায়নি।

রাধিকার মায়ের এই চিন্তার মধ্য দিয়েই লেখক উপমহাদেশে নারীদের গায়ের রঙ নিয়ে সম্মুখীন হওয়া পরিস্থিতির সামগ্রিক চিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন

শিক্ষাজীবনে সর্বোচ্চ ফল লাভ, মধ্যবিত্ত পরিবারে বড় হয়ে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে বিশ্বের অন্যতম বড় ব্যাংকগুলোর একটিতে কাজ পাওয়া, সব কিছুর পরেও তার মায়ের সবচেয়ে বড় চিন্তা ছিল তার বিয়ের ব্যাপারে।

অনেকটা আক্ষেপের সুরেই তাই এই চরিত্রের মুখ থেকে শোনা যায়-

“Her twenty-three-year-old daughter who grew up in middle class West Delhi, had cracked a job at one of the biggest investment banks in the world and all she cared about was its impact on her groom-hunt.”

– পশ্চিম দিল্লীর মধ্যবিত্ত পরিবারে বড় হওয়া তার ২৩ বছর বয়সী মেয়ে বিশ্বের অন্যতম বড় বিনিয়োগ ব্যাংকগুলোর একটিতে কাজ পেয়েছে, এবং তিনি শুধু চিন্তা করলেন পাত্র খোঁজার ওপর এর প্রভাবের কথা।

তার মায়ের চিন্তা ছিল, এত বেশি টাকা উপার্জন করা মেয়েকে কোনো ছেলে বিয়ে করবে, বা ছেলে বেশি উপার্জনকারী হলে কর্মজীবী মেয়েকে কেন বিয়ে করবে।

রাধিকার মায়ের এই চিন্তার চিত্রায়নের মাধ্যমেই ভারত তথা এই উপমহাদেশে নারীকে প্রতিবন্ধকতায় ফেলে রেখে একটি নির্দিষ্ট জীবনের ছকে ফেলে দেওয়ার যে প্রবণতা সেটি ফুটে ওঠে।

রাধিকার জীবনের দুটি প্রেমের গল্পের বর্ণনায় দেখা যায়, এক্ষেত্রেও তাকে সীমাবদ্ধ করে দেয়া হয়। নারীর প্রতি বৈষম্য, একটি অখণ্ড সত্ত্বারূপে দেখা এসব শুধু ভারতবর্ষেই নয়, কম বেশি পুরো পৃথিবীতেই পরিলক্ষিত হয়।

দেবাশিষ, তার প্রথম প্রেমিক প্রথম দিকে কঠোর পরিশ্রমী ও উচ্চাকাঙ্ক্ষী স্বপ্ন দেখা রাধিকাকে মেনে নেয়। যতদিন যেতে থাকে, রাধিকার মায়ের তথা পুরুষতান্ত্রিক সমাজের অনেক মায়ের আশঙ্কার কারণই যেন ধরা পড়ে দেবাশিষের আচরণে।

দেবাশিষ তার স্ত্রী হিসেবে চায় অতি সাধারণ ভারতীয় মেয়ে, যে বাসায় থেকে সন্তান পরিচর্যা করবে শুধু, সেই সাথে ‘তথাকথিত’ ‘মেয়েলি’ ধরনের হবে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে বেশিরভাগ পুরুষেরা নিজের থেকে সফল নারীকে খুব একটা স্বাভাবিক ভাবে গ্রহণ করতে পারে না, দেবাশিষ-রাধিকার সম্পর্কে ব্যাপারটি স্পষ্ট।

রাধিকার আরেক প্রেমিক, নীল। রাধিকার সাথে সম্পর্কে সে জড়ায়ই রাধিকার স্বাধীন দৃষ্টিভঙ্গি, উচ্চাকাঙ্ক্ষায় মুগ্ধ হয়ে। নীল একজন বিবাহিত পুরুষ, যে পারিবারিক সমস্যায় জর্জরিত। রাধিকার স্বভাবের নারীকে নীল প্রেমিকা হিসেবেই অগ্রাধিকার দেয়, স্ত্রী হিসেবে নয়। সমস্যার সূত্রপাত এখানেই। রাধিকার ইচ্ছাকে এখানেই আরেকবার কিছুটা ভিন্নভাবে কিন্তু নির্দিষ্ট ছকে চিন্তা করে নেওয়া হয়।

রাধিকা একজন মানুষ হিসেবে চায় স্বাধীনভাবে জীবনযাপন করতে, সফল হতে। কর্মক্ষেত্রের স্বাধীনতা, কাজ করাকে সে কারো দেওয়া অধিকার মনে করে না। একজন মানুষ হিসেবেই এটি তার স্বাভাবিক প্রবৃত্তি হিসেবেই সে ধরে নেয়। কোনো পুরুষ তাকে অধিকার ‘দিচ্ছে’, এখানেই তার মনে প্রশ্ন। নারী তো অর্ধেক কোনো সত্ত্বা নয় কিংবা অন্য কারো অধীনস্থ নয় যে তাকে অনুমতি নিয়ে, কারো দিয়ে দেয়া বিকল্প কিছু থেকে একটি বেছে নিয়ে বেঁচে থাকতে হবে।

অন্যদিকে একজন নারী হিসেবে সে একটি পরিবার চায়, চায় মা হতে। তার কাছে পরিবার ও কর্মক্ষেত্র একটি আরেকটির জন্য বাধাস্বরূপ নয়। উদ্ভূত সমস্যার কারণ পুরুষতান্ত্রিক সমাজের নির্ধারণ করে দেওয়া নিয়ম-নীতি, যা শুধু পুরুষের সময় ও সমস্যার কথা চিন্তা করেই নিয়মগুলো তৈরি করে।

বইটি চেতন ভগত একজন নারীর দৃষ্টিকোণ থেকে লিখে যেভাবে সুস্পষ্টভাবে সমস্যাগুলোর দিকে আঙুল তুলেছেন, সেটি প্রশংসার দাবিদার। নারীর উপমহাদেশীয় প্রেক্ষাপট থেকে যৌনতার ব্যাপারে লুকোছাপার ব্যাপারটিও রাধিকার কথায় উঠে আসে। ভারতবর্ষের বাস্তব চিত্র কখনো আক্ষেপ, কখনো বা বিদ্রূপ বা তিরস্কারের মধ্যে ফুটে উঠেছে, যে কারণে খুবই কম সময়ের মাঝে বইটি ভারত সহ অনেক দেশের মানুষের মধ্যে জনপ্রিয়তা পায়।

সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি, পারিবারিক অনুশাসন, নারীর ব্যক্তিগত চিন্তা স্বাধীনতা, আকাঙ্ক্ষা সব দিক মিলিয়ে নারীর অবস্থা কেমন এবং নারীর মানুষ হিসেবেই কী প্রাপ্য, তা নিখুঁতভাবে ফুটে উঠেছে। একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের বাইরেও মুক্ত চিন্তার সমাজেও যে নারীর প্রতি চিন্তা ভাবনায় কিছুটা বৈষম্য রয়েই যায়, সেটি লেখক অদ্ভুত দক্ষতায় দেখিয়ে দিয়েছেন। সবকিছু মিলিয়েই অবশ্য পাঠ্য একটি বই ‘ওয়ান ইন্ডিয়ান গার্ল’।

ফিচার ইমেজ- NDTV.com

Related Articles