অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, পৃথিবীর আহ্নিক গতি অর্থাৎ দিন-রাত্রির সূচনা প্রতিটি প্রাণীর কাজকর্মে প্রভাব ফেলে। এমনকি সেটা মানুষের আচার আচরণেও কম উল্লেখযোগ্য নয়। যেমন আমরা সাধারণত দিনের শুরুর দিকটায় নিজেকে খুব চাঙ্গা অনুভব করি, যা আমাদের কাজকর্মের চাঞ্চল্যে প্রমাণিত। অন্যদিকে দুপুর গড়িয়ে বিকাল, বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা, রাত- তার মানে যত অন্ধকার বাড়তে থাকে ততই আমাদের স্নায়ুর কার্যকারিতা কমতে থাকে। এখন আপনি বলতে পারেন দিনের বেলায় প্রচুর কাজকর্ম করার ফলে মস্তিষ্ক ক্লান্তি অনুভব করে, যার কারণে স্নায়ু দুর্বল হয়ে যায়। কিন্তু ভেবে দেখুন, আপনি যদি সারাদিন ঘুমিয়েও রাতের অন্ধকারে জেগে থাকার চেষ্টা করেন, আপনি কতটুকু সফল হবেন? আপনার মস্তিষ্ক সারাদিন কোনো কাজ না করে অলস সময় কাটালেও রাতে নিদ্রাভাব জাগবে। আপনি হয়ত ঘুম আটকে রাখতে পারবেন, কিন্তু ঝিমুনিকে আটকাতে পারবেন না। অর্থাৎ আপনার স্নায়ু দুর্বল হয়ে আসবেই।

এর কারণ মস্তিষ্কের ক্লান্তি বা দুর্বলতা নয়। সার্কাডিয়ান রিদম এর মাধ্যমেই বিজ্ঞানীরা মানুষের এই আচরণের ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি পর্যন্ত সার্কাডিয়ান রিদম (প্রাণীর দৈনন্দিন অভ্যাসে সূর্যালোকের প্রভাব) সাধারণ মানুষের নিকট তেমন একটা জনপ্রিয়তা লাভ করেনি। কেবল গবেষণাগারেই সীমাবদ্ধ ছিলো। ১৯৫০ এর দিকে ফ্রান্স হার্বার্ট নামক এক বিজ্ঞানী ‘Circa’ (About)‘Diem’ (Day) এই দুটো ল্যাটিন শব্দকে জোড়া দিয়ে ‘Circadian Rhythm‘ নামের উদ্ভব ঘটান, যার শাব্দিক অর্থ হল ‘দিন সম্বন্ধীয়’।

আর এটি বিজ্ঞানীদের নতুন কোনো আবিষ্কার নয়। মিশরীয় সভ্যতার জ্যোতির্বিদেরাও এই ব্যাপারে হালকা কিছু ধারণা রাখতেন। তারা ভাবতেন, দিন-রাতের পর্যায়ক্রমতার ফলেই মানুষের মধ্যে নিজের অজান্তে একটা প্রাকৃতিক রুটিন তৈরী হয়। এবং শুধু মানুষ নয়, এটি সৃষ্টির আদিলগ্ন হতেই প্রতিটি প্রাণীতে লক্ষণীয়। এখন যদি দিন শেষে রাতের আগমন এবং আবার দিনের শুরু- এমন একটা চক্রক্রমিক অবস্থা থেকে আপনাকে সরিয়ে হঠাৎ করেই এমন কোনো জায়গায় স্থানান্তর করা হয় যেখানে কোনো দিন নেই, শুধুই রাত, কিংবা কোনো রাত নেই, শুধুই দিন, তখন কী হবে? এই প্রশ্নের উত্তর উঠে আসে মেমোসা গাছের সেই পরীক্ষা থেকে।

মেমোসা গাছের উপর সার্কাডিয়ান রিদম পর্যবেক্ষণ; Source: nobelprize.org

১৮ শতকের দিকে মেমোসা গাছের উপর একটি পরীক্ষা চালানো হয়। মেমোসা গাছের একক বৈশিষ্ট্য হলো, দিনের বেলা এটি সূর্যের দিকে নিজের পাতাগুলো মেলে ধরে আর রাত হলেই সেগুলো একদম বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো চুপসে যায়। কেবলমাত্র পরীক্ষা করার উদ্দেশ্যেই এটিকে দিনের আলো থেকে সরিয়ে একটা অন্ধকার ঘরে রেখে দেখা হয়, তবুও একই আচরণ দেখা যায়। অথচ সেখানে সূর্যের আলো প্রবেশের কোনো সুযোগ ছিলো না। কয়েকদিন এমন হওয়ার পর ধীরে ধীরে এটি পাতাগুলোকে মেলে ধরা বন্ধ করে দেয়। এ থেকে বোঝা যায় মেমোসা গাছের শরীরে ছিলো কোনো এক প্রাকৃতিক ঘড়ি, যা তাকে প্রতিদিন সকালে গাছের পাতা মেলে ধরতে শিখিয়েছে এবং হঠাৎ পরিবেশ পরিবর্তন হওয়ার পরেও তার অভ্যাস সাথে সাথে পরিবর্তন হয়নি। ঠিক তেমনই আপনাকে হঠাৎ এমন কোনো জায়গায় নিয়ে যাওয়া হলে যেখানে দিন-রাত নেই, সেখানে ২৪ ঘন্টার মধ্যে একবার হলেও আপনার চোখে ঘুম নেমে আসবে। এটাই মূলত সার্কাডিয়ান রিদম।

দিন যত বাড়তে থাকে, ততই ঘুমের প্রয়োজনীয়তা বাড়তে শুরু করে, যা সার্কাডিয়ান রিদমের প্রভাব; Source: likedin.com

এই সার্কাডিয়ান রিদম নিয়ে গবেষণা করে ফিজিওলজিতে এ বছর নোবেল পেলেন যুক্তরাষ্ট্রের তিন বিজ্ঞানী জেফারি হল, মাইকেল রোসব্যাশ আর মাইকেল ইয়াং। জেনে নিই তাদের সুকীর্তির কথা।

জিনতত্ত্বের প্রারম্ভকাল থেকেই মৌমাছি অতি সুবিধাজনক এক গিনিপিগ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। তাদের এমন সুসংবদ্ধ জীবনব্যবস্থা মানুষের মধ্যেও খুব একটা দেখা যায় না। দৈনিক কার্যকলাপে একটা নীতিগত ছাপ রয়েছে মৌমাছির। নিজের দায়িত্ব থেকে একচুলও নড়তে দেখা যায় না। এমন ছকবাঁধা আচরণের কারণটা কী?

বিজ্ঞানীরা আগেই বলেছেন, মৌমাছির এমন নিয়ম-নিষ্ঠার পেছনে রয়েছে তার ক্রোমোজোমের কোনো একটি জিনের প্রভাব। কেননা, প্রাণীর যেকোনো আচরণ তার জিন দ্বারাই প্রভাবিত। কিন্তু বিজ্ঞানীরা এই জিনটিকে শনাক্ত করতে পেরেছেন মাত্র কয়েক বছর আগে (১৯৭০-এ বিজ্ঞানী সেমুওর বেনজার মৌমাছির ক্রোমোজোমে এই জিন আবিষ্কার করেন)।

১৯৮৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বিজ্ঞানী জেফারি হল এই জিনকে ক্রোমোজোম হতে আলাদা করতে সক্ষম হন। ‘পিরিয়ড’ (PER) নামক এই জিন যখন অকার্যকর থাকে, তখন মৌমাছির কাজকর্মে নানা ধরনের অস্বাভাবিকতা দেখা যায়। কিন্তু যখন এই পিরিয়ড জিন কার্যকর থাকে, তখন মৌমাছির স্বভাবগত আচরণে স্বাভাবিকতা ফিরে আসে। কী আছে এতে? সে প্রশ্নেরই উত্তর খুঁজতে তার সাথে যোগ দেন সহকর্মী মাইকেল রোসব্যাশ। দুজন মিলে উঠেপড়ে লাগেন পিরিয়ড জিনের রহস্য উদঘাটনে। চলে দিন-রাত গবেষণা আর বের হতে থাকে নানা রকম চাঞ্চল্যকর তথ্য। সার্কাডিয়ান রিদমের জগতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়।

পিরিয়ড জিনের মূল কাজ হলো প্রোটিন উৎপন্ন করা, আর এই প্রোটিনই হলো সার্কাডিয়ান রিদম নিয়ন্ত্রণের মূল চাবিকাঠি। এই প্রোটিন উৎপাদন যখন সর্বোচ্চ, প্রাণীর কর্মক্ষমতা তখন একদমই শূন্যের কোঠায়। আর রাতের অন্ধকার ঘুচে দিনের আলো ফুটতেই বাড়তে শুরু করে প্রোটিন উৎপাদন আর প্রাণীর মধ্যে চলে আসে কর্মচাঞ্চল্য। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, এই প্রোটিন উৎপাদনের যদি একটি গ্রাফ আঁকা হয়, তাহলে দেখা যাবে ওঠানামা চক্রাকারে একবার ঘুরে আসতে সময় লাগে প্রায় ২৪ ঘণ্টা। অর্থাৎ ব্যাপারটা এমন যে, প্রাণীর ভেতরের জিন বাইরের ঘড়ির সাথে তাল মিলিয়ে তার মনিবকে জাগিয়ে রাখতে সহায়তা করছে, আবার সময়মতো ঘুম পাড়াচ্ছে। প্রাণীর শরীরের ভিতর প্রাকৃতিকভাবে সেট হয়ে যাওয়া এই দেহঘড়ি কখনো একটুও সময়ের হেরফের করে না। কিন্তু সকল গবেষণা এখানেই শেষ নয়। এরপরও প্রশ্ন থাকে, কেন এই প্রোটিন উৎপাদন ওঠানামা করে? কার নির্দেশে পিরিয়ড জিন প্রোটিন উৎপাদন বন্ধ করে?

এমন প্রশ্নের উত্তরও আসে জেফারির গবেষণায়। আমরা অনেকেই এমন কিছু মাকড়সার কথা শুনেছি, যারা নিজের সন্তান জন্ম দিয়ে নিজেই সেই সন্তানের খাদ্যে পরিণত হয়। ভয়ংকর এই ঘটনাটিই ঘটে পিরিয়ড জিনের ক্ষেত্রে।

এই জিন প্রথমে mRNA তৈরি করে নিউক্লিয়াসে। তা পরিবাহিত হয়ে সাইটোপ্লাজমে গিয়ে তৈরি করেছে প্রোটিন, কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো এই পিরিয়ড প্রোটিনই আবার নিউক্লিয়াসে ফিরে এসে পিরিয়ড জীনের mRNA তৈরির জায়গা ব্লক করে দেয়, যার ফলে প্রোটিন উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। ধীরে ধীরে যখন ব্লক করা প্রোটিনগুলো সরে যেতে শুরু করে, তখন আবার প্রোটিন উৎপাদন শুরু হয়। আর এভাবেই চক্রাকারে চলতে থাকে প্রোটিনের উৎপাদন। প্রতিটি চক্রের সময় ২৪ ঘণ্টা। অর্থাৎ প্রতি ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রোটিনের উৎপাদন একবার কমে এবং একবার বাড়ে। জেফারি ও রোসব্যাশ দেখেন, দিনের বেলা এই প্রোটিন উৎপাদন মাত্রা থাকে একদমই কম। রাতের বেলা এর উৎপাদন বাড়তে থাকে আর যতই দিন ঘনিয়ে আসে, ততই উৎপাদন কমতে থাকে। অনেকটা খাল কেটে কুমির আনার মতো স্বভাব পিরিয়ড প্রোটিনের। যাকে উৎপাদন করছে, সেই তার নিজের উৎপাদন বন্ধ করছে।

জিন থেকে তৈরি হওয়া প্রোটিন আবার জিনেই ফিরে আসে আর নিজের উৎপাদন বন্ধে তৎপর হয়; Source: westca.com

কিন্তু আসলেই কি তা-ই? নাকি এর পেছনে কলকাঠি নাড়ছে অন্য কোনো জিন? এর উত্তর খুঁজতে কাজ করেন তৃতীয় ব্যক্তি মাইকেল ইয়াং। পিরিয়ড জিনের উপর আরো কিছু জিনের প্রভাব রয়েছে বলে তিনি গবেষণায় জানান। তাঁর মধ্যে একটি হলো ‘টাইমলেস’ (TIM) জিন। ইয়াং গবেষণায় দেখতে পান, যখন এই টাইমলেস জিন অকার্যকর থাকে, তখন মৌমাছির পিরিয়ড প্রোটিনের ওঠানামা অনেকাংশেই লক্ষণীয় হয় না আর তাছাড়া সেই সময়টায় এই চক্র পৃথিবীর আহ্নিক গতিকেও অনুসরণ করে না। কিন্তু টাইমলেস জিন যখন কার্যকর হয়, তখন পিরিয়ড প্রোটিনের বাড়তি-কমতিতে ব্যাপক প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। এ থেকে তিনি সিদ্ধান্তে আসেন, টাইমলেস জিন পিরিয়ড প্রোটিনকে নিজের উৎপাদন বন্ধে প্রভাবিত করে, আর তাছাড়া আহ্নিক গতি মেনে চলতেও সাহায্য করে। এছাড়াও এই পিরিয়ড প্রোটিনের উপর ‘DBT’, ‘CLK’, ‘CYC’ এই তিনটি জিনের প্রভাবও লক্ষ্য করেন তিনি।

সার্কাডিয়ান রিদমের জগতে এমন আবিষ্কার সত্যিই ভিন্ন মাত্রা সৃষ্টি করেছে। তবে গবেষণা এখনো শেষ হয়নি, বরং কেবল শুরু হয়েছে। বিজ্ঞানীদের মনে এ নিয়ে এখনো আছে হাজারো রকমের প্রশ্ন, যেমন এর প্রভাব এবং এর সাথে সংশ্লিষ্ট রোগ ব্যাধি সম্পর্কে ধারণা ইত্যাদি নানা ব্যাপার। এই সংশ্লিষ্ট একটি রোগ হল ‘জেটল্যাগ’। এটাকে যদিও রোগ বলা চলে না, বরং এটি হলো মানুষের পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার একটা সহজাত প্রবৃত্তি। এই জেটল্যাগের ধারণাও এতটাই সুবিশাল যে তা শুরু করলে আর শেষ হবে না।

মূলত সার্কাডিয়ান রিদম এখন গবেষণার এক বিরাট ক্ষেত্র। সহজভাবে ব্যাখ্যা করাও অনেক জটিল। স্বয়ং নোবেল কমিটির চেয়ারপার্সন আনা ওয়াডেলও এই ব্যাপারে হার মানেন। সার্কাডিয়ান রিদম সম্পর্কে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে একসময় আর না পেরে তিনি হাসতে হাসতে বলেন,

“আমার দ্বারা এটি এর চেয়ে সহজে আর ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়!”

ফিচার ইমেজ- freepik.com