আবিষ্কারের মাত্র চার বছর পরেই এত বড় স্বীকৃতি পাবার ঘটনা কিন্তু বিরল। পুরষ্কার পাবার পর ওয়াটসন-ক্রীক এর নাম এতটাই সাধারণ মানুষের কাছে পরিচিতি লাভ করে যে রোজালিন্ড ফ্রাঙ্কলিনের নাম অনেকের কাছেই অজানা থেকে যায়। যদিও কোনো কোনো লেখক তার নাম বিভিন্ন সময়ে শিক্ষার্থীদের জানাবার জন্য পাঠ্যপুস্তকের বর্ণনায় এনেছেন। রোজালিন্ডের আরেকটি অবদানের কথা না বললেই নয়, সেটা হচ্ছে ভাইরাস নিয়ে তার জটিল এবং অত্যাধুনিক পরীক্ষামূলক গবেষণা। বর্তমানে স্ট্রাকচারাল বায়োলজি বিষয়টির ভিত তিনিই গড়ে দিয়েছিলেন। ডিএনএ’র আণবিক গঠন আবিষ্কারের পরপরই আণবিক জীববিজ্ঞান শাখাতে রীতিমত এক বিপ্লব শুরু হয়ে গিয়েছিল। বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার ছিল রিকম্বিনেন্ট ডিএনএ, যেটা ব্যবহার করে ইচ্ছেমত প্রোগ্রাম করা ডিএনএ অন্য কোনো অর্গানিজমের মধ্যে স্থাপন করা যেত এবং পরবর্তী প্রজন্মকে মানুষ যে যে বৈশিষ্ট্যে সমৃদ্ধ দেখতে চায় সেসব বৈশিষ্ট্য, চরিত্র এবং গুণাগুণ তৈরি করা যাচ্ছিলো।

Image Source: Bio.com

১৯২০ সালের ২৫ জুলাই অভিজাত পরিবারের ব্যাংকার বাবার পাঁচ সন্তানের মধ্যে দ্বিতীয় সন্তান হিসেবে রোজালিন্ড এলসি  ফ্রাঙ্কলিনের জন্ম। ছোটবেলা থেকেই যৌক্তিকতা পছন্দ করতেন রোজালিন্ড। “মনে করো তুমি অমুক”- এই ধরনের খেলা কিংবা পুতুল বানানোর মতো খেলা তিনি পছন্দ করতেন না। সেলাই করা, কাপড় বোনা, কাঠের কাজ করা – এই ধরনের কাজ করতে স্বচ্ছন্দ বোধ করতেন তিনি। ছোটোবেলা থেকেই তার পছন্দ ছিল যে কোনো বিষয়ের ‘কারণ, প্রমাণ এবং বাস্তব সত্য’ অনুসন্ধান করা। পরীক্ষা করে নিজে যতক্ষণ না পর্যন্ত সন্তুষ্ট হচ্ছেন ততক্ষণ পর্যন্ত তিনি তার কাজ চালিয়েই যেতেন, কখনও কারো সাহায্য নিতেন না, যে কোনো পরীক্ষা তিনি একা নিজেই করতেন যে কারণে পরবর্তীতে ওয়াটসন-ক্রিকের কাছে ডিএনএ আবিষ্কারে তিনি পিছিয়ে পড়েন।

লন্ডনের সেন্ট পলস স্কুলে পড়ার সময় পদার্থ এবং রসায়ন বিজ্ঞানের প্রতি তার আগ্রহ দেখা যায় এবং পরবর্তীতে ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিজিকাল কেমিস্ট্রি পড়ার সুযোগ পান। মেয়ের পড়াশুনা নিয়ে তার বাবার প্রথম প্রথম অমত থাকলেও পরবর্তীতে তার মা এবং ফুপুর জোর দেয়ার কারণে তিনি মেয়েকে পড়ানোর জন্য রাজি হন। কিন্তু মন থেকে তিনি রাজি হননি। ১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে গেলে তিনি রোজালিন্ডকে পড়াশুনা স্থগিত রেখে চলে আসতে বলেন। কিন্তু ব্রিটিশ সরকার বিজ্ঞান নিয়ে পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের পড়াশুনা শেষ করা বাধ্যতামূলক করার জন্য সেই যাত্রা রোজালিন্ড পড়াশুনা ছাড়তে হয়নি। যদিও পরবর্তীতে যখন রোজালিন্ড ভাইরাস নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সব আবিষ্কার করছিলেন তার বাবা সে সময় খুব খুশি হয়েছিলেন।

যা-ই হোক ভাগ্য, চেষ্টা এবং জেদ এর সমন্বয়ে রোজালিন্ড ১৯৪১ কেম্ব্রিজে তার ডিগ্রি শেষ করেন। গ্রাজুয়েশন শেষ করার পর রোনালড নরিস (পরবর্তীতে রসায়নে নোবেল পান) এর সাথে বিজ্ঞানী হিসেবে  তিনি কাজ শুরু করেন। তখন যুদ্ধের সময় ছিল বিধায় তিনি যুদ্ধকালীন গুরুত্বপূর্ণ একটি সমস্যা – কয়লা এবং কার্বন কে কিভাবে দক্ষতার সাথে ব্যবহার করা যায় তা নিয়ে কাজ করছিলেন। এই সব কাজ ছিল পুরোপুরি পরীক্ষামূলক। কাজ করতে করতেই তিনি কার্বনের কিছু গাঠনিক পরিবর্তন আবিষ্কার করে ফেলেন। তার মধ্যে একটি আবিষ্কার ছিল কার্বনের গ্রাফাইটে পরিণত হওয়া যেখানে দেখা যায় যে, কিছু কিছু কার্বনকে গরম করলে সেটার অণুগুলো পরস্পর সমান্তরাল স্তরে ভাগ হয়ে অবস্থান করে এবং গ্রাফাইটে পরিণত হয়। ২২ থেকে ২৬ বছর বয়সের মধ্যে রোজালিন্ড কার্বন নিয়ে যেসব গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশ করেছিলেন তা আজও রসায়ন গবেষণায় অভিসম্বন্ধ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এই কাজের জন্য ১৯৪৫ সালে কেমব্রিজ থেকে ফিজিকাল কেমিস্ট্রি বিষয়ে তাকে ডক্টরেট ডিগ্রী দেয়া হয়।

কিন্তু এতেই রোজালিন্ড সন্তুষ্ট ছিলেন না। একটি পদার্থের ভিতরে কী কী ঘটে, অণু পরমাণুগুলো কিভাবে সাজানো থাকে এই বিষয়টা তাকে যেভাবেই হোক জানতে হবে। সেটা জানতে পারলেই মানুষের জীবন কোন আণবিক গঠনের উপর ভিত্তি করে টিকে আছে তা জানা যাবে। এর জন্য প্রথমে তাকে X-Ray Crystallography সম্পর্কে জানতে হবে। যারা ক্রিস্টালোগ্রাফি নিয়ে কাজ করে তারা এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কোন পদার্থের ভিতরে অনুগুলো কীভাবে সাজানো আছে সেটা বের করে। প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য রোজালিন্ড সহজ এবং ছোট কেলাস নিয়ে কাজ না করে জটিল এবং বড় বড় জৈবআণবিক কেলাসের গঠন নিয়ে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিলেন। যদিও তখনও তিনি ক্রিস্টালোগ্রাফি সম্পর্কে হাতে কলমে কাজ করা শুরু করেননি। ব্রিটিশরা যদিও প্রথম ক্রিস্টালোগ্রাফি আবিষ্কার করে, তবুও যুদ্ধ শেষ হবার পর রোজালিন্ড প্যারিসে গিয়ে এই কাজ শিখতে চাইলেন এবং তার এক বন্ধুর সাহায্যে সেখানে একটি চাকরিরও যোগাড় করে ফেলেন। মাত্র ২৭ বছর বয়সে তিনি প্যারিসে যান। সেখানে তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে তার সহকর্মী ডেভিড সায়রে বলেন যে রোজালিন্ড খুবই কম কিন্তু খুব দ্রুত কথা বলতেন, কথার মধ্যে জড়তা থাকতো না। অতিরিক্ত এবং অনাবশ্যক কথা বলা থেকে বিরত থাকতেন। যতক্ষণ কাজ করতেন ততক্ষণ মনোযোগ দিয়ে শুধু কাজই করতেন। তীক্ষ্ণ বুদ্ধির মানুষ ছিলেন রোজালিন্ড। বৈজ্ঞানিক তর্ক করতে ভালবাসতেন। কোনো বৈজ্ঞানিক সম্মেলনে গেলে বক্তাকে প্রশ্নের বাণে বোকা বানিয়ে ছাড়তেন রোজালিন্ড। সহকর্মীদের মধ্যে কেউ কাজে ফাঁকি দিলে একটুও সহ্য করতে পারতেন না তিনি।

তিন বছর প্যারিসে থাকার পর ১৯৫০ সালে তিনি লন্ডনে ফিরে আসেন। সে সময় কেমব্রিজের এই কিংস কলেজে যোগ দেন; Image Source: kcgs.soc.srcf.net

তিন বছর প্যারিসে থেকে ১৯৫০ সালে তিনি, লন্ডনে ফিরে আসেন। সে সময় কেমব্রিজের কিংস কলেজে যোগ দেন তিনি। পদার্থবিজ্ঞানী জন রেনডেল সেখানে পদার্থ, রসায়ন এবং জীববিজ্ঞানীদের নিয়ে একটি টিম গঠন করেন যাদের কাজ ছিল ডিএনএ’র গঠন আবিষ্কার করা। তখন পর্যন্ত এ সম্পর্কে যতটুকু জানা ছিল তা হলো ডিএনএ জেনেটিক তথ্য সরবরাহ করে এবং এর প্রোটিনের অণুগুলো প্যাঁচানো আকার ধারণ করতে পারে। কিন্তু তখনও কেউ এর বাহিরের বা ভিতরের গঠন আবিষ্কার করতে পারেনি।

এই টিমের সদস্য হিসেবে কাজ করতো রেমনড গস্লিং নামে এক ছাত্র যার কাজ ছিল ডিএনএ’র X-ray ছবি তোলা। তখনকার সময়ে ছবিগুলো ছিল অত্যন্ত চমৎকার। কিন্তু ছবিগুলো থেকে তথ্য বিশ্লেষণ করার মতো কেউ তাদের টিমে ছিল না। তখন জন রেনডেল রোজালিন্ড এর কথা শুনে তাকে একটি ফেলোশিপ দিয়ে কিংসে নিয়ে আসেন। তার নতুন কাজ কী হবে সে সম্পর্কে রেনডেল তাকে আগেই জানিয়ে দিয়েছিলেন। রোজালিন্ডকে লেখা তার কথাগুলো ছিল এরকম-

“After very careful consideration and discussion with the senior people concerned, it now seems that it would be a good deal more important for you to investigate the structure of certain biological fibers in which we are interested. This means that as far as the experimental X-ray effort is concerned, there will be at the moment only yourself and [the graduate student] Gosling, together with the temporary assistance of a graduate from Syracuse, Mrs. Heller.”

অর্থাৎ রেনডেল পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দিয়েছিলেন, রোজালিন্ড ভিন্ন একটি প্রজেক্টে একাই কাজ করবেন এবং তার সাথে দুজন শিক্ষার্থী থাকবে। এরকম পরিবেশই রোজালিন্ডকে পরবর্তীতে একা কাজ করতে উৎসাহিত করেছিলো। রেনডেলের পরেই পদমর্যাদায় কিংসের সেই  ল্যাবে যার অবস্থান ছিল তিনি হচ্ছেন মরিস উইল্কিন্স। রেনডেলের ছাত্র ছিলেন তিনি এবং যুদ্ধের সময় এটম বোমা নিয়ে কাজের অভিজ্ঞতা ছিল তার। রেনডেল ডিএনএ’র কাজ পুরোপুরি রোজালিন্ডকে করতে দিয়েছিলেন। তার আগে এই কাজটি করছিলেন উইল্কিন্স। তিনি ভেবেছিলেন পরে কোনো অভিজ্ঞ বিজ্ঞানী এলে টিমের সবাইকে নিয়ে এই বিষয়ে কাজ করবেন। কিন্তু রোজালিন্ড তার কাজে কোনোভাবেই হস্তক্ষেপ পছন্দ করছিলেন না। তিনি কাজ একাই করবেন বলে ঠিক করে রেখেছিলেন। পরবর্তীতে এই উইল্কিন্সের সাথে বিবাদে জড়িয়ে পড়েছিলেন রোজালিন্ড। এখানে উল্লেখ্য, ওয়াটসন এবং ক্রিকের সাথে আরেকজন, যিনি ১৯৬২ সালে ডিএনএ’র জন্য নোবেল পেয়েছিলেন, তিনি হচ্ছেন এই মরিস উইল্কিন্স।

ওয়াটসন এবং ক্রীক; Image Source: ua-magazine.com

ডিএনএ’র ল্যাবে রোজালিন্ড এবং তার ছাত্র গস্লিং একাই কাজ করে যাচ্ছিলেন। তারা X- ray দিয়ে ছবি তুলে ডিএনএ’র উপাত্ত সংগ্রহ করছিলেন যাতে করে এর গঠন সম্পর্কে জানা যায়। এই বিষয় নিয়ে তাদের পাঁচটি পেপার লেখার কথা ছিল। রোজালিন্ডের কাজ ছিল অনেকটা এরকম। তাকে X- ray Camera-কে এমনভাবে সেট করতে হবে যাতে করে এটা থেকে সূক্ষ্ম বীম বা রশ্মি বের হয়। ছবি তুলতে হলে সূক্ষ্ম এবং পাতলা রশ্মির দরকার ছিল কারণ ডিএনএ নিজেও লম্বা চিকন তন্তুর মতো দেখতে। এর আগে এই বিষয়ে যেসব কাজ করা হয়েছিলো সেখানে মোটা তন্তুর ডিএনএ ব্যবহার করা হয়েছিলো। কিন্তু পাতলা তন্তু নিয়ে পরীক্ষা করতে রোজালিন্ডের কোনো সমস্যায় পড়তে হয়নি, কারণ এর আগে কয়লা নিয়ে কাজ করতে গিয়ে সেখানে ক্লে এর আণবিক গঠন নিয়ে তিনি কাজ করে এসেছেন। তাই তিনি ভালোভাবেই জানতেন, পুরোপুরি কেলাসিত হয় না এমন পদার্থগুলোকে কীভাবে আণবিক এককে নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

একটি গ্লাসের রড দিয়ে তিনি ডিএনএ ফাইবারকে টেনে ধরলেন এবং প্রত্যেকটি ফাইবারকে সমান্তরালভাবে সাজালেন। কিন্তু এক্স রে বিক্ষিপ্ত করার জন্য ফাইবারগুলো ছিল অতিরিক্ত পাতলা। তাই তিনি সেগুলোকে মাকড়শার জালের মতো করে সাজালেন যাতে এদের আয়তন একসাথে মিলে বেড়ে যায়। এরপর এই জালের আকারের সাথে মিল রেখে তিনি এক্স রে বীম এই তন্তুগুচ্ছের উপর ফেললেন। তার ধারণা ছিল এইভাবে কাজটি করলে ডিএনএর পরিষ্কার ছবি পাওয়া যাবে। এই স্টাডি থেকে জানা গিয়েছিল যে, আর্দ্র পরিবেশে ডিএনএ কেমন আচরণ করে। রোজালিন্ডের ধারণা ছিল, আর্দ্রতাকে সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেই আরও পরিষ্কার ছবি পাওয়া যাবে। এই কাজ করতে করতে তিনি বুঝতে পারলেন, ডিএনএ দু’ধরনের অবয়বে থাকতে পারে– A type এবং B type, যা নির্ভর করবে কতটুকু পানি তন্তু বা ফাইবারগুলো টানতে পারছে। যখনই ফাইবারগুলোর আশেপাশে বাতাসের আপেক্ষিক আর্দ্রতা ৭৫% হলো, রোজালিন্ড ডিএনএ’র আরও পরিষ্কার এবং সূক্ষ্ম ছবিটি পেলেন যেটা গস্লিংএর পাওয়া ছবি থেকে অনেক বেশী তথ্য দিতে সক্ষম ছিল। এই ছবিগুলোকে রোজালিন্ড নাম দিলেন Dry, A-form of DNA। আর্দ্রতা যখন ৯৫% এ গিয়ে দাঁড়ালো তখন এক্স রে’র যে ছবি পাওয়া গেল সেখানে ফাইবারের অণুগুলোর আকার অনেকটা ক্রসের মতো ছিল এবং এই ক্রস সাইন ডিএনএ যে সর্পিল আকৃতির সেটা প্রমাণ করে দিল। কিন্তু পরের ছবিতে আগেরটার তুলনায় কম তথ্য পাওয়া যাচ্ছিলো।

এই পরীক্ষা থেকে তিনি এই উপসংহারে আসলেন যে wet DNA সর্পিল আকৃতির হয়। তিনি এই ক্রসের নাম দিলেন B-form of DNA। এই পরীক্ষা থেকে আরও একটি তথ্য উদঘাটন করলেন রোজালিন্ড। যেহেতু ডিএনএর অণুগুলো খুব সহজেই বাতাস থেকে পানি টানতে এবং আবার বাতাসে ছেড়ে দিতে পারছে, তাই ডিএনএ’র সাথের ফসফেট সুগারের অবস্থানগুলোও একই সাথে তিনি ঠিকভাবে বের করতে পারছিলেন। তিনি এই পরীক্ষা থেকে একটি মীমাংসায় আসলেন। সেটা হচ্ছে DNA অণুর চারিদিকে অবস্থিত পানির খুব কাছাকাছি এই ফসফেট সুগারগুলো অবস্থান করে এবং বেস বা নাইট্রোজেন ক্ষারগুলো ডিএনএ হেলিক্সের ভিতর সিঁড়ির মতো করে অবস্থান নেয়। যদিও দুটি ক্ষেত্রেই তার প্রমাণ এবং অনুমান সঠিক ছিল, কিন্তু এর মাধ্যমে  রোজালিন্ড কেবল একটি হেঁয়ালির মীমাংসা করতে পেরেছিলেন। আরও দুটি ধাঁধার মীমাংসা বাকি ছিল। একটি হচ্ছে প্রত্যেকটি সিঁড়ি দুটি বেস নিয়ে গঠিত কিনা। অপরটি হচ্ছে, যে ফসফেট তন্তু দিয়ে ফাইবারের অণুগুলো সর্পিলভাবে গঠিত সেগুলো পরস্পর বিপরীতমুখী কিনা।

উইল্কিন্সের জন্য রোজালিন্ডের ডাটা গুলো ওয়াটসন এবং ক্রীকের হাতে চলে যায়; Image Source: New Zealand Geographic

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর পাবার জন্য রোজালিন্ড আরও ডাটা সংগ্রহ করে যাচ্ছিলেন। কিন্তু এর মধ্যে ওয়াটসন এবং উইল্কিন্সের সাথে তার বিবাদ বাধে। A এবং B type DNA এর ছবি তোলার পর উইল্কিন্সের খুব আগ্রহ হয় যে তিনি ছবিগুলো বিশ্লেষণ করবেন। কিন্তু রোজালিন্ড সেটা চাচ্ছিলেন না। উইল্কিন্স B type DNA এর ছবি দেখে রোজালিন্ডকে বললেন, ডিএনএ যে ডাবল হেলিক্স সেটা এই ছবির মাধ্যমেই প্রমাণ হয়ে গিয়েছে। কিন্তু রোজালিন্ড ড্রাই বা A type ডিএনএ থেকেও একই ধরনের ছবি আশা করছিলেন। তাই তখনই তিনি কোনো উপসংহারে আসতে চাচ্ছিলেন না। এই বিষয় নিয়ে তাদের মধ্যে কিংস কলেজে থাকাকালীন অনেক বাকবিতণ্ডা হয়।

অন্যদিকে, এক কনফারেন্সে বিজ্ঞানী ওয়াটসন রোজালিন্ডের ডাটাগুলো নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন। শুধু তা-ই নয়, ওয়াটসন রোজালিন্ডের দেয়া লেকচারকে বিউটি কন্টেস্টের এর সাথে তুলনা করেন। আসলে রোজালিন্ডের কথাগুলো থেকে ওয়াটসন বুঝতে পেরেছিলেন যে তিনি এবং তার ছাত্র ক্রিক রোজালিন্ডের কাজের থেকে অনেক পিছিয়ে আছেন। তাই সেদিন সেই কনফারেন্সে ওয়াটসনের উদ্দেশ্যই ছিল রোজালিন্ডের ডিএনএ ডাটা নিয়ে তাকে ভুল ধারণা দেয়া যাতে রোজালিন্ডের কাজে বাধা তৈরি করা যায়। যদিও এই ধরনের বক্তব্য রোজালিন্ডকে নিজের কাজ নিয়ে তার আত্মবিশ্বাসকে এক চুলও নাড়াতে পারেনি। পরবর্তীতে ওয়াটসন এবং ক্রিক যখন রোজালিন্ডের উপাত্তগুলো থেকে ধারণা নিয়ে নিজেরা ডিএনএ’র মডেল তৈরি করেন তখন রোজালিন্ড সেখানে বড় ধরনের ভুল ধরে ফেলেছিলেন, যার কারণে তাদের কাজ সঠিকভাবে হয়নি বলে প্রমাণিত হয়। বিখ্যাত বিজ্ঞানী লরেন্স ব্রেগ তাদের কাজকে “The biggest fiasco” বলে সম্বোধন করেন এবং তাদেরকে ডিএনএ কাজ থেকে সরিয়ে নেন।

১৯৫২ সাল পর্যন্ত রোজালিন্ড একাই একমাত্র বিজ্ঞানী ছিলেন যিনি ডিএনএ নিয়ে ফুল টাইম কাজ করছিলেন। তিনি B type DNA কে আরও আর্দ্রতার ভিতর দিয়ে এক্স-রে’র সামনে আরও বেশী সময় রেখে পরীক্ষা করছিলেন। এভাবে এক সময় wet B type DNA ফাইবারকে এক্স-রে’র সামনে ৬২ ঘণ্টা পর্যন্ত রেখে দিয়ে তিনি সবচেয়ে সুন্দর ডাবল হেলিক্সের ছবি পান। এই ছবিই এখন জীববিজ্ঞান বইগুলোতে দেখা যায়। এরপর তিনি A type DNA নিয়ে কাজ করতে থাকেন। কারণ এই ডিএনএ’র ছবিতে B type এর চেয়ে অনেক বেশী তথ্য পাওয়া যাচ্ছিলো।

DNA ফাইবারকে এক্স রের সামনে ৬২ ঘণ্টা পর্যন্ত রেখে দিয়ে তিনি সবচেয়ে সুন্দর ডাবল হেলিক্সের ছবি পান; Image Source: isciencemag.co.uk

এরই মধ্যেই উইল্কিন্স সুযোগ বুঝে একটু একটু করে রোজালিন্ডের ডাটাগুলোর একটি ধারণা নেয়া এবং ডাটার রেপ্লিকা তৈরি করার চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন। উইল্কিন্স নিজেও ডিএনএ’র ছবি তোলার জন্য সচেষ্ট ছিলেন, কিন্তু রোজালিন্ডের এর মতো এত সুন্দর ছবি তার আসছিলো না এবং ছবি থেকে প্রাপ্ত ডাটাগুলোও কম তথ্য দিচ্ছিলো। তবুও উইল্কিন্স ওয়াটসনের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছিলেন এবং রোজালিন্ডের কাজ নিয়ে নিয়মিত খবরাখবর দিয়ে যাচ্ছিলেন। এরই মধ্যে রোজালিন্ড ডিএনএ’র ফাইবার কেলাসের গাণিতিক সমাধানের দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন। তার ধারণা ছিল, গাণিতিকভাবে যদি আবিষ্কারটি বর্ণনা করা যায় তাহলে আবিষ্কারের পক্ষে যুক্তি এবং প্রমাণ আরও সুসংবদ্ধ হবে। গণিতের এই কাজটি মারাত্মক জটিল একটি কাজ ছিল, যেটা রোজালিন্ড একা একা করছিলেন। তার মনে আস্তে আস্তে দৃঢ়ভাবে সন্দেহ জাগছিল যে ড্রাই ডিএনএ বা A-type DNA হেলিকেল নয়। এর মধ্যে উইল্কিন্স একটি রিপোর্টে রোজালিন্ডের অনুমতি না নিয়েই এই সম্পর্কে তার আবিষ্কার নিয়ে লিখে ফেলেন এবং প্রকাশ করে দেন। কিন্তু রোজালিন্ড নিজে তার সন্দেহ দূর না করা পর্যন্ত প্রকাশ করতে চাচ্ছিলেন না। আসলে গাণিতিক কাজটি ছিল অত্যন্ত কঠিন। আবার যেহেতু তিনি একা একা কাজটি করছিলেন তাই যখন ডাটা থেকে তিনি ভুল তথ্য সংগ্রহ করেছিলেন, সেই ভুল ধরিয়ে দেয়ার মতো কেউ তখন তার আশেপাশে ছিল না। পরবর্তীতে অবশ্য এই ভুল চোখে না পড়ার জন্য তিনি নিজেকে অনেক দোষ দিয়েছিলেন এবং দুঃখ পেয়েছিলেন।

রোজালিন্ডের প্রাপ্ত ছবিগুলো দেখার জন্য আরেক বিখ্যাত বিজ্ঞানী লিনাস পাউলিং কেমব্রিজে আসতে চেয়েছিলেন। ১৯৫২ সালের মে মাসে প্রোটিন নিয়ে একটা কনফারেন্সও হয়েছিল। কিন্তু কমিউনিস্ট হিসেবে দোষারোপ করে সরকার থেকে তাকে ব্রিটেনে আসতে দেয়া হয়নি। অনেকে মনে করেন, পাউলিং যদি আসতে পারতেন এবং এক্স রে ছবিগুলো দেখতে পারতেন তাহলে গাণিতিক মডেল বানানোর কাজটুকু তিনি করে ফেলতে পারতেন এবং ওয়াটসন–ক্রিকের অনেক আগেই তারা দুজন ডিএনএ’র আণবিক গঠন প্রকাশ করে ফেলতে পারতেন। এতে করে পাউলিং হয়তো একমাত্র বিজ্ঞানী হিসেবে তিনবার নোবেল পাওয়ার গৌরব অর্জন করতে পারতেন এবং রোজালিন্ডও ডিএনএ’র আবিষ্কারক হিসেবে মর্যাদা এবং পুরস্কার পেতে পারতেন। এছাড়াও ফ্রান্সিস-ক্রিক একবার রোজালিন্ডকে একসাথে কাজ করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। যদি সেই পরামর্শটুকুও রোজালিন্ড বিবেচনা করতেন তাহলে তারা দুজনেই সবার আগে এই ডিএনএ’র আবিষ্কার করে ফেলতে পারতেন।

পাউলিং যদি আসতে পারতেন এবং এক্স রে ছবি গুলো দেখতে পারতেন তাহলে গাণিতিক মডেল বানানোর কাজটুকু তিনি করে ফেলতে পারতেন এবং ওয়াটসন–ক্রিকের অনেক আগেই রোজালিন্ড এবং তিনি ডিএনএ’র আণবিক গঠন প্রকাশ করে ফেলতে পারতেন; Image Source: wavefunction.fieldofscience.com

এরপর একটি ঘটনা ঘটে যার কারণে ওয়াটসন এবং ক্রিক ডিএনএ’র কাজে সফলতা পায়। দুই দুইবার ওয়াটসন এবং ক্রীক রোজালিন্ডের প্রাপ্ত ডিএনএ’র ডাটা অন্য একজনের সাহায্যে তাদের হাতে পান। প্রথমবার,  উইল্কিন্সের মাধ্যমে রোজালিন্ডের ডাটাগুলো তাদের হাতে চলে যায়। কিন্তু এই খবরটা রোজালিন্ডের কানে বিন্দুমাত্র পৌঁছায়নি। এমনকি তার অনুমতি ছাড়াই সংগৃহীত ডাটা ওয়াটসন এবং ক্রিক তাদের গবেষণায় ব্যবহার করেন যাতে করে তাদের কাছে ডাবল হেলিক্সের বিষয়টা একদম পরিষ্কার হয়ে যায়। লিনাস পাউলিং এর আগে ডিএনএ নিয়ে একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন যেটা তিনি তার ছেলের মারফত ওয়াটসনের কাছে পাঠান। ওয়াটসন সেই প্রবন্ধটি আবার রোজালিন্ডের কাছে নিয়ে যান দেখানোর জন্য। তাদের সবার কাছে মনে হচ্ছিল যে ডিএনএ ডাবল হেলিক্স কারণ ওয়াটসন এবং ক্রীকের কাছে ৫ বছর আগের পুরাতন কিছু এক্স রে’র ছবি তোলা ছিল যা দেখে মনে হচ্ছিল যে ডিএনএ ডাবল হেলিক্স কিন্তু এই তথ্যটির আরও স্পষ্ট এবং পরীক্ষামূলক প্রমাণ আছে কেবল রোজালিন্ডের কাছে। কিন্তু রোজালিন্ড ছাড়া ছাড়াভাবে কোনো কিছুই প্রকাশ করবেন না। তার কাছে সত্য হচ্ছে সত্য, তার কাছে বাস্তবতা হচ্ছে বাস্তবতা।

পরীক্ষানিরীক্ষা করে A type ডিএনএ নিয়ে কোনো উপসংহারে না আসা পর্যন্ত তিনি কিছুই প্রকাশ করবেন না। তাকে বোঝাতে না পেরে রোজালিন্ডের কক্ষ থেকে বের হবার পর উইল্কিন্স ওয়াটসনকে আরেকটি কক্ষে নিয়ে যেখানে তিনি ওয়াটসনকে রোজালিন্ডের তোলা ডিএনএ’র সেই ছবিটি দেখান। এই ছবি দেখে এবং ডাটা পর্যবেক্ষণ করে ওয়াটসন ডিএনএ’র গঠন প্রথমবারের মতো সঠিকভাবে বুঝতে পারেন। এই ছবিগুলো দেখে ওয়াটসন শুষ্ক এবং আর্দ্র অবস্থায় ডিএনএ’র পার্থক্যটাও বুঝতে পারেন যেটা তার এবং ক্রীকের তোলা পাঁচ বছর আগের ছবি দেখে বোঝার উপায় ছিলো না। পরে অবশ্য উইল্কিন্স নিজেই তার দোষ স্বীকার করে নেন যে, এরকমটি করে একেবারে আনাড়ির মতো কাজ করে ফেলেছিলেন। রোজালিন্ডের তৈরি করা উপাত্ত ছাড়া কখনোই ডিএনএ’র পরিষ্কার এবং নিখুঁত তথ্য আবিষ্কার করা সম্ভব ছিল না।

দ্বিতীয়বার, তারা ডাটা পান রোজালিন্ডের দেয়া ডিএনএ নিয়ে আগের সেই লেকচার থেকে যেখানে ওয়াটসন উপস্থিত ছিলেন। সেই লেকচারকে রিপোর্ট আকারে রোজালিন্ড রিভিউ কমিটিতে জমা দিয়েছিলেন। সেই কমিটির প্রধান ছিলেন আবার মেক্স পেরুজ। তিনি এই রিপোর্ট ওয়াটসন এবং ক্রীকের কাছে প্রকাশ করে দেন। সেই কনফারেন্সে রোজালিন্ড তার ডাটা সম্পর্কে যা যা বলেছিলেন সেগুলোর কোনো কিছুই ওয়াটসনের মনে ছিল না কারণ তখন সেখান থেকে তিনি কোনো নোট নেননি। তাই নতুন ডাটা পাবার পর তার কাছে রোজালিন্ডের তৈরি করা এবং গবেষণায় ব্যবহার করা সব ডাটা চলে আসে। পেরুজের এমন কাজ করা বেআইনি ছিল কারণ এই রিপোর্টটি ছিল হাইলি কনফিডেন্সিয়াল। এই রিপোর্ট প্রকাশ করবার আগে রোজালিন্ডের কাছ থেকে কোনো অনুমতি নেয়া হয়নি। এমনকি রোজালিন্ড যে টিমে কাজ করতেন সেই টিমের প্রধান রেন্ডেলের কাছ থেকেও কোনো অনুমতিপত্র নেয়া হয়নি।

অবশেষে ওয়াটসন এবং ক্রীক মিলে তাদের কাজ বিখ্যাত নেচার পত্রিকায় প্রকাশ করে ফেলেন। সেই গবেষণায় রোজালিন্ডের অবদানের কথা স্বীকৃতিস্বরূপ দিলেও তার কোনো পেপারের রেফারেন্স দেয়া হয়নি। এমনকি ১৯৬২ সালে যখন তারা নোবেল পান সেই নোবেল লেকচারেও রোজালিন্ড এর নাম কেউ মুখেও আনেননি।

ওয়াটসন এবং ক্রীক এর প্রবন্ধ প্রকাশ পেল। তখনও পর্যন্ত রোজালিন্ড A type DNA এর ধাঁধার সমাধান করতে পারলেও Base pair নিয়ে সমস্যার সমাধান করতে পারেননি। Base pair নিয়ে ক্রীক এবং ওয়াটসনের মধ্যে মতের অমিল ছিল। ক্রীক দাবি করেছিলেন, তিনি ১৯৫৩ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি Base pair প্রস্তাব করেন। কিন্তু ওয়াটসন তার বই The Double Helix এ দাবি করেন যে এই প্রস্তাবটি শুধু তিনিই করেছিলেন, অন্য কেউ নয়। কিন্তু পরে প্রমাণিত হয় যে বিজ্ঞানী আরুইন চারগেফের ডাবল হেলিক্স নিয়ে গবেষণা ওয়াটসনকে Base pair সম্পর্কে বুঝতে সাহায্য করেন যে হেলিকেল সিঁড়িগুলো আসলে একেকটি Base pair, যেখানে এডিনিন থাইমিনের সাথে এবং গুয়ানিন সাইটোসিনের সাথে জোড়াভাবে থাকে।

ওয়াটসন এবং ক্রীক মিলে তাদের কাজ বিখ্যাত নেচার পত্রিকায় প্রকাশ করে ফেলেন। যদিও সেই গবেষণায় রোজালিন্ডের অবদানের কথা স্বীকৃতিস্বরূপ দিলেও তার কোন পেপারের রেফারেন্স দেয়া হয়নি; Image Source: bibliotecapleyades.net

আবিষ্কারের কৃতিত্ব না পেলেও ওয়াটসন এবং ক্রীকের প্রতি তার তেমন কোনো ক্ষোভ ছিল না। ক্রীকের সাথে তার সম্পর্ক ভাল ছিল, কিন্তু ওয়াটসনের সাথে যোগাযোগ তিনি রক্ষা করেননি। তাকে “That Horrible American” বলে সম্বোধন করতেন তিনি। তবে B type DNA নিয়ে রোজালিন্ড তার গবেষণাগুলোকে জার্নাল আকারে প্রকাশ করেছিলেন তার ছাত্র গস্লিংয়ের সাথে। সেখানে তারা B type DNA থেকে কী কী জানা যায় সে সম্পর্কে আলোচনা করেছিলেন।

পরবর্তীতে ভাইরাস নিয়ে এমনসব উন্নত মানের গবেষণা রোজালিন্ড করেছিলেন, বিশেষ করে টোব্যাকো মোজাইক ভাইরাস নিয়ে, যেগুলো ছিল কাটিং এজ গবেষণা। সেই গবেষণাগুলোর কল্যাণেই ভাইরাসের মৌলিক আণবিক বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে আমরা পরবর্তীতে জানতে পারি। ঐ গবেষণাগুলোর উপর ভিত্তি করেই পরে ভাইরাস নিয়ে আরও উন্নত মানের এবং জটিল রকমের গবেষণা সম্ভব হয়েছিল।

Reference

  1. McGrayne, S.B (1998). Nobel Prize Women in Science- Their Lives, Struggles, and Momentous Discoveries (Second Edition), Joseph Henry Press, Washington, D.C.

ফিচার ইমেজ- rsc.org