ডানবার’স নাম্বার: মাত্র ১৫০ জনের সঙ্গে সম্ভব সম্পর্ক রক্ষা

“মানুষ সামাজিক জীব।”

ছাত্রজীবনে এই তিনটি জাদুকরি শব্দ কে না লিখেছে! স্কুলে থাকতে তো বটেই, অনেকে কলেজে, কলেজের গণ্ডি পেরিয়ে ভার্সিটিতে, এমনকি চাকরির পরীক্ষার লিখিত অংশেও ব্যবহার করেছে এই তিনটি শব্দ। কিন্তু তারপরও কখনো ক্লিশে হয় না শব্দ তিনটি। পৌনঃপুনিক ব্যবহারেও ম্লান হয় না এর গূঢ়ার্থ। কারণ আসলেই তো মানুষ সামাজিক জীব। এটিই তো মানুষ হিসেবে তার প্রধানতম বৈশিষ্ট্য।

মানুষের সামাজিকতার ঝাণ্ডাবাহী উপাদান হলো সম্পর্ক। কোনো মানুষই পুরোপুরি একা বাস করতে পারে না। এমনকি একা একা জন্মাতেও পারে না। তার প্রয়োজন হয় সম্পর্ক। সম্পর্কের মাধ্যমেই তার জন্ম হয়েছে, জন্মগতভাবেই নানাজনের সাথে সম্পর্কের বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছে সে, এবং জীবনে চলার পথে প্রাণধারণের তাগিদেই তাকে অনেক মানুষের সাথে সম্পর্ক স্থাপন ও রক্ষা করতে হয়। কোনো কোনো সম্পর্ক হয়ে ওঠে অত্যন্ত গভীর, তাৎপর্যময় ও দীর্ঘস্থায়ী। আবার কিছু সম্পর্ক হয় ঠুনকো, অপ্রয়োজনীয় ও ক্ষণস্থায়ী।

কিন্তু সে যা-ই হোক, সম্পর্ক যে মানুষ গড়ে তোলে, এটিই ধ্রুব সত্য। এ ব্যাপারে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। তবে এখন অনেকের মনেই প্রশ্ন জন্মাতে পারে, একজন মানুষ তার জীবনে মোট কয়জনের সাথে সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে? এ প্রশ্নের কোনো নিশ্চিত উত্তর প্রদান করা সম্ভব নয়। কারণ একজন মানুষের কয়জনের সাথে সম্পর্ক থাকবে, তা নির্ভর করে অনেকগুলো বিষয়ের উপর। যেমন: লিঙ্গ, পেশা, সংস্কৃতি, মূল্যবোধ ইত্যাদি। আবার মানুষটি অন্তর্মুখী না বহির্মুখী, সেটিও এখানে একটি বড় ভূমিকা পালন করে।

তবে এসবের পরও মোটামুটি একটি আন্দাজ করা যায় যে, যেকোনো পরিস্থিতিতে একজন মানুষের সর্বোচ্চ ১৫০ জনের সাথে অর্থবহ সম্পর্ক থাকবে। এখানে অর্থবহ সম্পর্ক বলতে বোঝানো হচ্ছে সেই সম্পর্ক, যেখানে দুজন মানুষ একে অপরকে চিনবে, তাদের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া থাকবে, তারা পরস্পরের গুণ ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে অবগত থাকবে।

রবিন ডানবার; Image Source: BBC

সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই বিশেষ ‘১৫০’ সংখ্যাটির উদ্ভাবক ব্রিটিশ নৃতত্ত্ববিদ রবিন ডানবার। শুধু ১৫০ জনের সাথে সম্পর্ক বিষয়ক তত্ত্বটির জন্ম দিয়েই ক্ষান্ত হননি তিনি, এটির নামকরণও করেছেন নিজের নামেই। তার মতে, কোনো জিনিসের নামকরণ যখন কোনো মানুষের নামে করা হয়, ততদিনে মানুষটি মারা যায়। নিজের বেলায়ও যেন সেরকম কিছু না হয়, তাই ১৫০-কে তিনি নিজেই অভিহিত করেছেন ডানবার’স নাম্বার হিসেবে।

১৯৯২ সালে একটি অনুচ্ছেদে প্রথম ডানবার’স নাম্বারের উল্লেখ করেন ডানবার। বিশেষ এ সংখ্যাকে তিনি এভাবে সংজ্ঞায়িত করেন যে,

“সেই সংখ্যক মানুষ, যাদের সাথে আপনার হঠাৎ করে বারে দেখা হয়ে গেলে, বিনা আমন্ত্রণেই তাদের সাথে বসে পান করার সময় আপনি অস্বস্তিতে ভুগবেন না।”

ব্যাপারটিকে আরেকটু সহজ করা যাক। ধরুন, নিজের কাজের সূত্রে আপনি প্রচুর মানুষকে চেনেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও আপনার অনেকের সাথেই হাই-হ্যালো রয়েছে। কিন্তু তাদের সবাইকেই কি আপনার ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসেবে দাবি করতে পারবেন? পারবেন না। কেবল নির্দিষ্ট সংখ্যাক মানুষের সাথেই আপনার একটি ঘনিষ্ঠ সখ্য থাকবে, যা কেবল ভদ্রতা বা আনুষ্ঠানিকতাতেই আটকে থাকবে না।

সম্পর্ককে যখন এমন শর্তাধীন করে ফেলা হবে, তখন স্বাভাবিকভাবেই শর্ত পূরণে সক্ষম মানুষের সংখ্যা কমে যাবে। কারণ সব মানুষের সাথেই আপনার খুব অন্তরঙ্গ হয়ে ওঠা সম্ভব না। অফিসে বসের সাথে হয়তো আপনার খুব দহরম মহরম রয়েছে। বস যেকোনো প্রয়োজনেই প্রথমে আপনাকে তলব করেন। অফিসের সবাই জানে, আপনি বসের প্রিয় পাত্র। কিন্তু তারপরও, বসের সাথে আপনার সম্পর্কের মধ্যে কোথাও একটা অদৃশ্য সীমারেখা অবশ্যই রয়েছে। সেই সম্পর্ক আপনার খুব সহজে পেরোনো সম্ভব না। তাই আপনি শুধু বসের বাহ্যিক রূপটাই দেখতে পারবেন। যদি তার ভেতরের রূপটিও আপনার দেখার সুযোগ ঘটে যায়, সেটি হবে ব্যতিক্রম, এবং বস তখন আপনার অর্থবহ সম্পর্কযুক্ত ১৫০ জনের তালিকায়ও যুক্ত হয়ে যাবেন।

কেন মাত্র ১৫০ জনের সাথেই এমন অর্থবহ সম্পর্ক গঠন করা সম্ভব? এর কারণ হিসেবে ডানবার উল্লেখ করেছেন প্রাইমেট বর্গের প্রাণীদের মস্তিষ্ক এবং তাদের গড় সামাজিক গোষ্ঠীর আকারের মধ্যকার পারস্পরিক সম্পর্ককে। এই সম্পর্কটি তিনি নির্ধারণ করেছেন নিউরো-ইমেজিং এবং পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে।

১৯৮০’র দশকে ডানবার গবেষণা করছিলেন শিম্পাঞ্জীদের নিয়ে। তিনি বোঝার চেষ্টা করছিলেন, কেন তারা নিজেদের মধ্যে সামাজিকতা রক্ষা এবং পরস্পরকে লালন-পালনে এত বেশি সময় ব্যয় করে। ঠিক তখনই প্রাইমেট বর্গের প্রাণীদের মস্তিষ্ক এবং তাদের সামাজিক গোষ্ঠীর আকার বিষয়ক তত্ত্বের জন্ম হয়। সেই তত্ত্বকে তিনি পরবর্তীতে মানুষের ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করেন, এবং আবিষ্কার করেন যে মানুষের মস্তিষ্কের যে গড় আকৃতি, তা কেবল ১৪৮ জন মানুষের সাথে অর্থবহ সম্পর্ক রক্ষায় সক্ষম।

যথারীতি অর্থবহ সম্পর্ক রক্ষা বলতে এখানে বোঝানো হচ্ছে ওই ১৪৮ জনের ব্যাপারে মোটামুটি বিস্তারিত ধারণা, সম্পর্কের মাত্রা অনুযায়ী তাদের সাথে আচরণ, তাদের বিভিন্ন কাজ ও ব্যবহারকে বুঝতে পারা, তাদের সাথে অতীত স্মৃতি সংরক্ষণ ইত্যাদি। মানুষের মস্তিষ্ক একই সময়ে এই প্রক্রিয়াগুলো গড়ে ১৪৮ জন পরিচিত মানুষের জন্যই করতে পারে। এরপর সেই ১৪৮ সংখ্যাটিকেই রাউন্ড ফিগারের মাধ্যমে ১৫০ হিসেবে কল্পনা করে নেন ডানবার।

২০১২ সালে টেড টকে কথা বলার সময় তিনি বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করেন এভাবে,

“দেখা যায় যে আমরা কেবল নির্দিষ্ট কিছু সংখ্যক ব্যক্তিবিশেষের সাথেই অর্থবহ সম্পর্ক বজায় রাখতে পারি। কারণ মস্তিষ্কের আকৃতি অনুযায়ী আমাদের প্রত্যেকেরই অবধারণগত সীমাবদ্ধতা রয়েছে।”

টেড টকে কথা বলছেন ডানবার; Image Source: TEDxObserver

ডানবার শুধু ১৫০ সংখ্যাটি খুঁজে বের করেই থেমে যান না। তিনি তার গবেষণা অব্যাহত রাখেন, এবং আবিষ্কার করেন যে সুপ্রাচীনকাল থেকেই মানুষ নিজেদের অর্থবহ সম্পর্ক ১৫০ জনের মাঝেই সীমাবদ্ধ রেখেছে। সেই শিকারী-সংগ্রাহক যুগের সমাজগুলো গঠিত হতো ১৫০ জন মানুষের সমন্বয়ে। এরপর নবপলীয় যুগের গ্রামগুলোতে বাস করত ১৫০ থেকে ২০০ জন মানুষ। এমনকি আধুনিক সময়ের সেনাবাহিনীর প্রতিটি কোম্পানিতেও থাকে ১৮০ জন করে সৈন্য।

অনেকের কাছেই ১৫০ সংখ্যাটিকে খুব বড় মনে হতে পারে। তারা ভাবতে পারেন, এতগুলো মানুষের সাথে অর্থবহ আন্তঃব্যক্তিক যোগাযোগ কীভাবে সম্ভব! এই সমস্যারও সমাধান করেছেন ডানবার। তিনি কখনোই মনে করেন না ১৫০ জন মানুষের সাথেই সমান অন্তরঙ্গতা বজায় রাখা সম্ভব।

ডানবারের মতে, একজন মানুষ মূলত খুব বেশি অন্তরঙ্গ সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে মাত্র পাঁচজনের সাথে। এই পাঁচজন হলো তার সবচেয়ে আপনজন, ভালোবাসার মানুষ। এই পাঁচজনের সাথে সে যেকোনো সুখ-দুঃখ ভাগ করে নিতে পারে, তাদেরকে যেকোনো গোপন কথা বলতে পারে।

“এই পাঁচজন হলো আপনার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু মানুষ। তারাই আপনার পাশে থাকে, আপনাকে আবেগিক সমর্থন দেয়।”

মানুষের সম্পর্ক-বৃত্তের নানা স্তর; Image Credit: Emmanuel Lafont

এই পাঁচজনের বাইরেও একজন মানুষের সম্পর্কের বৃত্তে আরো বেশ কিছু স্তর থাকে। যেমন ১৫ জন থাকে তার ভালো বন্ধু, ৫০ জন বন্ধু, ১৫০ জন অর্থবহ পরিচিত, ৫০০ জন জানাশোনা, এবং ১৫০০ জন যাদের সে দেখা হলে স্রেফ চিনতে পারে। এই বৃত্তগুলোয় আবার মানুষের আসা-যাওয়া চলতে থাকে। যেমন: খুব আপন কেউ হয়তো সময়ের ব্যবধানে নিছকই ভালো বন্ধুতে পরিণত হয়, ভালো বন্ধু হয়ে যায় শুধু বন্ধু, আবার হুট করে নিতান্ত অপরিচিত বা স্বল্পপরিচিত কারো সবচেয়ে আপনজন বনে যাওয়াও অসম্ভব কিছু নয়।

লিঙ্গ এই স্তরবিন্যাসে বড় ভূমিকা পালন করতে পারে। যেমন: অনেক সমাজেই নারীরা বাইরে গিয়ে কাজ করে না, যার ফলে বাইরের দুনিয়ার সাথে তাদের তেমন একটা যোগাযোগ নেই। কিন্তু সারাদিন নিজগৃহ বা আশেপাশের মানুষদের সাথে সময় কাটানোয় খুব ভালো সম্পর্ক তাদের অনেকের সাথেই গড়ে ওঠে। সুতরাং তাদের জানাশোনা বা দেখা হলে চিনতে পারার মতো সম্পর্ক থাকে কম মানুষের সাথে, কিন্তু খুব আপনজন বা খুব ভালো বন্ধু থাকে পুরুষদের তুলনায় অপেক্ষাকৃত বেশি।

এদিকে একজন মানুষ অন্তর্মুখী না বহির্মুখী, সেটিও হয়ে ওঠে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক। বহির্মুখীরা অনেক মানুষের সাথে মেশে এবং তাদের পরিচিত নেটওয়ার্ক হয় অনেক বিস্তৃত। কিন্তু তাদের সাথে খুব বেশি অন্তরঙ্গতা থাকে খুব কম মানুষেরই, যাদের সাথে তাদের ব্যক্তিগত পর্যায়ে ঘনিষ্ঠতা থাকে। আবার অন্তর্মুখীদের যোগাযোগের ব্যাপ্তি হয়তো সীমিত, কিন্তু যাদের সাথে তাদের মেলামেশা রয়েছে, তাদের সাথে অন্তরঙ্গতাও অনেক বেশি গভীর।

সম্প্রতি এই তত্ত্বেই নতুন কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ কিছু সংযুক্তি ঘটিয়েছেন ডানবার। ২০১৮ সালের ১০ আগস্ট ফিনান্সিয়াল টাইমসের ‘Why drink is the secret to humanity’s success‘ শীর্ষক একটি আর্টিকেল প্রকাশ করেন তিনি। সেখানে তিনি নতুন আরো কিছু সংখ্যার অবতারণা ঘটান। তিনি লেখেন,

“আমাদের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বা আপন যে পাঁচজন, তাদের সাথে আমরা আমাদের মোট সামাজিক সময়ের ৪০ শতাংশ ব্যয় করি। এছাড়া ঘনিষ্ঠ আরো ১০ জন থাকে, যাদের সাথে আমরা মোট সময়ের আরো ২০ শতাংশ ব্যয় করি। সব মিলিয়ে, আমরা আমাদের মোট সময়ের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই ব্যয় করি মাত্র ১৫ জন মানুষের পেছনে।”

ডানবার প্রণীত তত্ত্বের রয়েছে বিশ্বব্যাপী তুমুল জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা। বিস্ময়কর হলেও সত্য, সুইডিশ আয়কর কর্তৃপক্ষ ডানবার’স নাম্বারকে এত বেশি গুরুত্ব দিয়েছে যে, এটির অনুকরণে তারা গোটা দেশব্যাপী নিজেদের সকল অফিসকেই ঢেলে সাজিয়েছে। তাদের কোনো নির্দিষ্ট অফিসেই তারা ১৫০ জনের বেশি কর্মী নিয়োগ দেয় না।

এছাড়া ১০,০০০ ঘণ্টা নীতিখ্যাত ম্যালকম গ্লাডওয়েলও সম্মতি জানিয়েছেন ডানবার’স নাম্বারে। ২০০০ সালে প্রকাশিত জনপ্রিয় বই ‘দ্য টিপিং পয়েন্ট’-এ তিনি আলোচনা করেন এটির বিষয়ে। তিনি একটি কোম্পানির উদাহরণ টেনে দেখান যে, কোম্পানিটি সবচেয়ে ভালোভাবে পরিচালিত হয়েছে তখনই, যখন একটি অফিসে একজন নেতার অধীনে ১৫০ জন ব্যক্তি কাজ করেছে। কিন্তু যখনই এক ছাদের তলায় ১৫০ এর বেশি মানুষ একসাথে কাজ করতে শুরু করেছে, তখনই বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা উৎপাত হিসেবে দেখা দিয়েছে, এবং কোম্পানিটির স্বাভাবিক চলার গতি ব্যাহত হয়েছে।

তবে সকলেই বিনাবাক্যব্যয়ে ডানবার’স নাম্বারকে স্বীকার করে না। এমন অনেকেই আছেন, যারা ডানবার’স নাম্বারকে সরাসরি অস্বীকার করেছেন। যেমন: ২০০১ সালে ক্রিস্টোফার ম্যাককার্থির নেতৃত্বে একটি গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সামাজিক গোষ্ঠীকে বিশ্লেষণের মাধ্যমে দেখানো হয় যে, কোনো সামাজিক নেটওয়ার্কে মোট সদস্য সংখ্যা হয় ২৯০। অর্থাৎ সংখ্যাটি ডানবার’স নাম্বারের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ।

১৫০ নয়, কিছু পরিসংখ্যান বলে ২৫০ জনের সাথে সম্পর্কের কথা; Image Credit: Emmanuel Lafont

এছাড়া ডানবার তার তত্ত্ব প্রণয়নের প্রায় ২০ বছর পর, ২০১০ সালে টাইলার ম্যাককরমিকের নেতৃত্বে কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির তিন সদস্য বিশিষ্ট একটি গবেষক দল একক ব্যক্তিবিশেষের সামাজিক নেটওয়ার্কের গড় আকার নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। সেখানে তারা মস্তিষ্কের আকৃতি নয়, গুরুত্বারোপ করেন বাস্তবসম্মত জরিপ ও পরিসংখ্যানগত হিসাবে। এবং শেষ পর্যন্ত দেখা যায়, একটি গড় নেটওয়ার্কের আকার হলো মোট ৬১১টি সংযোগ। আর মধ্যমা হলো ৪৭২টি সংযোগ। সাধারণ মানুষের কাছে এই সংখ্যাগুলো হয়তো খুব একটা তাৎপর্য বহন করে না, কিন্তু পরিসংখ্যানবিদদের কাছে সংখ্যাগুলো মাথা ঘুরিয়ে দেয়ার মতো। কেননা এই সংখ্যাগুলো ডানবার’স নাম্বারকে অগ্রাহ্যই শুধু করছে না, বরং সেটিকে বিপুল ব্যবধানে পিছনেও ফেলে দিচ্ছে।

এছাড়া ২০১০ সালেই জ্যাকব মরগান একটি আর্টিকেল রচনা করেন, যার শিরোনাম ছিল ‘Why Dunbar’s Number is Irrelevant’. সেই আর্টিকেলটি তিনি শেষ করেন এভাবে,

“আমাদের উচিৎ নয় চেষ্টা করা যে কীভাবে শক্তিশালী সম্পর্কের সংখ্যাকে আমরা সর্বোচ্চ করতে পারি, কিংবা কীভাবে আমরা ডানবার’স নাম্বারকে হারিয়ে দিতে পারি। কারণ কাজটি থেকে কোনো ফলই পাওয়া যাবে না, কেননা সেটি খুবই অপ্রাসঙ্গিক। যেখানেই সম্ভব দুর্বল সম্পর্ক তৈরি করুন, কেননা সেগুলো খুবই মূল্যবান, এমনকি শক্তিশালী সম্পর্কের চেয়েও।”

তবে এইসব সমালোচনায় খুব একটা পাত্তা দেন না স্বয়ং ডানবার। তিনি নিজে এখনো অটল রয়েছেন তার সৃষ্ট তত্ত্বে, যার প্রমাণ একটু আগেই পেয়েছেন ২০১৮ সালে রচিত তার আর্টিকেলটির মাধ্যমে। এছাড়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের তুমুল জনপ্রিয়তার ফলে যখন তার তত্ত্বটি অনেকের কাছেই প্রশ্নবিদ্ধ হতে শুরু করেছিল, তখন তিনি তার তত্ত্বটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের যুগেও প্রাসঙ্গিক কি না, তা যাচাইয়ের জন্য গবেষণা শুরু করেন। এবং শেষ পর্যন্ত তিনি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের যুগেও তার তত্ত্বটি সমান প্রাসঙ্গিক রয়েছে।

তার যুক্তি হলো, ফেসবুক, টুইটার, ইনস্টাগ্রাম প্রভৃতির কল্যাণে হয়তো মুহূর্তেই প্রচুর মানুষের সাথে যোগাযোগ ও সম্পর্ক স্থাপন সম্ভব হচ্ছে, যা ১৯৯০’র দশকে ছিল কল্পনাতীত ব্যাপার। কিন্তু তাই বলে কি আন্তঃব্যক্তিক যোগাযোগের মাত্রায় খুব বেশি উন্নয়ন ঘটেছে? ঘটেনি। মানুষ আগের চেয়েও অনেক বেশি ব্যস্ত হয়ে গেছে। তাই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে কাজে লাগিয়েও তারা প্রকৃত অর্থবহ সম্পর্ক সৃষ্টি করতে পারছে না। ফেসবুকে হয়তো অনেকের হাজার হাজার বন্ধু, টুইটারে আরো বেশি ফলোয়ার, কিন্তু দিনশেষে অর্থবহ ও গভীর সম্পর্ক সৃষ্টি ও রক্ষা তারা হাতেগোনা অল্প কিছু মানুষের সাথেই করছে।

এখনো আবিষ্কৃত হয়নি সত্যিকারের ভার্চুয়াল স্পর্শের পদ্ধতি; Image Source: Gotcha!

দ্য গার্ডিয়ানকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে ডানবারের দৃষ্টিভঙ্গি,

“হ্যা, আমি আপনার টুইট থেকে জানতে পারছি আপনি সকালে কী দিয়ে নাস্তা করেছেন। কিন্তু এর মাধ্যমে আসলে কি আমি ব্যক্তি আপনাকে আরো ভালোভাবে জানতে পারছি? এইসব ডিজিটাল উন্নয়ন আমাদেরকে পরস্পরের সংস্পর্শে থাকতে সাহায্য করছে, কেননা অতীতে এমন অনেক সম্পর্ক হয়তো দূরত্বের কারণে মরেই যেত। কিন্তু তারপরও, দিনশেষে একটি সম্পর্ককে অর্থবহ করে তুলতে আমাদের একসাথে থাকা খুবই জরুরি। ভার্চুয়াল সংস্পর্শে থাকার চেয়ে বাস্তব স্পর্শের উপর আমরা অনেক বেশি নির্ভরশীল। কিন্তু এখনো আমরা খুঁজে বের করতে পারিনি বাস্তবের স্পর্শকে কীভাবে ভার্চুয়ালি রূপান্তরিত করা যায়। যেদিন আমরা তা করতে সক্ষম হব, সেদিন নিঃসন্দেহে আমরা বড় কোনো অর্জন করে ফেলব।”

তিনি শেষ করেন শব্দের চেয়ে স্পর্শের গুরুত্ব উপস্থাপনের মাধ্যমে,

“শব্দেরা খুবই পিচ্ছিল। যেকোনো দিনেই, লিখিত ১০০০ শব্দের চেয়ে একটি স্পর্শের মূল্য অনেক অনেক বেশি।”

বিজ্ঞানের চমৎকার সব বিষয়ে রোর বাংলায় লিখতে আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন এই লিঙ্কেঃ roar.media/contribute/

This article is in Bengali language. It is about the Dunbar's Number, and why we can maintain meaningful relationships with only 150 people. Necessary references have been hyperlinked inside.

Featured Image © Emmanuel Lafont

 

Related Articles