Image Credit: businessinsider

এখন পর্যন্ত মহাবিশ্বে আমাদের মতো বুদ্ধিমান সভ্যতার খোঁজ মেলেনি। কিন্তু কেন? উত্তরে আমরা বলছি কারণ আমরা অনন্য। সভ্যতা পরিক্রমার কোনো এক জায়গায় এসে বাকি সব সভ্যতা মুখ থুবড়ে পড়লেও আমরা পার করে এসেছি সেই অনতিক্রম দেয়াল। কিন্তু কোথায় সেই বিশাল ফিল্টারের অবস্থান? আজকের লেখায় আমাদের আলোচনা সেই গ্রেট ফিল্টারের অবস্থান নিয়ে।

Image Credit: zidbits.com

একটা সম্ভাবনা হতে পারে, এই মহাবিশ্বের প্রাণ সৃষ্টিটাই একটি বিরল ঘটনা। অর্থাৎ প্রাণের ইতিহাসের একেবারে গোড়াতেই এই গ্রেট ফিল্টারের অবস্থান। একটু ভালো করে লক্ষ্য করলেই ব্যাপারটা অনুমান করা যায়। যেমন দীর্ঘ ১ বিলিয়ন বছরের ভাঙ্গা গড়ার পর সুস্থির হয়েছিল আমাদের পৃথিবী। তার উপর আজ পর্যন্ত আমরা কিন্তু কোনো ল্যাবরেটরিতে কৃত্রিম প্রাণ তৈরি কিংবা প্রাণ তৈরির সেই পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারিনি। যদি তাই সত্য হয়ে থাকে তবে বলতে হয়, বুদ্ধিমান সভ্যতা দূরে থাক, পৃথিবী ছাড়া মহাবিশ্বের আর কোথাও প্রাণেরই অস্তিত্ব নেই।

যদি মহাবিশ্বে জীবনের উদ্ভব কোনো বিরল ঘটনা না হয়ে থাকে, তবে আরেকটা সম্ভাবনা হতে পারে এমন, এককোষী থেকে বহুকোষী জীবে রূপন্তরই আসলে গ্রেট ফিল্টার। কারণ জীবনের উদ্ভবের ২ বিলিয়ন বছর কেটে যাওয়ার পরেই কিন্তু জটিল প্রাণের আবির্ভাব ঘটেছে, সুগঠিত হয়েছে নিউক্লিয়াস। অর্থাৎ মহাবিশ্বের অন্যসব প্রাণ সরল প্রোক্যারিয়ট পর্যন্ত এসে থমকে গেছে, পৃথিবীর মতো জটিল ইউক্যারিয়টে রূপান্তরিত হতে পারেনি। তার মানে হলো মহাবিশ্বে সরল প্রোক্যারিয়টরা কিলবিল করছে, কিন্তু তাদের ভাগ্যে আর উন্নত হওয়া সম্ভবপর হয়ে উঠেনি।

কিংবা এমনও হতে পারে আমরা এই কিছুদিন আগেই গ্রেট ফিল্টার পার করে এসেছি। মাঝারি বুদ্ধিমত্তা থেকে মানুষের বুদ্ধিমত্তায় রূপান্তরই হলো গ্রেট ফিল্টার। শিম্পাঞ্জীদের মাঝারি মানের বুদ্ধিমত্তা থেকে মানুষের মতো বুদ্ধিমত্তার আবির্ভাব সাদা চোখে সহজ মনে হলেও আসলে ব্যাপারটা এরকম নয়। বিবর্তন যে সবসময় প্রাণীকে উন্নত থেকে উন্নততর করবে, এমন নয়। কারণ বিবর্তন কখনো একটা নির্দিষ্ট লক্ষ্যকে সামনে রেখে আগায় না। এটা এমনিই ঘটে। কোনো কারণ ছাড়াই ঘটে। বিবর্তনের মূল চাবিকাঠি হলো চারপাশের বাস্তুতন্ত্রের সাথে মানিয়ে চলা, অভিযোজন করা। পৃথিবীর বাস্তুতন্ত্র তার প্রাণীকে বিবর্তনের মাধ্যমে শুধুমাত্র একবার বুদ্ধিমান সভ্যতায় নিয়ে আসলেও অন্য গ্রহগুলোর ক্ষেত্রে এমনটাও নাও হতে পারে। প্রাকৃতিক নির্বাচনের এই অসাধারণ ফল হয়তো মহাবিশ্বে সত্যিই বিরল।

Image Credit: Planet of the Apes

কিন্তু সমস্যা হলো গ্রেট ফিল্টারের প্রতিনিধি হিসেবে এরা খুব একটা টেকসই না। এই যেমন খোদ পৃথিবীতেই ৪৬টা ভিন্ন ভিন্ন অবস্থানে, ভিন্ন ভিন্ন পরিবেশে এককোষী থেকে বহুকোষী প্রাণের উদ্ভব ঘটেছে। আজ বাদে কাল যদি আমরা মঙ্গলে ফসিলায়িত ইউক্যারিয়টের দেখা পাই, তবে নিশ্চয়ই সেটাও বিলিয়নে একটা ঘটনা ঘটার মতো বিরল হবে না। তারপরও যদি নিজেদেরকে আমরা বিরল ও অনন্য দাবি করতে চাই তাহলে আমাদের নজর দিতে হবে আরেকটা প্রপঞ্চের দিকে। আর সেটা হলো ‘Rare Earth Hypothesis’.

Image Credit: eternosaprendizes.com

এ তত্ত্ব বলছে হতে পারে মহাবিশ্বে পৃথিবীর মতো গ্রহের অভাব নেই, হতে পারে সে সব গ্রহে পৃথিবীর মতো অনুকূল পরিবেশও আছে। কিন্তু এর মাঝেও সূর্যের সাথে পৃথিবীর সম্পর্ক কিংবা পৃথিবীর সাথে চাঁদের মতো বেশ বড় একটা উপগ্রহের সম্পর্ক যেটা কিনা পৃথিবীর জোয়ার ভাটা এবং অনন্য আবহাওয়ার জন্য দায়ী, কিংবা পৃথিবীর নিজের কোনো একটা বিশিষ্টের জন্য এ গ্রহটা অন্য সকল গ্রহ থেকে অনন্য। আর হয়তো তাই শুধু এখানেই ঘটেছে প্রাণের বিস্তারণ।

দ্বিতীয় সম্ভাব্যতা, আমরাই প্রথম

বিগ ব্যাং এর পর আজ অব্দি প্রায় ১৩.৮ বিলিয়ন বছর পার হয়ে গেল। হতে পারে প্রাণের উৎপত্তি ও বিকাশের জন্য আমাদের মহাবিশ্ব অনেক নবীন। মহাবিশ্ব সবে বুদ্ধিমান সভ্যতার বিকাশের অনুকূলে এসেছে। আমাদের মতো স্বল্প সংখ্যক প্রজাতি তাদের উন্নতির যাত্রাপথে এগোচ্ছে। বুদ্ধিমত্তায় তারাও আমাদেরই মতো। খুব বেশি এগিয়ে যাওয়ার সময় পায়নি। অর্থাৎ মহাবিশ্বে জীবনের উদ্ভব ও বিকাশের ইতিহাস সূচনা হয়েছে আমাদের দ্বারাই। এবং তৃতীয় শ্রেণির বুদ্ধিমত্তার দৌড়ে আমরাই সকলের চেয়ে এগিয়ে।

একটু খেয়াল করলেই বোঝা যায় ব্যাপারটা। মহাকাশের পানে দুরবিন তাক করে আমরা এখনো দেখি, কী হারে দূর ছায়াপথগুলোতে ঘটে যাচ্ছে গামা রশ্মি বিস্ফোরণ! সে তুলনায় মহাবিশ্বের এই অঞ্চলটা এখন তুলনামূলকভাবে বেশ শান্ত। মহাজাগতিক এসব মহাপ্রলয় আমরা বেশ আগেই পার করে এসেছি। তার উপর পৃথিবীর নিজস্ব অগ্ন্যুৎপাত, উল্কাপাত কমে কমে শান্ত হতে পৃথিবীর সময় লেগেছে কয়েকশ মিলিয়ন বছর। এত কিছুর পরেই না পৃথিবীতে ঘটেছে প্রাণের বিকাশ। আর তাই মহাবিশ্বে জৈবিক বুদ্ধিমত্তা ও প্রাযুক্তিক উৎকর্ষতায় আমরাই প্রথম এই ধারণাটিও একেবারে ফেলে দেয়ার মতো কিন্তু নয়!

তৃতীয় সম্ভাব্যতা, আমাদের ধ্বংস অনিবার্য

‘মঙ্গলে মিললো তরল পানির অস্তিত্ব’। ‘কিউরিসিটির ফসিলায়িত মাইক্রো অর্গানিজম আবিষ্কার’। কেমন হতো যদি ঘুম থেকে উঠে সকালে পত্রিকার পাতায় এমন শিরোনাম আপনার চোখে ভাসে! পৃথিবী ছাড়াও অন্য গ্রহে তবে ঘটেছে প্রাণের বিস্তারন। অসাধারণ একটা খবর তাই না? তবে আপনার জন্য বলছি এটা হবে পত্রিকায় শিরোনাম হওয়া মানব ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ কোনো সংবাদ। সভ্যতার ইতিহাসে এর থেকে খারাপ খবর আর হতেই পারে না। এর মানে হলো প্রাণের উদ্ভব মহাবিশ্বে কোনো বিরল ঘটনা নয়, এককোষী থেকে বহুকোষীতে রূপান্তর বিলিয়নের মধ্যে একটা এরকম বিরল ঘটনা নয়। অর্থাৎ মহাবিশ্বে আমরা বিরল নই, আমরা প্রথমও নই। গ্রেট ফিল্টার আমরা পেছনে ফেলে আসিনি। আমাদের সামনেই আছে গ্রেট ফিল্টারের অবস্থান।

আমাদের আগেও অনেক অনেক প্রজাতি আমাদের মতো বুদ্ধিমত্তা লাভ করেছিল, কিন্তু ওই গ্রেট ফিল্টারে গিয়ে সবাই মুখ থুবড়ে পড়েছে। আমরাও নিশ্চয়ই তার ব্যতিক্রম হবো না! অর্থাৎ আমাদের ধ্বংস অনিবার্য।

কিন্তু ভবিষ্যতে আসু এই গ্রেট ফিল্টারটা আসলে কী? গামা রশ্মি বিস্ফোরণের মতো কোনো মহাজাগতিক প্রলয় নাকি একটা নির্দিষ্ট বুদ্ধিমত্তায় এসে নিজেরাই নিজেদেরকে ধ্বংস করে ফেলে বুদ্ধিমান সভ্যতাগুলো? এই যেমন এ মুহুর্তে মানুষের হাতে যে পরিমাণ পারমাণবিক বিস্ফোরক আছে তাতে পৃথিবীর প্রায় সকল প্রজাতিকে কম করে হলেও বেশ কয়েকবার ধ্বংস করা যাবে। আইনস্টাইনকে একবার প্রশ্ন করা হয়েছিল “তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধে কী ধরনের অস্ত্র ব্যবহার হতে পারে?” আইনস্টাইনের উত্তর ছিল “তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ সম্পর্কে জানি না, তবে চতুর্থ বিশ্বযুদ্ধ যে লাঠি এবং পাথর দিয়ে হবে তা বলতে পারি”। আজ বেঁচে থাকলে আইনস্টাইন হয়তো বলতেন, চতুর্থ বিশ্বযুদ্ধ করার মতো কেউ থাকলে তো!

তার মানে গ্রেট ফিল্টারকে পুরোপুরি বুঝতে হলে শুধু জীববিজ্ঞানের কিংবা মহাকাশবিজ্ঞান নিয়ে পড়ে থাকলে চলবে না, আমাদের বুঝতে হবে বুদ্ধিমান সভ্যতার সামাজিক প্রেক্ষাপট, গবেষণা করতে হবে তাদের মনস্তত্ত্ব নিয়েও। আগামি পর্বে আমরা গ্রেট ফিল্টারের এরকম বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করবো। আর বুঝতে চেষ্টা করবো কোথায়, কীভাবে, কোন রূপে বিরাজ করছে মানব সভ্যতার সবচেয়ে বড় এই আতঙ্কটি। ততদিনে…

নদীর জলে থাকিরে কান পেতে,

কাঁপে যে প্রাণ পাতার মর্মরেতে ।

মনে হয় যে পাব খুঁজি ফুলের ভাষা যদি বুঝিরে,

যে পথ গেছে সন্ধ্যা তারার পারে, মন মনরে আমার”। – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

The article is about the history of life in the universe. This also discuss about the possibility of the existence of other races outsde the earth.

Featured image: sci-news.com