বাঁচার জন্য শুধুমাত্র নিজেদের তাপমাত্রা বাড়িয়ে মৌমাছির ভিমরুল নিধন

জাপানি জাতের একধরনের বিরাট ভিমরুল যার  বৈজ্ঞানিক নাম হচ্ছে Vespa mandarinia japonica। এরা মৌমাছি শিকার করতে ওস্তাদ। প্রায়ই এরা জাপানি মৌমাছি শিকারে বের হয়। কিন্তু যদি কোনোভাবে একটি মাত্র ভিমরুল এই কাজটি করতে যায় তাহলে তাদের মরণদশা হয়ে যায়। কোনো ভিমরুল যদি মৌমাছির চাক আক্রমণ করে তাহলে বিভিন্ন দিক দিয়ে প্রায় ১৮০ থেকে ৩০০টির উপর মৌমাছি ভিমরুলের চারদিক ঘিরে ধরে এবং নিজেরা একসাথে হয়ে নিজেদের মধ্যে একটি গোল সদৃশ বলের আকার নিয়ে ভিমরুলকে চেপে ধরে যাতে ভিমরুল চাকতির কোনো ক্ষতি না করতে পারে। পরীক্ষা করে দেখা গিয়েছে যে এরকম আক্রমণের পরে মৌমাছিগুলো ভিমরুলের গায়ে কোনো কামড় দেয়নি, হূল ফুটায়নি, চাপ দিয়ে দুমড়ে মুচড়ে ফেলেনি, এমনকি নিঃশ্বাস পর্যন্ত বন্ধ করেনি, তবুও মোটামুটি বিশ মিনিটের মধ্যে ভিমরুল সেখানে মৃত্যুবরণ করে। এরকমটি কেন হয়? কী এমন সেখানে মৌমাছিরা করে যার কারণে কারণে ভিমরুল মারা পড়ে? আজকের লেখায় এই বিষয়ে আলোচনা করা হবে।

কোনো কামড় নেই, হূল ফুটানো নেই, দুমড়ে মুচড়ে ফেলা হয়নি, নিঃশ্বাস বন্ধ করেনি, তবুও ভিমরুল মরে গেল, কীভাবে? Source: dhakatime24.com

যখন এই বিরাট আকারের ভিমরুল মৌমাছির চাকতি আক্রমণ করে, তখন প্রায় একশোর উপর মৌমাছি ভিমরুলকে মেরে ফেলার জন্য এর চারদিকে বলের মতো হয়ে ঘিরে ধরে। যখন মৌমাছিরা এরকমভাবে অবস্থান নেয় তখন তারা খুব জলদি তাদের নিজেদের শরীরের তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেয়। এই তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে ৪৭ কিংবা ৪৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠে যায়। পুরো তাপমাত্রাটি মৌমাছির শরীরে বিরাজ করে এবং এই তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে সকল মৌমাছিই অংশ নেয়। এই তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণেই ভিমরুলের মৃত্যু ঘটে [১]।

মৌমাছিরা খুব জলদি তাদের নিজেদের শরীরের তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেয়; Source: The Honeybee Conservancy

প্রকৃতির কী সুন্দর নিয়ম। প্রকৃতি বিপদের সময়ে মৌমাছিদের একত্র করে দলবেঁধে আক্রমণ করার জন্য নির্দেশ দেয়। কারণ একটিমাত্র মৌমাছি এই কাজটি করতে পারবে না। একটিমাত্র মৌমাছি যদি ভিমরুলকে আক্রমণের পর এর শরীরের তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেয় তাহলে মৌমাছি থেকে সেই তাপ ভিমরুলের গায়ে লাগলেও ভিমরুলের তেমন কোনো ক্ষতি হবে না। কারণ তাপমাত্রা বাড়ানোর সাথে সাথে কিছু তাপ বাইরে বিকিরিত হয়ে গেছে। তাই ভিমরুলের গায়ে যে তাপ যাবে সেটা অনেক কম হবে।

কিন্তু একসাথে একশো মৌমাছি যদি আক্রমণ করে এদের গায়ের তাপমাত্রা একত্রে বাড়িয়ে দেয় তাহলে মৌমাছিরা যে বলের মতো তৈরি করে ভিমরুলকে ঘিরে ধরেছে সেই বলের ভিতরে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাবে। খুব স্বাভাবিক যে একটি মাত্র মৌমাছি যে পরিমাণ তাপ তৈরি করবে এর থেকে একশো গুন বেশি তাপ তৈরি করবে একশো মৌমাছি যেটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং ভিমরুলকে মেরে ফেলতে যথেষ্ট। একশো মৌমাছির থেকে যে তাপ শক্তি ভিমরুলের গায়ে যায় সেটার কারণে ভিমরুলের টিকে থাকা দায় হয়ে পড়ে এবং সেখানেই ভিমরুল মারা যায়। এখানে আরেকটি প্রশ্ন আসে, মৌমাছিদের নিজেদের শরীরে এত তাপমাত্রা তৈরি করলে নিজেরাই মারা পড়ার কথা, কিন্তু সেটা তো হচ্ছে না। এরকমটি এক্ষেত্রে হবে না কারণ, বেশি তাপমাত্রা মৌমাছিদের জন্য প্রাণঘাতী নয়, কিন্তু ভিমরুলের জন্য তা মারাত্মক [২]।

একসাথে একশো মৌমাছি যদি আক্রমণ করে এদের গায়ের তাপমাত্রা একত্রে বাড়িয়ে দেয়; Source: Beemaster

এরকম আরও উদাহরণ আছে। Vespa simillima xanthoptera নামের একটি ভিমরুল জাপানের Apis cerana japonica নামক একটি মৌমাছির প্রধান শত্রু। এই জাতের ভিমরুলগুলো প্রায়ই এই মৌমাছিদের চাকে হামলা করে। পরীক্ষা করে দেখা গেছে যে জুলাই থেকে অক্টোবর – এই সময়ের মধ্যে শ্রমিক ভিমরুলগুলো মৌমাছির চাকের চারপাশে ঘুরঘুর করে। একটু সুযোগ পেলেই এরা সেই চাকে হামলা করে এবং তাদের নিজেদের জন্য এবং নিজেদের লার্ভার খাবারের জন্য মৌমাছি শিকার করে। মাঝেমাঝেই মৌমাছিরা এসব ভিমরুলকে চেপে ধরে এবং এর চারপাশে উপরে বর্ণনা করা প্রক্রিয়াতে আক্রমণ করে [৩]।

ভিমরুলগুলো প্রায়ই এই মৌমাছিদের চাকে হামলা করে; Source: honeybeesuite.com

ভিমরুলকে ঘিরে মৌমাছিরা যে বলের মতো আকার কিংবা আবরণ তৈরি করে অবস্থান করে সেখানে ঘিরে ধরার প্রায় সাথে সাথেই তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেতে থাকে। প্রায় চার মিনিটের মধ্যে তাপমাত্রা ৪৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের উপরে উঠে যায়। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে এই তাপমাত্রা প্রায় ২০ মিনিট পর্যন্ত ধরে রাখা হয় এবং এরপরে মৌমাছিরা তা আস্তে আস্তে কমিয়ে আনতে থাকে। পরীক্ষা করে দেখা গেছে যে তাপমাত্রা কমানোর সময় ৩৪ মিনিট পর্যন্ত তা আস্তে আস্তে কমে। কিন্তু এরপরে খুব দ্রুত কমে গিয়ে আশেপাশের পরিবেশের ন্যায় তাপমাত্রায় নেমে আসে। পুরো প্রক্রিয়াতে মোট সময় অতিবাহিত হয় প্রায় ৬০ মিনিট। কারণ প্রায় ৩০ মিনিট পর্যন্ত সবগুলো মৌমাছি বল আকারে অবস্থান করে, এরপর আস্তে আস্তে সবগুলো মৌমাছি সেখান থেকে সরে আসতে শুরু করে। যখন ১০-১৫টি মৌমাছি অবশিষ্ট থাকে তখনই মৃত ভিমরুলকে দেখা যায়।

মৌমাছির বলের ভিতর তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেতে থাকে; Source: Funnyjunk

এখানে আরেকটি বিষয় বলে রাখি যে যখন মৌমাছি আক্রমণ করে তখন কিছু বৈশিষ্ট্য বিজ্ঞানীদের মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। দেখা গিয়েছে যে, ভিমরুল মৌমাছির চাকে আক্রমণ করার প্রায় ১৫ সেকেন্ডের মধ্যে অন্তত একটি মৌমাছি ভিমরুলকে আক্রমণ করবে, এরপর খুব দ্রুত ২০০ এর বেশি মৌমাছি সেখানে ভিমরুলকে আক্রমণ করে এর চারপাশে বলের ন্যায় অবস্থান করবে। পরীক্ষা করে যখন ব্যাপারটি দেখা হয় তখন দেখা যায় যে, প্রায় সব ক্ষেত্রেই একই রকম ফলাফল এসেছে। ঠিক একই রকম ফলাফল এসেছে ইউরোপের একটি ভিমরুল এবং মৌমাছির ক্ষেত্রেও [৪]।

উপরের আলোচনা থেকে বোঝা যাচ্ছে যে প্রকৃতির অদ্ভুত খেয়াল। ছোট ছোট প্রাণীগুলোকেও লড়াই করার পুঁজি তৈরি করে দিয়েছে প্রকৃতি, এমনকি বুদ্ধি করে সেই লড়াই নিজে নিজে শিখে নেয়ার পদ্ধতিও তৈরি করে দিয়েছে। এগুলো সম্পর্কে জেনে সত্যিই অবাক লাগে।

তথ্যসূত্র:

[১] Walker, J. (2007). Flying Circus of Physics. John Wiley & Sons, Inc.

[২] Khamsi, R. (2007) Honeybees gang up to smother deadly hornets,” New Scientist, Accessed on 30th April, 2018

[৩] Papchristoforou, A., A. Rortais, G. Zafeiridou, G. Theophilidis, L. Garnery, A. Thrasyvoulou, and G. Arnold. (2007) Smothered to death: Hornets asphyxiated by honeybees,” Current Biology, 17, No. 18, pp. 795-796

[৪] Ono, M., I. Okada, M. Sasaki. (1987) Heat production by balling in the Japanese honeybee, Apis cerana Japonica as a defensive behavior against the hornet, Vespa simillima xanthoptera,  Experientia, 43, No. 9, 1031-1032

ফিচার ইমেজ সোর্স: SpaceBattles Forums

Related Articles