কীভাবে ভূমিকম্প থেকে আলোর ঝলকানির সৃষ্টি হয়?

পৃথিবীর কিছু কিছু জায়গা থেকে এমন খবর পাওয়া গিয়েছে যে ভূমিকম্প অনুভূত হওয়ার পরপর সেখানে আলোর ঝলকানি দেখা গিয়েছে। সেই আলো রাতের আকাশকে হয় লাল করে ফেলেছে, না হয় সেই জায়গার মাটির উপরের চারপাশ আলোকিত করে ফেলেছে, না হয় কোনো এক উজ্জ্বল আলোক পিণ্ড বাতাসের ভিতর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ব্যাপারটা প্রথম দিকে কেউ বিশ্বাস করেনি। কিন্তু পরে যখন ঘটনাটির বেশ কিছু প্রমাণ পাওয়া গেলো তখন বিজ্ঞানীরাও এটা নিয়ে মাথা ঘামানো শুরু করলেন এবং এ নিয়ে বেশ কিছু গবেষণাপত্রও বের হলো। অনেক পত্রপত্রিকাতে বেশ কিছু প্রমাণমূলক ছবিও প্রকাশ পেয়েছিলো। গত বছরের সেপ্টেম্বরে মেক্সিকোতে ৮.২ মাত্রার যে ভূমিকম্প হয়েছিলো সেখানেও এমন রহস্যময় আলো ভূকম্পনের পরে দেখা গিয়েছে বলে প্রতিবেদন দেয়া হয়। কিন্তু এমন আলো উৎপন্ন হওয়ার কারণ কী? আবার শুধুমাত্র ভূমিকম্প হওয়ার পরেই কেন এরকম আলোর তৈরি হয়? ভূমিকম্প হয় মাটির নিচে। তাহলে মাটির উপরে কেন এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়?

Source: hexapolis.com

ভূমিকম্প থেকে আলো তৈরি হওয়ার এই ব্যাপারটা নিয়ে বিভিন্ন রকমের মতভেদ আছে। হাজার রকম রিপোর্ট, অনেক রকমের প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও ভূকম্পন আলো তৈরির ঘটনা নিয়ে বিতর্ক রয়ে গিয়েছে। এই আলো শুধুমাত্র একটি কারণের উপর নির্ভর করে না-ও তৈরি হতে পারে। এরকম রহস্যময় আলো তৈরির পেছনে অনেকগুলো কারণ একসাথে কাজ করতে পারে। তবুও কিছু কিছু ব্যাখ্যা বিজ্ঞানীরা দেয়ার চেষ্টা করেছেন।

একটি কারণ হতে পারে যে, ভূমিকম্পের ফলে মাটির নিচের পাথরগুলোর উপর চাপ তৈরি হয়। সাধারণত টেকটনিক প্লেটের নড়াচড়ার কারণে এমনটি হতে পারে। এসময় আগ্নেয় শিলা (Igneous Rock) এবং পাললিক শিলা (Sedimentary Rock) চাপের কারণে পরিবর্তিত হয়ে রূপান্তরিত শিলা বা পাথরে (Metamorphic Rock) পরিণত হয়। প্রচণ্ড চাপের কারণে অনেক সময় এসব প্রস্তরখণ্ড ফেটে (Rupture) ভাগ হয়ে যেতে চায়। এই ফেটে যাওয়ার সময় কিছু শক্তি বের হয়ে যায়।এর ফলে সূক্ষ্ম ধূলিকণা, গ্যাস এবং মুক্ত ইলেকট্রন ইত্যাদি বের হয়ে পরে। এর থেকে ধরে নেয়া যায় যে, এই মুক্ত ইলেকট্রনগুলো বাতাসের অণুগুলোকে উত্তেজিত করে ফেলে এবং সেখান থেকে আলো নিঃসরণ হয়।

Source: Geology In

আবার, আরেকটি কারণ হতে পারে যে,  ভূকম্পন তরঙ্গের কারণে অবশ্যই মাটির উপরে এবং নিচে কম্পন অনুভূত হবে এই তথ্য আমরা জানি। এই কম্পন গতির কারণে মাটির নিচে জমে থাকা দাহ্য গ্যাস, যেগুলো খুব তাড়াতাড়ি শিখা বিস্তার করে জ্বলে উঠে পুড়ে যায়, বের হয়ে আসতে পারে। এই গ্যাসগুলো মাটির নিচে বিভিন্ন ভৌগলিক কারণে জমে থাকতেই পারে। এই গ্যাসগুলো বাতাসের সংস্পর্শে এসে জ্বলে গিয়ে আলো তৈরি করে। এমনকি অনেক সময় এরা স্ফুলিঙ্গেরও সৃষ্টি করতে পারে [১]।

Source: youtube.com

বিভিন্ন গবেষণাপত্রে এ নিয়ে বেশ কিছু প্রতিবেদন প্রকাশ পেয়েছে। যেমন, ১৯৭০ সালে নেচারে প্রকাশিত একটি প্রবন্ধে বলা হয় যে ভূমিকম্পের সাথে সাথে অনেক সময় বিভিন্ন রকম লাইটনিং বা বজ্রপাতের সৃষ্টি হতে পারে। যেমন, বল লাইটনিং। এর কারণ হিসেবে সেখানে বলা হয় পিজো ইলেকট্রিক প্রভাবের কথা, যা মাটির নিচের বিভিন্ন স্তরে পৃথিবীর চাপের কারণে তৈরি হতে পারে। এর ফলে একটি বৈদ্যুতিক ক্ষেত্র তৈরি হয়ে যেতে পারে যার প্রভাবে এমন আলো তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। জাপানে একটি প্রথা আছে, যেহেতু সেখানে প্রায় প্রতিদিনই ছোট ছোট ভূমিকম্প হয়, তাই তারা আকাশে অস্বাভাবিক বজ্রপাত দেখে ভূকম্পন হওয়ার সম্ভাবনা বের করে। তাদের একটি বিশ্বাস আছে যে পৃথিবীর ভূমির নিচে চাপজনিত পরিবর্তনের কারণে বৈদ্যুতিক ক্রিয়াশীল স্থান (Electric Field) তৈরি হতে পারে যে কারণে মাটির উপরে এমন অস্বাভাবিক আচরণ ভূমিকম্পের আগে বা পরে দেখা যায়। উল্লেখ্য যে, ভূমিকম্পের ফলে এরকম আলোক উৎস তৈরির গবেষণা জাপানেই বেশী করা হয়েছে এবং এটা নিয়ে আধুনিকতম গবেষণা ১৯৩০ সালে তেরাদা এবং মুসিয়া নামের দুই জাপানী বিজ্ঞানী প্রথম শুরু করেন [২]।

Source: youtube.com

বিংশ শতাব্দীতে ভূকম্পনে আলোর গুরুত্বপূর্ণ কিছু ঘটনার উদাহরণগুলো হচ্ছে- জাপানের ইদু উপদ্বীপে ২৬ নভেম্বর ১৯৩০ সালে ভূমিকম্পের পর চারদিক এমন আলোকোজ্জ্বল হয়ে পরে যেটা নাকি জ্যোৎস্নার থেকেও তীব্র ছিল। ২৭ জুলাই ১৯৭৬ সালে চীনে তাংশান ভূমিকম্পের ফলে এরকম আলো উৎপন্ন হয়। সেখানকার মানুষদের সাথে কথা বলে জানা যায় যে, ভূমিকম্পের সাথে সাথে চারপাশ এত আলোকজ্জ্বল হয়ে পড়েছিল যে, তাদের ঘুম ভেঙ্গে গিয়েছিলো। বিজ্ঞানীরা এই আলোর হাতেনাতে প্রমাণ পান ওয়াশিংটনের  ইয়াকিমা ইন্ডিয়ান রিজার্ভেশন নামক জায়গায়, যেখানে মূলত ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী বা উপজাতিদের বাস। এই জায়গায় ভূমিকম্পের ফলে চারপাশে যে আলো তৈরি হয় তা শনাক্ত করা সম্ভব হয়। এখান থেকে কিছু প্রমাণমূলক ছবি, কিছু লিখিত প্রতিবেদন এবং কিছু উপাত্ত সংগ্রহ করা সম্ভবপর হয়। এই উপাত্তগুলো থেকে বিজ্ঞানীরা পরিসংখ্যানের গাণিতিক তত্ত্ব ব্যবহার করে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। সেখানে দেখানো হয় যেসব এলাকা ভূমিকম্পপ্রবণ সেই এলাকাগুলোতে টেকটনিক বিকৃতির (Tectonic Strain) সাথে এই আলো উৎপত্তির কারণ জড়িয়ে থাকতে পারে। একটি হাইপোথেসিস বা প্রস্তাবনা ব্যবহার করে এই গবেষণাপত্রটি প্রকাশ করা হয়েছিলো যা ছিল মূলত উপাত্তের উপর নির্ভরশীল। কিন্তু কোনো প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যপূর্ণ এবং গাঠনিক যুক্তি এখানে দেখানো হয়েছিলো না।

Source: youtube.com

কিন্তু এই গবেষণাটি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কারণ এর পরেই বিজ্ঞানীরা এই বিষয়ের উপর কিছু চিন্তাশীল গবেষণার সাথে যুক্ত হন। এরপরেই বিজ্ঞানীরা এর গাঠনিক বৈশিষ্ট্য নির্ণয়, পরীক্ষাগারে কৃত্রিম পরিবেশ তৈরি করে এর উপর গবেষণা, আরও উন্নত প্রযুক্তি এবং যন্ত্র বের করা যেগুলোর মারফত আরও সূক্ষ্ম উপাত্ত যাতে পাওয়া যায়- সেরকম গবেষণা শুরু করেন এবং বেশ কিছু ক্ষেত্রে সফলতা লাভ করেন। পরীক্ষাগারের অনুসন্ধানে প্রমাণিত হয় যে, ইলেকট্রনের কারণে এমন আলোকজ্জ্বল পরিবেশ তৈরি হতে পারে তখনই যখন ভূমির নিচে যে জায়গায় কম্পনের কারণে ফাটল তৈরি হয়েছে সেই ফাটল যদি ভূমির উপরভাগ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। এতে করে ভিতরের গ্যাস, ধূলিকণা বা মুক্ত ইলেকট্রন  সহজেই বাইরে বের হয়ে আসতে পারবে। তবে একটা সমস্যার সমাধান করা এখানে খুব কঠিন হয়ে পড়েছে যে, প্রত্যক্ষদর্শীরা দাবি করে যে এই আলো কয়েক সেকেন্ড, এমনকি মিনিট পর্যন্ত অবস্থান করেছিলো। কিন্তু পরীক্ষা করার সময় এই আলোর স্থায়িত্ব এক সেকেন্ডের বেশী ছিল না। তাই এখানে একটি খটকা লেগেই থাকে [৩, ৪]।

Source: steemit-production.com

তবে এটা অনস্বীকার্য যে এরকম রহস্যময় ঘটনার সঠিক বৈজ্ঞানিক বিবৃতি দেয়া এতটা সহজ নয়। ভূকম্পন বিষয়ে বিখ্যাত এক গবেষক পেরি বেয়ারলি তার শিক্ষার্থীদের বলতেন যে, ভূমিকম্পের ফলে আলোর উৎপত্তির এই ঘটনা, যেটা মানুষ দাবী করে, এটা আসলে ভূকম্পনবিদ্যার একটি অন্ধকার শাখা! যদিও পরবর্তী গবেষণায় এরকম আলোর উৎপত্তির ঘটনা এবং বাস্তবতা স্বীকার করা হয়েছে। সর্বোপরি এটাকে প্রকৃতির দানই বলতে হবে এবং প্রকৃতিকে ধন্যবাদ দিতেই হবে মানুষদের নতুন একটি শাখায় গবেষণা করার দ্বার উন্মুক্ত করে দেয়ার জন্য। ভূমিকম্পের ফলে আলো তৈরি হওয়ার ঘটনার সাথে যদি মানব সমাজের কোন ক্ষতির সম্ভাবনা থাকে তাহলে হয়তো এই বিষয়ে গবেষণা করার কারণেই কোনো সময় এর কারণে মানব সমাজ বিলুপ্ত হবার হাত থেকে রক্ষা পাবে! সত্যি কথা বলতে কি, কোনো গবেষণাই ছোট নয়। প্রত্যেকটি গবেষণার একটি দীর্ঘকালীন উপকারিতা আছে যেটা আজ না হয় কাল প্রকাশ পাবেই এবং সবার জন্য মঙ্গল বয়ে আনবে।

তথ্যসূত্র:

[১] Walker, J. (2007). Flying Circus of Physics. John Wiley & Sons, Inc.

[২]  Finkelstein, D. and Powell, J. (1970). Earthquake lightning, Nature, 228, No. 5273, 759-760

[৩] Derr, J.S. (1986). Luminous phenomena and their relationship to rock fracture, Nature, No. 321, 470-471

[৪] Derr, J. S. (1973). Earthquake lights: a review of observations and present theories. Bulletin of the Seismological Society of America, 63, No. 6, 2177-2187.

ফিচার ইমেজ: all4desktop.com

Related Articles