ইন্টারস্টেলার স্পেস: যেখানে কেউ কখনো যায়নি!

জটিল গল্পনির্ভর চলচ্চিত্র নির্মাতা ক্রিস্টোফার নোলানের আলোচিত মুভি ইন্টারস্টেলার আমরা অনেকেই দেখেছি। সেখানে দেখানো হয়, পৃথিবী বসবাস অনুপযোগী হয়ে পড়ায় নাসার বিজ্ঞানীরা নতুন একটি স্টার সিস্টেমে মানববসতির পরিকল্পনা করছেন। সেই স্টার সিস্টেমে যাবার জন্য নভোচারীরা স্পেসটাইম ফেব্রিকস্থ ওয়ার্মহোল ব্যবহার করেন। ওয়ার্মহোল হচ্ছে এমন একটি হোল বা গর্তপথ, যা ব্যবহার করে তাত্ত্বিকভাবে আলোকবর্ষ দূরের পথও পাড়ি দেয়া সম্ভব।

ইন্টারস্টেলার মুভিতে দেখানো ওয়ার্মহোল। Image courtesy of Fandom.

Interstellar এর বাংলা অনুবাদ করলে দাঁড়ায় ‘তারামধ্যবর্তী’। রাতের আকাশে আমরা যে কোটি কোটি (মিল্কি ওয়ে গ্যালাক্সিতে ১০০ বিলিয়ন ও পুরো মহাবিশ্বে ১ বিলিয়ন ট্রিলিয়ন) তারা দেখি, তেমন দুটি তারার মধ্যকার অংশ বা স্পেস হচ্ছে ইন্টারস্টেলার স্পেস। আমাদের নিজস্ব সোলার সিস্টেম বা সৌরজগত যেমন ৮টি গ্রহ (প্লুটো বাদে) ও তাদের উপগ্রহের সমন্বয়ে গঠিত, তেমনি প্রতিটি স্টার সিস্টেমের রয়েছে নিজস্ব গ্রহ ও উপগ্রহসমগ্র। আমাদের স্টার সিস্টেমের নক্ষত্র সূর্য হওয়ায় আমাদের স্টার সিস্টেমকে বলা হয় সোলার সিস্টেম। অন্যদিকে, ভিন্ন কোনো নক্ষত্র ও তার গ্রহ-উপগ্রহসমূহকে বলা হয় সেই নক্ষত্রের সিস্টেম বা স্টার সিস্টেম। আমাদের সোলার সিস্টেমও একটি স্টার সিস্টেম, যে সিস্টেমের স্টার হচ্ছে সূর্য।

সূর্যের সবচেয়ে কাছাকাছি নক্ষত্র বা সৌরজগতের সবচেয়ে কাছাকাছি স্টার সিস্টেমের নাম হচ্ছে আলফা সেন্টরি স্টার সিস্টেম। সূর্যকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা আমাদের স্টার সিস্টেমের মতো আলফা সেন্টরির নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে তার স্টার সিস্টেম গড়ে উঠেছে। তবে আমাদের সোলার সিস্টেমের মতো আলফা সেন্টরি স্টার সিস্টেমের নক্ষত্র একটি নয়। বরং তিনটি! অন্যভাবে বললে, আলফা সেন্টরি স্টার সিস্টেমে ‘সূর্য’ রয়েছে তিনটি। এদের মধ্যে আমাদের কাছাকাছি নক্ষত্রটির নাম প্রক্সিমা সেন্টরি।

আলফা সেন্টরি স্টার সিস্টেম; Image courtesy of Skatebiker.

আমাদের সূর্য থেকে আলফা সেন্টরি স্টার সিস্টেমের দূরত্ব কত? সেটা জানার আগে আমাদের বুঝতে হবে এই দূরত্ব বোঝার সক্ষমতা আমাদের রয়েছে কি না। মহাশূন্য এত সুবিশাল যে, এর বিশালত্ব বোঝার সক্ষমতা আসলে মানবমস্তিষ্কের নেই। মানবমস্তিষ্ক পরিচিত কিলোমিটার, মাইলের মতো পার্থিব দূরত্বের এককের সাথে। তাই মহাশূন্যের দূরত্ব পরিমাপের এককগুলো আমাদের কাছে কেবলই কিছু সংখ্যা। উদাহরণস্বরূপ, সূর্য থেকে আলফা সেন্টরির দূরত্ব ৪.৪ আলোকবর্ষ। কিন্তু এই দূরত্ব আসলেই কতটা দূরত্ব? আমাদের বোধগম্য এককে বললে ৪৪,০০০,০০০,০০০,০০০ কিলোমিটার। কিন্তু তবু কি আমরা এই দূরত্বর বিশালতা উপলব্ধি করতে পারছি? বুঝতে কি পারছি এই দূরত্ব আসলে কতটা দূরত্ব?

আমরা যদি হাতে থাকা সবচেয়ে উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহারে আলফা সেন্টরি স্টার সিস্টেমে পৌঁছানোর চেষ্টা করি, অর্থাৎ ঘন্টায় ৫৬,০০০ কি.মি. গতিতে ছুটে গেলেও আলফা সেন্টরিতে পৌঁছাতে আমাদের ৮৬,০০০ বছর সময় লাগবে! এবং এটা হচ্ছে সূর্য থেকে আমাদের সবচেয়ে কাছের নক্ষত্র বা তারকায় পৌঁছানোর উচ্চাকাঙ্খী হিসাব। রাতের আকাশে আমরা যত ট্রিলিয়ন তারা দেখি তার দুটোর দূরত্বই যদি এত হয়, তাহলে মহাবিশ্ব কত বড়?

তার মানে দাঁড়াচ্ছে, আমরা আসলে চিরকালের জন্য আমাদের সৌরজগতের মধ্যে আটকা পড়ে আছি। সূর্যকে ছেড়ে আরেকটি নক্ষত্রের দেখা পাওয়া, বর্তমান প্রযুক্তিতে, আমাদের ক্ষমতার অতীত।

সোলার সিস্টেম ও অন্যান্য স্টার সিস্টেম; Image courtesy of NASA/UofChicago.

তাহলে ইন্টারস্টেলার ভ্রমণ বা তারা থেকে তারায় ভ্রমণের কথা আসছে কেন?

এ প্রশ্নের অনেকগুলো তাত্ত্বিক উত্তর রয়েছে। তবে এই লেখার বিষয়বস্তু ইন্টারস্টেলার ভ্রমণের বাস্তব দিকটি নিয়ে। মানবীয় সীমাবদ্ধতার কারণে পৃথিবীর কোনো প্রাণীর পক্ষে হয়তো ৮৬,০০০ বছরের পথ পাড়ি দিয়ে আলফা সেন্টরিতে পৌঁছানো সম্ভব নয়। তাই বলে মেশিনের পক্ষেও কি নয়? মেশিনের তো প্রাণীর মতো জীবনকাল নেই। আমাদের তৈরি মেশিন কি তবে পারে না আমাদের হয়ে ইন্টারস্টেলার দূরত্ব পাড়ি দিয়ে আলফা সেন্টরিতে গিয়ে হাজির হতে? উত্তর হচ্ছে, হ্যাঁ পারে, এবং আমরা সেই পথেই আছি।

আজ থেকে ৪০ বছর আগে ১৯৭৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় অবস্থিত কেপ ক্যানেভেরেল লঞ্চপ্যাড থেকে ভয়েজার-২ নামে নাসার একটি নভোযান মহাশূন্যের উদ্দেশ্যে পৃথিবী ত্যাগ করে। ১৫ দিন পর একই লঞ্চপ্যাড থেকে উড্ডয়ন করে নাসার আরেকটি নভোযান, ভয়েজার-১। নভোযান দুটোর প্রাথমিক উদ্দেশ্য ছিলো বৃহস্পতি ও শনি গ্রহ নিয়ে গবেষণা করা। যথাক্রমে ৩ ও ৪ বছর পর নভোযানগুলো বৃহস্পতি ও শনি গ্রহে পৌঁছে। প্রাথমিক পরিকল্পনায় না থাকলেও, বৃহস্পতি ও শনি গ্রহ গবেষণা শেষে নভোযান দুটো রওয়ানা করে ইউরেনাস ও নেপচুনের পথে। তারপর ইউরেনাস ও নেপচুন শেষে যাত্রা করে আরও দূরের পথ। মানব ইতিহাসে এখন পর্যন্ত ভয়েজাররাই সবচেয়ে বেশি দূরত্ব অতিক্রম করা নভোযান। ভয়েজারদের আগে পাইওনিয়ার ১০ ও ১১-ও আমাদের সৌরজগত অতিক্রম করেছিলো। ১৯৯৮ সালের ১৭ই ফেব্রুয়ারি ভয়েজার-১ পাইওনিয়ার-১০-কেও অতিক্রম করে।

সৌরজগত পেরিয়ে ইন্টারস্টেলার স্পেসে ভয়েজার-১ ও ভয়েজার-২; Image courtesy of NASA/JPL-Caltech.

(ফান ফ্যাক্ট: ভয়েজার-১ প্রকৃতপক্ষে ভয়েজার-২ এর পর পৃথিবী ত্যাগ করে। তাহলে সেটির নাম ভয়েজার-১ কেন? কারণ পরে উড্ডয়ন করলেও মিশন পরিকল্পনা ছিলো, ভয়েজার-১ ভয়েজার-২ এর আগে তার লক্ষ্যে পৌঁছুবে। তাই পরে উড্ডয়ন করেও এর নাম ভয়েজার-১।)

ভয়েজার-১ এর সাথে মানবজাতির কিছুটা রোমান্টিক স্মৃতি জড়িত রয়েছে। ভয়েজার-১ যখন শনি গ্রহকে অতিক্রম করে সৌরজগতের সীমানার দিকে এগিয়ে যায়, তখন প্রখ্যাত বিজ্ঞানী কার্ল সেগান মিশনে জড়িত বিজ্ঞানীদের অনুরোধ করেন ভয়েজার-১ এর ক্যামেরা পৃথিবীর দিকে ঘুরিয়ে শেষবারের মতো পৃথিবীর একটি ছবি তুলতে। এত দূর থেকে তোলা ছবিতে পৃথিবীর অস্তিত্ব প্রায় বোঝা যাবে না ও ক্যামেরার মুখ পৃথিবীর দিকে ঘোরানোর ফলে সূর্যরশ্মির কারণে ক্যামেরা ক্ষতিগ্রস্ত হবার সম্ভাবনা থাকবে- এ ধরনের যুক্তিতর্ক শেষে নাসার বিজ্ঞানীরা কার্ল সেগানের অনুরোধ রক্ষা করতে সম্মত হন। তারপর ভয়েজার-১ ক্যামেরা শেষবারের মতো একবার পৃথিবীর দিকে মুখ করে। আর তাতে ধরা পড়ে ‘সূর্যালোকে ভাসতে থাকা ছোট্ট বালুকণা’ পৃথিবীর সবচেয়ে বিখ্যাত ছবিটি- The pale blue dot!

ভয়েজার-১ থেকে তোলা পৃথিবীর ছবি – The pale blue dot; Image courtesy: Ratio Scientiae.

উড্ডয়নের ৩৫ বছর পর ২০১২ সালের ১৫ই আগস্ট ভয়েজার-১ সৌরজগতকে ছাড়িয়ে প্রথমবারের মতো ইন্টারস্টেলার স্পেসে প্রবেশ করে। আর ভয়েজার-২ প্রবেশ করে মাত্র কয়েক মাস আগে, ৫ নভেম্বর ২০১৮ তারিখে।

ইন্টারস্টেলার স্পেস ব্যাপারটি অনেকটা পৃথিবীর নো ম্যান’স ল্যান্ডের মতো। নো ম্যান’স ল্যান্ড যেমন দুটি দেশের মাঝামাঝি নিরপেক্ষ একটি অংশ, যার উপর কোনো নির্দিষ্ট দেশের অধিকার নেই, তেমনি ইন্টারস্টেলার স্পেস হচ্ছে দুটি নক্ষত্রের মাঝামাঝি অংশ যা নক্ষত্র দুটির সিস্টেম ও প্রভাবের বাইরে। ভয়েজার নভোযানের ক্ষেত্রে এই ইন্টারস্টেলার স্পেস হচ্ছে সূর্য ও তার নিকটতম নক্ষত্র আলফা সেন্টরির মধ্যকার পথ, যে পথের দূরত্ব ৪০,০০০,০০০,০০০,০০০ কিলোমিটার।

ভয়েজার-১ ও ভয়েজার-২ প্রতি মূহুর্তে ৫৫,০০০ কিমি/ঘন্টা গতিতে গত ৪১ বছর ধরে পৃথিবী থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। এই দীর্ঘ সময়ে নভোযান দুটি পাড়ি দিয়েছে প্রায় ১৭,০০০,০০০,০০০ কিলোমিটার পথ। মানব ইতিহাসে মানবসৃষ্ট কোনোকিছুই এই দূরত্ব বা এর ধারেকাছের কোনো দূরত্ব পাড়ি দেয়নি। মানবসৃষ্ট কোনো বস্তু অদ্যাবধি এত দ্রুত গতিতেও কখনো বিচরণ করেনি। ভয়েজার ভিন্ন মানবসৃষ্ট কোনো বস্তু কখনো ইন্টারস্টেলার স্পেসেও প্রবেশ করেনি। ভয়েজার নভোযান দুটো তাই মানব ইতিহাসের অনেক শুরুর কারিগর।

মহাশূন্যে ভয়েজার-১ এর অবস্থান; Image courtesy of Angelich/NRAO/AUI/NSF.

এই মূহুর্তে ভয়েজার-১ আমাদের সৌরজগতকে পেছনে ফেলে তীব্র গতিতে আলফা সেন্টরি স্টার সিস্টেমের দিকে ছুটে যাচ্ছে। যেতে পথে পৃথিবীতে পাঠাচ্ছে অসংখ্য তথ্য, উপাত্ত, ডাটা। তবে ভয়েজারদের সাথে আমাদের এই যোগাযোগ আর বেশিদিন স্থায়ী হবে না। মহাবিশ্বের আর সবকিছুর মতোই ভয়েজার নভোযানের জ্বালানি রসদও নশ্বর। ৪১ বছরের ব্যস্ত জীবন শেষে নভোযানগুলোর আয়ু দ্রুতই ফুরিয়ে আসছে। আরও কিছুদিন বাঁচিয়ে রাখার জন্য তাই বিজ্ঞানীরা নভোযানগুলোর মধ্যে থাকা যন্ত্রগুলো একে একে শাট ডাউন করতে শুরু করেছেন। এ প্রেক্ষিতে ১৯৯০ সালে মেমোরি সংরক্ষণের জন্য শাট ডাউন করা হয় ভয়েজার-১ নভোযানের ক্যামেরাটি। তারপর জ্বালানী রক্ষার জন্য একে একে বন্ধ করা হয় আরও অনেক যন্ত্র।

এ মুহূর্তে ন্যূনতম জ্বালানী ব্যবহার করে নভোযান দুটি পৃথিবীতে বিজ্ঞানীদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছে। ২০২৫ সালে চিরতরে নিশ্চুপ হবার আগে শেষবারের মতো আমরা প্রিয় ভয়েজারকে শুনতে পাবো। তারপর সব চুপ। নিউটনের গতিসূত্র মেনে ওরা ভেসে যেতে থাকবে নীরব, নিকশ, নিস্তব্ধ মহাশূন্যের অসীম পথে। ৮৬,০০০ বছরের দীর্ঘ ভ্রমণ শেষে ভয়েজার-১ হয়তো আলফা সেন্টরিতে গিয়েও পৌঁছুবে। কিন্তু ততদিনে হয়তো পৃথিবীতে মানবজাতির কোনো অস্তিত্ব থাকবে না। বা পৃথিবী ফেলে মানবজাতির অস্তিত্ব থাকবে ভিন্ন কোনো গ্রহে! ভিন্ন কোনো স্টার সিস্টেমে!

ভয়েজার-১; Image courtesy of NASA/JPL-Caltech.

ভয়েজার-১ ও ভয়েজার-২ এর অবস্থান সম্পর্কে রিয়েল টাইম আপডেট পাবেন এখানে

This is a Bangla article that discusses about intersteller space. All references are hyperlinked inside the article.

Feature image: Skatebiker

Related Articles