আচ্ছা, ‘পিংক মুন' বা গোলাপি চাঁদের নাম শুনেছেন কখনো? নাম শুনে কী মনে হয়? ব্লাড মুন যেভাবে নিজের নামের অর্থের সাথে সামঞ্জস্য রেখে রক্তের মতো লাল রঙ নিয়ে আকাশে উদিত হয়, ঠিক তেমনি পিংক মুনও তার নামের সাথে মিল রেখে গোলাপি রঙ ছড়িয়ে উদিত হয়?

সত্যি বলতে, পিংক মুনের সাথে ‘পিংক' বা গোলাপি রঙের কোনো সম্পর্কই নেই। একটি সাধারণ চাঁদ বা পূর্ণিমা দেখতে যেমন হয়, পিংক মুনও দেখতে ঠিক একই রকম। তবে নামের কারণ বা ভিন্নতা রয়েছে এই নাম দেওয়ার ইতিহাস বা তাৎপর্যের ক্ষেত্রে। এপ্রিলের পূর্ণিমাকেই বলা হয় ‘পিংক মুন' বা ‘ফুল পিংক মুন'। 

এপ্রিলের পূর্ণিমাকেই বলা হয় ‘পিংক মুন'; Image source: narcity.com


পিংক মুন নামটি যেভাবে এলো

প্রাচীনকালে চন্দ্রপঞ্জিকা দেখেই মৌসুম বা মাস ঠিক করা হত। তখন সৌরপঞ্জিকার মতো স্থির কোনো পঞ্জিকা ছিল না যা দেখে সহজেই বারো মাসের হিসাব বোঝা যাবে।

চন্দ্রপঞ্জিকা ২০১৯; Image source: vertex42.com

পূর্ণিমা মানেই নতুন মাসের আগমন ধরে নেওয়া হত। সেই সময়ে জুলিয়ান বা গ্রেগরিয়ান পঞ্জিকা তারা অনুসরণ করতো না। এই ভিন্ন ভিন্ন পূর্ণিমার মাধ্যমেই তারা মাসের হিসাবটা করে নিত। যুগের পর যুগ ইউরোপ এবং আদি আমেরিকান আদিবাসী গোষ্ঠীগুলো এই নিয়মই মেনে চলেছে। ইউরোপিয়ান বা স্থানীয় আমেরিকান জনগণ নিজেদের সুবিধার্থে প্রত্যেকটি পূর্ণিমার আলাদা আলাদা নামও নির্ধারণ করে দেয়। নামগুলো তারা উত্তর গোলার্ধে ঘটে যাওয়া সাধারণ ঘটনা বা কোনো মাসের বিশেষ কোনো বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমেই ঠিক করা হয়। যেমন- জানুয়ারির ‘ফুল ওলফ মুন', ফেব্রুয়ারির ‘ফুল স্নো মুন', মার্চের ‘ফুল ওর্ম মুন', এপ্রিলের ‘ফুল পিংক মুন', মে মাসের ‘ফুল ফ্লাওয়ার মুন, জুনের ‘ফুল স্ট্রবেরি মুন', জুলাইয়ের ‘ফুল বাক মুন’, আগস্টের ‘ফুল স্টার্জন মুন’, সেপ্টেম্বরের ‘ফুল কর্ন মুন', অক্টোবরের ‘ফুল হান্টার্স মুন', নভেম্বরের ‘ফুল বীবর মুন’ এবং ডিসেম্বেরের ‘ফুল কোল্ড মুন’। এগুলো ছাড়াও কোনো কোনো বছর ১৩টা ‘ফুল মুন’ বা পূর্ণিমা দেখা যায়। অতিরিক্ত একটি পূর্ণিমার নাম ‘ব্লু মুন'।

কেন এই চাঁদকে ‘পিংক মুন' বলা হয়? 

এপ্রিল মাসের পূর্ণিমাকে ‘পিংক মুন' বলা হয়। তবে চাঁদটি দেখতে একদমই ‘পিংক' বা ‘গোলাপি’ রঙের নয়। আবহাওয়ার উপর নির্ভর করে হালকা হলুদ, কমলা, লাল বা সাদা হতে পারে।

চাঁদটি দেখতে হালকা হলুদ, কমলা, লাল বা সাদা হতে পারে; Image source:wyso.org

তবে গোলাপি কোনোভাবেই হবে না। নিতান্তই কাকতলীয় বিষয় হবে যদি কোনো বছর লাল এবং সাদা মিলে হালকা গোলাপি দেখায় এই ‘পিংক মুন'। স্বাভাবিক কারণেই তাহলে প্রশ্ন আসে- গোলাপি চাঁদ না হলে এর নাম ‘পিংক মুন' হয় কেন? নামটি আসলে এই মাসের পারিপার্শ্বিক পরিবেশের পরিপ্রেক্ষিতে আসে। বসন্তের এই সময়ে বিভিন্ন নতুন ও সুগন্ধি ফুলের আগমন ঘটে। এর মধ্যে ইউরোপ ও আমেরিকায় ‘মস পিংক' বা ‘ওয়াইল্ড গ্রাউন্ড ফ্লক্স’ ফুল ফোঁটা খুব সাধারণ একটি বিষয়। এটি আদি আমেরিকার একপ্রকার বন্য ফুল। সেকাল থেকে একাল পর্যন্ত প্রতি বছরই এ সময়ে এই ফুলে চারপাশের পরিবেশ ভরে ওঠে। আর এসব ফুলের গোলাপি রঙের আভা যেন এ সময়ে ভূমি থেকে আকাশ পর্যন্ত ছড়িয়ে যায়।

পিংক মুনের আধ্যাত্মিক অর্থ 

আধ্যাত্মিক অর্থে, পিংক মুন বা গোলাপি চাঁদ হলো পুনর্জাগরণ এবং নবজীবনের প্রতীক। মার্চের ফুল মুন বা পূর্ণিমাকে বলা হয় ফুল ওর্ম মুন। এটা হলো শীতের মৌসুমের শেষ পূর্ণিমা। একনাগাড়ে লম্বা সময়ের জন্য ঠাণ্ডা, বেরঙ, নীরস এবং করুণ শীতকালের কারণে পরিবেশটা কেমন জানি মরা মরা হয়ে যায়। ফলে এপ্রিল আসতে আসতে বসন্তের আগমন যে আনন্দ ও সৌন্দর্য আশেপাশের বাতাবরণে ছড়িয়ে দেয় তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তাই এপ্রিলের প্রথম পূর্ণিমা যে পরিবেশের নতুন জন্ম ও সৌন্দর্যের প্রতীক তা অনেকটা বোধগম্য। অনেকের বিশ্বাস, পিংক মুনের আলো সকলের শক্তি ও প্রাণ আবার ফিরিয়ে আনবে। পিংক মুন আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, জীবন হলো উত্থান-পতন, শীতযাপন এবং পুনর্জাগরণের একটি চক্র যা মৃত্যু অবধি চলতেই থাকে। যেমন- প্রতি বছর এই সময়ে গোলাপি রঙের ওয়াইল্ড গ্রাউন্ড ফ্লক্সের আগমন ঘটে এবং কিছু সময় পর তা চলে যায়। পরবর্তীতে নতুন রূপে ও নতুন সৌন্দর্যে আবার ফিরে আসে। 

ওয়াইল্ড গ্রাউন্ড ফ্লক্স; Image source:gardenia.net

এই মুনের অন্য নামগুলো হলো স্প্রাউটিং গ্রাস মুন, হেয়ার মুন, ফিশ মুন ও এগ মুন। প্রত্যেকটি নামের পেছনেই এই মৌসুমের কোনো বৈশিষ্ট্যের ছাপ দেখা যায় । যেমন- এই সময়ে নতুন করে ঘাস গজানো শুরু করে। তাই এর নাম ‘স্প্রাউটিং গ্রাস মুন'। আরেক নাম ‘এগ মুন', কারণ বসন্তে পাখিরা ডিম পাড়ে। ফিশ মুনও বলা হয়, কেননা মাছের ফলন এই মৌসুমে অধিক। খরগোশ এই ঋতুতেই সন্তান জন্ম দেয়। আর এজন্য এপ্রিলের পূর্ণিমাকে ‘হেয়ার মুন'ও বলা হয়। উল্লেখ্য যে, মে মাসের পূর্ণিমাকেও ‘হেয়ার মুন' বলা হয়। তাছাড়া এপ্রিল মাসের এই প্রথম পূর্ণিমা যাজকীয় বা খ্রিস্টানদের পঞ্জিকায় ‘প্যাসচেল মুন' নামেও পরিচিত। পিংক মুন খ্রিস্টানদের গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় উৎসব ‘ইস্টার সানডে’র তারিখ নির্ধারণে সহায়তা করে বিধায় এর নাম ‘প্যাসচেল মুন' দেওয়া হয়।

পিংক মুন খ্রিস্টানদের গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় উৎসব ‘ইস্টার সানডে’র তারিখ নির্ধারণে সহায়তা করে; Image source: visitrenotahoe.com

এপ্রিলের পূর্ণিমার পর প্রথম যে রবিবার আসে সেই দিনই পালিত হয় ইস্টার সানডে। জ্যোতির্বিদরা বিশ্বাস করেন যে, প্রতিটি পূর্ণিমাই আমাদের উপর কোনো না কোনো প্রভাব ফেলে। সবসময় বিষয়টি আমরা বুঝতে না পারলেও প্রতিনিয়ত এরকমই হচ্ছে বলে তাদের ধারণা। জ্যোতির্বিদ সিন্ডি ম্যাককিয়ান বলেন, "জ্যোতির্বিদ্যায় চাঁদ আমাদের অনুভূতি, চক্র, উর্বরতা এবং এরকম আরো কিছু বিষয় নিয়ন্ত্রণ করে।" তিনি আরো বলেন, "এপ্রিলের পূর্ণিমা হলো উজ্জীবনের প্রতীক। এর প্রভাবে মানুষের মধ্যে স্থির অনুভূতি এবং আনন্দ পরিলক্ষিত হয়।" জ্যোতির্বিদ প্যাভলোভার মতে, "পিংক মুন আমাদের অনুভূতিকে মার্চের ফুল মুন থেকে অধিক প্রভাবিত করে। এ সময় সবকিছুতে একপ্রকার ভঙ্গুরতাও দেখা যায়, আবার একপ্রকার নতুনত্বও দেখা যায়। নতুন সম্পর্ক গড়ার এবং নতুন কোনো বিবর্তনও ঘটতে পারে এই সময়।" তার মতে, পিংক মুনের আলোর দরুণ সবকিছু একেবারে নতুন করে গড়তে শুরু করে। 

প্রতিটি পূর্ণিমাই কোনো না কোনো রাশিতে উদিত হয়। আর পিংক মুন বৃশ্চিক নক্ষত্রপুঞ্জে উদিত হয়। পূর্ণিমা সাধারণত কোনো কিছুর পরিপূর্ণতা লাভ করা বা পরিসমাপ্তি বোঝায়। আর বৃশ্চিক রাশির কথা বললে এই অর্থটি আরো সামঞ্জস্যপূর্ণ। ১২টি রাশিকে মোট চার ভাগে ভাগ করা হয়। যেমন- আগুন, মাটি, বায়ু এবং জল রাশি। এই বৃশ্চিক হলো জল রাশির অন্তর্ভুক্ত। তাই এটি স্বভাবতই জল রাশির সাধারণ বৈশিষ্ট্যগুলো বহন করে। যথা- ইচ্ছাশক্তি, আত্মসংযম, অনুভূতির গভীরতা। অর্থাৎ এই বিষয়গুলো আমাদেরকে নির্দেশ করে যে মনের ভেতর যত দুঃখ বা অপ্রীতিকর ঘটনা চাপা পড়ে আছে তা ভুলে গিয়ে জীবনটাকে আবার নতুন করে শুরু করাই শ্রেয়। এপ্রিলের পূর্ণিমা যেন একটা উজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকে যাওয়ার জন্যই বারবার পথপ্রদর্শন করে। 

 ‘স্প্রিং ক্লিনিং' বা বসন্তকালীন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার মাধ্যমে পরিচ্ছন্ন জীবনের আরম্ভ করা যায়; Image source: destorage.com

বসন্তের আগমনে গাছপালার পাতা থেকে শুরু প্রায় সকল জীবজন্তুই নতুন করে নিজেদের জীবনটাকে সাজানো শুরু করে। আবার ‘পিংক’ বা গোলাপি রঙ হলো পুনর্জাগরণের রঙ। এসব কিছুর প্রেক্ষিতে বসন্তের এই ‘পিংক মুন'ও যে আমাদের নবজীবন শুরু করার দিকে যেতে বলে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। ব্যাপারটি যে শুধুমাত্র আধ্যাত্মিক বা মনস্তাত্ত্বিক সেরকমও নয়। শুধু মনের মনের ময়লা দূর করার মধ্যেই ‘পিংক মুন'-এর ব্যাপারটি শেষ হয় না। ‘স্প্রিং ক্লিনিং' বা বসন্তকালীন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার মাধ্যমে ঘরবাড়ি এবং আশেপাশের পরিবেশ পরিষ্কার রেখে নতুন এবং পরিচ্ছন্ন জীবনের আরম্ভ করা যায়।

This article is in Bangla language. It's about Sources have been hyperlinked in this article. 
Featured image: greatlakeledger.com