মেন্ডেলবাদ: জীবজগতের বংশবিস্তারের মূলসূত্র

হুমায়ুন আহমেদ, বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়, টমাস ইয়ং, রোয়ান অ্যাটকিনসন, ফ্র্যাংক এইচ. নেটারের মতো এমন কয়েক হাজার নামের বেলায় ইতিহাস সাক্ষ্য দেবে এই বলে যে, তারা হলেন সেই দলভুক্ত, যাদেরকে তাদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার জন্য স্মরণ করা হয় না। তাদের স্মরণ করা হয় ভিন্ন কোনো দিকে ভিন্ন কোনো অবদানের জন্য।

হুমায়ূন আহমেদ রসায়নশাস্ত্রের একজন পি.এইচ.ডি ডিগ্রীধারী অধ্যাপক, আমরা কিন্তু তাকে স্মরণ করি কথাসাহিত্যিক হিসেবে। বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় একজন ডাক্তার, তাকেও স্মরণ করা হয় সাহিত্যিক হিসেবে; ছোটগল্পের একজন সেরা লেখক তিনি। টমাস ইয়ং পেশায় একজন ডাক্তার, তাকে স্মরণ করা হয় পদার্থবিদ্যায়, আলোকবিদ্যায় বিশেষ অবদানও রয়েছে তার। ফ্র্যাংক এইচ. নেটার, তিনি একজন ডাক্তার এবং চিত্রশিল্পী। নেটারের বাবা-মায়ের ইচ্ছে ছিল তিনি হবেন একজন ডাক্তার, আর তার নিজের ইচ্ছে ছিল চিত্রশিল্পী হবার। তিনি দুটোই হয়েছেন; বাবা-মায়ের স্বপ্ন পূরণ করেছেন, চিকিৎসাবিজ্ঞানের জটিল চিত্রগুলো এঁকে এঁকে চিত্রশিল্পীও হয়েছেন। তাকে কিন্তু ডাক্তার হিসেবে স্মরণ করা হয় না, স্মরণ করা হয় একজন সফল চিত্রশিল্পী হিসেবে। তার আঁকা মানবদেহের প্রতিটি অংশের চিত্র সম্বলিত বইটি পুরো বিশ্বে একযোগে চিকিৎসাবিজ্ঞানে পড়ানো হয়।

রোয়ান অ্যাটকিনসন; Source: facebook.com

মিস্টার বিনের কথা বলার প্রয়োজন আছে বলে মনে মনে হয় না, তার আসল নাম রোয়ান অ্যাটকিনসন। তিনি একজন ইঞ্জিনিয়ার, কিন্তু তাকে আমরা চিনেছি কৌতুকাভিনয়ের মাধ্যমে। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি টুকটাক কৌতুকাভিনয়ের সাথে জড়িত ছিলেন, কর্মজীবনে এটাই হয়ে দাঁড়ায় তার পেশা। এ লেখায় থাকছে এমনই একজন মানুষের কথা, যিনি ছিলেন এমন কীর্তিমানদেরই দলভুক্ত।

গ্রেগর ইয়োহান মেন্ডেল; Source: biography.com

গ্রেগর ইয়োহান মেন্ডেল; পেশায় ছিলেন ধর্মযাজক, কিন্তু নামটি বারবার চলে আসে বিজ্ঞানের বইতে। নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে, বিজ্ঞানের বংশগতিবিদ্যা শাখায়। তিনিই বংশগতিবিদ্যার জনক। জীববিজ্ঞানে যদি তার অবদান ও কাজের কথা বলা হয়, আর সেই সাথে জুড়ে দেওয়া হয় তার কাজের সময়কালকে; তাহলে নিঃসন্দেহে যে কারো মনে হবে, কেবল বংশগতিবিদ্যার জনক আখ্যা দেওয়াটা কম হয়ে গেছে, তাকে তো এর চেয়ে বড় কিছু দেওয়া উচিত ছিল। সে সময়ে নোবেল পুরষ্কার চালুই হয়নি, কিন্তু এত পুরনো কাজগুলো এখনো বংশগতিবিদ্যার ভিত্তি ধরা হয়। যৌক্তিক তর্কে কখনো বাধাপ্রাপ্ত হয়নি এই ধর্মযাজকের অবদান।

বেশি কিছু না, জীবনের সাতটি বছর তিনি ব্যয় করেন একটি গবেষণায়, সে গবেষণায় তিনি ব্যবহার করেছেন মটরশুঁটি গাছ। গবেষণার সময়কাল বলা খুব জরুরী। ১৮৫৬ থেকে ১৮৬৩, এই সময় ব্যপ্তিতে তিনি কাজ করেন মটরশুঁটি গাছগুলো নিয়ে, আর মানব ইতিহাসে দিয়ে যান অভাবনীয় কিছু সাফল্য। জ্ঞান-বিজ্ঞান তৎকালীন সময়ে এতটা উন্নত হয়নি যে, তার গবেষণাকৃত উপাত্তগুলো আত্মস্থ করবে। ফলস্বরূপ যা হওয়ার তা-ই হলো; ১৮৬৬ সালে তিনি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন, সেই গবেষণাপত্র অবহেলা আর অনাদরে পড়ে রইলো বহু বছর। মানুষের মাঝে সাড়া পড়বে কীভাবে, এই গবেষণার ফল বুঝতে হলে যে পূর্বজ্ঞান প্রয়োজন, মানবজাতি তখনো শিখে উঠেনি তা। মেন্ডেল মারা যান ১৮৮৪ সালে, তার মৃত্যুর প্রায় ১৬ বছর পর, ১৯০০ সালে তিন দেশের তিনজন বিজ্ঞানী; হিউগো ডে ভ্রিস, কার্ল করেন্স আর এরিক শ্চেমেক, তারা পৃথক পৃথকভাবে মেন্ডেলের গবেষণাপত্রটি খুঁজে নিয়ে গবেষণা করেন। তিনজনই সাফল্যের সাথে প্রকাশ করেন মেন্ডেলের কৃতিত্বের কথা। এই হলো ইতিহাসের মাইলস্টোন, সকলের চোখের সামনে আসে মেন্ডেল নামক এই ধর্মযাজকের নাম।

মেন্ডেলবাদ ব্যাখ্যার আগে কোষের ব্যাপারে জানা যাক। যেকোনো জীবদেহ অসংখ্য কোষ দ্বারা নির্মিত। একটির উপর আরেকটি ইট দিয়ে, পাশাপাশি ইটের সারি সাজিয়ে যেমন দালান নির্মাণ করা হয়, ঠিক এভাবেই কোষ দ্বারা নির্মিত হয় জীবদেহ। মানুষের শরীরের সবকিছুর মূল একক কোষ। কোষ খালি চোখে দেখা যায় না। কোষের ভেতরে থাকে আবার কোষীয় অঙ্গাণু। কোষীয় অঙ্গাণুগুলোর মাঝে প্রধান নিয়ন্ত্রণকর্তা হলো নিউক্লিয়াস। নিউক্লিয়াসের অভ্যন্তরে থাকে ক্রোমোসোম। প্রাণিভেদে প্রতি কোষের নিউক্লিয়াসে ক্রোমোসোম সংখ্যা ভিন্ন হয়ে থাকে। মানুষের প্রতিটি দেহকোষের নিউক্লিয়াসে পাওয়া যাবে ৪৬টি ক্রোমোসোম। ক্রোমোসোমেরও গভীরতা রয়েছে, ক্রোমোসোম তৈরি হয়েছে ডিএনএ কোড দিয়ে। ডিএনএর ক্ষুদ্রাংশ হলো জিন। নিচের ছবিগুলোই আপনাকে ক্রোমোসোম, ডিএনএ আর জিনের সাথে ভালোমতো পরিচয় করিয়ে দেবে।

ডিএনএ ও আরএনএ; Source: basicknowledge101.com

ডিএনএ’র গঠন; Source: terravivos.com

ক্রোমোসোম; Source: ghr.nlm.nih.gov

Source: cancer.gov

Source: news-medical.net

Source: fragilex.org

আজকের আলোচনার বিষয় এই ‘জিন’কে ঘিরে। কোডগুলো একত্রিত হয়েই জিন হিসেবে বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করে থাকে। আমাদের শরীরের ক্ষুদ্র হতে ক্ষুদ্রতর সকল বৈশিষ্ট্যের কথাই লেখা রয়েছে প্রতিটি কোষের সবগুলো ক্রোমোসোমে। মানুষের কোষে থাকা ৪৬টি ক্রোমোসোমই বলে দিচ্ছে একজন মানুষের মাঝে কী কী বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পাবে। চুল কালো হবে নাকি লাল হবে, মানুষটি লম্বা না খাটো হবে- সবকিছু বলছে এই ক্রোমোসোম। ৪৪টি ক্রোমোসোম বলছে শারীরিক বৈশিষ্ট্যের কথা, যাদের অটোসোম বলা হয়, আর বাকি ২টি বলছে লিঙ্গ কী হবে সেই কথা, যাদের বলা হয় সেক্স ক্রোমোসোম। মেন্ডেলের তথ্যমতে, এ ধরনের প্রতিটি বৈশিষ্ট্যের পেছনে এক জোড়া জিন কাজ করে থাকে। সেই আলোকেই মেন্ডেলবাদ ব্যাখ্যা করা হবে।

মানুষের প্রতিটি কোষের নিউক্লিয়াসে থাকা ২৩ জোড়া ক্রোমোসোম; Source: pmgbiology.com

মেন্ডেলবাদে বেশ কিছু আশ্চর্য হওয়ার মতো ব্যাপার আছে। মেন্ডেল যখন ধর্মযাজকের দায়িত্ব পালন করছেন কোনো এক গীর্জায়, তখন অবসর সময়ে তিনি মেতে উঠতেন এই গবেষণাতে। মটরশুঁটি গাছ ছিলো তার গবেষণার উপাদান। মটরশুঁটি গাছের নির্দিষ্ট প্রকরণটি ছিলো Pisum sativum। বিজ্ঞানের ছাত্রদের কাছে এই নাম সুপরিচিত। এত গাছ থাকতে এই প্রকরণটি বেছে নেওয়ার বেশ কিছু মূখ্য কারণ রয়েছে, যা তিনি তার গবেষণাপত্রে উল্লেখ করেন। মটরশুঁটি গাছগুলোর আয়ু স্বল্প হওয়াতে, খুব দ্রুতই বংশবিস্তার করে, বংশবিস্তারে পরবর্তী প্রজন্মগুলোও প্রজননের জন্য বেশ উর্বর হয়ে থাকে। এছাড়া ফুলগুলো আকারে বড় ও উভলিঙ্গ হয়, উভলিঙ্গ হওয়াতে পর-পরাগায়নের সম্ভাবনা থাকে না। পর-পরাগায়ন হয়ে গেলে হয়তো অন্য কোনো গাছ কিংবা অন্য কোনো প্রকরণের বৈশিষ্ট্য মিশে যেতে পারতো।

সাত বছর সময়কাল ধরে এই মটরশুঁটি নিয়ে গবেষণা করেন মেন্ডেল। এই সাত বছরে প্রায় ২৩,০০০ মটরশুঁটি গাছ নিয়ে তাকে নাড়াচাড়া করতে হয়েছে! এই পরীক্ষা যদি মানুষকে নিয়ে করা হয়, তবে একই ফলাফল আসবে; কিন্তু পরীক্ষাটি সম্পূর্ণরূপে করে দেখতে হলে ১ম বংশধর কিংবা ২য় বংশধরের মাঝে প্রজনন করা প্রয়োজন। এ কারণে মানুষ নিয়ে এই পরীক্ষাটি করা সম্ভব নয়। ধরা যাক, সেক্ষেত্রে বংশধারায় আপনি ও আপনার স্ত্রী বা স্বামী হলেন মূলরেখা। আপনাদের ছেলে-মেয়ে হবে প্রথম বংশধর, তাদের ছেলে-মেয়ে হবে আপনার দ্বিতীয় বংশধর। এভাবেই চলতে থাকবে। মটরশুঁটি গাছে পর-পরাগায়ন ঘটতে দেয়া হচ্ছে না, স্বপরাগায়ন ঘটানো হচ্ছে। মানুষের মাঝে এটি পরীক্ষা করে দেখতে চাইলে, যৌনমিলন ঘটাতে হবে ভাই-বোনের মাঝে। এজন্যই মূলত উদ্ভিদ ব্যবহার করেই এই পরীক্ষাটি করতে হয়। এছাড়াও মানুষের প্রজনন একটি দীর্ঘমেয়াদী পদ্ধতি, এমন পরীক্ষা করতে গেলে সেটি অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ ব্যাপার হয়ে দাঁড়াবে।

পর-পরাগায়ন যদি হয়, তাহলে কোন বৈশিষ্ট্যটি এসে হানা দিচ্ছে, সেটা গবেষক ধরতে পারবেন না, তাই স্ব-পরাগায়নকে মূলত বেছে নেয়া হয়। দুটি মটরশুঁটি গাছের মাঝে যখন প্রজনন সম্পন্ন হবে, তখন নতুন গাছগুলো হবে প্রথম বংশধর। নতুনগুলোর নিজেদের মাঝে প্রজননের মাধ্যমে জন্মাবে দ্বিতীয় বংশধর। মেন্ডেলবাদ ব্যাখ্যার জন্য এই দুই বংশধরই যথেষ্ট।

মেন্ডেলের এই বংশগতি সম্পর্কিত ধারণা কিংবা ব্যাখ্যাগুলো যখন প্রকাশিত হয়, তখনো ক্রোমোসোম, জিন, ডিএনএ এসব আবিষ্কৃত হয়নি। মেন্ডেলের গবেষণাগুলো কিন্তু এসবকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে। ভাবলে অবাক হতে হয় যে, জিন কিংবা ডিএনএ সম্পর্কে যখন মানুষ জানতই না, তখন একজন ধর্মযাজক এর চেয়েও একধাপ এগিয়ে এই জিনিসগুলোর ফলাফল খুঁজে বের করলেন! জিন কী সেটি না জানলেও তিনি কিন্তু কল্পনা করতে পেরেছিলেন ঠিকই, এর নাম দেন তিনি ‘ফ্যাক্টর’। তিনি বলেন, প্রতিটি বৈশিষ্ট্যের পেছনে অবশ্যই দুটি ফ্যাক্টর দায়ী। বর্তমানে কিন্তু কোষের নিউক্লিয়াসের ভেতর আমরা তা-ই দেখতে পাই, প্রতিটি ক্রোমোসোম জোড়ায় জোড়ায় অবস্থান করে। শুধুমাত্র কল্পনাশক্তি আর মটরশুঁটির বংশপরম্পরায় বৈশিষ্ট্যের পরিবর্তনকে ভিত্তি করে একজন ধর্মযাজক এমন এক ধারণা নিয়ে আসেন, যা তখন মানুষ বুঝতেই পারেনি।

এসব বিষয় বিস্তারিত বুঝতে হলে একটি কোষের আণুবীক্ষণিক গঠন নিয়ে জ্ঞান থাকা প্রয়োজন; ক্রোমোসোম, জিন আর ডিএনএ সম্পর্কিত বিস্তারিত জ্ঞান প্রয়োজন। যেহেতু তখনো সেসব আবিষ্কার হয়নি, মানুষের মাঝে মেন্ডেলের গবেষণাপত্র তেমন একটা সাড়া ফেলেনি সেসময়। কিন্তু মানুষ যখন ক্রোমোসোম বিষয়ক তথ্য সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করে, তখন সকলের টনক নড়ে যে, মেন্ডেলবাদ কতটা গুরুত্বপূর্ণ আর কার্যকর ব্যাখ্যা ছিলো। মেন্ডেলবাদকে এখনো বংশগতির মূল ভিত্তি ধরা হয়।

মেন্ডেলের বংশগতিবিদ্যার উপর দুটো সূত্র রয়েছে। এই সূত্র দুটোই মূলত পুরো বংশগতিবিদ্যার ভিত্তিস্বরূপ কাজ করছে। যদিও সূত্র দুটি তার বক্তব্য নয়। মেন্ডেল কেবলমাত্র মটরশুঁটি নিয়ে কাজ করে ফলাফল ও সেগুলোর ব্যাখ্যা লিপিবদ্ধ করেছেন, কোনো সূত্র আকারে প্রকাশ করেননি। পরবর্তীতে তারই গবেষণালব্ধ তত্ত্বগুলো বিবৃতি আকারে প্রকাশ করেন কার্ল করেন্স। কিন্তু তিনি এর পুরো কৃতিত্ব দেন মেন্ডেলকে।

প্রথম সূত্রে বলা আছে:

“সংকর জীবে বিপরীত বৈশিষ্ট্যের জিনগুলো মিশ্রিত বা পরিবর্তিত না হয়ে পাশাপাশি অবস্থান করে এবং জননকোষ সৃষ্টির সময় পরস্পর থেকে পৃথক হয়ে যায়।”

‘সংকর’ শব্দটি দ্বারা প্রথম কিংবা পরবর্তী বংশধরদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। মেন্ডেলের গবেষণা শুরুই হয়েছে এমন এক প্রজাতিকে ধরে, যার মাঝে অন্য কোনো প্রকরণের বৈশিষ্ট্য নেই, একদম সম্পূর্ণ নিজস্ব বৈশিষ্ট্য রয়েছে জীবটির। মটরশুঁটি গাছের পিতা-মাতা উভয়েই খাঁটি, অন্য কোনো বৈশিষ্ট্যের সংমিশ্রণ নেই তাতে (যদিও তা সম্ভব নয়, তবে তত্ত্বগত ভাবে ধরে নেয়া যাক এমনটি)। পিতা-মাতার প্রজননে যখন প্রথম বংশধর সৃষ্টি হলো, তখন দুটি গাছের বৈশিষ্ট্য মিলেমিশে একাকার হয়ে তবেই এক শংকর প্রজাতিরূপে জন্ম নিলো নতুন কিছু মটরশুঁটি গাছ।

‘বিপরীত বৈশিষ্ট্য’ দ্বারা বোঝানো হয়েছে এমন এক বৈশিষ্ট্যকে যা পিতা ও মাতা মটরশুঁটি গাছে বিপরীত ছিলো। উদাহরণ সহজ করার জন্য ধরে নেয়া যাক, পিতা গাছের পাতাগুলো কালো আর মাতা গাছের পাতাগুলো সাদা। দুটো গাছের পাতার রঙ সম্পূর্ণ বিপরীত। এই পাতার রঙের পেছনে অবশ্যই দুটি জিন কাজ করছে। এই বিপরীত বৈশিষ্ট্যকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে মেন্ডেলের প্রথম সূত্রটি।

এবার সূত্রটির মূল বক্তব্য জানা যাক। শংকর একটি জীবে পিতা-মাতা থেকে বিপরীত বৈশিষ্ট্যের জিনজোড়গুলো যেভাবে এসেছে, শংকর জীবে তা ওভাবেই রয়ে যায়, মিশ্রিত হয়ে যায় না, পাশাপাশি অবস্থান করে। শংকর জীব যখন প্রজননে উদ্যত হবে, তখন তার দেহে জননকোষ সৃষ্টি হবে, দুটি জীবের জননকোষের মিলনেই উৎপন্ন হবে নতুন আরেকটি জীবের। জননকোষ সৃষ্টির সময় সেই অমিশ্রিতভাবে বিপরীত বৈশিষ্ট্যের জিনগুলো রয়ে গেছে, তা পৃথক হয়ে যাবে পরস্পর থেকে। প্রথম সূত্রের বিবৃতিতে এটুকুই বলা আছে। তারপর কী ঘটবে, সে সম্পর্কে ধারণা দেয়া হয়েছে দ্বিতীয় সূত্রে। প্রথম সূত্রে কেবলমাত্র প্রথম বংশধরের জিনোটাইপ আলোচনা করা হয়েছে। একটি জীবের কোনো এক বাহ্যিক বৈশিষ্ট্যের পেছনে যে জিনজোড় দায়ী, তাকে বলা হয় তার জিনোটাইপ। প্রথম সূত্রে সবই এককভিত্তিক ব্যাপার। যেমন, জীবের কেবলমাত্র একজোড় বিপরীত বৈশিষ্ট্যকে আলোচনায় আনা হয়েছে।

দ্বিতীয় সূত্রের বিবৃতিতে বলা হয়, প্রথম বংশধরদের মাঝে প্রজননের ফলে দ্বিতীয় বংশধরে বৈশিষ্ট্যের কেমন পরিবর্তন-পরিবর্ধন ঘটবে। দ্বিতীয় সূত্রে জীবের দুই জোড়া কিংবা ততোধিক জোড়া বিপরীত বৈশিষ্ট্যের ক্ষেত্রে কী ঘটবে তা চিন্তা করা হয়েছে। সূত্রটি হলো,

“দুই বা ততোধিক জোড়া বিপরীত বৈশিষ্ট্যের মধ্যে প্রজনন ঘটালে প্রথম বংশধরে কেবলমাত্র প্রকট বৈশিষ্ট্যগুলোই প্রকাশিত হবে, কিন্তু জননকোষ সৃষ্টির সময় বৈশিষ্ট্যগুলো জোড়া ভেঙে পরস্পর থেকে স্বাধীনভাবে বিন্যস্ত হয়ে ভিন্ন ভিন্ন জননকোষে প্রবেশ করবে।”

‘প্রকট’ শব্দটির ব্যাপারে জানা যাক প্রথমে। প্রতিটি বাহ্যিক বৈশিষ্ট্যের পেছনে অবশ্যই দুটো জিন দায়ী থাকবে। যদি জিন দুটো একই রকম (হোমোজাইগাস) না হয়ে ভিন্ন (হেটেরোজাইগাস) হয়, তাহলে প্রকট-প্রচ্ছন্নের ব্যাপারগুলো চলে আসে। হেটেরোজাইগাস এক জোড় জিনের একটি বলছে চুলের রং কালো হবে, অপরটি বলছে চুলের রং বাদামী হবে। দুটো মিলিয়ে দেখা গেলো চুলের রং হয়েছে কালো। অর্থাৎ একটি জিনের বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পেয়েছে। যার বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পেয়েছে সেটি মেন্ডেলীয় প্রকট জিন, আর অপরটি মেন্ডেলীয় প্রচ্ছন্ন জিন। (উদাহরণকে সহজ করতে চুলের রং উল্লেখ করা হলো। চুলের রং, চোখের রং, উচ্চতা এমন ব্যাপারগুলোর পেছনে মূলত দুইয়ের অধিক জিন দায়ী থাকে, যাকে আমরা পলিজিন (Polygene) বলি।)

দ্বিতীয় সূত্রের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, যদি পিতা-মাতার দুই কিংবা ততোধিক বিপরীত বৈশিষ্ট্যকে ধর্তব্যে নিয়ে থাকি আমরা, তবে প্রথম বংশধরে দেখা যাবে, কেবলমাত্র প্রকট বৈশিষ্ট্যগুলোই প্রকাশ পেয়েছে। আর তত্ত্বগতভাবে পিতার বৈশিষ্ট্যগুলোকে প্রকট মনে করা হয়। প্রথম সূত্রে আমরা দেখেছি, জিনগুলো যেহেতু মিশ্রিত হচ্ছে না, সেহেতু প্রথম বংশধরে প্রচ্ছন্ন বৈশিষ্ট্যগুলো প্রকাশিত হবার সম্ভাবনা নেই। দ্বিতীয় বংশধর সৃষ্টির সময়ে, জিনগুলো জোড় ভেঙে স্বাধীন হয়ে যায় ও পৃথক পৃথক জননকোষে প্রবেশ করে থাকে। জননকোষগুলো একেকটা একেকরকম বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হয়ে গেলো তাহলে। সন্তান জন্ম নিতে যে জননকোষ ব্যবহৃত হবে, সন্তানের মাঝে আমরা ঠিক সেই বৈশিষ্ট্য খুঁজে পাবো।

এবার উদাহরণ দিয়ে ব্যাখ্যা করার যাক সূত্রগুলোকে। ধরা যাক, আমাদের কাছে দুটো খাঁটি মটরশুঁটি গাছ রয়েছে। একটি পুরুষ, একটি স্ত্রী। তাদের দুই জোড়া বিপরীত বৈশিষ্ট্য আমাদের পর্যবেক্ষণে আনতে হবে। পিতা গাছের পাতাগুলো লম্বা আর সাদা রঙের, মাতা গাছের পাতাগুলো খাটো আর কালো রঙের। এমনটি হওয়া সম্ভব নয়, শুধু উদাহরণ সহজ করার খাতিরে এভাবে ভেবে নেওয়া হলো। এই বৈশিষ্ট্যগুলোকে জিনোটাইপ আকারে লিখলে, যখন ইংরেজি বড় হাতের অক্ষর লেখা হবে, বুঝতে হবে, সেটি প্রকট বৈশিষ্ট্য; ছোট হাতের অক্ষরগুলো প্রকাশ করবে প্রচ্ছন্ন বৈশিষ্ট্য। যেমন,

১. লম্বা হওয়ার জিনোটাইপ: প্রকট- T, প্রচ্ছন্ন- t
২. খাটো হওয়ার জিনোটাইপ: প্রকট- S, প্রচ্ছন্ন- s
৩. সাদা হওয়ার জিনোটাইপ: প্রকট- W, প্রচ্ছন্ন- w
৪. কালো হওয়ার জিনোটাইপ: প্রকট- B, প্রচ্ছন্ন- b

তত্ত্বগতভাবে, পিতার বৈশিষ্ট্যের জন্য দায়ী সকল জিন প্রকট, আর মাতার প্রচ্ছন্ন। আমরা আগেই জেনেছি, পিতার পাতাগুলো লম্বা (TT) আর সাদা (WW)। মাতার পাতাগুলো খাটো (ss) আর কালো (bb)। একটি বিষয় মনে করে নেই আবারো, প্রতিটি বৈশিষ্ট্যের পেছনে দুটো জিন দায়ী।

এবার নিচের ছবিটি ভালোমতো লক্ষ্য করুন।

মেন্ডেলীয় প্রথম সূত্রের ফলাফল; source: লেখক

এই হলো আমাদের প্রথম বংশধর, সূত্রানুযায়ী প্রতিটি সন্তান সকল প্রকট বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হবে আর জিনোটাইপ একই থাকবে তাদের। এখানে জিনোটাইপ দাঁড়িয়েছে TsWb। সন্তান গাছগুলোর পাতা হবে পিতা গাছের পাতার মতো লম্বা আর সাদা। এরপরে কী ঘটবে তাদের দ্বিতীয় বংশধরের সাথে, সেই ব্যাপারে আমাদের জানাবে দ্বিতীয় সূত্রটি।

এবার প্রথম বংশধরের যেকোনো দুটি সন্তানের মাঝে প্রজনন ঘটানো হবে। সূত্রানুযায়ী, প্রজননকালে জিনগুলো জোড় ভেঙে পৃথক ও স্বাধীন অস্তিত্বের অধিকারী হবে। নিচের ছবিটি লক্ষ্য করার জন্য অনুরোধ করছি। ছবিটিতে প্রথমে একটি সন্তানের জিনজোড়গুলো ভেঙে মিশ্রিত হয়ে গেছে।

জননকোষে জিনের বন্টন; source: লেখক

এবার দুই সন্তানের মিশ্রিত হয়ে যাওয়া জিন সম্বলিত জননকোষগুলোর মাঝে প্রজনন সম্পন্ন হয়ে দ্বিতীয় বংশধরের জন্ম হয়েছে।

এই ছবির চার্টের জিনোটাইপগুলো লিখে দেওয়া হলো। কোন মটরশুঁটি গাছের পাতা কেমন হবে, জিনোটাইপ মিলিয়ে উল্লেখ করা হলো চার্টে।

মেন্ডেলীয় দ্বিতীয় সূত্রের ফলাফল; source: লেখক

ঠিক একইভাবে কিন্তু বাবা-মায়ের রোগ-বালাই সন্তানের দেহে গড়াচ্ছে। দেখা গেলো, একই পরিবারের এক সন্তান কিছুদিন পরপরই প্রচুর অসুস্থ হয়, আবার অপর সন্তান খুব স্বাস্থ্যবান, কোনো অসুখ নেই তার। সন্তান ছেলে হবে নাকি মেয়ে হবে, তা-ও নির্ভর করে এই জিনোটাইপ সম্পর্কিত মেন্ডেলীয় ব্যাখ্যার উপর। একসময় আমাদের দেশে পুত্র সন্তানের জন্য স্ত্রী নির্যাতনের হার ছিলো অনেক বেশি, মানবশিশুর জন্মের প্রক্রিয়া নিয়ে সমাজের অজ্ঞতারই ফলাফল সেটি।

আগেই বলা হয়েছে, মানুষের ৪৬টি ক্রোমোসোমের মাঝে ২টি হলো সেক্স ক্রোমোসোম; যা নির্ধারণ করে থাকে সন্তানের লিঙ্গ। পুরুষের ক্ষেত্রে দুই ধরনের ক্রোমোসোম পাওয়া যায়, x ও y। আর নারীতে এক ধরনের, শুধুমাত্র x। কেবল y এর উপস্থিতিতেই একটি শিশু পুংলিঙ্গের হয়। জননকোষের মিলনের সাথে সাথে এটি নির্ধারিত হয়ে যায় যে, সন্তান ছেলে হবে, নাকি মেয়ে। পুরুষের জননকোষে যেকোনো একটি ক্রোমোসোম উপস্থিত থাকতে পারবে, কেননা জননকোষে ৪৬টি ক্রোমোসোম জোড়ায় জোড়ায় থাকে না। মেন্ডেলবাদ অনুসারে ক্রোমোসোমগুলো জোড়া ভেঙে ২৩টি করে পৃথক পৃথক জননকোষে প্রবেশ করে। স্ত্রীর সকল জননকোষে একটি করে y ক্রোমোসোম রয়েছে। কিন্তু পুরুষের দুইটি জননকোষে থাকবে x আর বাকি দুইটিতে থাকবে y। কী করে এটা বোঝা যায়, তার সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা দেওয়া হলো।

পুরুষের শরীরে একটি Premordial Germ Cell মিয়োসিস পদ্ধতিতে চারটি Sperm তৈরি করে। এখন একটি Premordial Germ Cell-এ অবশ্যই একটি x আর একটি y ক্রোমোসোম জোড়াকারে অবস্থান করছে। শরীরের সকল কোষে এমন জোড় অবস্থান করবেই। Premordial Germ Cell যখন চারটি Sperm তৈরি করছে, তখন প্রতিটি ক্রোমোসোম প্রথমে সংখ্যাবৃদ্ধি করছে, তারপর সেগুলো পৃথক পৃথক জননকোষে প্রবেশ করে চারটি জননকোষ তৈরি করছে। এভাবেই জানা গেলো, চারটি Sperm-এর দুটোয় x আর দুটোয় y রয়েছে। y সম্বলিত Sperm যদি স্ত্রীর জননকোষের সাথে নিষেকের মাধ্যমে সন্তান জন্ম দেয়, কেবল তখনই সন্তানের লিঙ্গ হবে পুংলিঙ্গ, অন্যথায় স্ত্রীলিঙ্গ।

সন্তান পুত্র হবে নাকি কন্যা হবে তার জিনগত ব্যাখ্যা; Source: www.pathwayz.org

অনেক সময় দেখা যায়, পিতা-মাতার মাঝে কেউ একজন, কিংবা দুজনেই বর্ণান্ধ, অথবা জন্মগতভাবে বধির, অথবা জন্মগতভাবে অন্ধ। যেহেতু জন্মগত, সেহেতু তাদের জিনোটাইপেই এই সমস্যা বিদ্যমান রয়েছে। সন্তানের দেহেও এই একই সমস্যা গড়াবে। তবে তাদের সকল সন্তানের ক্ষেত্রে কিন্তু এই সমস্যাগুলো প্রকাশ পাবে না। দ্বিতীয় সূত্র অনুসারে, জিনগুলো জোড়া ভেঙে মিশ্রিত হয়ে যাবে। এ কারণে কিছু সন্তান পিতা-মাতার মতো হবে, কিছু সন্তান সুস্থ-সবল হবে।

এই আলোচনার মাধ্যমে দেখানো হলো কীভাবে বংশগতিবিদ্যার মূল বিষয়গুলোর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা জানা যায় মেন্ডেলবাদ থেকে। বেঁচে থাকুক মেন্ডেলবাদ, এতো সুন্দর ব্যাখ্যার জন্য। বিজ্ঞান ছাড়া এতো সুন্দর ব্যাখ্যা আর কে দেবে। সেই পাথর ঘষে আগুন জ্বালানো থেকে শুরু, বর্তমানে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বস্তুতেও যেমন বিচরণ রয়েছে মানুষের, তেমনি বিশাল মহাশূন্যের মাঝেও রয়েছে অজানাকে জানার হাতছানি। যুগে যুগে ইয়োহান মেন্ডেলের মতো মানুষের অনুসন্ধিৎসু মনই আজকের পৃথিবীতে নিয়ে এসেছে জ্ঞান-বিজ্ঞান আর প্রযুক্তির এই অসাধারণ অগ্রগতি।

তথ্যসূত্র:

১) T. W. Sadler (2015). Langman’s Medical Embryology. Issue 13. p. 14-20

২) Gazi S. M. Ajmol, Dr. Gazi S. M. Asmot (2015). Biology-Second Paper(XI-XII). Issue 2. p. 246-249, 258

ফিচার ইমেজ- medicine.uiowa.edu

Related Articles