সৃজনশীলতা যে কত রকমের হতে পারে তার কোনো ইয়ত্তা নেই। মানুষের ভিতর সৃজনশীলতা মনে হয় জন্মপ্রদত্ত গুণ। কেউ সেটা ব্যবহার করে, আবার কেউ করে না। সকল বিষয়ের মধ্যেই সৃজনশীলতা, শিল্প, নতুন কিছু করার উপায় ইত্যাদি প্রয়োগের ব্যবস্থা থাকেই। অপেক্ষা হচ্ছে শুধু সেটা একটু ভেবে বের করা এবং সাহস করে সেটা প্রকাশ করা। পৃথিবীতে এখনও পর্যন্ত বিখ্যাত সব চিত্রশিল্পীর আবির্ভাব ঘটেছে।

বিখ্যাত এই শিল্পীরা কতভাবে যে তাদের ছবিগুলো এঁকেছেন, কত রকমের বার্তা তাদের এই ছবিগুলোর মধ্যে দিয়ে প্রকাশ করতে চেয়েছেন তার ইয়ত্তা নেই। সবাই কিন্তু ব্রাশ দিয়ে ছবি আঁকেন এবং বাজারে বিভিন্ন ধরনের পেইন্টিং ব্রাশ কিনতেও পাওয়া যায়। এই ব্রাশ দিয়ে রঙ নিয়ে খেলা করাও সোজা। কিন্তু এমন কিছু চিত্রকর কিছু অভিনব উপায়ে তাদের চিত্রকে সবার সামনে প্রকাশ করেছেন যেটা দেখলে তাক লেগে যেতে হয়। এমন একটি উপায় হচ্ছে বিন্দু দিয়ে একটি পুরো ছবি এঁকে ফেলা। অর্থাৎ ছবিতে শুধু ছোট ছোট ডট বা বিন্দু বসানো হবে এবং সেই বিন্দু দিয়েই বিভিন্ন অবয়ব আঁকা হবে।

ফ্রেঞ্চ চিত্রশিল্পী জর্জ সুরা (Georges Seurat) এমনই একজন শিল্পী ছিলেন, যিনি চিত্রশিল্প জগতে ছবি আঁকার নতুন পদ্ধতি বাস্তবায়ন করেছেন। তার নিজের আঁকা ছবি বিখ্যাত Sunday Afternoon on the Island of La Grande Jatte। এ ছবিতে তিনি কোনো ব্রাশের ব্যবহার করেননি, বরং শুধু বিভিন্ন রঙের বিন্দু দিয়ে বিশাল ক্যানভাসের একটি ছবি তৈরি করে ফেলেছিলেন তিনি। চিত্রশিল্প জগতে এই পদ্ধতিতে ছবি আঁকার নাম হচ্ছে বিন্দু চিত্র বা Pointillistic Painting

ফ্রেঞ্চ চিত্রশিল্পী জর্জ সুরা (Georges Seurat) যিনি চিত্রশিল্প জগতে শুধু বিন্দু দিয়ে ছবি আঁকার নতুন পদ্ধতি বাস্তবায়ন করেছেন; Source: hudojonik-impressionist.ru

Pointillistic Painting এর বৈশিষ্ট্য হচ্ছে বিপুল সংখ্যক বিন্দু দিয়ে পুরো ছবিটি আঁকা হবে। দূর থেকে দেখলে বোঝাই যাবে না যে ছবিটি শুধুমাত্র ডট দিয়ে আঁকা হয়েছে। কিন্তু কাছে গেলে বিন্দুগুলোকে আলাদা করা যাবে। এছাড়াও বিন্দু চিত্রের সামনে যেকোনো জায়গায় দাঁড়ালে যে রঙ দেখা যাবে এর থেকে দূরে গেলে আগের দেখা রঙের পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাবে। এখানটাই বিন্দু চিত্রের মহত্ব। ব্রাশ দিয়ে আঁকা ছবির ক্ষেত্রে এরকমটি দেখা যায় না। এই একটি বৈশিষ্ট্য এই ধরনের ছবিগুলোকে অনেক বেশী অনন্য করে তুলেছে।

Pointillistic Painting এর বৈশিষ্ট্য হচ্ছে বিপুল সংখ্যক বিন্দু দিয়ে পুরো ছবিটি আঁকা হয়। এই ছবিটি হাই টাইডের একটি বিন্দু দিয়ে আঁকা ছবি; Source: National Gallery of Australia

বিজ্ঞানের একটি সুন্দর ধর্মের কারণে বিন্দু চিত্রগুলো এমন একটি গুণ পেয়ে গিয়েছে। কোনো বস্তু থেকে যখন আলো আমাদের দিকে আসে এবং যখন সেটা আমাদের আইরিশের ভিতর দিয়ে যায় তখন আলো ছড়িয়ে পড়ে এবং আমাদের চোখে সেই বস্তুটির একটি অবয়ব তৈরি করে। যখন এই আলো একটি মাত্র বিন্দু থেকে আসে তখন আমাদের রেটিনাতে সেই বিন্দুর একটি গোলাকার প্রতিচ্ছবি তৈরি হয়ে যায়। আবার যখন দুটি বিন্দু থেকে আলো আসে তখন প্রত্যেক বিন্দুই নিজের নিজস্ব গোলাকার প্রতিচ্ছবি তৈরি করতে চায়। সমস্যা হয় তখনই যখন দুটি বিন্দু অনেক কাছাকাছি  অবস্থান করে। বেশী কাছাকাছি অবস্থান করলে আমাদের চোখ দুটি বিন্দুকে আলাদা করতে পারে না, কারণ দুটি বিন্দু থেকে আসতে থাকা আলো একে অন্যের সাথে জড়িয়ে যায় (Overlap) এবং একসাথে হয়ে আমাদের চোখে প্রতিচ্ছবি তৈরি করে, যে কারণে আমরা তখন দুটি বিন্দু আলাদা করতে পারি না, যদিও বিন্দু দুটি পরস্পর থেকে আলাদা।

দুটি বিন্দু থেকে আসতে থাকা আলো একে অন্যের সাথে জড়িয়ে যায় এবং আমাদের চোখে একটিমাত্র প্রতিচ্ছবি তৈরি করে, যে কারণে দুটি বিন্দু আলাদা করা যায় না, যদিও বিন্দু দুটি পরস্পর থেকে আলাদা; Source: wikimedia-commons.com

Pointillistic Painting বা বিন্দু চিত্রে এরকম হয়। ধরা যাক, ছবিতে অনেকগুলো বিন্দু পাশাপাশি বসানো হয়েছে। বিন্দুগুলো বিভিন্ন রঙের। আমরা যদি ছবিটির কাছাকাছি থাকি তাহলে আমাদের কাছে লাগবে বিন্দুগুলো পরস্পর থেকে বেশ দূরে অবস্থান করছে এবং তাদের রঙও ভিন্ন। কিন্তু দূরে গেলেই পূর্বের ব্যাখ্যার ন্যায় কিছু একটা হবে। তখন আমরা রঙ আলাদা করতে পারবো না, বরঞ্চ অন্য কোনো রঙের উপস্থিতি টের পাবো। যেমন, ধরা যাক নীল এবং লাল দুটি বিন্দু পাশাপাশি আছে। দূর থেকে দেখলে আমরা বুঝবো সেটা মেজেন্টা, কারণ নীল আর লাল একসাথে করলে মেজেন্টা রঙ হয়।

আবার এই দুটি বিন্দুর পাশে যদি হলুদ রঙ থাকে তখন এই বিন্দুগুলো থেকে আসা আলোর তরঙ্গ  আমাদের চোখে একে অন্যের উপর উপরিস্থাপিত হয়ে গোলাপি রঙ তৈরি করবে। এই উপরিস্থাপনের ফলে আমাদের মস্তিষ্ক বিন্দুগুলোকে গোলাপি রঙের দেখতে থাকবে। অর্থাৎ যেসব চিত্রশিল্পী বিন্দু চিত্র তৈরি করেন তারা তাদের ছবিতে মানুষের দৃষ্টিশক্তি এবং দৃষ্টি পদ্ধতিকে ব্যবহার করেন। আর এই কারণেই বিন্দু চিত্র একটি অনন্য নিদর্শন, অনন্য সৃষ্টি এবং অনন্য শিল্প।

শুধু বিন্দু দিয়ে আঁকা আইফেল টাওয়ার; Source: arthipo.com

তৈল চিত্র বা Oil Painting এর ক্ষেত্রে দেখা যায় যে ছবি থেকে আসা আলোগুলো অনেক মৃদু হয়। কিন্তু বিন্দু চিত্রগুলো দেখতে বেশ উজ্জ্বল হয়। তৈল চিত্রের উপর রঙের স্তর থাকে। আলোগুলোকে সেই স্তর ভেদ করে একবার এসে প্রতিফলিত হয়ে আবার তেলের স্তর ভেদ করে আমাদের চোখে আসতে হয় এবং সেখান থেকে আমরা চিত্রটি বুঝতে পারি। কিন্তু এই চিত্র দেখতে অনেক অনুজ্জ্বল (Dim) মনে হয়। কিন্তু বিন্দু চিত্রে স্তরের কোনো ঝামেলা না থাকায় সরাসরি আলো এসে পড়াতে ছবি উজ্জ্বল লাগে। তাছাড়া বিন্দু চিত্রে ব্যবহার করা রঙের মিশ্রণ দেখাটা নিয়ন্ত্রণ করে আমাদের মস্তিষ্ক, তাই সেটা আরও বেশী সুন্দর মনে হয়।

Source: guggenheimmuseum.org

এখানে উল্লেখ্য যে, বিভিন্ন কালার মনিটর, বিভিন্ন রঙ এবং ডিজাইনের মোজাইক, বিভিন্ন রঙের তাঁতের কাপড়, প্রিন্টিং ইত্যাদি যে তৈরি করা হয় সেখানেও কিন্তু বিন্দু চিত্রে ব্যবহার করার এই ছোট্ট চালাকি ব্যবহার করা হয়। এসব ক্ষেত্রেও অনেকগুলো বিভিন্ন রঙের বিন্দু ব্যবহার করা হয় এবং আমাদের মস্তিষ্কের উপর ছেড়ে দেয়া হয় যে আমরা কোন রঙ দেখবো। আবার অনেক সময় পরীক্ষা করেও দেখা হয় যে, কোন জায়গায় কতগুলো কোন রঙের বিন্দু বসালে দর্শক কোন একটি নির্দিষ্ট রঙ দেখবে যেটা তাদের পছন্দনীয় হবে। টেলিভিশন মনিটরেও এমন করা হয়। সেখানে অবশ্য তিনটি মৌলিক রঙ লাল, নীল এবং সবুজ রং ব্যবহার করা হয়। কারণ এই তিনটি রঙের বিভিন্ন রকমের মিশ্রণ থেকেই অন্যান্য রঙের সৃষ্টি। রঙের উজ্জ্বলতাও এসব ক্ষেত্রে অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাড়ায়।

ফিচার ইমেজ সোর্স:  overstockArt.com (জর্জ সুরা এর আঁকা বিখ্যাত Sunday Afternoon on the Island of La Grande Jatte- এই ছবিতে কোন ব্রাশের ব্যবহার করা হয়নি)

তথ্যসূত্র:

Walker, J. (2007). Flying Circus of Physics. John Wiley & Sons, Inc.