এই লেখাটি লিখেছেন একজন কন্ট্রিবিউটর।চাইলে আপনিও লিখতে পারেন আমাদের কন্ট্রিবিউটর প্ল্যাটফর্মে।

যারা অন্তত গুনের নিয়মগুলো জানে তারা অবশ্যই জানবে, ৩ এর সাথে ৩ গুন করলে কী হয়। কিংবা তিনটি ৩ পরপর গুন করলে, (৩ * ৩ * ৩) কী আসবে। এভাবে একটি সংখ্যাকে সেই সংখ্যাটি দ্বারা বারবার গুন করলে উত্তর কী হবে সেটা আমরা হয়তো সহজেই বের করে পারব। কিন্তু নিচের গুনটির দিকে একটু খেয়াল করলে দেখবেন, খুবই এলেমেলো ও হযবরল লাগছে-

৩ * ৩ * ৩ * ৩ * ৩ * ৩ * ৩ * ৩ * ৩ * ৩ * ৩ * ৩ * ৩ * ৩ * ৩ * ৩ * ৩ * ৩ * ৩ * ৩ * ৩ * ৩ * ৩ * ৩ * ৩ * ৩ * ৩ * ৩ * ৩ * ৩ * ৩ * ৩ * ৩ * ৩ * ৩ * ৩ * ৩ * ৩ * ৩ * ৩ * ৩ = ৩.৬৪৭ * ১০^১৯

তো গণিদবিদরা ঠিক করলেন, একটি সংখ্যাকে ওই সংখ্যাটি দ্বারা যদি বেশকিছুবার গুন করা হয় তবে যতবার গুন করতে সংখ্যাটি নেয়া হয়েছে সেটা ওই সংখ্যাটির মাথায় বসিয়ে দেয়া হবে। যেমন, উপরের উদাহরণটি লেখা যাবে ৩^৪১ এভাবে। কেননা ৩ কে ৪১ বার ৩ দ্বারা গুন করা হয়েছে। এখানে ৪১ কে বলা হবে ৩ এর ‘ধনাত্বক পুর্ণসংখ্যা সূচক’ (positive integer exponent) এবং এই সূচকটি যদি ঋণাত্বক হয় তবে তাকে বলা হবে ‘ঋণাত্বক পূর্ণসংখ্যা সূচক’। সাধারণত যেকোনো সংখ্যার জন্যে এই সূচককে লেখা হয়-

b^x = N; যেখানে, B হল বেস, X হচ্ছে সূচক এবং N হচ্ছে ফলাফল।

এখন একটা প্রশ্ন আসতে পারে যদি সূচক শুণ্য হয় তবে কী হবে? অর্থ্যাৎ b^0 = আমরা কী লিখতে পারি? এটার উত্তর হচ্ছে সর্বদা ১ পাব। বিষয়টা আমরা এভাবে ভাবতে পারি যে, যদি কোন সঙ্খ্যাকে সে সংখ্যাটি দ্বারা কখনো গুন করা নাই হয়ে থাকে তবে আমরা ১ ছাড়া আর কী পেতে পারি, তাই না? আবার যদি বেসটা শুণ্য হয় তবে? গণিতবিদরা একমত হয়েছেন যে ০ কে ০ বার গুন করা আসলে আমাদের সংজ্ঞার বাইরের জিনিস। তাই আমরা ০^ কে অসঙ্গায়িত বলে ধরে নিয়েছি।

এখন আমরা খুব দ্রুত সূচকের কিছু নিয়মের সাথে পরিচিত হব।

১. গুনের নিয়ম, X^n  * X^= X^(n+m)

২. সূচকের উপর সূচক, (X^n)^m = X^nm

৩. গুনফলের উপরে সূচক, (XY)^n = X^n * Y^n

৪. ভগ্নাংশের উপর সূচক, (X/Y)^n = Xn / Yn

৫. ঋণাত্বক সুচক, Xn / Xm = X^(n-m)

এতক্ষণ তো সূচক নিয়ে বেশকিছু কথা বলা হলো। এবার আসি সূচকের সাথে আরেকটি গাণিতিক যন্ত্র লগ বা লগারিদমের সম্পর্ক নিয়ে। আমরা এর আগেই দেখে এসেছি সূচকের সাধারণভাবে প্রকাশিত রূপ হচ্ছে  b^x = N; যেখানে, B হলো বেস, X হচ্ছে সূচক এবং N হচ্ছে ফলাফল। আবার b, N এবং X কে লগারিদম দিয়ে প্রকাশ করা হয় নিম্নরূপে।

X = log_b N; অর্থ্যাৎ লগারিদম এবং সূচকের বেসকে যদি একই রাখা হয় তবে সূচকে প্রাপ্ত ফলাফলকে উক্ত বেস দ্বারা তার উপরে লগারিদমিক অপারেশন করা হলে আমরা সূচকটি পাব। এক কথায় আমরা বলতে পারি, সূচক এবং লগের ভেতরে একটা বিপরীত (inverse) সম্পর্ক রয়েছে।

এবার একটা উদাহরন দেখা যাক।

আমরা জানি যে, (যেকোন সংখ্যা)^ = ১

অতএব, log_(যেকোনো সংখ্যা) ১ = ০

তাহলে বোঝা গেল যে লগারিদম একদম সহজ করে বললে সূচকের বিপরীত। এবার আগানো যাক লগারিদমের কিছু নিয়ম নিয়ে,

১. গুণনের নিয়ম, log (XY) = log X + log Y

২. ভাগের নিয়ম, log (X/Y) = log X – log Y

৩. সূচকের নিয়ম, log (X^n) = n log X

এখন আমরা লগের একটা মজার ব্যাবহার দেখব। সাধারণত লগ সম্বলিত কোনো সমীকরণ সমাধানের একটা পদ্ধতি হচ্ছে উক্ত সমীকরণের উভয় পার্শ্বকে লগের বেসের সূচক হিসেবে প্রকাশ করা; এতে করে লগসম্বলিত অংশটি চলে যায় এবং সমীকরণটি সাধারাণ বীজগাণিতিক সমীকরণে পরিণত হয়।

যেমন, প্রদত্ত কোনো সমীকরণ যদি এমন হয়,

log_b X = Y তবে আমরা লিখতে পারবো, blog_bX = b^Y

  • X = bY

কেন এভাবে লগ চলে গেল তা যদি প্রমাণ করতে চাই তবে–

ধরে নিই, log_b N = X এবং blogb^N = N` à যা সূচকের রূপে আছে। এর বিপরীতটা যদি আমরা নেই তবে পাব, log_b N` = log_b N অর্থ্যাত N` = N যা আমাদের উপরে করে আসা দাবির সাথে মিলে যায়।

এখন আমরা আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের দিকে নজর দেই। ধরুন আপনার এলাকায় নতুন একটা ব্যাংক হয়েছে যারা কিনা তাদের উদ্বোধনী অফার স্বরূপ বছরে ১০০% হারে সুদ প্রদান করবে। সুতরাং আপনি যদি ১ টাকার একটা ফিক্সড ডিপোজিট করেন তবে বছরান্তে আপনি ২ টাকা পাবেন। তো আপনার এলাকায় গণিত জানা খুব চতুর একজন মানুষ বোকাসোকা ব্যাংকের ম্যানেজারের সাথে দেখা করতে গেল। গিয়ে ম্যানেজারকে জিজ্ঞেস করল যে, যদি বছরে ১০০% সুদ দেন তাহলে তাকে ৬ মাসে ৫০% সুদ দেওয়া যাবে কিনা?

ম্যানেজার চিন্তা করে দেখল যে লোকের কথার যুক্তিতো ঠিকই আছে ১ বছর টাকা রাখলে যদি ২ টাকা পাওয়া যায় তাহলে ৬ মাস রাখলে আমি তাকে ১.৫ টাকা দেব। যেই কথা সেই কাজ। সেই চতুর লোক ব্যাংকে ১ টাকা ৬ মাসের জন্যে ফিক্স করে ৬ মাস পর টাকা উঠিয়ে সেই টাকা আবার ফিক্স করে ১ বছরে ২.২৫ টাকা কামাই করে ফেলল!

আপনি যদি সেই ব্যাংকের ম্যানেজার হন তবে আপনার মাথায় টাক পড়তে বাধ্য কারণ ‘সবার অঙ্ক মিললেও আপনার অঙ্ক মিলছে না’। কারণটি কী? খুবই সহজ, কারণ এর আগের অংশগুলো যদি পড়ে আসেন তাহলে বুঝবেন যে, ৫০% হার সুদে ১ টাকার ফ্যাক্টর হল ১.৫ এবং আপনি এটা বছরে দুইবার পাবেন ৬ মাস করে, অর্থ্যাত ১.৫= ২.২৫ টাকা।

তো যাই হোক, চালাক লোকটি পরের বছর ভাবল একটু দেখে আসি ম্যানেজার এখনও বোকা আছে কিনা। সে এবার গিয়ে ৩ মাস করে টাকা রাখতে চাইলো, বিনিময়ে সুদের হার হবে ২৫%। বোকা ম্যানেজার এবারোও অংক মেলাতে না পেরে হ্যাঁ বলে দিল এবং বছর শেষে চালাক লোকটি এবার ২.৪৪ টাকা হাতিয়ে নিল। চালাক লোকটি খেয়াল করে দেখল সে যত বেশি সময়ের ইন্টার্ভাল কমাচ্ছে তত বেশি করে সে টাকা হাতিয়ে নিতে পারছে ব্যাংক থেকে। কিন্তুউ, অনেক বড় একটা কিন্তু আছে। কারণ, এর মানে কি আমরা যত ইন্টার্ভাল কমাতে থাকত তত বেশি টাকা পেতে থাকব?

এই প্রশ্নটির উত্তর দেওয়ার আগে একটু হিসাব করে আসি, হিসেবটা নিচে দেওয়া হলো-

ইন্টার্ভাল

ফ্যাক্টর

রিপিট

ফলাফল

১ বছর

১ + ১

৬ মাস

১ + ০.৫

২.২৫

৩ মাস

১ + ০.২৫

২.৪৪

১ মাস

১ + ০.০৮

১২

২.৬১৩

১ সপ্তাহ

১ + ০.০১৯

৫২

২.৬৯৩

১ দিন

১ + ০.০০৬২৭৩৯

৩৬৫

২.৭১৪৬

১ ঘন্টা

----

----

২.৭১৮

১ মিনিট

----

----

২.৭১২৮

১ সেকেন্ড

----

----

২.৭১২৮২৮

 উপরের হিসেবগুলো খেয়াল করলে দেখতে পাবেন যে, শুরুর দিকে বেশি লাভ করতে পারলেও একটা সময়ে এসে প্রাপ্ত ফলাফল স্থির হয়ে গেছে এবং সেটা ২.৭১২৮ এর কাছাকাছি অবস্থান করছে। এই যে বিশেষ সঙ্খ্যাটি আমরা পেলাম, এর একটা সুন্দর নাম রয়েছে। একে বলা হয় অয়লারের ধ্রুবক, e = 2.7128 … … … … … এবং এটি একটি অসীম পর্যন্ত বিস্তৃত অমূলদ সংখ্যা।

এই অয়লায়ের ধ্রুবকের একটা সুন্দর ব্যাবহার হচ্ছে আমাদের আশেপাশের প্রাকৃতিক সকল প্রক্রিয়াই এই ধ্রুবককে বেস ধরে পরিবর্তিত হয়। সেটা নিয়ে আরো বিস্তারিতভাবে আমরা আরেকদিন আলোচনা করব।

This Bangla article is about power, logarithm, and Euler Constant. 

Featured Image: Hip Wallpapers