নিউরোজেনেসিস: পূর্ণবয়স্ক মানুষে নিউরন তৈরির অজানা এক প্রক্রিয়া

মানবদেহের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ মস্তিষ্ক। মানবসভ্যতাকে সামনে এগিয়ে নেওয়ার নীলনকশার রচনাও হয়েছে এই মস্তিষ্কেই। কিন্তু দীর্ঘদিন যাবত আমাদের ধারণা ছিলো মানুষের মস্তিষ্কের গাঠনিক একক নিউরন আর বিভাজিত হয় না। মায়ের গর্ভে মানবকোষের দলাপিন্ডের বয়স যখন ৪২ দিন, তখন তৈরী শুরু মস্তিষ্ক। প্রতি মিনিটে গড়ে ২,৫০,০০০ করে নিউরন তৈরি হয় এ সময়ে। ভ্রূণের বয়স ৬ মাস হওয়ার মধ্যেই মানব মস্তিষ্কের বেশিরভাগ নিউরন তৈরি হয়ে যায়। বলা বাহুল্য, পূর্ণবয়স্ক মানুষে থাকা ৮৫-৮৬ বিলিয়ন নিউরনের বেশিরভাগই তৈরী হয়ে যায় এ সময়ে।

মানব মস্তিষ্ক উন্নয়নের পথযাত্রা; ছবিসূত্রঃ brainfacts.org

তবে এরপরেও চলতে থাকে নিউরনগুলোর মধ্যে আন্তঃসংযোগ স্থাপন সহ নানা ধরনের কাজ। মূলত মানব দেহে একটি কোষ বিভাজিত হয়েই তার অনুরূপ আরেকটি কোষ তৈরী করে, তবে বিশেষায়িত এই নিউরনকোষ আর বিভাজিত হয় না। এ ব্যাপারটিকে নিত্যদিনের জীবনের একটি ঘটনার সাথে তুলনা করা যাক। অনেকটা বাড়ি তৈরীতে ব্যবহৃত রডের সাথে তুলনা করা যায় নিউরনগুলোকে। রডগুলো যেমন ছড়িয়ে থাকে বাড়ির ভিত্তি থেকে সর্বত্র, ঠিক তেমনি আমাদের নিউরনগুলোও ছড়িয়ে থাকে একদম পায়ের পাতা পর্যন্ত। বাড়ি তৈরীর পর যেমন একে ভেঙেচুরে নতুন করে কোনো রড লাগানো অসম্ভব ব্যাপার, ঠিক তেমনি বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিলো মানব মস্তিষ্কের নিউরনগুলোও অনেকটা এরকম। ১৯১৩ সালে প্রখ্যাত নিউরোবায়োলজিস্ট সান্তিয়াগো র‍্যামন তার কিছু গবেষণালব্ধ ফলাফল থেকে এ ধারণার প্রবর্তন করেন।

মস্তিষ্কে থাকা নিউরনের জটিল নেটওয়ার্ক; ছবিসূত্রঃ bioedonline.org

কারণ নিউরন কোষকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় নতুন করে তৈরী হওয়ার মতো উপাদানগুলোও নিউরনে অনুপস্থিত। তাই দীর্ঘদিন যাবত বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিলো নিউরন নিজের অনুলিপি সৃষ্টি করে না। ফলে পূর্ণবয়স্ক মানবদেহে নতুন নিউরন তৈরী হওয়ার সম্ভাবনাও শূন্যের কোঠায়। কিন্তু আসলেই কি তাই?

পূর্ণবয়স্ক মানুষেও তৈরী হতে পারে নতুন নিউরন

সাম্প্রতিক গবেষণাগুলো বলছে পূর্ণবয়স্ক মানুষেও নতুন করে তৈরী হতে পারে নিউরন। আর এই প্রক্রিয়াকে বলা হয়ে থাকে ‘নিউরোজেনেসিস‘। তবে পুরাতন নিউরন থেকে বিভাজিত হবার মাধ্যমে নয়, বরং অন্য একটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। চলুন জেনে নিই কী সেই প্রক্রিয়া আর মস্তিষ্কের বিভিন্ন রোগ নিরাময়ে ঠিক কতটা গুরুত্বপূর্ন সেটি।

কী এই নিউরন?

নিউরন হলো স্নায়ুতন্ত্রের ইট। এই ইটে নির্মিত স্নায়ুতন্ত্র দিয়েই আমরা অনুভব করি আশপাশের সবকিছুকে। ঠান্ডা কিংবা গরমের অনুভব, ভালো কিংবা মন্দ সম্পর্কিত সিদ্ধান্ত সহ আপনার আমার জীবনের সবগুলো কাজের সাথে জড়িত এই স্নায়ুতন্ত্র। মোটা দাগে এ স্নায়ুতন্ত্রকে দু’ভাগে ভাগ করা চলে।

মানুষের স্নায়ুতন্ত্রের একটি ছবি; ছবিসূত্রঃ commons.wikimedia.org

১. স্নায়বিক সিস্টেমের সদর দপ্তর বা রাজধানীকে বলা হয় কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র। এটি গঠিত হয় ব্রেইন আর স্পাইনাল কর্ড নিয়ে।

২. এ সিস্টেমের মাঠকর্মী, যা প্রত্যেকটি অঙ্গে আছে, তাকে বলা হয় প্রান্তীয় স্নায়ুতন্ত্র। ধরুন, আপনার হাতে যদি একটি মশা কামড় দেয়, তাহলে তার তথ্য স্নায়বিক সিস্টেমের সদর দপ্তরে মাঠকর্মী স্নায়ুরা সেকেন্ডের ভগ্নাংশের মাঝে পৌছে দিবে।

নিউরন দিয়েই দেহের প্রয়োজনীয় তথ্য প্রবাহের মূল কাজটি হয়ে থাকে। তাই কোনো কারণে আপনার নিউরন ক্ষতিগ্রস্থ হলে তা আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নিয়ে যাবার ব্যবস্থা না থাকলে দেহ যে আস্তে আস্তে অচল হয়ে পড়বে তা বলাই বাহুল্য। আবার পার্কিনসন্স, আলঝেইমার্স কিংবা হান্টিংটন্স রোগে যারা ভোগেন, তাদের ক্রমান্বয়ে নিউরনের পরিমাণ কমতে থাকে। ফলে এ রোগগুলো নিউরোডিজেনারেটিভ ডিসঅর্ডার নামে পরিচিত। প্রতি বছর এই রোগে আক্রান্তদের সংখ্যা যেভাবে আশংকাজনক হারে বাড়ছে, সেক্ষেত্রে এ আবিষ্কার হয়তো এ রোগীদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে পারবে।

কোথায় হয় এই নিউরোজেনেসিস?

নতুন নিউরন তৈরী হয় মানুষের মস্তিষ্কের ‘হিপ্পোক্যাম্পাস’ নামক এলাকায়। এই অঞ্চলে অবস্থিত ‘নিউরাল স্টেম সেল’, যেটি Neural stem and progenitor cell নামেও পরিচিত। এই কোষগুলো বিভাজিত হয়েই নতুন নিউরন তৈরী করে। মস্তিষ্কের এই অঞ্চলটি এতদিন ধরে গবেষক চক্ষুর আড়ালেই মানুষের জীবনের বেশিরভাগ সময় ধরে নিউরন তৈরী করে যাচ্ছে। আর এই ‘হিপ্পোক্যাম্পাস’ মূলত মানুষের দীর্ঘমেয়াদী স্মৃতিশক্তি, অর্জিত শিক্ষা আর আবেগের সাথে জড়িত। ১৯৯০ সালে সর্বপ্রথম এই ব্যাপারে বিজ্ঞানীরা জানতে পেরেছিলেন। তবে প্রথমে বিজ্ঞানীরা এই প্রক্রিয়াটি হয়তো নতুন কোনো রোগের সাথে সম্পর্কিত বলেই ধারণা করেছিলেন। বিস্তর গবেষণায় বেরিয়ে আসে এটি মূলত নতুন নিউরন তৈরীর একটি প্রক্রিয়া। চাইলে দেখে নিতে পারেন সাম্প্রতিক সময়ে নিউরাল স্টেম সেল নিয়ে কাজ করা বিজ্ঞানী সান্ডারিন থুরেটের ‘টেড টক’-এ দেওয়া এই লেকচারটি।

কীভাবে বোঝা যাবে নতুন নিউরন তৈরি হচ্ছে?

কার্বন-১৪ নামের একটি তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ ব্যবহার করে যেকোনো কোষের বয়স নির্ধারণ করা যায়। তাই মস্তিষ্কের হিপ্পোক্যাম্পাস নামক অঞ্চল এর এবং এর আশেপাশের কোষগুলোর বয়স এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্ণয় করে দেখা গেছে এই অঞ্চলে বেশ কিছু কোষ সদ্যই তৈরী হচ্ছে। হিসাব করে দেখা গেছে প্রতিদিন প্রায় নতুন ৭০০ নিউরন কোষ মানুষের মস্তিষ্কের হিপ্পোক্যাম্পাস এলাকায় যোগ হচ্ছে। তবে নিউরোজেনেসিস নিয়ে গবেষণারত বিজ্ঞানীদের প্রাপ্ত তথ্য থেকে বেরিয়ে এসেছে যে, অতিরিক্ত মাত্রায় ধূমপান, অনিয়ন্ত্রিত মদ্যপান, উচ্চ রক্তচাপ কিংবা মানসিক অশান্তির কারণে এই প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হতে পারে। শুধুমাত্র মানসিক অশান্তির কারণেই নতুন নিউরন কোষের তৈরি হবার হার ১০% কমে যেতে পারে। এছাড়া আরো কিছু বংশগত এবং পরিবেশগত কারণে একেক ব্যক্তি এবং গোষ্ঠীতে নতুন নিউরন তৈরী হওয়ার প্রবণতা একেক রকম হতে পারে।

নতুন নিউরন কোষের বয়স নির্ধারণ করার প্রক্রিয়া; ছবিসূত্রঃ ars.els-cdn.com

আগের ধারণা কি তাহলে ভুল ছিলো?

যেহেতু নিউরন কোষকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় বিভাজিত হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় অন্যতম প্রধান উপাদান সেন্ট্রিওল অনুপস্থিত, তাই দীর্ঘসময় ধরে বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিলো নিউরন বিভাজিত হয় না। এই ধারণাটা কিন্তু মোটেও ভুল নয়। হিপোক্যাম্পাস এলাকায় যে নতুন নিউরন তৈরী হয়, তা পুরাতন নিউরন থেকে বিভাজিত হয়ে তৈরী হয় না। বরং সেই এলাকায় থাকা নিউরাল স্টেম সেল (Neural stem and progenitor cells) থেকেই নতুন নিউরন তৈরীর এই ব্যাপারটি ঘটে থাকে। এবং এই প্রক্রিয়াটি মস্তিষ্কের বেশিরভাগ অঞ্চলেই ঘটতে দেখা যায় না। সুতরাং মস্তিষ্কে নতুন নিউরন তৈরী হওয়ার এলাকা যে কত কম, তা একটি হিসাব করলেই বোঝা যাবে। মানুষের মস্তিষ্কে গড়ে প্রায় ৮৫ থেকে ৮৬ বিলিয়ন নিউরন কোষ থাকে। আর হিপ্পোক্যাম্পাস এলাকায় প্রতিদিন গড়ে মাত্র ৭০০ নিউরন কোষ তৈরী হয়। তাহলে বোঝাই যাচ্ছে এই পরিমাণ কতটা স্বল্প। পাশাপাশি বিজ্ঞানীরা জটিল এই মস্তিষ্কের উপর গবেষণা করে বের করার চেষ্টা করছেন আর কোনো অঞ্চলে এভাবে নতুন করে নিউরন তৈরী হয় কিনা।

মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশের ছবি; ছবিসূত্রঃ macalester.edu

রোগ নিরাময়ে নিউরোজেনেসিস

মস্তিষ্কে আঘাত কিংবা রোগে আক্রান্ত হবার ফলে যদি নিউরন কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে তা সারিয়ে নেওয়ার কোনো প্রক্রিয়া এখনো বিজ্ঞানীদের জানা নেই। কিংবা পার্কিনসন্স, আলঝেইমার্স কিংবা হান্টিংটন্স রোগে যারা ভোগেন, তাদের ক্রমান্বয়ে নিউরনের পরিমাণ কমতে থাকে। এই নিউরোডিজেনারেটিভ রোগগুলোর এখনো পর্যন্ত কোনো চিকিৎসা আবিষ্কার হয়নি। সুতরাং বিজ্ঞানীদের ধারণা হিপ্পোক্যাম্পাস এলাকায় নতুন করে নিউরন তৈরী হওয়ার এই প্রক্রিয়া এ দু’ধরনের রোগের চিকিৎসায় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারে।

মস্তিষ্কের ‘হিপ্পোক্যাম্পাস’ এলাকায় তৈরি হয় নতুন নিউরন; ছবিসূত্রঃ thinkstockphotos.com

পাশাপাশি মস্তিষ্কের যে বিশাল অংশ জুড়ে নতুন করে নিউরন তৈরি হয় না, সেই অঞ্চলগুলোর নিউরন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে হয়তো এই প্রক্রিয়া অনুসরণ করে নতুন নিউরন তৈরি শুরু করা যেতে পারে।

ফিচার ইমেজ- kennisinzicht.umcg.nl

Related Articles