বিস্ময় জাগানিয়া কিছু বৈজ্ঞানিক তথ্য যা হয়তো আপনিও জানেন না

“দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া
ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া,
একটি ধানের শিষের উপরে
একটি শিশির বিন্দু।”

বিজ্ঞান ছাড়া আজকের পৃথিবী অচল। প্রাত্যহিক জীবনের প্রতি মুহূর্তে আমাদের সঙ্গী বিজ্ঞান, এটি ধ্রুব সত্য। আর তাই নিত্যদিন আমরা বিজ্ঞানকে জানার কত চেষ্টাই না করছি! বিজ্ঞান যেমন প্রতিনিয়ত বদলে যাচ্ছে, সমৃদ্ধ হচ্ছে, একইসাথে সমৃদ্ধ করছে আমাদের জ্ঞানভাণ্ডারও। কিন্তু নিত্যনতুন জ্ঞানের ভিড়ে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপরের পঙক্তিগুলো যেন আরো বাস্তব হয়ে উঠেছে। কত কষ্ট করে গবেষণা করে কত কিছুই আমরা শিখছি প্রতিদিন, কত কঠিন কঠিন বই পড়ে জানছি নিত্য-নতুন কত তথ্য, তথাপি কিছু অতি সাধারণ বিষয় সম্পর্কে আমরা রয়ে যাই অন্ধকারে। অথচ সে বিষয়গুলো খুবই মজাদার এবং বিস্ময়করও বটে। আজ আলোচনা করা হবে এমনই কিছু বিস্ময়কর বৈজ্ঞানিক তথ্য সম্পর্কে, যেগুলো জানার পর বিস্ময়ে আপনার চোখ কপালে উঠবার জোগাড় হবে।

সমুদ্র থেকে আসে পৃথিবীর অর্ধেক অক্সিজেন

ফাইটোপ্লাংকটন; source: uts.edu.au

শিশুকাল থেকে আমরা জেনে আসছি, বেঁচে থাকার অপরিহার্য উপাদান অক্সিজেন আসে বৃক্ষ থেকে। সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় বৃক্ষের উৎপাদিত অক্সিজেনেই বেঁচে আছি আমরা। কিন্তু আপনি জানেন কি, পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের অর্ধেক অক্সিজেন আসে সমুদ্র থেকে? হ্যাঁ, সমুদ্রে বসবাসকারী ক্ষুদ্র এককোষী সামুদ্রিক উদ্ভিদ ফাইটোপ্লাংকটনের কল্যাণে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে যে পরিমাণ অক্সিজেন বিমুক্ত হচ্ছে, তা মোট অক্সিজেনের অর্ধেক। কিন্তু ফাইটোপ্লাংকটনের এই নীরব ভূমিক সম্পর্কে আমরা ক’জন অবগত আছি?

মৃত্যুর পরও বায়ুনিষ্কাশণ?

বায়ু ত্যাগ করা নিয়ে আমরা যথেষ্ট নিরাপত্তাহীনতায় ভুগে থাকি; কখন না আবার সকলের সামনে ভয়ানক আওয়াজ করে বসি কে জানে! তবে মৃত্যুর পর আর বায়ুত্যাগ নিয়ে কোনো ভয় নেই। ভয় পেতে হলে জীবন্ত তো থাকা চাই! কিন্তু মৃত্যুর পর মানুষ বায়ুত্যাগ করে আবার কীভাবে? আপনার দেহে যখন প্রাণ থাকবে না, তখন দেহের উপর আপনার কর্তৃত্বও থাকবে না। যেকোনো ধরনের পচন, ব্যাকটেরিয়া সংক্রান্ত বিপাক এবং কোনো পেশির সংকোচনে দেহে জমে থাকা গ্যাস তখন বিনা দ্বিধায় সকলের সামনেই বেরিয়ে যাবে!

জেনেটিক্সের সুফল পাচ্ছে ইউরোপীয়রা

ব্ল্যাক ডেথের প্রতীকি ছবি; source: Medievalists.net

সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা গবেষণায় খুঁজে পেয়েছেন বিচিত্র এক তথ্য। ইউরোপের শতকরা ১০ ভাগ মানুষই স্বাভাবিকভাবে এইচআইভি থেকে অনাক্রম্য। এর কারণ তাদের পূর্বপুরুষরা! মধ্যযুগে ইউরোপজুড়ে ঘটে যাওয়া অসংখ্য মহামারী রোগ ছড়িয়ে পড়ার খবর আমরা ইতিহাসে দেখতে পাই। যেমন- ব্ল্যাক ডেথ আর পক্স। এসব বিপর্যয়ের সময়ে যারা বেঁচে গিয়েছিলেন, তাদের দেহে এবং তাদের বংশধরদের দেহে সংঘটিত হয়েছে জেনেটিক মিউটেশন। আর এই মিউটেশনের ফলে এখন কিছু মানুষ এইডসের ভয় থেকে মুক্ত!

গেমারদের জন্য সুখবর

গেম খেলা ভালো নয়; চোখের ক্ষতি, মাথার ক্ষতি, সময় নষ্ট সহ আরো কত কী যে শুনতে হয় গেমারদের তার হিসাব নেই। কিন্তু গবেষকরা এবার ভিডিও গেমারদের জন্য নিয়ে এসেছেন সুখবর। পরিমিত পরিমাণে ভিডিও গেম স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর তো নয়ই, বরং তা মস্তিষ্ককে করে অধিক কর্মক্ষম, দক্ষ এবং বৃদ্ধি করে স্মরণক্ষমতা! তাছাড়াও একসাথে একাধিক কাজে মনোযোগ দেয়ার ক্ষমতা তৈরি হয়, ডিসলেক্সিয়ার মতো সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া যায় আর কমায় মানসিক ধকল।

মুখবিহীন কীট

মুখবিহীন লুনা মথ; source: youtube.com

লুনা মথ নামক এক প্রকারের মথের কোনো মুখ নেই! বিস্ময়কর হলেও সত্যি, এই পতঙ্গটি জন্মের পর গুটির মধ্যে যে ক’দিন থাকে, কিছু খাবার আর পুষ্টি গ্রহণ করে। গুঁটি থেকে বেরোবার পর বেচারা আর কোনো খাবার খেতে পায় না। পাবে কী করে? মুখই যে নেই। এই মথগুলো বেঁচে থাকে বড়জোড় সাত দিন। অস্বাভাবিক মৃত্যু ব্যতিরেকে লুনা মথের মৃত্যু সাধারণত অনাহারেই হয়ে থাকে।

ঘাসের কান্না

ঘাস কাটার সময় একপ্রকার গন্ধ নাকে আসে, খেয়াল করেছেন নিশ্চয়ই। এই গন্ধ নিছক গন্ধ নয়, এই গন্ধ ব্যথায় কুঁকড়ে যাওয়া একটি ঘাসের চিৎকারের বহিঃপ্রকাশ! হ্যাঁ, সবুজ দুর্বাঘাস সহ আরো কয়েক প্রজাতির ঘাসজাতীয় গুল্ম যখন কোনোভাবে আক্রান্ত হয় কিংবা তাদের কোনো অঙ্গ কাটা পড়ে, তখন তারা একপ্রকার উদ্বায়ী পদার্থ ক্ষরণ করে, যা আমাদের অলফ্যাক্টরি স্নায়ুতে সুড়সুড়ি দিলে আমরা একপ্রকার গন্ধ অনুভব করি, হাজারো ঘাসের নিঃশব্দ আহাজারির গন্ধ!

সংরক্ষিত মধু নষ্ট হয়ে যায় না

পিরামিডের ভেতরে পাওয়া মধুর পাত্র; source: .strangehistory.net

মধুর একটি বিস্ময়কর গুণ হচ্ছে এটি একেবারে ‘এয়ার টাইট’ বা বায়ুনিরুদ্ধ করে সংরক্ষিত করলে এটি বছরের পর বছর ধরে ভোজ্য থাকবে। ‘বছরের পর বছর’ একটু কম বলা হলো, হাজার বছর টিকে থাকে বায়ুনিরুদ্ধভাবে সংরক্ষিত মধু! আর এর দৃষ্টান্ত হচ্ছে মিশরের হাজার বছরের পুরনো পিরামিড থেকে বদ্ধ পাত্রে মধু পাওয়া গেছে, যা আজও ভক্ষণযোগ্য ও বিশুদ্ধ!

মেঘের ভর কিন্তু অনেক বেশি!

আকাশে ভেসে বেড়ানো সাধারণ আকারের একখণ্ড মেঘের ভর কত হতে পারে বলুন তো? দেখে কি খুব পাতলা মনে হয়? অথবা ছোট? আসলে ভূপৃষ্ঠ থেকে আমাদের পর্যবেক্ষণের কোনোটিই সঠিক নয়। কারণ একখণ্ড সাধারণ আকারের মেঘের আয়তন আমরা খালি চোখে যা দেখি, তার চেয়ে অনেক বেশি। এরকম এক খণ্ড মেঘের ভর ১০০টি হাতির চেয়ে বেশি, প্রায় ১০ লক্ষ পাউন্ড!

অক্টোপাসের একাধিক মস্তিষ্ক থাকে

যদি মস্তিষ্কই হয় কোনো প্রাণীর বুদ্ধিমত্তার পরিমাপক, তাহলে অক্টোপাসই সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণী। কারণ এদের মস্তিষ্কের সংখ্যা যে নয়! তাছাড়াও অক্টোপাসের রয়েছে তিনটি হৃদযন্ত্র। একটি শুধুমাত্র ফুলকা বা শ্বসনযন্ত্রের জন্য, একটি আছে কেন্দ্রীয়ভাবে সবকিছুর জন্য এবং অপর একটি হৃদযন্ত্র শুধুমাত্র এর পাগুলোর জন্য।

সবচেয়ে শক্তিশালী জীব ব্যাকটেরিয়া

গনোরিয়া ব্যাকটেরিয়া; source: medicalnewstoday.com

ব্যাকটেরিয়া, ক্ষুদ্র একপ্রকার অণুজীব, যাদের কিনা খালি চোখে দেখাই যায় না, আর এরাই কিনা পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী জীব! হ্যাঁ, আকার বিবেচনায় যখন আপনি এর ক্ষমতার কথা জানবেন, তখন এ কথা আপনিও মানতে বাধ্য হবেন। নিজের দেহের ওজনের চেয়ে ১ লক্ষ গুণ বেশি ওজন বহন করতে সক্ষম এরা! তবে সকল ব্যাকটেরিয়া নয়, শুধুমাত্র গনোরিয়ার ব্যাকটেরিয়ারই ক্ষমতা এতো বেশি।

মানবদেহের ডিএনএর বিস্ময়কর দৈর্ঘ্য

ডিএনএ কুণ্ডলী; source: youtube.com

আমাদের দেহের প্রতিটি জিনে ৫০০ থেকে ২৫ লাখ পর্যন্ত নিউক্লিওটাইডের জোড় থাকে। এসব ডিএনএ’র গড় দৈর্ঘ্য ৫ সেন্টিমিটার। ফলে একটি কোষের সবগুলো ডিএনএকে কুণ্ডলী খুলে জোড়া লাগালে সেগুলোর দৈর্ঘ্যই অভাবনীয় হবে। এবার ভাবনার আরো গভীরে প্রবেশ করুন। মানুষের দেহে মোট কোষের সংখ্যা ৩৭ ট্রিলিয়ন বা ৩৭ লক্ষ কোটি! এই ৩৭ লক্ষ কোটি কোষের সবগুলোতে থাকা ডিএনএগুলোকে কুণ্ডলী খুলে জোড়া লাগালে দৈর্ঘ্যটা কত হতে পারে ভাবা যায় কি! ২X১০^১৪ মিটার। এই অতিবৃহৎ ডিএনএ সুতাকে আপনি সূর্য থেকে এর সবচেয়ে দূরবর্তী গ্রহ প্লুটো পর্যন্ত ১৭ বার নিয়ে যেতে পারবেন এবং ফিরিয়ে আনতে পারবেন!

এক চামচ পানির অণুর কি বিশাল দৈর্ঘ্য!

এক চামচ বা ৫ মিলিলিটার পানিতে অণুর সংখ্যা ২x১০^২৩টি। এই প্রতিটি অণুতে আবার রয়েছে তিনটি করে পরমাণু, একটি অক্সিজেন এবং দুটি হাইড্রোজেন। এই এক চামচ পানির সবগুলো পরমাণুকে যদি আপনি পাশাপাশি রাখতে চান তাহলে এর দৈর্ঘ্য হবে ৫০ বিলিয়ন কিলোমিটার, যা আমাদের সৌরজগতের প্রস্থের প্রায় ১০গুণ!

মহাবিশ্বে আমরা কি আসলেই একা?

মিল্কিওয়ে; source: universetoday.com

বিজ্ঞানীরা দাবি করেন যে তারা এখনো পর্যন্ত মহাবিশ্বের মাত্র চারভাগ জানতে পেরেছেন। এই চারভাগেই রয়েছে আনুমানিক ৫ হাজার কোটি গ্যালাক্সি! এরকম এক একটি গ্যালাক্সিতে রয়েছে ১ লক্ষ থেকে ১০ লক্ষ্য কোটি তারকা বা নক্ষত্র যাদের ঘিরে রয়েছে কত সৌরজগৎ তার ইয়ত্তা নেই। শুধুমাত্র আমাদের গ্যালাক্সি মিল্কিওয়েতেই আমাদের পৃথিবীর মতো ১ লক্ষ কোটি গ্রহ থাকতে পারে বলে ধারণা করছেন বিজ্ঞানীরা! এরপরও কীভাবে বলি যে, মহাবিশ্বে পৃথিবীর বাইরে প্রাণের অস্তিত্ব নেই?

বিড়াল কেন সবসময় পা মাটির দিকে রেখেই পড়ে?

কখনো লক্ষ্য করেছেন কি, বিড়ালকে উপর থেকে উল্টে পাল্টে যেভাবেই ফেলা হোক না কেন, মাটিতে সবার আগে বিড়ালের পা টাই আঘাত করে। এখানে রয়েছে বিড়ালের সূক্ষ্ম এক চালাকি। যখন একে ঠিক উল্টো করেও নিচে ফেলে দেয়া হয়, তখন এরা এদের দেহের দু’ভাগ পৃথকভাবে ব্যবহার করে ত্বরিতগতিতে দেহের নিম্নভাগ নিচে নিয়ে আসে। এই ভিডিওটি দেখতে পারেন চাইলে।

মানবদেহে কোষের চেয়ে বেশি ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা

আমাদের ত্বকে ঘাম বের হবার ছিদ্র ঘিরে ব্যাকটেরিয়ার ঝাঁক; source: thoughtco.com

জীববিজ্ঞান ল্যাবরেটরিতে পেট্রি ডিশ দেখেছেন নিশ্চয়ই? পেট্রি ডিশের মধ্যে ব্যাকটেরিয়া কালচার করা হয়। তবে যা শুনলে আপনার গাঁ ঘিনঘিন করে উঠতে পারে তা হচ্ছে আপনি নিজেই একটা জীবন্ত পেট্রি ডিশ! কী, বিশ্বাস হচ্ছে না? আপনার দেহে যত পরিমাণ কোষ আছে, ব্যাকটেরিয়া আছে তার ১০ গুণ! চলতে ফিরতে প্রতিটি মানুষ এক একটি ব্যাকটেরিয়ার অভয়ারণ্য! যতই সাবান, স্প্রে, হ্যান্ডওয়াশ বা এন্টি জার্মওয়াশ ব্যাবহার করুন কেন, ব্যাকটেরিয়া থেকে আপনার রেহাই নেই। এরা ধ্রুব সঙ্গী। কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে এসব ব্যাকটেরিয়ার প্রায় সম্পূর্ণটাই আমাদের দেহের জন্য উপকারী। শুধু উপকারী বললেই চলে না, অপরিহার্য। এদের ছাড়া আমাদের বেঁচে থাকা অসম্ভব।

ফিচার ইমেজ- pcwallart.com

Related Articles