দ্য রাশোমন ইফেক্ট: প্রত্যক্ষদর্শীদের অবিশ্বস্ততার এক অতি-পরিচিত সমস্যা

ধরুন, আপনি কোনো একটি ঘটনার বিচার করছেন, কিন্তু সাক্ষীরা একই ঘটনার ভিন্ন কিন্তু সমানভাবে বিশ্বাসযোগ্য বিবরণ দিচ্ছে। সেক্ষেত্রে কোনটা সত্য আর কোনটা মিথ্যা তা আপনি কীভাবে বলবেন? এক্ষেত্রে আপনার মাথায় একটি প্রশ্নের উদয় হতে পারে, বস্তুনিষ্ঠ সত্য কি আদৌ বিদ্যমান এবং বাস্তবতা কি আপেক্ষিক?

এখানেই উদয় ঘটে রাশোমন ইফেক্টের যেখানে মানুষ একই ঘটনার উল্লেখযোগ্যভাবে ভিন্ন, কিন্তু সমানভাবে বিশ্বাসযোগ্য বিবরণ দেয়। এটি এমন একটি পরিস্থিতি বর্ণনা করে যেখানে একই ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দ্বারা পরস্পরবিরোধী ব্যাখ্যা বা বর্ণনা দেওয়া হয়, অথচ সকলের ব্যাখ্যাই বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে হয়।

Source: Ted Ed, https://www.youtube.com/watch?v=xg5y6Ao7VE4
Image courtesy: TW News

এটি ‘কুরোসাওয়া ইফেক্ট’ নামেও পরিচিত। আকিরা কুরোসাওয়া নির্মিত ১৯৫০ সালের জনপ্রিয় সিনেমা রাশোমনের নামানুসারে রাশোমন ইফেক্টের নামকরণ করা হয়েছে। সিনেমায় একই অপরাধের ঘটনায় চারজন ভিন্ন ভিন্ন সাক্ষীর দ্বারা একটি হত্যার ঘটনাকে চারটি ভিন্ন উপায়ে বর্ণনা করা হয়েছে। একটি ঘটনা সম্পর্কে মানুষের ধারণা তাদের পৃথক ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার উপর ভিত্তি করে যথেষ্ট ভিন্ন হতে পারে, এই বিষয় বোঝানোর জন্য রাশোমন শব্দটি প্রায়শই ব্যবহৃত হয়। এমনও সম্ভব যে একটি ঘটনাকে বিভিন্ন ব্যক্তি বিভিন্নভাবে বর্ণনা করে, যেখানে তারা নিজেরাও জানে না যে তারা মিথ্যা বলছে।

বর্তমানে ‘রাশোমন ইফেক্ট’ শব্দটি একাধিক সাক্ষীর অবিশ্বস্ততার কারণে, একক ঘটনাকে বিভিন্নভাবে বর্ণনা করা যায় বোঝানোর ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়। সাক্ষীদের এই অবিশ্বাস্যতা এবং বস্তুনিষ্ঠতার অভাব বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক, পরিস্থিতিগত পার্থক্যের ফলে হতে পারে।

সিনেমা এবং সাহিত্যে রাশোমন ইফেক্ট

জাপানি ছোটগল্পের জনক রিয়োনোসুকে আকুতাগাওয়ার, ১৯২০ সালে প্রকাশিত ছোট গল্প ‘ইন দ্য গ্রোভ’ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ১৯৫০ সালে আকিরা কুরোসাওয়া রিয়োনোসুকের আরও একটি গল্পের সাথে সমন্বয় করে তৈরি করেন ‘রাশোমন’ সিনেমাটি।

কিয়োটোর একটি রাশোমন গেটের নিচে দাঁড়িয়ে তিনজন পুরুষ; এর মধ্যে একজন পুরোহিত, একজন কাঠুরিয়া এবং একজন কমোনার ঝড় থেকে আশ্রয় নিতে গেলে সেখান থেকে সিনেমার কাহিনী শুরু হয়। যেখানে কাঠুরিয়া এবং পুরোহিত তিন দিন আগে বনের মধ্যে কিভাবে একটি নীরব, শান্ত বাঁশের ঝোঁপে একজন সামুরাইয়ের লাশ খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল সেই কাহিনী নিয়ে আলোচনা করছিল। যেখানে একে একে, অপরাধের সাথে পরিচিত সাক্ষীরা তাদের ঘটনাগুলোর সংস্করণ বর্ণনা করে। কিন্তু যখন তারা প্রত্যেকেই তাদের প্রেক্ষিতে ঘটনা বলে, দেখা যায় যে প্রতিটি সাক্ষ্য যুক্তিযুক্ত কিন্তু ভিন্ন এবং প্রতিটি সাক্ষী নিজেদের অপরাধের সাথে জড়াচ্ছে।

Rashomon (1950)
Image courtesy: Rašomon

“আমরা সবাই কোনো না কোনো কিছু ভুলে যেতে চাই, তাই আমরা গল্প বলি।”-কমোনার

সেখানে এক ডাকাতের বিরুদ্ধে একজন সামুরাইকে হত্যা এবং সামুরাইয়ের স্ত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগ আনা হয়। কাঠুরিয়া, পুরোহিত (যিনি হত্যার আগে সামুরাই এবং তার স্ত্রীকে দেখেছেন), সামুরাইয়ের স্ত্রী, দস্যু, এমনকি সামুরাইয়ের প্রেতাত্মাকেও বিচারে তলব করা হয়। কিন্তু তাদের প্রত্যেকের ঘটনার প্রতিটি বিবরণ ভিন্ন এবং পরস্পরবিরোধী। 

“কমোনার: মিথ্যা বলা মানুষের স্বভাব। বেশিরভাগ সময় আমরা নিজেদের সাথেই সৎ হতে পারি না।

পুরোহিত: সেটা হতে পারে। কিন্তু এর কারণ হলো মানুষ দুর্বল, তাই তারা মিথ্যা বলে, এমনকি নিজের কাছেও।”

রাশোমন প্রভাব সাধারণত দুটি নির্দিষ্ট অবস্থার অধীনে ঘটে। প্রথমত, আসলে কী ঘটেছিল তা যাচাই করার কোনো দৃঢ় প্রমাণ নেই, এবং দ্বিতীয়ত, ঘটনাটির একটি রায় প্রদান করার জন্য চাপ থাকে, প্রায়শই একজন কর্তৃত্বপূর্ণ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান দ্বারা তা প্রদান করা হয় যারা নিশ্চিত সত্য সনাক্ত করার চেষ্টা করে। কিন্তু রাশোমন প্রভাবের ধারণাটি একটি একক, বস্তুনিষ্ঠ সত্যের ধারণাকেই দুর্বল করে দেয়।

সিনেমায় কে সবচেয়ে সঠিক বা সত্য বর্ণনা দেয় তার কোনো স্পষ্ট ইঙ্গিত থাকে না বলে, দর্শকরা তা আলাদা করতে পারে না, যার ফলে তারা কোনো নির্দিষ্ট চরিত্রকে বিশ্বাস করতে পারে না। পরিবর্তে, প্রতিটি সাক্ষ্য যখন সমানভাবে সত্য মনে হয়, তখন দর্শকরা নিজেরাই তাদের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্তে পৌঁছায় কে আসল অপরাধী। আর এখানে তখন দর্শকদের সিদ্ধান্তেও বিপুল ভিন্নতা দেখা যায়।

কুরোসাওয়ার চলচ্চিত্রগুলোর মাঝে মানব প্রকৃতির হতাশাবাদী দিকগুলোর প্রতিফলন নিহিত রয়েছে এবং রাশোমনই তার প্রথম কাজ যেখানে তিনি সেই হতাশাবাদকে তার পূর্ণভাবে প্রকাশ করেছেন। মানুষের মিথ্যা এবং প্রতারণার প্রবৃত্তির নীরাশা থেকে কুরোসাওয়া এমন একটি গল্প তৈরি করেছিলেন যেখানে  চরিত্রগুলোর অহং, দ্বৈততা এবং দম্ভ সত্যকে খুঁজে পাওয়া কঠিন করে তোলে। কার অপরাধের বর্ণনা নির্ভরযোগ্য? কে সঠিক? কেউ বলতে পারে না।

সিনেমাটি শুধু এর আকর্ষণীয় গল্পের কারণে সাফল্য পায়নি, বরং এটি একজন সাধারণ মানুষের জীবনের বিভিন্ন অভিজ্ঞতা; প্রতারণা, অহং, দম্ভ, অহমিকার সাথে জড়িত সত্যের অনুসন্ধানের সম্পর্কের দিকগুলোও উন্মোচন করেছে। এই সিনেমা বিশ্বকে একটি নতুন জগতের সাথে পরিচিত করেছে যেখানে সত্য, ন্যায়বিচার এবং মানুষের স্মৃতি সম্পর্কে আমাদের দৃষ্টিকোণে একটি নতুন মাত্রা যুক্ত করে। রাশোমন সিনেমার প্রেক্ষাপট জাপানের একাদশ শতাব্দীর সামাজিক সংকটের সময়ে। এক্ষেত্রে, কুরোসাওয়া সেই সংকটপূর্ণ সময়ের প্রেক্ষাপট, মানুষের আচরণের চরম দিকগুলো প্রকাশের জন্য ব্যবহার করেন।

Source: The Simpsons
Image Courtesy: abpradio

রাশোমন প্রভাবের ব্যবহার দেখা যায় এমন কয়েকটি সিনেমা হচ্ছে দ্য ইউজুয়াল সাসপেক্টস (The Usual Suspects, 1995), গন গার্ল (Gone Girl, 2014), রিজারভার ডগস (Reservoir Dogs, 1992), এলিফ্যান্ট (Elephant, 2003), ভেনটেজ পয়েন্ট (Vantage Point, 2008) ইত্যাদি।

রাশোমন স্টাইল কুয়েন্টিন টারান্টিনোর অন্যতম সেরা চলচ্চিত্র রিজারভার ডগসে দেখা যায়। ডাকাতির পরে ডাকাতদের একটি দল একে অপরকে সন্দেহ করতে শুরু করে এই ভেবে যে তাদের মধ্যে একজন গুপ্তচর আছে। ফলে একে অপরের বিরুদ্ধে চলে যায়। প্রত্যেকের অভিযোগ অনুসারে বিশ্বাসহীনতা তৈরি হয় সকলের মধ্যে, এবং কীভাবে ডাকাতিতে গোলমাল হয় তা একে একে উঠে আসে প্রত্যেকের প্রেক্ষাপটে।

আধুনিক সিনেমায় রাশোমন ইফেক্টের উল্লেখযোগ্য ব্যবহার ২০১৪ সালের চলচ্চিত্র ‘গন গার্ল’-এ পাওয়া যায়। এই মিস্ট্রি-থ্রিলারে একজন ব্যক্তি তার স্ত্রীর নিখোঁজ হবার ক্ষেত্রে সন্দেহভাজন হিসেবে শুরুতে থাকেন। সেখানে গল্পের বর্ণনাকারীকে ধীরে ধীরে অবিশ্বস্ত মনে হতে থাকে। তিনি পুরো গল্প জুড়ে কম নির্ভরযোগ্য হয়ে উঠলে দর্শকরা তখন সত্য খুঁজে বের করতে আরও বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়ে।

বাস্তব জীবনে এই প্রভাবের কিছু উদাহরণ

রাশোমন প্রভাব শব্দটি গল্প বলা থেকে শুরু করে মনোবিজ্ঞান, সিনেমা, বিজ্ঞান থেকে আইন পর্যন্ত বিভিন্ন বিষয়ে ব্যবহৃত হয়।

স্নায়ুবিজ্ঞানীরা গবেষণায় দেখেন যে, আমরা যখন মস্তিষ্কে একটি স্মৃতি গঠন করি, তখন আমাদের চোখের সামনে দেখা তথ্যের ব্যাখ্যা আমাদের পূর্ববর্তী অভিজ্ঞতা এবং অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন পক্ষপাত দ্বারা প্রভাবিত হয়। এই পক্ষপাতগুলোর মধ্যে কিছু নির্দিষ্ট ব্যক্তির জন্য অনন্য, আবার কিছু সার্বজনীন। উদাহরণস্বরূপ, অহংকেন্দ্রিক পক্ষপাত মানুষকে অবচেতনভাবে তাদের স্মৃতিগুলোকে এমনভাবে প্রভাবিত করতে পারে যা তাদের কর্মের উপর ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করে। এমনকি যদি আমরা সঠিকভাবে একটি স্মৃতি আমাদের মস্তিষ্কে ধারণ করতে সক্ষম হই, তবুও এটি স্মরণ করার সময় নতুন কিছু তথ্য এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হয়ে স্মৃতিটি পরিবর্তন করে এবং যখন আমরা পরে সেই ঘটনা স্মরণ করি, আমরা সাধারণত মূল অভিজ্ঞতার পরিবর্তে পরিবর্তিত স্মৃতি মনে রাখি। এই অন্তর্নিহিত মনস্তাত্ত্বিক ঘটনাগুলো থেকে বোঝা যায় যে রাশোমন প্রভাব যেকোনো স্মৃতির ক্ষেত্রে উদয় হতে পারে।

আবার জীববিজ্ঞানে দেখা যায়, বিজ্ঞানীরা একই ডেটাসেট থেকে গবেষণা শুরু করেন এবং একই বিশ্লেষণাত্মক পদ্ধতি প্রয়োগ করেন, কিন্তু তাদের প্রায়ই ভিন্ন ভিন্ন ফলাফল প্রকাশ করতে দেখা যায়। নৃবিজ্ঞানীদের ক্ষেত্রে প্রায়শই দেখা যায় যে, তাদের ব্যক্তিগত প্রেক্ষাপটের প্রভাবে তাদের বিশেষজ্ঞ  ধারণার উপর প্রভাব পড়ছে। এমন একটি বিখ্যাত ঘটনা হচ্ছে, দুই নৃতত্ত্ববিদ মেক্সিকোর টেপোজ্‌টলান (Tepoztlan) গ্রাম পরিদর্শন করেন। প্রথম গবেষক সেই শহরের জীবনকে সুখী ও সন্তুষ্টিসমৃদ্ধ হিসেবে বর্ণনা করেন, কিন্তু দ্বিতীয়জন বাসিন্দাদের হতাশ এবং অসন্তুষ্ট হিসেবে বর্ণনা করেন।

বিশেষজ্ঞদের কথা রেখে যদি সাধারণ জনগণের প্রেক্ষিতে ভাবা যায়, রাশোমন প্রভাব তাদেরও প্রভাবিত করতে পারে, বিশেষ করে যখন বিশ্বের কোনো জটিল ঘটনা সম্পর্কে উপলব্ধির কথা আসে। উদাহরণস্বরূপ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং আরব দেশগুলোর নেতাদের মধ্যে ২০১৫ সালের নিরাপত্তা সম্মেলনের পর ঐ সম্মেলন সম্পর্কে মিডিয়া রিপোর্টগুলোর মধ্যে ব্যাপক বৈচিত্র্য লক্ষ্য করা যায়। কেউ কেউ বলেছিলেন, সম্মেলনটি খুব ভালোভাবে সম্পন্ন হয়েছে, আবার, অনেকে বলেন যে এটি সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে।

পরিশেষে

দর্শন এবং যোগাযোগ থেকে সমাজবিজ্ঞান এবং নৃবিজ্ঞান পর্যন্ত বিভিন্ন শাখায় রাশোমন প্রভাবের প্রকৃত প্রভাব রয়েছে। এটি প্রায়শই রাজনীতি এবং সামাজিক ন্যায়বিচার নির্ধারণেও উঠে আসে। এসকল পরিস্থিতিতে রাশোমন ইফেক্ট কীভাবে আমাদের অভ্যন্তরীণ পক্ষপাত, অবচেতনভাবে বা সচেতনভাবে যা ঘটেছে তার ব্যাখ্যাকে প্রভাবিত করতে পারে তা তুলে ধরে।

Source: Sketchplanations, https://sketchplanations.com/the-rashomon-effect
Image Courtesy: Sketchplanations

স্মৃতি এবং উপলব্ধির এই ধরনের দ্বন্দ্ব মানুষের ক্ষেত্রে প্রতিনিয়তই ঘটছে। কেন আমাদের এমন ভিন্ন ভিন্ন, প্রতিদ্বন্দ্বী ধারণার সৃষ্টি হচ্ছে তার সঠিক কারণ বের করা লোভনীয় লাগতে পারে। কিন্তু সম্ভবত রাশোমন ইফেক্ট আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করে, তা হলো- সত্য আসলে কী? এমন কোনো পরিস্থিতি কি আছে যেখানে শুধু একটিমাত্র ‘বস্তুনিষ্ঠ সত্য’ নেই? একই ঘটনার এমন বিভিন্ন সংস্করণ আমাদের কোনো একটি সময়, স্থান এবং জড়িত ব্যক্তিদের সম্পর্কে কি কিছু বলতে পারে? এবং যদি আমরা একটি ঘটনার এমন বিভিন্ন তথ্য, পটভূমি এবং পক্ষপাত নিয়ে কাজ করি, তাহলে আমরা সেক্ষেত্রে কীভাবে একটি দলীয় সিদ্ধান্ত পৌঁছাতে পারি? অনেক প্রশ্নের মতো, এগুলোরও কোনো একটি নির্দিষ্ট উত্তর নেই। 

Related Articles