Welcome to Roar Media's archive of content published from 2014 to 2023. As of 2024, Roar Media has ceased editorial operations and will no longer publish new content on this website.
The company has transitioned to a content production studio, offering creative solutions for brands and agencies.
To learn more about this transition, read our latest announcement here. To visit the new Roar Media website, click here.

বিদ্যুতের বিস্ময়-পুরুষ: নিকোলা টেসলা

আধুনিক তড়িৎ বিজ্ঞানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নামটি তার- নিকোলা টেসলা। সমগ্র জীবনব্যাপী সৃষ্টি সুখের উল্লাসে মেতে থাকা এক মহৎ হৃদয়ের মহাপুরুষ টেসলা। তাকে ধরা হয় পৃথিবীর সর্বকালের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্ভাবকদের একজন। পৃথিবীর কথিত শক্তি সংকট  (Power Crisis) ধারণার অবসান ঘটিয়ে মানুষের জীবন আরও বেশি স্বাচ্ছন্দ্যময় করে তুলতে একজন টেসলাই যথেষ্ট ছিলেন; যদিও চিরন্তন পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থা তা হতে দেয় নি।

নিকোলা টেসলা, বিদ্যুতের বিস্ময়

নিকোলা টেসলা, বিদ্যুতের বিস্ময়; Image Source: openclipart.com

১৮৫৬ সালের ১০ জুলাই, এক ভয়াল ঝড়বৃষ্টি আর বজ্রপাতের রাতে টেসলার জন্ম। পরিবেশের ভয়াবহতা দেখে কুসংস্কারাচ্ছন্ন ধাত্রী বলেছিলো, “এ বাচ্চা হবে অন্ধকারের সন্তান” কিন্তু সদ্যোজাত টেসলার ফুটফুটে মুখটার দিকে তাকিয়ে তার মা বলেছিলেন, “না, এ হবে আলোর সন্তান।” প্রকৃতই এই সন্তান পরিণতকালে গোটা বিশ্বে আলো ছড়িয়ে দিয়েছিলো।

টেসলার জন্ম বর্তমান ক্রোয়েশিয়ার মিলজান নামক স্থানে। তার পিতা মিলুটিন টেসলা ছিলেন সার্বিয়ান প্রথাগত চার্চের যাজক ও লেখক। বাবার ইচ্ছে ছিলো ছেলেকেও যাজক হিসেবে তৈরী করা, কিন্তু টেসলার বরাবরই  বিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহ ছিলো। টেসলার মা জুকা ম্যান্ডিক ছিলেন গৃহিনী। গৃহস্থালির কাজের সুবিধার্থে তার মায়ের ছোটখাটো উদ্ভাবনী ক্ষমতার প্রয়োগ পরবর্তীকালের একজন সফল উদ্ভাবক টেসলার উপরে যথেষ্ট প্রভাব রেখেছিলো।

অস্ট্রিয়াতে গ্র্যাজ পলিটেকনিক ইন্সটিটিউটে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার সময় টেসলা তড়িৎচৌম্বকক্ষেত্র ও এসি কারেন্ট চালিত মোটর নিয়ে ভাবতে থাকেন। জীবনের পরবর্তী ছয়টি বছর তিনি এই ভাবনাতে নিমগ্ন থাকেন। ১৮৭০ সালে তিনি ইউনিভার্সিটি অফ প্রাগে পড়াশুনা শুরু করেন। এখানে প্রতিদিন টানা দীর্ঘ সময় ধরে গবেষণার কাজ করতে গিয়ে তার স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটে, পড়াশোনারও ব্যাঘাত হতে থাকে। এক সময় টেসলা জুয়ায় আসক্ত হয়ে পড়েন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ বছরে পড়াশুনার খরচ সব জুয়ায় হারিয়ে আর প্রস্তুতির অভাবে পরীক্ষা দিতে না পেরে টেসলা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন এবং পড়াশুনা শেষ না করেই ১৮৮১ সালে বুদাপেস্ট চলে যান। সেখানে সেন্ট্রাল টেলিগ্রাফ অফিসে কর্মরত অবস্থায় তার মাথায় প্রথম আবেশী মোটর (Induction Motor) এর ধারণা আসে। এখানেই তিনি ঘূর্ণায়মান তড়িৎক্ষেত্রের মূলনীতির একটি স্কেচ তৈরী করেন, যা আজও বহু বৈদ্যূতিক যন্ত্রে ব্যবহৃত হচ্ছে। তার এই সাফল্য তাকে দিকপরিবর্তী তড়িৎ প্রবাহ বা এসি কারেন্টসহ ভবিষ্যতের আরও অনেক উদ্ভাবনের ভিত্তি গড়ে দেয়।

২৩ বছর বয়সী টেসলা, ১৯৭৯

২৩ বছর বয়সী টেসলা, ১৮৭৯; Image Source: en.wikipedia.org

১৮৮৪ সালের জুনে, টেসলা টমাস আলভা এডিসনের সাথে কাজ করার জন্যে নিউ ইয়র্ক পাড়ি জমান। তার পকেটে ছিলো শুধু ৪ সেন্ট আর একটা সুপারিশপত্র। সুপারিশপত্রটি লিখেছিলেন এডিসনের প্রাক্তন নিয়োগকর্তা চার্লস ব্যাচেলর। এতে লিখা ছিলো, “প্রিয় এডিসন, আমি দুজন মহান ব্যাক্তিকে চিনি। একজন আপনি, আরেকজন এই তরুণ।”

এডিসন ছিলেন একই সাথে একজন সফল উদ্ভাবক ও ব্যবসায়ী। অপরদিকে টেসলা উদ্ভাবনে যতটা ভালো ছিলেন, ঠিক ততোটাই দুর্বল ছিলেন ব্যবসায়। ডিসি কারেন্টের ব্যবসা করে এডিসন তখন রীতিমত একজন সফল পুঁজিপতি। সঙ্গত কারণেই এডিসনের সাথে টেসলার পদ্ধতিগত ও নীতিগত বিরোধ লেগেই থাকতো। টেসলার এসি কারেন্ট প্রকৌশল নিয়ে এডিসনের সন্দেহ থাকলেও তিনি তাকে ৫০,০০০ ডলার দেবার শর্তে এই প্রকল্প শেষ করার একটি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেন। কয়েক মাসের মধ্যেই কাজ সেরে ফেলার পরে প্রাপ্য অর্থ দাবী করলে এডিসন বলেন, “ওটা তো কৌতুক ছিলো। তুমি আমেরিকান কৌতুক বোঝো না। যখন পুরোদস্তুর আমেরিকান হয়ে উঠবে, তখন ঠিক বুঝবে।” টেসলা তৎক্ষণাৎ এডিসনের চাকরী ছেড়ে বেরিয়ে পড়েন। অবশ্য পারষ্পারিক বিভেদের দেয়াল ছাড়িয়ে এই দুই মহান উদ্ভাবক একে অপরের যথেষ্ট গুণগ্রাহী ছিলেন, একজন আরেকজনের কাজের প্রতি সবসময় শ্রদ্ধাশীল ছিলেন।

'টাইম' ম্যাগাজিনের কভারে এডিসন ও টেসলা

‘টাইম’ ম্যাগাজিনের কভারে এডিসন ও টেসলা ; Image Source: content.time.com

এডিসনের কোম্পানি থেকে বেরিয়ে আসার পর অবশ্য তার মূল্যবান প্রকল্পে অর্থলগ্নী করার লোকের অভাব পড়ে নি। ওয়েস্টার্ন ইউনিয়ন কোম্পানী, এডিসনের অফিসের অনতিদূরেই টেসলার জন্যে একটি ল্যাব এর ব্যবস্থা করে দেয়। সেখানে টেসলা তার অনেক গুরুত্বপূর্ণ উদ্ভাবনা পরিচালনা করেন। এখানে তিনি এক্স-রে প্রযুক্তি, বৈদ্যুতিক অনুনাদ, তারবিহীন তথ্য সরবরাহ পদ্ধতিসহ আরও অনেক উদ্ভাবনা নিয়ে কাজ করেন। এখানেই টেসলা এসি মোটর আর এসি পাওয়ার সিস্টেমের উন্নতি ঘটিয়ে নিজের নামে পেটেন্ট করে দেন। এই পেটেন্ট এর ফলে তিনি ৬০,০০০ ডলার ও আরও কিছু আনুষঙ্গিক সুবিধা লাভ করেন। এডিসন ও তার মাঝে চলা “কারেন্টের যুদ্ধ” তিনি অনতিবিলম্বে জিতে যান। ডিসি কারেন্ট এর চেয়ে এসি কারেন্ট অনেক বেশি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এসি কারেন্ট ছিলো অপেক্ষাকৃত সহজলভ্য আর সস্তা। প্রায় বিনামূল্যে এক বিশাল এলাকাজুড়ে জনসাধারণের জন্যে বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রকল্পও তৈরি করেছিলেন তিনি, যদিও তা আর হয়ে ওঠে নি। ১৯০১ সালে এই নিমিত্তে তিনি ওয়ার্ডেনক্লিফ টাওয়ার নির্মান করেন, যা পরে অর্থাভাবে বন্ধ হয়ে যায়।

ওয়ার্ডেনক্লিফ টাওয়ার

ওয়ার্ডেনক্লিফ টাওয়ার; Image Source: longislandplace.com

আধুনিক উদ্ভাবনগুলোর কোনটিতে হাত নেই তার! ফ্লুরোসেন্ট বাল্ব থেকে শুরু করে এক্স-রে, লেজার, ইলেকট্রিক মোটর, রিমোট কন্ট্রোল, ওয়্যারলেস বা তারহীন যোগাযোগ ব্যবস্থা, রোবটিক্স, এমনকি আধুনিক স্মার্টফোনের প্রাথমিক ধারণাও তার দেয়া। সমগ্র পৃথিবী ভালোভাবে তারযুক্ত যোগাযোগ ব্যবস্থার সুবিধা লাভ করার আগেই তিনি তারবিহীন যোগাযোগ ব্যবস্থার চিন্তা শুরু করে ফেলেছিলেন। নিজের সময়ের থেকে অনেক বেশি অগ্রসর ছিলেন টেসলা। এখনও তার বিভিন্ন মূলনীতি আর সূত্র অনুসরণ করে নিত্য নতুন উদ্ভাবনা চলছে। মার্কনীর অন্তত ৬ বছর আগে টেসলা বেতার সম্প্রচারে সফল হন। তার বেশিরভাগ উদ্ভাবনী ধারণাই অন্যেরা নিজের নামে চালিয়ে পেটেন্ট করে নিয়েছে। তাদের সম্পর্কে টেসলা বলেন, “তারা আমার ধারণা চুরি করুক, এতে আমার কিছু যায় আসে না। আমি শুধু বলি, তাদের নিজেদের কোনো ধারণা আসে না কেন?

টেসলার ছিলো এক অনন্য সাধারণ ক্ষমতা। যেকোনো ডিজাইন তৈরী হবার আগে তিনি সেটির ত্রিমাত্রিক একটি প্রতিরুপ মানসচক্ষে দেখতে পেতেন। বুদাপেস্টে থাকাকালীন একদিন পার্কে বন্ধুর সাথে হাঁটছিলেন আর কবিতা আবৃত্তি করছিলেন। অকস্মাৎ তার মনে একটি ছবি ভেসে উঠলো। সেখানেই কাঠি দিয়ে ধূলোর উপরে এঁকেছিলেন তার অনেক সাধনার ধন, সেই বিখ্যাত এসি মোটরের চিত্র। পরবর্তীতে এসি মোটর উদ্ভাবনের পর তিনি বলেছিলেন, তিনি আসলে নতুন কিছু করেন নি, তার সেই মানসপটের প্রতিলিপিকেই বাস্তব রুপ দান করেছেন মাত্র!

টেসলার হাতে ছিলো এই মহাবিশ্বের গভীরতম রহস্যের চাবি। তিনি জানতেন এর গোপনীয়তার গোপনতর সূত্র। আর সে রহস্য উন্মোচনের মূলমন্ত্রও তিনি বলে গেছেন। তিনি বলেন, “যদি তুমি ৩, ৬, ৯ এই তিনটি সংখ্যার মাহাত্ম্য বোঝ, তো তোমার হাতে মহাবিশ্বের চাবি থাকবে।” তিনি আরও বলেন, “যদি মহাবিশ্বের রহস্য জানতে চাও, তাহলে শক্তি, কম্পন আর কম্পাঙ্কের ব্যাপারে চিন্তা করো।”

নিউ ইয়র্কে নিকোলা টেসলা কর্ণার

নিউ ইয়র্কে নিকোলা টেসলা কর্ণার; Image Source: Wikimedia Commons

আজীবন অবিবাহিত টেসলা কখনো কোনো নারীর সাথে সম্পর্কে জড়িয়েছেন বলে জানা যায় নি। নারীদের তিনি সবদিক দিয়ে পুরুষের চেয়ে উচ্চতর মনে করতেন। নিজেকে কখনো কোনো নারীর যোগ্য মনে করেন নি তিনি। আর তাছাড়া তার মতো কাজপাগল মানুষের জন্যে একটি একাকী জীবন জরুরীও ছিলো। ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যবিহীন টেসলা সারা জীবন অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন শুধু মানুষের কল্যাণের জন্য। তাই উদ্ভাবনে তৎকালীন সবার সেরা হলেও আর্থিক দিক দিয়ে তিনি স্বচ্ছল ছিলেন না। ১৯৪৩ সালের ৭ জানুয়ারি, ঋণবদ্ধ ও একাকী অবস্থায়, নিউ ইয়র্কার হোটেলের ৩৩২৭ নাম্বার কক্ষে টেসলা মৃত্যুবরণ করেন।

বেলগ্রেডে রক্ষিত টেসলার দেহভস্ম

বেলগ্রেডে রক্ষিত টেসলার দেহভস্ম; Image Source: pinterest.com

টেসলা ছিলেন মানবতার সেবায় নিবেদিতপ্রাণ এক মহতী আত্মা। তার একমাত্র প্রচেষ্টা ছিলো প্রকৃতির নিগুঢ়তম রহস্য আবিষ্কার করে মানুষের জীবনকে সহজতর করা। কোনো ব্যবসায়িক লক্ষ্য নিয়ে তিনি কখনো চালিত হন নি। বিদ্যুতকে অপেক্ষাকৃত সহজ ব্যবহার্য বস্তুতে পরিণত করে তিনি এক জাদুকরী পরিবর্তনের সূচনা করেন। বিস্ময়কর কল্পনাশক্তি আর অমূল্য মেধার দ্বারা যুগ যুগ ধরে কল্পনাপ্রবণ ও আত্মত্যাগী মানুষদের অনুপ্রেরণা হয়ে আছেন নিকোলা টেসলা।

This article is in Bangla Language. It's a short life story about the famous scientist Nikola Tesla.

References

1. biography.com/people/nikola-tesla-9504443
2. livescience.com/45950-nikola-tesla-biography.html
3. pbs.org/newshour/rundown/5-things-you-didnt-know-about-nikola-tesla/
4. smithsonianmag.com/history/the-rise-and-fall-of-nikola-tesla-and-his-tower-11074324/

Featured Image: wallpaper-house.com

Related Articles