ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে নতুন ফর্মেশন নিয়ে আর্জেন্টিনা

বিশ্বকাপের আগে আর্জেন্টিনার অবস্থা খুব একটা সুবিধার ছিল না। তা সত্ত্বেও আর্জেন্টিনার সমর্থকরা এসব ভুলে বিশ্বকাপ জয়ের আশায় বুক বেধেছিলেন। কিন্তু বিধি বাম, গ্রুপ পর্বের প্রথম ম্যাচেই বিশ্বকাপে নবাগত আইসল্যান্ডের বিপক্ষে ১-১ গোলে ড্র করে আর্জেন্টিনা বর্তমানে অনেকটাই ব্যাকফুটে। আর্জেন্টিনার কোচ সাম্পাওলির কৌশল ও একাদশ নিয়ে এর মধ্যেই প্রশ্ন ওঠা শুরু হয়ে গিয়েছে। এই অবস্থায় আর্জেন্টিনা বাংলাদেশ সময় ২২ জুন রাত ১২টায় খেলতে নামছে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে। দ্বিতীয় রাউন্ডে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে উঠতে গেলে আর্জেন্টিনার জন্য এই ম্যাচ জিততেই হবে।

আর্জেন্টিনা আইসল্যান্ডের বিপক্ষে খেলেছিল ৪-২-৩-১ ফর্মেশনে। আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগকে এই ম্যাচে বেশ দুর্বল লেগেছে, আইসল্যান্ডের সামান্য আক্রমণেই অনেক সময় এই রক্ষণভাগ ভেদ হয়ে গিয়েছে। নিকোলাস ওটামেন্ডি বাদে রক্ষণভাগের কেউ ভালো পারফর্ম করতে পারেননি। অন্যদিকে আর্জেন্টিনার মিডফিল্ড বলে কোনো কিছুর উপস্থিতি পাওয়া যায়নি আইসল্যান্ডের বিপক্ষে। সামনের ফরওয়ার্ডরাও তেমন কোনো সুযোগ তৈরি করতে পারেননি, লিওনেল মেসির কিছু দূরপাল্লার শট ছাড়া।

লিওনেল মেসি; সোর্স: independent.co.uk

হোর্হে সাম্পাওলি এই ব্যাপার বুঝতে পেরে ৪-২-৩-১ এ খেলার চিন্তা বাদ দিয়েছেন। ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে ম্যাচের আগে ম্যাচ পূর্ববর্তী অনুশীলনে তিনি বিভিন্ন কম্বিনেশনে দলকে খেলিয়ে ক্রোয়েশিয়ার কাছ থেকে প্রত্যাশিত জয়টা ছিনিয়ে নিয়ে আসতে চাইছেন। সাম্পাওলি মূলত দুই ধরনের ফর্মেশন নিয়ে কাজ করেছেন আপাতত: ৩-৩-১-৩ ও ৩-৪-৩।

আর্জেন্টিনা ম্যানেজার হোর্হে সাম্পাওলি

৩-৩-১-৩ ফর্মেশনে আর্জেন্টিনার গোলরক্ষক থাকছেন উইয়ি ক্যাবায়েরো। ক্যাবায়েরোর সামনে তিনজন ডিফেন্ডার হিসেবে সাম্পাওলি খেলাবেন নিকোলাস তাগ্লিয়াফিকো, নিকোলাস ওটামেন্ডি ও গ্যাব্রিয়েল মের্কাদোকে। তাদের সামনে তিনজন মিডফিল্ডার হিসেবে খেলবেন মার্কাস অ্যাকুনিয়া, হ্যাভিয়ের ম্যাশচেরানো ও এদুয়ার্দো সালভিও। আক্রমণাত্মক মিডফিল্ডার হিসেবে খেলছেন লিওনেল মেসি। বাম উইঙ্গার হিসেবে থাকবেন ক্রিস্টিয়ান পাভন, অন্যদিকে ডানপাশে থাকবেন ম্যাক্সিমিলিয়ান মেজা। আর সবার সামনে একমাত্র স্ট্রাইকার হিসেবে আগের ম্যাচের মতোই থাকবেন সার্জিও অ্যাগুয়েরো।

উইয়ি ক্যাবায়েরো; সোর্স: independent.co.uk

৩-৪-৩ ফর্মেশনের ক্ষেত্রেও গোলরক্ষক যথারীতি উইয়ি ক্যাবায়েরো। তিন সেন্টারব্যাক হিসেবে এই ফর্মেশনেও আছেন নিকোলাস তাগ্লিয়াফিকো, নিকোলাস ওটামেন্ডি ও গ্যাব্রিয়েল মের্কাদো। এদের সামনে দুজন সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার হিসেবে থাকবেন হ্যাভিয়ের ম্যাশচেরানো ও এনজো পেরেজ, আর দুই উইংব্যাক হিসেবে ডানদিকে এদুয়ার্দো সালভিও আর বামদিকে মার্কাস অ্যাকুনিয়া। সামনে তিনজন অ্যাটাকারের মাঝে থাকবেন সার্জিও অ্যাগুয়েরো, আর দুপাশে লিওনেল মেসি ও ম্যাক্সিমিলিয়ান মেজা।

যে ফর্মেশনেই সাম্পাওলি দলকে খেলান না কেন, মার্কোস রোহো, লুকাস বিলিয়া ও অ্যানহেল ডি মারিয়ার বাদ পড়া নিশ্চিত। এই তিনজনেরই আইসল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচের পারফর্মেন্স ছিল সবচেয়ে হতাশজনক। তাই বলা যায় সঠিক সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন সাম্পাওলি।

অ্যানহেল ডি মারিয়া; সোর্স: independent.co.uk

৩-৩-১-৩ ফর্মেশন নিয়ে অনেকে হাসলেও এই প্রথম বিশ্বকাপে এই ফর্মেশনের ব্যবহার নয়। সাম্পাওলির গুরু হিসেবে পরিচিত মার্সেলো বিয়েলসা ২০১০ বিশ্বকাপে চিলিকে এই ফর্মেশনে খেলিয়েছিলেন।

চিলির ৩-৩-১-৩; সোর্স: zonalmarking.net

তবে দুই ফর্মেশনেই ৩ সেন্টার ব্যাকের মধ্যে একমাত্র প্রথাগত সেন্টার ব্যাক নিকোলাস ওটামেন্ডি। বাকি দুজন নিকোলাস তাগ্লিয়াফিকো ও গ্যাব্রিয়েল মের্কাদো মূলত ফুলব্যাক হিসেবেই খেলে থাকেন। তবে এমনও না যে তারা কখনোই ফুলব্যাক হিসেবে খেলেননি। নিকোলাস তাগ্লিয়াফিকো আয়াক্সের হয়ে এই মৌসুমে চারটি ম্যাচ সেন্টার ব্যাক হিসেবে খেলেছেন। অন্যদিকে গ্যাব্রিয়েল মের্কাদো এই পজিশনে খেলেছেন মোট ১৩টি ম্যাচ সেভিয়ার হয়ে। তবে নিকোলাস তাগ্লিয়াফিকোর উচ্চতা মাত্র ৫ ফুট ৭ ইঞ্চি, তাই বাতাসে তিনি ভালোই ভুগবেন।

নিকোলাস ওটামেন্ডি; সোর্স: independent.co.uk

মার্কাস অ্যাকুনিয়া খেলবেন বাম উইংব্যাক হিসেবে, আর এদুয়ার্দো সালভিও আগের ম্যাচের মতো খেলছেন ডানপাশে। আর্জেন্টিনার হয়ে ফুলব্যাক হিসেবে দলে সুযোগ পেলেও তারা তাদের দলে খেলে থাকেন উইঙ্গার হিসেবে। ফলে রক্ষণে কেউই সেরকম দক্ষ নন। ফুলব্যাকের বদলে উইংব্যাক হিসেবে খেললে তারা আরও স্বাধীনতা পাচ্ছেন সামনে এগিয়ে যাওয়ার, কারণ তখন পেছনে ২ জন সেন্টার ব্যাকের বদলে ৩ জন সেন্টার ব্যাক থাকবেন ব্যাক-আপ হিসেবে। ফলে অনেকটা উইঙ্গারের মতোই তারা খেলতে পারবেন। ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার হিসেবে থাকবেন অভিজ্ঞ সৈনিক হ্যাভিয়ের ম্যাশচেরানো। ৩-৪-৩ ম্যাশচেরানোর সাথে মিডফিল্ডার হিসেবে থাকবেন ৩২ বছর বয়সী এনজো পেরেজ। ম্যানুয়েল লানজিনির ইনজুরিতে দলে জায়গা পাওয়া এই মিডফিল্ডার ২০১৪ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিলেন। সাধারণত বক্স-টু-বক্স সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার হিসেবে খেলা পেরেজ রাইট মিডফিল্ডার হিসেবেও খেলতে পারেন। তাই সাম্পাওলি খেলার মধ্যে ফর্মেশন করতে চাইলে পেরেজ খুব সহজেই সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার থেকে রাইট মিডফিল্ডার হিসেবে খেলা শুরু করতে পারবেন।

হ্যাভিয়ের ম্যাশচেরানো; সোর্স: independent.co.uk

৩-৩-১-৩ ফর্মেশনে লিওনেল মেসি খেলবেন আক্রমণাত্মক মিডফিল্ডার হিসেবে, আর সাম্পাওলি ৩-৪-৩ ফর্মেশনে খেলালে তার স্থান হবে ডান উইঙয়ে। প্রথম ম্যাচে আইসল্যান্ডের বিপক্ষে পেনাল্টি মিসের পরে মেসি আছেন বিশাল চাপে। তাছাড়া পুরো ম্যাচে ১১টি শট করে একটিও গোল করতে পারেননি তিনি। ১৯৭০ সালের বিশ্বকাপে ইতালির লুইগি রিভার পরে কেউ এত শট করেও গোল করতে পারেননি- এমন রেকর্ড নেই। অনেকেই বলছেন মেসি চাপে খেলতে পারেন না। তবে মেসির আর্জেন্টিনা সতীর্থরা তার পক্ষেই আছেন। পাওলো ডিবালা বলেন, “আমরা সবাই মেসির সাথেই আছি। আমরা সবাই প্রস্তুত মেসিকে সাহায্য করার জন্য”। ডিফেন্ডার ক্রিশ্চিয়ান আন্সালদি বলেন, “মেসি শুধু পিচের মধ্যে না, বরং পিচের বাইরেও সে আমাদের সেরা খেলোয়াড়। মেসি এখন ভালো অবস্থায় আছে, যা আমাদের জন্য ভালো”।

গত ম্যাচ শেষে লিওনেল মেসি; সোর্স: freepressjournal.in

অ্যানহেল ডি মারিয়ার হতাশাজনক পারফর্মেন্সের পরে তার বদলে দলে আসবেন ম্যাক্সিমিলিয়ান মেজা বা ক্রিস্টিয়ান পাভন। ফক্স স্পোর্টসের মতে, আর্জেন্টিনা শেষ পর্যন্ত ৩-৪-৩ ফর্মেশনই ব্যবহার করতে যাচ্ছে, যাতে ম্যাক্সি মেজা প্রধান একাদশে থাকবেন ক্রিস্টিয়ান পাভনের বদলে।

ম্যাক্সিমিলিয়ান মেজা; সোর্স: independent.co.uk

এবার আসা যাক আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষের ব্যাপারে। নাইজেরিয়ার বিপক্ষে ২-০ গোলে জিতে ক্রোয়েশিয়া আছে অনেকটাই ফুরফুরে মেজাজে। তবে ক্রোয়েশিয়া ক্যাম্পে সমস্যার অভাবও নেই। অধিনায়ক লুকা মদ্রিচ জড়িয়ে পড়েছেন দুর্নীতি মামলায়। অন্যদিকে এসি মিলান স্ট্রাইকার নিকোলা কালিনিচ পিঠের ইনজুরিতে পড়েছেন। তার বিশ্বকাপের এখানেই সমাপ্তি। তবে অনেক মিডিয়ার মতে, কালিনিচ নাইজেরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে সাবস্টিটিউট হিসেবে নামতে চাননি, তাই এতে কোচ জলাতকো দালিচ তাকে দল থেকে বের করে দিয়েছেন।

নিকোলা কালিনিচ; সোর্স: givemesport.com

কোচ জলাতকো দালিচ এই ম্যাচে কিছু পরিবর্তন আনতে পারেন বলে আভাস দিয়েছেন। তবে অবিসংবাদিতভাবে মূল গোলরক্ষক থাকবেন মোনাকোতে খেলা দানিয়েল সুবাসিচ। দুই সেন্টার ব্যাক হিসেবে গত ম্যাচের মতোই লিভারপুলের দেয়ান লভরেন ও বেসিকতাসের ডোমাগোজ ভিদার থাকার কথা। অভিজ্ঞ সেন্টারব্যাক ভেদরান করলুকা আরেকটি ম্যাচ খেললেই জাতীয় দলের হয়ে ১০০টি ম্যাচ খেলার গৌরব অর্জন করবেন, তাই সাবস্টিটিউট হিসেবে তাকে মাঠে নামতে দেখা যেতে পারে। রাইটব্যাক হিসেবে এই দলে খেলবেন অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের সাইম ভ্রিয়ালকো, আরেকদিকে লেফটব্যাক হিসেবে থাকবেন এসি মিলানের ইভান স্ত্রিনিচ।

ভেদরান করলুকা; সোর্স: dailystar.co.uk

নাইজেরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে কোনো প্রথাগত ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার নিয়ে খেলেনি ক্রোয়েশিয়া। তবে শক্তিশালী আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ম্যাচে এমন না হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। ফিওরেন্টিনার মিলান বাদেল এই ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার হিসেবে দলে জায়গা পেতে পারেন। দুই ফরওয়ার্ড আন্দ্রে ক্রামারিচ ও আনতে রেবিচ দল থেকে বাদ যেতে পারেন। তাদের বদলে ডান উইঙয়ে আরেক মিডফিল্ডার মার্সেলো ব্রোজোভিচ জায়গা পেতে পারেন, যিনি ইতালির ইন্টার মিলান ক্লাবে খেলে থাকেন। নাম্বার ১০ হিসেবে আছেন বর্তমান সময়ের অন্যতম সেরা মিডফিল্ডার রিয়াল মাদ্রিদের লুকা মদ্রিচ। বাম উইঙয়ে আরেক ইন্টার মিলান ফুটবলার ইভান পেরিসিচ ও মূল স্ট্রাইকার হিসেবে জুভেন্টাসের মারিও মান্দজুকিচের জায়গা নিশ্চিত। মারিও মান্দজুকিচ বাতাসে বেশ দক্ষ, তাই আর্জেন্টিনার তিন সেন্টার ব্যাক, যাদের ৩ জনেরই উচ্চতা মান্দজুকিচের থেকে কম, তাদের তিনি ভালোই ভোগাবেন।

৬ ফুট ৫ ইঞ্চি উচ্চতার মারিও মান্দজুকিচকে কি পারবেন ঠেকাতে আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগ? সোর্স: goal.com

সাম্পাওলি বেশ বড় বাজি ধরছেন এই ম্যাচে ৩-৪-৩/৩-৩-১-৩ ফর্মেশন নিয়ে। যদি এই ফর্মেশন কাজ করে, বাকি বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার স্থায়ী ফর্মেশন হয়ে যেতে পারে এটি। অন্যদিকে কাজ না করলে, ২০০২ বিশ্বকাপের মতোই গতবারের ফাইনালিস্টদের গ্রুপপর্বে বাদ পড়ার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যাবে।

আর্জেন্টিনা সম্ভাব্য একাদশ

ক্যাবায়েরো; 

মের্কাদো, ওটামেন্ডি, তাগ্লিয়াফিকো; 

সালভিও, ম্যাশচেরানো, পেরেজ, অ্যাকুনিয়া; 

মেসি, অ্যাগুয়েরো, মেজা। (৩-৪-৩)

ক্রোয়েশিয়ার সম্ভাব্য একাদশ

সুবাসিচ; 

ভ্রিয়ালকো, লভরেন, ভিদা, স্ত্রিনিচ; 

রাকিটিচ, বাদেল; 

ব্রোজোভিচ, মদ্রিচ, পেরিসিচ; 

মান্দজুকিচ। (৪-২-৩-১)

Featured Image: fifa.com

Related Articles