২২ বছর ধরে ইংল্যান্ডের দল আর্সেনালের দায়িত্ব সামলেছেন। বর্নাঢ্য এই ক্যারিয়ার শেষ করে এখন একটা বিরতি নিচ্ছেন ফ্রান্সে। এই সময়ে নিজের ক্যারিয়ার, চাওয়া, পাওয়া সবকিছু নিয়ে স্মৃতিচারণ করেছেন আর্সেন ওয়েঙ্গার

আর্সেন, আপনাকে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট করা হলে আপনি কী আইন পাশ করাবেন?

ফুটবলকে আমি বাধ্যতামূলক করে দেবো; ফ্রান্সের সব জায়গায়, প্রতিটা স্কুলে।

আপনার জীবন থেকে কিছু মুছে ফেলতে চাইলে কী মুছবেন?

সব পরাজয়।

আপনার জীবনের চূড়ান্ত কল্পনার ব্যাপারটা কী?

ওরকম কিছু আমার জীবনে নেই। হ্যাঁ, হয়তো পুরো দলকে একটা সুরে খেলতে দেখা। সেটা কখনো কখনো হয়েছে। কিন্তু পুরো ম্যাচে হয়নি। দলের সবাই একই সুরে, ছন্দে খেলছে; এটা খুব বিরল। এই মুহুর্তগুলো এলে কাজের কষ্টটা কমে যায়।

আপনার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল কী?

সম্ভবত একই ক্লাবে ২২ বছর কাটিয়ে দেওয়া। আমি এমন একজন মানুষ যে, ঘুরে বেড়াতে পছন্দ করে। আবার চ্যালেঞ্জও পছন্দ করি। কিন্তু আমি নিজের চ্যালেঞ্জেই বন্দী হয়ে ছিলাম।

২০০৪ লিগ জয়ের পর; Image Source: Talk Sports

আপনার সবচেয়ে বড় ভয় কী?

আমার সবচেয়ে বড় ভয় শারীরিক স্বাধীনতা হারিয়ে ফেলা। আমি এই ঘুরে-ফিরে বেড়ানো, শারীরিক অনুশীলন করা পছন্দ করি। এটা হারানোটা আমার সত্যিকারেরর ভয়।

কারো কাছে ক্ষমা চাইবেন?

এই জীবনে যাদের কষ্ট দিয়েছি। আমি যে কাজ করি, তাতে জীবনে অনেককে শাস্তি দিতে হয়েছে। অন্যকে খুশি করতেই এটা করতে হয়েছে। ২৫ জনের একটা দল নিয়ে কাজ করা মানে ১৪ জনকে বেকার বসিয়ে রাখা প্রতি সপ্তাহে।

কারো সাথে ক্যারিয়ার বদল করতে হলে কার সাথে করবেন?

এমন কেউ যার মানুষের জীবনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলার সম্ভাবনা আছে। বা একজন রাজনীতিবিদ, যিনি একটা বিপ্লবী ধারণা নিয়ে আসবেন।

ফুটবলে না এলে কী করতেন?

কোনো না কোনো প্রতিদ্বন্দ্বীতাপূর্ণ জায়গাতেই থাকতাম। আমি প্রতিদ্বন্দ্বীতা পছন্দ করি।

বব মার্লেকে কেন পছন্দ করেন?

সে একটা সত্যিকারের ক্লাস। সেই সময় তার মিউজিক ছিলো একটা বিস্ময়। এটা খুব দুঃখজনক যে, সে মাত্র ৩৫ বছর বয়সে মারা গেলো। সে খেলা ভালোবাসতো, মিউজিক ভালোবাসতো। আমার কাঝে জ্যামাইকা মানে বব মার্লে। ওখানে খেলা আর মিউজিক এক সাথে চলে।

আপনার ফুটবলে শুরুটা কীভাবে?

একটা ছোট্ট রেস্টুরেন্ট থেকে। ওই রেস্টুরেন্টে স্থানীয় ফুটবল দলের প্রধান দপ্তর ছিলো। স্টার্সবার্গ শহরের বাইরে ছিলো এটা। আমি ওখানে রোজ ফুটবল নিয়ে আলোচনা শুনতাম। পাঁচ কী ছয় বছর বয়স থেকে আমি এসব আলোচনা শুনে বড় হয়ে উঠেছি। মাঠে যেতাম ওদের সাথে। আমার মনে হতো, ঈশ্বর ছাড়া এই দলকে কেউ রক্ষা করতে পারবে না।

আপনার বাবা এই দলের কোচ ছিলেন?

আবার বাবা একটা দল করেছিলেন। কারণ তিনি দেখেছিলেন, আমি ফুটবল নিয়ে পাগল ছিলাম। আমি ১৩ বছর বয়সে খেলা শুরু করলাম। ওই দলের কোচ ছিলো না। ১৯ বছর বয়স অবধি আমি কোনো কোচ পাইনি কখনো। এরপরও আমার ফুটবলে ক্যারিয়ারটা কত লম্বা হলো। এটা বিস্ময়কর একটা ভাগ্য।

আপনি স্টার্সবার্গে খেললেন। এরপর ৩৩ বছর বয়সে কোচ হলেন। কোচ হওয়ার কারণটা কী?

প্রথমত আমি নিশ্চিত ছিলাম না যে, আমার কোচিং করানোর যোগ্যতা আছে কি না। কারণ, আমার তো তেমন বর্নাঢ্য খেলোয়াড়ী জীবন ছিলো না। আমি নিশ্চিত ছিলাম না যে, আমার প্রকৃতিপ্রদত্ত ক্ষমতা আছে কি না। আমাকে আসলে চারপাশের লোকজন কোচ বানিয়ে ফেলেছিলো। তারা আমার ভেতর এটা দেখতে পেরেছিলো। আমি দেখতে পাইনি। আমি আমার চেয়ে বয়সী খেলোয়াড়দের নিয়েও কাজ করলাম।

শুরুর সেই দিনগুলো; Image Source: Talk Sports

১৯৯৬ সালে আপনি ইংল্যান্ডে চলে এলেন বিদেশী কোচ হিসেবে। এটা কী বিস্ময়কর ছিলো না?

অবশ্যই। ইংল্যান্ডের যে ইমেজ ছিলো, তাতে মনে হতো এখানে বিদেশী কোচরা ভালো করে না। আমার আগে দুই কী তিনজন ছিলেন। তারা বিদেশীদের কোচ হিসেবে চাইতো না। এখানে শত শত তত্ত্ব ছিলো যে, কোনো বিদেশী কোচরা সফল হয় না।

আমি এটা ধরে নিয়েই এসেছিলাম যে, আবার জাপান ফিরে যেতে হবে। আমি জাপানকে খুব ভালোবেসেছিলাম। তবে ইউরোপে ফেরাটাও পছন্দ করছিলাম। ধরে রেখেছিলাম, কাজ না হলে ফিরে যাবো।

ইংলিশ প্রেসের সাথে আপনার কঠিন কিছু সময় গেছে। কিভাবে সামলেছিলেন?

তারা আমাকে নিয়ে অনেক গল্প ছেপেছে। অনেক মিথ্যে কথা লিখেছে। দেখুন, এটা একটা জনমুখী চাকরি, এখানে আপনাকে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতেই হবে। আপনাকে নিজের মনোযোগ ধরে রাখা নিয়ে কাজ করতে হবে। ওসব গুজব, মিথ্যে; এগুলো তাদের মতো চলবে। ও নিয়ে মনোযোগ দেওয়ার কিছু নেই।

আপনি ২০০৩-০৪ সালে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হলেন। সাফল্যের রহস্যটা কী ছিলো?

বাস্তবিকভাবে আমরা দেড় বছর অপরাজিত ছিলাম; ৪৯ ম্যাচ। এটা খুব মজার ব্যাপার। কারণ, ২০০২ সালে আমি যখন শিরোপা জিতলাম, তখন বলেছিলাম যে, আমার স্বপ্ন হলো অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হওয়া। পরের মৌসুমে আমরা ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের কাছে শিরোপা হারালাম। আমি ছেলেদের জিজ্ঞেস করলাম, আমরা কেন পারলাম না? ওরা বললো, এটা আপনার দোষ। আমি জানতে চাইলাম, কেন? ওরা বললো, আপনি আমাদের ওপর বেশি চাপ দিয়েছেন। আমি একটু অবাক হলাম। কারণ, আমি কথাটা আসলেই বিশ্বাস করতাম বলে বলেছিলাম।

আপনার ফুটবল দর্শন নিয়ে কথা বলা যাক। আপনি এই যুগের ফুটবলকে ঠিক কীভাবে দেখেন?

আমার সাধারণ দৃষ্টি হলো, আপনাকে জিততে হবে এবং স্টাইলের সাথে জিততে হবে। আপনি যে সুন্দর ফুটবল খেলবেন, জয় আসা উচিত তার ফল হিসেবে। আপনি যেভাবে মাঠে নিজেকে প্রকাশ করবেন তার ফল হিসেবে। সারাটা জীবন লোকে বলেছে, শনিবার জিততে হবে। সেটা আমি জানি। কিন্তু আমার প্রশ্ন, কিভাবে জিতবো? আমি মনে করি, আপনার যেদিন খেলা থাকবে, সেদিন আপনার ভক্তরা ঘুম থেকে উঠে বলবে, আহ, আজ আমার দলের খেলা আছে! এই সুন্দর অনুভূতিটা উপহার দিতে পারাই ফুটবল।

একজন ভালো কোচের সংজ্ঞা কী?

এমন একজন যে তার স্কোয়াডের বেশিরভাগই বের করে আনতে পারে। সমষ্টিগতভাবে এবং ফলাফলের দিক থেকে সেরাটা বের করে আনতে পারে।

আমার কাছে যে লিগ জেতে, সে-ই যে সেরা কোচ, এমন কোনো কথা নেই। এর কোনো পরিমাপ হয় না। আপনি এটা মাপতে পারবেন না। এজন্যই আমার সবসময় চূড়ান্ত লক্ষ্য থাকতো অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হওয়া। কারণ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পথে যদি আপনি একবারও হারেন, তার মানে আপনার আরও উন্নতির সুযোগ আছে।

ওয়েঙ্গারের দেখা সবচেয়ে প্রতিভাবান অঁরি; Image Source: Talk Sports

আপনি খেলোয়াড়, সংবাদমাধ্যম, ক্লাবের বোর্ড সামলেছেন। কোনটা কঠিন?

দেখুন, এই সামলানোর নানা দিক আছে। প্রথমত, খেলার স্টাইল ও ফলাফল। দ্বিতীয়ত, ব্যক্তিগত স্তরে খেলোয়াড়দের উন্নতি। আর তৃতীয়ত, অবকাঠামো ও দর্শনের উন্নতি।

আর্সেনালে ২২ বছর কাটানোর পর এখন আর্সেন ওয়েঙ্গারের ভবিষ্যত কী?

আমি নিজেই নিজেকে এই প্রশ্ন করছি। আমার কী এটাই করে যাওয়া উচিত, যা করছি? নাকি আমি এতদিন ধরে যা শিখেছি, সেটা একটু ভিন্ন উপায়ে মানুষের সাথে ভাগাভাগি করা উচিত? আগামী কয়েক মাসে আমার এই প্রশ্নের জবাব পেতে হবে।

আর্সেনালে প্রথম যখন এলেন, সেই দিনগুলোর কথা একটু বলেন।

ডেভিড ডিয়েন আমাকে আর্সেনালে নিয়ে এসেছিলেন। ১৯৮৯ সালের ২ জানুয়ারি। আমি তখন তুরস্কে ছিলাম। ওখান থেকে ইংল্যান্ডে উড়াল দিলাম। সেই সময়ে আর্সেনালের গ্যালারিতে পুরুষ ও মহিলারা একসাথে বসতে পারতো না। তখনও আমি ধূমপান করতাম।

কিছু দ্রুত প্রশ্ন। আপনার ওপর প্রভাব ফেলা সেরা খেলোয়াড় কে?

সবচেয়ে প্রতিভাবান খেলোয়াড় আমার কোচিংয়ে... থিয়েরি অঁরি।

কোন খেলোয়াড় আপনাকে হতাশ করেছে?

অনেকে। বড় খেলায়। নাম বলবো না। তারা আমার চেয়ে শারীরিকভাবে শক্তিশালী।

নিখুঁতের সবচেয়ে কাছাকাছি মেসি; Image Source: AFP

কোন ম্যাচটা খেলে সবচেয়ে আনন্দ পেয়েছেন?

সম্ভবত বার্সেলোনাকে হারানো। তারা তখন সেরা ছন্দে ছিলো। ওরা তখন অপরাজেয় ছিলো। সেই অবস্থায় দুই পক্ষ থেকে ওই ম্যাচে অবিশ্বাস্য ফুটবল হয়েছিলো।

কোন খেলোয়াড়কে দলে নিতে পেরে সবচেয়ে গর্বিত হয়েছেন?

উমমম... আমি আসলে কম দামে যেসব খেলোয়াড় নিয়েছি, তারা অনেকেই সেরা হয়েছে। তোরে, অঁরি, ক্যাম্পবেল, আনেলকা।

আপনার কাছে নিখুঁত খেলোয়াড় কে?

নিখুত বলে কিছু হয় না। উদাহরণ হিসেবে বলি, মেসি নিখুঁতের সবচেয়ে কাছাকাছি। সে অন্যদের খেলাতে পারে, নিজে স্কোর করতে পারে। কিন্তু তারও দুর্বলতা আছে।