ওদের জন্য ভালোবাসা

১.

“তামিম, মুশফিক থাকলে কিন্তু ব্যাটিংয়ে নামবি!” মাশরাফির ‘রসিকতা’ শুনে মুচকি হেসে ইতিবাচক উত্তরই দিলেন তামিম। রসিকতাই হবে বোধহয়, নতুবা হাতে এত বড় ব্যান্ডেজ দেখার পরও ব্যাটিংয়ে নামতে বলার কথা তো নয়। একটু খটকা লাগলো, যখন একটু পর এসে আবারো মনে করিয়ে দিলেন মাশরাফি, “নামতি হবে কিন্তু!”  মাশরাফি কি আসলেই নামতে বলছেন? 

এরপর আরো একবার এসে বলতেই বিষয়টা পরিষ্কার হয়ে গেল। হ্যাঁ, সত্যিই তামিমকে নামতে বলছেন মাশরাফি। তামিমও ভাবতে শুরু করে দিলেন, নেমেই পড়বেন নাকি? বাধ সাধলেন ফিজিও, একদম এসব উল্টোপাল্টা কাজ করা যাবে না। এমন অবস্থায় মাঠে নেমে ভাঙা হাড়ে ঝাঁকি লাগানো, দৌড়ঝাঁপ, ব্যাটিং- আরে, ফাজলামি চলছে নাকি? 

মাশরাফি ওসব কানে তুললেন না কিছু। নিজের গোটা ক্যারিয়ার জুড়ে এসব অভিজ্ঞতা তো আর কম হলো না, তিনি জানেন কোন ইনজুরির ধকল কতটা। এটাও জানেন, কোন ইনজুরিতে ঝুঁকি কতটুকু। ফিজিওর কথা কানে না তুলে ইতোমধ্যে কোত্থেকে কাঁচি নিয়ে এসে গ্লাভস কাটতে শুরু করে দিয়েছেন। বীতশ্রদ্ধ হয়ে কোচ ড্রেসিংরুমে ঘুরে আবার চলে এলেন ঘটনাস্থলে। এরই মধ্যে মুমিনুল এসে প্যাড পরিয়ে দিয়েছেন, তামিমও সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন যে তিনি নামবেনই। কিন্তু ফিজিও অনুমতি না দিলে যে নামা হবে না!  

অবশেষে সিদ্ধান্ত হলো, মুশফিক টিকে থাকলে তবেই নামবেন তামিম। কিন্তু ফিজিও শর্ত জুড়ে দিলেন, কিছুতেই দৌড়ানো যাবে না। যদি শর্ত না মানেন তামিম, তবে মাঠে নামতে দেবেন না। রাজি হয়ে গেলেন তামিম, মুস্তাফিজ আউট হয়ে গেলে তিনি নামছেন তাহলে!

তবু কোচ নিজেকে বুঝাতে পারছেন না তামিমের এই পাগলামি। এসে বললেন, “তোমার যাওয়ার দরকার নেই। তোমাকে আরো অনেক দিন খেলতে হবে।” কিন্তু তামিম নিজের যুক্তিতে অনড়, “একটা বল আমি খেলে নিতে পারবো।” কোচ হাল ছেড়ে দিলেন, “বুঝে নিও কিন্তু, ইটস ইয়োর কল!” ঘাড় বাঁকিয়ে তামিমের প্রত্যুত্তর, “ঠিক আছে, আমার কল। আমি যাচ্ছি।”

Image Source : Orissa Post

২.

সেদিন মুশফিকুর রহিমের খেলার কথা ছিলো না।

১২ তারিখের অনুশীলনে পাওয়া পাঁজরের ব্যথা আরেকবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিলো এশিয়া কাপের প্রথম ম্যাচের আগেরদিন। এমনও গুঞ্জন আকাশে-বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছিলো, হয়তো দেশেই ফিরে আসতে হবে তাকে। টিম ম্যানেজমেন্ট থেকে আগাম কোনো কিছু জানানো হয়নি, কারণ তাতে প্রতিপক্ষ শিবির মোমেন্টাম পেয়ে যেতে পারতো। কিন্তু একটা চাপা সংশয় ছিলো স্বগত; তামিম-সাকিব পুরোপুরি ফিট নন, দুজনই রীতিমতো তীব্র ব্যথার সঙ্গে যুঝছেন। অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজা তো কলিজা হাতে নিয়ে রীতিমতো ‘মেডিকেল মিরাকল’ হয়ে মাঠ দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন, ইনজুরি ভীতিটা তার নিত্যদিনের সঙ্গী। বাংলাদেশ ক্রিকেট যে পঞ্চবটীর তলায় প্রতিনিয়ত আশ্রয় খোঁজে, সেই পঞ্চবটীর চতুর্থ মহীরূহও শেষপর্যন্ত হয়তো খেলবেন না। সব ঠিকঠাক হয়ে গেলো, পাঁজরের নয় নম্বর হাড়ে চিড় নিয়ে এ ম্যাচে নামছেন না মুশফিক। দুর্ভাগ্যজনক এক পরিস্থিতিতে টেস্ট অভিষেক হয়ে যাওয়া নাজমুল হোসেন শান্তকে হয়তো আরেকবার দুর্ভাগ্যজনক পরিস্থিতিতেই ওয়ানডেতে অভিষিক্ত হতে হবে।  

কিন্তু মুশফিক পাঁজর নিয়ে ভাবলেন না, তিনি ভাবলেন হৃদয় দিয়ে। সব সংশয়ের ইতি টেনে দিয়ে টিম ম্যানেজমেন্টকে পরিষ্কার করে জানিয়ে দিলেন, বুকে-পাঁজরে টেপ জড়িয়ে হলেও তিনি খেলতে নামবেন। এতটা কষ্ট করেছেন এই এশিয়া কাপকে সামনে রেখে, সেটাকে এভাবে শেষ হয়ে যেতে দিতে পারেন না তিনি। শেষপর্যন্ত লড়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে মাঠে নেমে গেলেন মুশফিক, চোখে-মুখে দৃঢ়প্রতিজ্ঞার স্ফুরণ।

চিকিৎসকদের সব সতর্কবাণীকে উপেক্ষা করে পেইন কিলারের ভরসায় তিনি যখন শ্যাডো করতে করতে পৌঁছালেন ক্রিজে, বাংলাদেশের তখন থরহরিকম্প অবস্থা। স্কোরবোর্ডে এক রান তুলতে না তুলতেই ড্রেসিংরুমে ফিরে গেছেন লিটন দাস এবং সাকিব আল হাসান, লাসিথ মালিঙ্গা তখন আগুন ঝড়াচ্ছেন। নামতে না নামতেই দেখলেন, সুরাঙ্গা লাকমলের এক বাউন্সারে প্লেসমেন্টের গড়বড়ে এশিয়া কাপ শেষ হয়ে গেলো সতীর্থ এবং প্রিয় বন্ধু তামিম ইকবালের। চোখে আগুন, বুকে পাথর বেঁধে দাঁতে দাঁত চেপে পিচের একদিকে পড়ে থাকলেন।

image Credit : Associated Press

৩.

সেদিন ক্যারিয়ার থেমে যেতে পারতো তামিম ইকবালের।

আরহামের শরীরটা একটু খারাপ ছিলো। নিজের সঙ্গে যুদ্ধ করে প্রস্তুত হয়েছিলেন তবু দেশকে আরেকবার প্রতিনিধিত্ব করার জন্য। তবে ভিসা জটিলতার কারণে দলের সঙ্গে একসাথে যাওয়া হলো না, রুবেল হোসেন আর তিনি দেশে রয়ে গেলেন। অবশেষে ভিসা যখন এলো, তার আগের দিনই দুবাইতে উড়ে গেছেন রুবেলও। তখনই হয়তো আঁচ করতে পেরেছিলেন, সময়টা খুব একটা ভালো যাচ্ছে না।

দেশ থেকেই ফিটনেস নিয়ে সংশয়ের মেঘ উঁকি দিয়েছিলো আকাশে, ব্যাটিং প্র্যাকটিসের সময় বাঁ হাতের অনামিকায় তীব্র ব্যথা অনুভব করেছিলেন। সেই মেঘ কাটলো না ম্যাচের ২৪ ঘন্টা আগেও, প্রধান নির্বাচক বললেন, “তামিম ইকবালের খেলা নিয়ে আছে সংশয়। আমরা শনিবার প্রথম ম্যাচে তাকে যে পাবোই, এমন নিশ্চয়তা নেই।”

ঈদ-উল-আযহার ছুটিতে সবাই তখন পরিবারের সঙ্গে ছুটি কাটাচ্ছেন। ব্যস্ততম সময়সূচীর মধ্যে একটু সময় বের করে নেওয়াটাই যেখানে কঠিন, সেখানে এই ছুটির সময়টুকু কে-ই বা হাতছাড়া করতে চায়! কিন্তু তামিম ফিরে এলেন চট্টগ্রাম থেকে, বাসায় থেকে যে ফিটনেসটা ঠিক রাখতে পারবেন না! পছন্দের সব খাবারদাবার ছেড়ে দিয়েছেন, বেশ কিছুদিন হলো। এর আগে রোজার ছুটিতেও বাসায় যাননি, নিজেকে প্রস্তুত রাখতে প্র্যাকটিস সেশন বাদ দেওয়া যাবে না যে!

এত ত্যাগ-তিতিক্ষা যে এশিয়া কাপকে সামনে রেখে, সেই এশিয়া কাপের প্রারম্ভে এত এত ইনজুরির চোখরাঙানি ধাতে সইলো না তামিমের। হাতে টেপ জড়িয়ে, পেইন কিলার ইনজেকশন নিয়ে নেমে গেলেন ইনিংসের সূচনা করতে।

অথচ অদৃষ্টের কী নির্মম পরিহাস, হুক-পুল বরাবরই দারুণ স্বাচ্ছন্দ্যে খেলা তামিম সুরাঙ্গা লাকমলের গৎবাঁধা এক বাউন্সারে ব্যাটে-বলে করতে গিয়ে টাইমিং ঠিক করলেও প্লেসমেন্টে গড়বড় করে ফেললেন। যন্ত্রণায় হঠাৎ গোটা দুনিয়াটা অন্ধকার হয়ে এলো তার সামনে, এই ম্যাচে তাহলে আর ব্যাটিং করতে পারবেন না তিনি? পেইন কিলার নিয়েও যে এই যন্ত্রণা সামাল দেওয়া বড্ড কঠিন, নামলে যে গোটা ক্যারিয়ারটাই হুমকির মুখে পড়ে যাবে!

ক্ষুদ্রকায় ওই শরীরে বিশাল হৃদয়টুকু কীভাবে লুকিয়ে রাখেন মুশফিক, সে এক রহস্য বৈকি ; Image Source : ESPNcricinfo

৪.

তখনও তার ব্যাটে ফুল ফুটতে শুরু করেনি। মাত্র ২৮ ম্যাচের ক্যারিয়ারে উপর্যুপরি ব্যর্থতায় খাদের কিনারায় গিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন, তার জায়গায় দলে প্রথমবারের মতো সুযোগ পেয়ে দলে চলে এলেন ধীমান ঘোষ। খালেদ মাসুদ পাইলটের কাছ থেকে গ্লাভস জোড়া বুঝে নেওয়ার পর সেই প্রথম বুঝতে পারা, এই পর্যায়ে টিকে থাকতে হলে পরিশ্রমের বিকল্প নেই। এরপর দিন যত গিয়েছে, নিজেকে শাণিত করার চেষ্টা করেছেন প্রতিনিয়ত। টানা পাঁচ ম্যাচে মাত্র চার রান করতে পেরে দল থেকে বাদ পড়া সেই মুশফিকুর রহিম আজ বাংলাদেশ ক্রিকেটের অন্যতম মহীরূহ।

রাস্তাটা খুব সহজ ছিলো না। ক্যারিয়ারের শুরুতে ‘সোনাঝরা সাফল্য’ বলতে যা বোঝায়, সেটা ঠিক পাওয়া হয়নি তার। যে লর্ডসে খেলা প্রত্যেক ক্রিকেটারের আজন্ম সাধ, মাত্র ১৬ বছর বয়সে সেই লর্ডসেই অভিষেক তার। সেই অভিষেকের পিছনে অভিজ্ঞতা ছিল না, বরং ছিল দুটো মৌলিক বৈশিষ্ট্য- ব্যাটিং টেকনিক এবং পরিণতিবোধ। অভিষেক টেস্টের আগেই সাসেক্স এবং নর্দাম্পটনের বিপক্ষে দুটো প্রস্তুতি ম্যাচে দারুণ ব্যাটিং করে জিওফ বয়কটের প্রশংসা কুড়ালেন। তবে প্রথম ম্যাচে সেভাবে কিছু করা হয়নি তার, মাত্র ১৯ রানেই আউট হয়ে যান। এরপর ওয়ানডেতেও অভিষেক হয়ে গেলো তার, একই সিরিজে অভিষিক্ত হন সাকিব আল হাসান এবং ফরহাদ রেজাও। কিন্তু প্রথম ফিফটিটা পেতে অপেক্ষা করতে হলো ছয় মাসেরও বেশি, এর আগে পারফরম্যান্স খুব একটা দৃষ্টিনন্দন ছিল না বৈকি। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সেই ফিফটির পর বিশ্বকাপে ভারতের বিপক্ষে পরিণত আরেকটি ইনিংস, পায়ের নিচে মাটি পেয়ে যাওয়াটাই ছিল স্বাভাবিক।

কিন্তু এরপরই ছন্দপতন, কোনোক্রমেই আর রান আসে না তার ব্যাটে। প্রতিভা নিয়ে সংশয় নেই, ব্যাটিং টেকনিকের দিক থেকেও ওই অল্প বয়সেই দলে সেরা ব্যাটসম্যানদের একজন তিনি। অথচ পারফরম্যান্সে সেটার ছিটেফোঁটাও দেখা যায় না। এরপর দেখে ফেললেন পাথুরে বাস্তবতা, তলিয়ে যেতে শুরু করলেন ক্রমাগত ব্যর্থতার চোরাবালিতে। ততদিনে বুঝতে শুরু করেছেন, এই পর্যায়ের ক্রিকেটে শুধু প্রতিভা আর ব্যাটিং টেকনিক দিয়ে টিকে থাকা যাবে না। উন্নতি করতে হবে প্রতিনিয়ত, করতে হবে কঠোর পরিশ্রম।

সেই থেকে শুরু, এরপর নেটে প্রচণ্ড মনোযোগী হয়েছেন, পরিশ্রম করতে শুরু করেছেন। প্র্যাকটিসে আসেন সবার আগে, ফেরেন সবাই চলে যাওয়ার পর। উদ্দেশ্য একটাই, আরো একটু বেশি ভালো করতে হবে। সঙ্গে পেলেন বিকেএসপির প্রিয় কোচ মোহাম্মদ সালাহউদ্দিনকে, তারই নিবিড় পরিচর্যায় শুরু করলেন নিজেকে ভাঙাগড়ার খেলা। প্রতিদিন নিজেকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিতেন, সেই চ্যালেঞ্জ ছোঁয়ার নেশায় ছুটতে শুরু করলেন প্রবল একাগ্রতায়।

এই জেদ, কঠোর পরিশ্রম, প্রবল একাগ্রতা এবং আত্মনিবেদনই মুশফিককে করে তুলেছিলো সবার থেকে আলাদা। ধীরে ধীরে মহীরূহ হয়ে ওঠাটা দেখেছে সবাই, নিজের সঙ্গে নিরন্তর লড়াইটা খালি চোখেই ধরা পড়েছে সবার। ছোট্ট সেই ‘১৬ বছরের অনভিজ্ঞ ছোকড়া’ থেকে যেভাবে ব্যর্থতার চোরাবালিতে পড়ে গিয়েছিলেন, নিষ্ঠা এবং কঠোর পরিশ্রমের সঙ্গে প্রতিভার অতুলনীয় মিশেলে তিনিই ধীরে ধীরে হয়ে উঠেছেন আমাদের ‘মিস্টার ডিপেন্ডেবল’।

সততা, পরিশ্রম আর নিবেদনের মাধ্যমে হয়ে উঠেছেন আমাদের ‘বদ্দা’; Image Credit : thenews.pk

৫.

ভারতের বিপক্ষে ২০০৭ বিশ্বকাপে সেই বিখ্যাত ইনিংসটার আগে সেরকম চোখে পড়ার মতো কোনো পারফরম্যান্স ছিল না তামিমেরও। সত্যি বলতে, ওই ইনিংসের পরও একটা লম্বা সময় ধরে বলার মতো কোনো পারফরম্যান্স ছিল না। ডাকাবুকো শরীরী ভাষায় দলের জন্য ওপেনিংয়ে মূল ভরসা হয়ে গিয়েছিলেন খুব অল্প সময়ের মধ্যেই, তবে সেই ভরসার পিছনে একটা সমস্যাও ছিল। তামিমের হাতে ছিল হাতেগোনা চার-পাঁচটা শট, দুর্বলতার জায়গাও ছিল যথেষ্টই। একের পর এক ইনিংসে ব্যর্থ হচ্ছিলেন, শট খেলার প্রচণ্ড ইচ্ছের বলি হয়ে প্রায় প্রতি ম্যাচেই অনর্থক আউট হয়ে যাচ্ছিলেন বারবারই। কখনো অফ স্ট্যাম্পের বেশ বাইরের বল খোঁচা মারতে গিয়ে, কখনো ডাউন দ্য উইকেটে উড়িয়ে মারতে গিয়ে। প্রতিভার কিছুমাত্র তুলে ধরতে পারছিলেন না।

তামিম বুঝতে পারলেন, এভাবে চলবে না। নিজেকে বদলাতে হবে, নিজের তূণে তীরের পরিমাণও বাড়াতে হবে। শুধু ডাকাবুকো মনোভাব দিয়েই কাজ চলবে না, ধারাবাহিকতাটাও খুবই গুরুত্বপুর্ণ। হাতে শট বাড়ানোর জন্য একটি শট নিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা, দিনের পর দিন পরিশ্রম করতে শুরু করলেন। লেগসাইডে দুর্বলতার কথা বেশ চাউর হয়ে গিয়েছিলো, সেখানেও উন্নতির জন্য কঠোর পরিশ্রম শুরু করলেন। অবশেষে সেই পরিশ্রম কাজে লাগতে শুরু করলো, দারুণ কিছু পারফরম্যান্স উপহার দিলেন তামিম। কিন্তু ধারাবাহিকতাটা যে আসছে না! প্রায়শ’ই অহেতুক শটে নিজের গুরুত্বপূর্ণ উইকেট বিলিয়ে দিয়ে আসতেন, দলও মাঝেমধ্যে বিপদে পড়ে যেত। তবে তামিমের মাথার উপর ছায়া হয়ে ছিল টিম ম্যানেজমেন্ট, কোনোক্রমেই তার কাঁধ থেকে সে হাতটা সরে আসেনি। তবে সরে এসেছিলাম আমরা, অকৃতজ্ঞতার চূড়ান্ত উদাহরণ সৃষ্টি করেছিলাম।

এরই মধ্যে একটা জঘন্য কাণ্ড হয়ে গেলো। তামিম একটি ন্যুডলসের বিজ্ঞাপনে কাজ করেন, সেটা নিয়ে নোংরা ট্রল শুরু হয়ে গেলো গোটা বাংলাদেশে। তাকে তুলনা করা হলো সেই ন্যুডলসের সঙ্গে, সঙ্গে আরো কুৎসিত সব সমালোচনা। এমনকি সেই পর্যন্ত না থেমে তামিমের সদ্য বিবাহিতা স্ত্রীকে মাঝরাতে ঘুম থেকে তুলে অকথ্য গালাগালিও করা হয়েছে। সব সয়ে নিয়েছেন তামিম, শুধু দেশের জন্য কিছু একটা করার তাগিদ থেকে সব ভুলে আবার মন দিয়েছেন ওই বাইশ গজেই।

আজ তামিম আমাদের দেশসেরা ব্যাটসম্যান, বিশ্বের সবচেয়ে হাই প্রোফাইল ওপেনারদের মধ্যে একজন। সব ফরম্যাটে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক হয়েছেন, উইজডেন বর্ষসেরা হয়েছেন। যেখানে একটা সময় বাংলাদেশের কোনো ব্যাটসম্যানের একটি সেঞ্চুরির প্রত্যাশায় চাতক পাখির মতো অপেক্ষায় থাকতে হতো আমাদের, তিনি একে একে বিভিন্ন ফরম্যাটে করেছেন ২০টি সেঞ্চুরি। যে তামিম একসময় ক্যাম্প কিংবা প্র্যাকটিস থেকে পালিয়ে বাঁচতেন, সেই তামিম এখন ঈদের ছুটিতে প্রিয় মানুষগুলোর সান্নিধ্যে না থেকে নিরন্তর প্র্যাকটিস করেন, ট্রেনারকে সঙ্গে নিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা ফিটনেস ট্রেনিং করেন। বরাবরের খাদ্যরসিক মানুষটি এখন ফিটনেস ঠিক রাখতে পছন্দের খাবারগুলো দেখলে মুখ ফিরিয়ে নেন। জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ, নিজের সন্তান আরহামের যে সময়টাতে তাকে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, সেই সময়টাতেও দেশকে কিছু একটা দেওয়ার তাগিদ নিয়ে ছুটে বেড়ান দেশে-বিদেশে।

তামিমরা সেরা হয়ে ওঠেন প্রচুর ত্যাগ-তিতিক্ষা এবং কঠোর পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে। একসময় যে তামিম ছিলেন সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো উদ্বেল, হঠাৎ ঝড়ো হাওয়াতে এলোমেলো করে দিয়ে আবার নিস্তব্ধ হয়ে যাওয়া সাইক্লোন, সেই তামিমই এখন বাংলাদেশের ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপনগুলোর একটি। সৌম্য-শান্ত, নির্মল আকাশের মতো নীলাভ, ধারাবাহিকতার প্রতিমূর্তি। খ্যাতির পিছনে না দৌড়ে দেশের জন্য জীবন দিতে প্রস্তুত থাকা একজন মানুষ। চট্টলাবাসী তামিম ইকবাল খান এখন আমাদের ‘বদ্দা’ হয়ে উঠেছেন স্বীয় কর্মগুণে।

মুশফিক-মিঠূনরাই সময় মতো হাল ধরেছিলেন ; Image Credit : The Daily Star

৬.

মুশফিকের সঙ্গে মিঠুন বেশ কিছুক্ষণ সঙ্গ দিয়েছিলেন বটে, শত রানের পার্টনারশিপও গড়ে উঠেছিলো। এরপরই হঠাৎ মড়ক, মুশফিক একের পর এক ব্যাটসম্যানের যাওয়া-আসা দেখেছেন এক প্রান্তে দাঁড়িয়ে। দুবাইয়ের ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার ফোসকা পড়া গরমে পাঁজরের অসহনীয় যন্ত্রণার সঙ্গে যোগ হয়েছিলো ক্র্যাম্প। বড় শট খেলতে কষ্ট হচ্ছিলো বলে শুরুটা করেছিলেন সাবধানী, সিঙ্গেল-ডাবলের মাধ্যমেই রানের চাকাটা সচল রেখেছেন গোটা ইনিংস জুড়ে। তবে শুধু এক-দুই রানে কি আর এখনকার ক্রিকেট চলে? তাই মাঝেমধ্যেই বড় শট খেলছিলেন মুশফিক, চার বা ছক্কা মেরে বুকের বাম পাশটায় হাত দিয়ে ব্যথায় কুঁকড়ে যাচ্ছিলেন। এরপর আবার বুকে পাথর বেঁধে গিয়ে স্ট্যান্স নিচ্ছিলেন, দলকে যে হারতে দেওয়া চলবে না!

শতকটা হয়ে যাওয়ার পর আর যেন চলতে চাইছিলো না শরীরটা, ইনজুরি আর গরমের তীব্রতা মিলিয়ে পেরে উঠছিলেন না আর। জীবনীশক্তি শুষে নিয়েছিলো যেন দুবাইয়ের উষ্ণতা। এমন সময়ই ঘটনাটা ঘটিয়ে ফেললেন তামিম, নেমে পড়লেন ব্যাট হাতে। আর ভোজবাজির মতো বদলে গেলো ম্যাচের হালচাল। ২২৯ রানে ৯ উইকেট হারিয়ে যখন শঙ্কার মুখে বাংলাদেশ, তামিমের মোকাবেলা করা একটিমাত্র বল যেন বদলে দিলো গোটা ম্যাচটাকে। যে লাকমলের বলে আহত হয়েই এশিয়া কাপ শেষ হয়ে গেলো তামিমের, সেই লাকমলের সামনেই নামলেন ওভারের শেষ বলটি মোকাবেলা করার জন্য। যথারীতি আরেকটি শর্ট বল, কীভাবে যেন এক হাতেই ঠেকিয়ে দিলেন সেটা। স্বাভাবিক সময়ে হয়তো এই বলটিকেই কবজির এক মোচড়ে মাঠছাড়া করতেন, কিন্তু ততক্ষণে বাংলাদেশ জয়-পরাজয়ের ঊর্ধ্বে চলে গেছেন। এই ম্যাচটা আর বাংলাদেশ হারতেই পারে না।

সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তে কী প্রচণ্ড অবিচল একসময়ের ‘খামখেয়ালি’ তামিম; Image Source: Circle of cricket

মাঠে নামার জন্য প্রস্তুত হওয়ার দরকার ছিলো, কিন্তু সেটা করার মতোও অবস্থা ছিল না তামিমের। হাতে প্লাস্টার করা, কোনোমতেই হাতটা গ্লাভসে ঢুকানো যাচ্ছিলো না। মাশরাফি নিজে গ্লাভস কেটে কোনোমতে হাতটা গলিয়ে ঝুলিয়ে দিলেন হাতটা। প্যাড দুটো মুমিনুল পরিয়ে দিলেন, অ্যাবডোমিন্যাল গার্ডটাও পরিয়ে দিলেন মাশরাফি নিজেই! অভিমন্যুকে যুদ্ধসাজে সজ্জিত করে যেন চক্রব্যুহ ভেদ করতে পাঠালেন যুধিষ্ঠির!

কিন্তু কেন নেমেছিলেন তামিম? বিশ্বকাপ ফাইনাল ছিল না এটা, টেস্ট ম্যাচের শেষ তিনটি ওভারও ছিল না। তবুও কেন এত বড় একটা ঝুঁকি নিতে হলো তাকে? তামিমের উত্তরটা তার প্রতি সম্মানটা বাড়িয়ে দেয় বহুগুণে, “আমি ওই অবস্থায়ও দেশের জন্য কিছু একটা করতে চেয়েছিলাম। এই আবেগটা ছিল। আমি জানি, আমি চার-ছয় মারতে পারবো না। না পারবো সেঞ্চুরি বা ফিফটি করতে।” তবু তিনি নেমেছিলেন, কারণ তিনি জানতেন তার এই মাঠে নামাটা হতবিহ্বল করে দেবে প্রতিপক্ষ শিবিরকে।

কিন্তু মুশফিক? তিনি চমকে যাননি হঠাৎ তামিমকে নামতে দেখে? “নাহ, আমি একটুও চমকাইনি। আমাকে লোক পাঠিয়ে বলা হয়েছিল যে তামিম নামবে।” যখন তামিম নামলেন, মুশফিকের নামের পাশে ১১২ রান লেখা। কিন্তু তার থেকেও বড় দুশ্চিন্তার কথা, মুশফিক আর পেরে উঠছিলেন না শরীরের সঙ্গে যুদ্ধ করে। কিন্তু কোথায় কী? তামিম মাঠে নামার সঙ্গে সঙ্গে বদলে গেলো গোটা পরিস্থিতি। গোটা ম্যাচেই শান্ত, স্থিতধী মুশফিক এবার আগুন জ্বালালেন মাঠে। সেই আগুনে দগ্ধ হলো গোটা শ্রীলঙ্কান দলটাই, ‘মাস্টারমাইন্ড’ হাতুরুসিংহের শিষ্যেরা তখনও হিসাব মেলাতে হন্যে হয়ে উঠেছেন। মুশফিকের মাথায় ওসব কিছু নেই। তিনি শুধু জানতেন, স্ট্রাইক কোনোমতেই ছাড়া চলবে না। তাকে ব্যাটিং করতেই হবে, প্রতিপক্ষকে দুমড়ে-মুচড়ে দিতে হবে। আর মাত্র তিনটা ওভার বুকে পাথরচাপা দিয়ে খেলতে হবে তাকে। দেশের জন্য, দলের জন্য, সতীর্থের জন্য, ‘আমাদের’ তামিমের জন্য…।

বাংলাদেশ কোনোমতেই এই ম্যাচ হারতে পারতো না, কোনোমতেই না। তামিম একটা বল খেলে জিতিয়ে দিলেন বাংলাদেশকে, তুলে নিলেন স্বর্গসম উচ্চতায়। এমন এক উচ্চতায়, যা নিয়ে যুগ যুগ পরও আখ্যান রচিত হবে। তামিম জিতলেন, বাংলাদেশ জিতলো, ক্রিকেট জিতলো। মাঠ ছাড়ার আগেই প্রতিপক্ষ দলের খেলোয়াড়েরা কুর্ণিশ জানালেন তামিমকে। এই আবেগ শুধু শব্দে প্রকাশ করার ভাষা পৃথিবীতে আবিষ্কৃত হয়নি, এই উপলব্ধির গভীরতা পরিমাপ করার মানদণ্ড এখন অবধি আবিষ্কৃত হয়নি। এক হাতে রূপকথা লিখলেন তামিম, গর্বিত করলেন গোটা বাংলাদেশকে। আত্মনিবেদনের অদ্ভুত সুন্দর এক নিদর্শন স্থাপন করলেন, যা ক্রিকেটের সীমানা ছাড়িয়ে উঠে গেছে অনন্য এক উচ্চতায়!

৭.

বাংলাদেশে ক্রিকেট যে এখন সার্বজনীন রূপ ধারণ করেছে, শুরুর দিকে এমন পরিস্থিতি ছিল না। একটা সময় ছিল, ক্রিকেট খেলে মাসিক রুটিরুজির ব্যবস্থাটুকুও হতো না। সামান্যতম সুযোগ-সুবিধা ছিল না, এমনকি সামাজিকভাবে ‘ক্রিকেটার’ ব্যাপারটাকে পেশা হিসেবে নেওয়ার মতো ঔদার্য্যও খুব একটা দেখানোর সুযোগ ছিল না।

দিন বদলেছে সময়ের ডানায় চড়ে। মানুষ এখন ক্রিকেট শুধু দেখে না, মানুষ ক্রিকেটে খায়, ক্রিকেটে ঘুমায়, ক্রিকেটেই স্বপ্ন দেখে। আমাদের বাংলাদেশে হাজারো সমস্যা, তবে সব সমস্যার মধ্যেও এক চিলতে আনন্দ মানুষ খুঁজে ফেরে সবুজ গালিচা বিছানো মাঠের মাঝখানটাতে ওই বাদামি রঙের বাইশ গজি পিচটাতে। দিনশেষে ওই ক্রিকেটই আমাদেরকে এক ছাদের নিচে নিয়ে আসে, আমাদের হাসায়, আমাদের কাঁদায়। এই দিনটা রাতারাতি আসেনি, এসেছে মাশরাফি-সাকিব-তামিম-মুশফিক-রিয়াদদের রক্ত জল করা পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে।

ঠিক যে সময়গুলোতে স্ত্রী-সন্তানের পাশে থাকাটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, ওরা সেই সময়টুকু দেশে-বিদেশে দৌড়ে বেড়ায় শুধু দেশকে প্রতিনিধিত্ব করার নেশায়। মাশরাফির স্ত্রী সুমির নড়াচড়া করতেও প্রচণ্ড কষ্ট হচ্ছিলো, সেজন্যই মাশরাফি একবার স্ত্রীকে বলে ফেলেছিলেন একটা সিরিজে তিনি খেলবেন না। সেটা শুনতেই অসুস্থ মানুষটা হুট করে লাফিয়ে বিছানা থেকে উঠে গিয়ে জামাকাপড় গোছাতে শুরু করলেন, ক্যাপ্টেনকে যে খেলতেই হবে দেশের জন্য! বাংলাদেশের ক্রিকেট এখন একটা ব্র্যান্ড, এখনকার মা-বাবা ছেলে-মেয়েদেরকে ক্রিকেট খেলতে দেখলে স্বপ্ন দেখেন ভবিষ্যতের সাকিব-তামিম-মাশরাফিদের। অলিগলিতে এখন ক্রিকেট নিয়ে আড্ডার আসর জমে, টিভি রুমে সপরিবারে মহাসমারোহে ক্রিকেট ম্যাচ দেখতে বসাটাও এখন আলাদা একটা উৎসব। এমন প্রত্যেকটি অর্জনের পিছনে লুকিয়ে আছে ওদের ঘাম, রক্ত, অশ্রু।

সামর্থ্য এবং সম্ভাবনা দুই নিয়েই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এসেও হেলায় সুযোগ বারবার নষ্ট করেছেন সাব্বির; Image Credit: ESPNcricinfo

এত এত ত্যাগ-তিতিক্ষার মধ্য দিয়ে যে দলকে তারা তিল তিল করে গড়ে তুলেছেন, নিয়ে এসেছেন এমন এক উচ্চতায়। বাংলাদেশ জাতীয় দলের ক্রিকেটার মানে এখন বিশাল কিছু; গ্ল্যামার-টাকা থেকে শুরু করে নারীসঙ্গ, সবই যেন পিছনে হিড়িক পড়ে যায়। আর সেই হুজুগে মেতেই আমাদের বর্তমান প্রজন্মের কিছু খেলোয়াড় হঠাৎ পথচ্যুত হন, গ্ল্যামারে চোখ ঝলসে গিয়ে পূর্বসূরীদের রক্ত জল করা পরিশ্রমে গড়া একটি প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে তারা বিপথগামী হওয়ার কথা ভাবেন। আমাদের পঞ্চপাণ্ডবদের কেউ সারা জীবনের জন্য পঙ্গু হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা নিয়ে ‘মেডিক্যাল মিরাকল’ ঘটান, কেউ বছরের পর বছর তুমুল ওয়ার্কলোড এবং ইনজুরির বহর নিয়ে হাসিমুখে ম্যাচের পর ম্যাচ জিতিয়ে চলেন, কেউ আবার ভাঙা হাত কিংবা ভাঙা পাঁজর নিয়ে দেশের জন্য জীবন বাজি রেখে লড়াই করতেও দুবার ভাবেন না।

আজকের তরুণদের নিয়ে হাজারো অভিযোগ। প্রিয় তরুণ প্রজন্ম, উদাহরণগুলো আপনাদের সামনেই রয়েছে। অনুগ্রহ করে তাদেরকে দেখুন, জানুন, অনুভব করুন। তামিম একবার বলেছিলেন, দলের জুনিয়রদের সামনে একটা স্ট্যান্ডার্ড তৈরি করে দিয়ে যেতে চান। সেটা তারা ইতোমধ্যে করেছেন, বাংলাদেশের নাম তারা এমন এক উচ্চতায় তুলে নিয়ে গেছে যেখানে পৌঁছানোর কথা আমরা এর আগে স্বপ্নেও ভাবতে পারেননি। আপনাদের কাজ এবার সেই আদর্শটুকু গ্রহণ করে লিগ্যাসিটা টেনে নেওয়া। যদি সেটা করা যায়, তবেই না আমরা স্বপ্ন দেখবো সুন্দর একটা ভবিষ্যতের। বাংলাদেশের ষোল কোটি মানুষ যে একচিলতে হাসির জন্য আপনাদের মুখাপেক্ষী হয়েই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে!

Featured Image Credit : fungyung.com

Related Articles