বিজয়ের রানপ্রসবা ২০১৮

ওপেনিংয়ে তামিম ইকবালের সঙ্গীর সাময়িক সমাধান হয়েছিলেন। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এনামুল হক বিজয়ের শুরুটা আশাবাদী করে তুলেছিলো সবাইকে। প্রথম ১৯ ওয়ানডেতেই তিন সেঞ্চুরি! রীতিমতো চোখ ধাঁধাঁনো শুরু। অথচ অমন শুরুর পর বিজয়ের ওয়ানডে ক্যারিয়ারে ম্যাচের সংখ্যা মাত্র ৩৭।

২০১৫ বিশ্বকাপে ইনজুরিতে পড়ার পর বাদ পড়লেন। তারপরই রব উঠলো, বিজয়ের ব্যাটিংটা চলে না। বেশি ডট খেলেন, স্ট্রাইক রোটেট করতে পারেন না, সেলফিশ ক্রিকেট খেলেন – এমন আলোচনায় সরব হলো তার ক্যারিয়ার। গুঞ্জন ছিল, এসব আলোচনার হোতা তৎকালীন বাংলাদেশ কোচ চন্ডিকা হাথুরুসিংহে। তার ইচ্ছায় ইনজুরি সারলেও বিজয়ের আর ওয়ানডে দলে ফেরা হয়নি।

Image Credit: The Daily Star

হাথুরুসিংহে বিদায় নিলেন। তিন বছর ওয়ানডে দলে ফেরেন বিজয়। গেল বছরের শুরুতে পাওয়া সুযোগটা কাজে লাগাতে পারেননি এই ডানহাতি ব্যাটসম্যান। ৭ ওয়ানডে খেলে সর্বসাকুল্যে ৮৭ রান করেন। ২০১৮ সালটা তাই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রত্যাবর্তনেই ব্যর্থতার দলিল হয়ে টিকে রইলো তার ক্যারিয়ারে।

কিন্তু আবার এই ২০১৮ সালকেই বারবার আলিঙ্গনে জড়াতে চাইবেন বিজয়। কারণ এই বছরে ঘরোয়া ক্রিকেটে রান উৎসব করেছে এই ব্যাটসম্যানের ব্যাট, রানের ফল্গুধারা বয়ে গেছে ২৬ বছর বয়সী এই ওপেনারের ব্যাটে। হ্যাঁ, ঠিকই পড়ছেন, জাতীয় দলে ব্যর্থ হওয়া বিজয় ২০১৮ সালে ঘরোয়া ক্রিকেটে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের মধ্যে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক। ঘরোয়া ক্রিকেটে খেলেছেন চারটি টুর্নামেন্ট, আর এই চার টুর্নামেন্ট মিলে ১,৮৪৩ রান করেছেন তিনি!

বছরের শুরুতে ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে ছিলেন দ্বিতীয় সেরা ব্যাটসম্যান। সদ্য সমাপ্ত বাংলাদেশ ক্রিকেট লিগের (বিসিএল) সপ্তম আসরে শীর্ষ রানসংগ্রাহক বিজয়। জাতীয় ক্রিকেট লিগ, বিসিএলের ষষ্ঠ আসরে (২০১৮ সালেই হয়েছে) ব্যাটিংয়ের সেরা ছন্দে না থাকলেও বছরশেষে তৃপ্তির অনেক রসদ এখন তার ভান্ডারে।

বিজয় এবং অন্য সেরা ব্যাটসম্যানরা

রানের তুবড়ি ছুটিয়েছেন গোটা বছরজুড়ে; Image Credit: BCB

২০১৮ সালে ঘরোয়া ক্রিকেট শুরু হয়েছে বিসিএলের ষষ্ঠ আসর দিয়ে। তিন রাউন্ড পর বিরতি পড়ে। ৫ ফেব্রুয়ারি শুরু হয় ঢাকা প্রিমিয়ার ক্রিকেট লিগ। তারপর শেষ তিন রাউন্ড অনুষ্ঠিত হয় বিসিএলের। অক্টোবরে শুরু হয় জাতীয় ক্রিকেট লিগের (এনসিএল) ২০তম আসর। এনসিএল শেষ হতেই ফ্র্যাঞ্চাইজভিত্তিক বিসিএলের সপ্তম আসর শুরু হয়, শেষ হয় গত ২৭ ডিসেম্বর।

ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে ৭৪৪, এনসিএলে ২৭৮ ও বিসিএলের দু’টি আসরে যথাক্রমে ১৬৩ ও ৬৫৮ রান করেছেন বিজয়। সব মিলিয়ে তার নামের পাশে জ্বলজ্বল করছে ১,৮৪৩ রান, যা অন্য সব ব্যাটসম্যানদের তুলনায় ঈর্ষনীয়ই বটে। দ্বিতীয় স্থানে আছেন অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যান নাঈম ইসলাম, তিনি ১,৭৯৬ রান করেছেন চার টুর্নামেন্টে। ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে ৭২০, এনসিএলে ৪৪৪ ও বিসিএলের দু’টি আসরে যথাক্রমে ১১০ ও ৫২২ রান করেছেন নাঈম। ১,৭৯৪ রান করে তৃতীয় স্থানে জুনায়েদ সিদ্দিকী। বাঁহাতি এই ওপেনার ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে ৫৪২, এনসিএলে ৪০৪ ও বিসিএলের দু’টি আসরে যথাক্রমে ৩৪৮ ও ৫০০ রান করেছেন। ১,৭৪৪ রান করে চতুর্থ স্থানে থাকা আব্দুল মজিদের রানগুলো ছিল এমন : ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে ৬২৮, এনসিএলে ৩৯৭ ও বিসিএলের দু’টি আসরে যথাক্রমে ৩০৯ ও ৪১০ রান। এই তালিকার পাঁচে অবস্থান করা সাদমান ইসলাম করেছেন ১,৬৯৩ রান। বছরের শেষ দিকে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে টেস্ট অভিষেক হওয়া এই বাঁহাতি ওপেনার ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে ৪৬২, এনসিএলে ৬৪৮ ও বিসিএলের দু’টি আসরে যথাক্রমে ৫০০ ও ৮৩ রান করেছেন। ১,৬২৩ রান করে ষষ্ঠ অবস্থানে লিটন কুমার দাস। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের ব্যস্ততার ফাঁক গলিয়ে চার টুর্নামেন্টেই খেলা লিটন ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে ৫৩৭, এনসিএলে ২২০ ও বিসিএলের দু’টি আসরে ৭৭৯ ও ৮৭ রান করেছেন।

২০১৮ সালের মূল্যায়নে বিজয়

Image Credit: BCB

ব্যাটসম্যান হিসেবে গত বছরটা দুর্দান্ত কেটেছে বিজয়ের। যা কিছু আক্ষেপ আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফেরার সুযোগ কাজে লাগাতে না পারায়। ব্যাটিংয়ের দিক থেকে বছরটার মূল্যায়নে তিনি বলেছেন,

‘বিসিএলের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক হয়েছি। ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে ৫ রানের জন্য দ্বিতীয় হয়েছি। ঘরোয়া ক্রিকেটটা আমার জন্য দারুণ গেছে। এর মধ্যে দু’টি ডাবল সেঞ্চুরি করেছি; একটা ১৮০, একটা ১৭০, সব মিলিয়ে ৬-৭টা বড় সেঞ্চুরি। জাতীয় দলে ফিরে আসার দারুণ একটা সুযোগ পেলাম, কিন্তু ভালো করতে পারিনি। ইনিংসগুলো বড় করার সুযোগ ছিল। আমি কিছু ইনিংসে সেট হয়ে আউট হয়ে গেছি। ৩৫, ১৮, ২৮ এই তিনটা ইনিংস যদি বড় করতে পারতাম, তাহলে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটও ভালো হতো। ভালো করলে জাতীয় দলের সঙ্গে থাকতে পারতাম। তা ছাড়া বছরটা দারুণ গেছে। আমার কাছে মনে হয় ২০১৮ সাল বিশ্লেষণ করলে আমার জন্য ভালোই গেছে।’

এক বছরে চার টুর্নামেন্টে প্রায় সাড়ে আঠারোশ’ রান। বিজয় বলেছেন, এটা তৃপ্তির-সন্তুষ্টির। তিনি বলেছেন,

‘আল্লাহর রহমতে আমি সবসময় ক্যারিয়ারে ভালো অবস্থায় ছিলাম। সবার একটা খারাপ সময় যায় যে, অনেকে টানা ১০-২০ ইনিংস রান করছে না। কখনোই আমার এমন সময় যায়নি যে, বিজয় ১০ ইনিংস ধরে রান করছে না। এটা আমাকে খুব তৃপ্তি দেয়, শান্তি দেয়। নিজের মাঝে একটা সন্তুষ্টি আসে যে, আমি সবসময় একটা রানের মধ্যে থাকি। এটাকে আরও ভালো করার সুযোগ আছে।’

এমন ধারাবাহিকতার সঙ্গে ব্যাটিংয়ে কোনো পরিবর্তন এসেছে কিনা জানতে চাইলে বিজয় বলেছেন,

‘একটা বড় ব্যাপার অভিজ্ঞতা। আমার ৭০টা (আসলে ৮৩টি) প্রথম শ্রেণির ম্যাচ হয়েছে। সেশন বাই সেশন খেলার একটা অভ্যাস এসেছে। অভিজ্ঞতা অবশ্যই গুরুত্ব রাখে। এখন একটু পরিণত হয়েছি। বিয়ে করছি, বউ আছে। বউ অনেক সাহায্য করে। একটু স্থিরতা তো আসেই, ধৈর্য্যও কাজে লাগে। স্কিলে টুকটাক পরিবর্তন আসে খেলার সঙ্গে। স্লো উইকেটে এমন, বাউন্সি উইকেটে এমন, এই স্পিনারকে এভাবে খেললে আরও রান আসবে, পেসারকে এভাবে সামাল দেয়া যায়, এমন ছোট ছোট পরিবর্তন তো ম্যাচ-বাই-ম্যাচ হয়ই। আমার কাছে মনে হয় এগুলোও বড় পরিবর্তন।’

বিশ্বকাপের স্বপ্ন হারিয়ে যায়নি

Image Credit: AFP

২০১৮ সালে ব্যর্থ হলেও নতুন বছরে জাতীয় দলে সুযোগ পেলে তা কাজে লাগাতে আত্মবিশ্বাসী বিজয়। ডানহাতি এই ওপেনারকে আশাবাদী করে তুলেছে গত বছরে ব্যাট হাতে অসাধারণ ধারাবাহিকতা। তাই মনের কোনো এক কোণে এখনও লালন করছেন ২০১৯ বিশ্বকাপ খেলার স্বপ্ন। তিনি বলেছেন,

‘হ্যাঁ, আমি রান করবো। আমি পুরো আত্মবিশ্বাসী। আমার প্রথম শ্রেণিতে ১৭টা, লিস্ট-এ তে ৯টা, টি-২০তে একটা সেঞ্চুরি; সর্বমোট ২৭টা সেঞ্চুরি হয়ে গেছে। আমার কাছে মনে হয়, রান আমি করতে পারবো। ইনশাল্লাহ রান আমাকে ধরতে হবে না, রান আমাকে ধরা দিবে। এবার ভালো করিনি, এটা নিয়ে ভাবছি না। কারণ সুযোগ আসবেই। সুযোগের অপেক্ষায় আছি অবশ্যই। সুযোগ আসলেই তা কাজে লাগানোর চেষ্টা করবো। মূল টার্গেট বিশ্বকাপ খেলা, বিশ্বকাপ খেলার জন্য যা করা দরকার করতে চাই।’

স্মিথের কাছে বিজয়ের পাঁচ প্রশ্ন

স্টিভ স্মিথ; Image Credit: Getty Images

বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের (বিপিএল) ষষ্ঠ আসরে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্সের হয়ে খেলবেন বিজয়। যেই দলে বিদেশি ক্রিকেটার কোটায় খেলবেন স্টিভ স্মিথ, শোয়েব মালিকের মতো ব্যাটসম্যানরা। ২৬ বছর বয়সী এই বাংলাদেশি ব্যাটসম্যানের আশা, স্মিথের কাছ থেকে শিখতে পারবেন। সতীর্থ স্মিথের জন্য ৫টি প্রশ্নও তৈরি করেছেন বিজয়। হালের অন্যতম সেরা এই ব্যাটসম্যানের কাছে জানতে চাইবেন নিজের প্রশ্নগুলোর উত্তর।

তিনি বলেছেন,

‘আমি মনে করি, আধুনিক ক্রিকেটে ভিরাট কোহলি, স্টিভ স্মিথ, জো রুট, কেন উইলিয়ামসনদের ধরা হয় যে, এরা নিজেদের কিংবদন্তির পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে। তাদের মধ্যে স্মিথ অন্যতম সেরা। ওদের আক্রমণাত্মক মনোভাব, আচরণ, চিন্তাভাবনা… এগুলো অসাধারণ। আমি ৪-৫টা প্রশ্ন প্রস্তুত করে রেখেছি স্মিথের জন্য। স্মিথ আসলে আমি ওকে জিজ্ঞাসা করবো। কীভাবে চিন্তা করে, কীভাবে এত বড় পর্যায়ে আসছে। ও সাসপেন্ড হওয়ার আগেও বিশ্বসেরা ছিল। এরকম একটা খেলোয়াড়ের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ হলে আমার মনে হয় অসাধারণ হবে। এছাড়া শোয়েব মালিক আছেন, উনি অভিজ্ঞতাসম্পন্ন মিডল অর্ডার ব্যাটসম্যান। আমাদের তামিম ভাই, ইমরুল ভাইরা আছেন। সবার কাছ থেকে শেখার আছে। উনাদের পরামর্শ নিয়ে বিপিএল বা বিপিএলের পরের টুর্নামেন্টগুলোতে ভালো করতে চাই।’

বিজয় না থাকলেও তামিমের সঙ্গী হিসেবে তিন ফরম্যাটে ইমরুল কায়েস, লিটন দাস, সৌম্য সরকারদের নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা থেমে নেই। হোক ঘরোয়া ক্রিকেট, ব্যাটসম্যান হিসেবে রান জোয়ারের ২০১৮ সালে যে আত্মবিশ্বাস সঞ্চয় করেছেন বিজয়, আগামীর টুর্নামেন্টগুলোতে সেটির সঠিক অনুবাদ করতে পারলে, ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারলে তার জন্য আবার আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের দুয়ার খুলতে বিলম্ব হওয়ার কথা নয়।

This article is in Bangla language. This article focuses on the last year flamboyant performance by Anamul Haque Bijoy. 

Featured Image: AFP

Related Articles