কোপা আমেরিকা বনাম ইউরো: কোন টুর্নামেন্ট এগিয়ে?

দেখতে দেখতে শেষ হয়ে গেল এবারের ইউরো এবং কোপা আমেরিকার আসর। ইউরোর ১১টি শহর ঘুরে ওয়েম্বলিতে অনুষ্ঠিত হয় ইউরোর ফাইনাল, যেখানে ইংল্যান্ডের সমর্থকদের স্তব্ধ করে দিয়ে শিরোপা জিতে নেয় ‘ডার্ক হর্স’ হিসেবে ইউরো খেলতে আসা ইতালি। অন্যদিকে ব্রাজিলের মারাকানা স্টেডিয়ামে স্বাগতিকদের হারিয়ে দীর্ঘদিনের শিরোপাখরা কাটাতে পারল আর্জেন্টিনা, মেসিও পেলেন ক্যারিয়ারের প্রথম আন্তর্জাতিক শিরোপা জয়ের স্বাদ। 

কোপা আমেরিকা এবং ইউরোর মধ্যে কোন টুর্নামেন্ট এগিয়ে, সে তর্কবিতর্ক অনেক বছর ধরেই চলে আসছে। তবে এবারই প্রথম একই সময়ে ইউরো এবং কোপা আমেরিকার আয়োজন এই বিতর্কের আগুনে বাড়তি ঘি জুগিয়েছে। ইউরো নিয়ে সাধারণ ফুটবলপ্রেমীদের উৎসাহ ছিল বরাবরের মতোই তুঙ্গে, কিন্তু কোপা আমেরিকা নিয়ে সমর্থকদের উৎসাহে বেশ ভাটা পড়েছে।

ইউরো নাকি কোপা, সামগ্রিকভাবে কোন মহাদেশীয় টুর্নামেন্ট এগিয়ে? কেনই বা এগিয়ে? আজকের এই লেখায় আমরা খুজব সেই উত্তর। 

তারকার ভার

ইউরো বনাম কোপার লড়াইয়ে সবার প্রথমে যে ব্যাপারটি উঠে আসবে, তা হচ্ছে দুই টুর্নামেন্টে তারকা ফুটবলারদের উপস্থিতি। সেদিক বিবেচনায় এবারের ইউরোতে যেন তারকার হাট বসেছিল। প্রায় প্রতিটা দলেই ছিল এক বা একাধিক তারকা ফুটবলারের উপস্থিতি, যা টুর্নামেন্টের ঔজ্জ্বল্য বাড়িয়ে দিয়েছিল বহুগুণে। নিঃসন্দেহে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোই ছিলেন তারকা হিসেবে ইউরোর প্রধান বিজ্ঞাপন; কিন্তু এর বাইরেও কিলিয়ান এমবাপ্পে, হ্যারি কেইন, কেভিন ডি ব্রুইনা, রবার্তো লেভানডফস্কিসহ আরো অনেক তারকা ফুটবলাররা তাদের তারকাখ্যাতির মাধ্যমে ইউরোকে আলোকিত করেছেন। পেদ্রি, ড্রামসগার্ড, স্পিনাৎজোলারা খুব বড় তারকা না হলেও নিজেদের পারফরম্যান্সের মাধ্যমে পুরো ইউরোজুড়েই দর্শকদের মুগ্ধ করে রেখেছিলেন।

তারকাদের মিলনমেলায় মুখরিত ছিল এবারের ইউরো; Image credit: firsttimefinish.co.uk

অন্যদিকে, মেসি-নেইমার-সুয়ারেজ বাদে কোপায় ছিলেন না তেমন কোনো তারকা ফুটবলার। অ্যালেক্সিস সানচেজ, সার্জিয়ো আগুয়েরো, এডিনসন কাভানিরা নিজেদের সেরা সময় পেছনে ফেলে এসেছেন বহুদিন আগেই। আর্জেন্টিনার শিরোপাজয়ের নায়ক ডি মারিয়াও বেশিরভাগ ম্যাচ শুরু করেছেন সাইডলাইনে থেকেই। ইনজুরির কারণে খেলতে পারেননি ফিলিপে কৌতিনহো, হামেস রদ্রিগেজদের মতো তারকা ফুটবলাররা। এজন্য পুরো টুর্নামেন্টজুড়েই তারকাখ্যাতির অভাব ছিল সুস্পষ্ট। মূল তারকাদের বাইরে কলম্বিয়ার লুইস দিয়াজ, পেরুর লাপাদুলা এবং প্যারাগুয়ের আলমিরন বাদে আর কারো পারফরম্যান্সই তেমন চোখে পড়ার মতো ছিল না। ব্যাপারটি হতাশাজনক হলেও সত্যি যে, একসময় তারকাবহুল লাতিন আমেরিকান ফুটবল এখন তারকাখরায় ভুগছে। তারকা ফুটবলারের অভাব থাকায় ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে কোপা আমেরিকা নিয়ে উৎসাহও ছিল অনেকটাই কম। তারকা ফুটবলারের অভাব কোপা আমেরিকার ঔজ্জ্বল্য অনেকটাই ফিকে করে দিয়েছে। 

মেসি-নেইমার-সুয়ারেজ ত্রয়ীই ছিলেন এবারের কোপার প্রধান তারকা; Image credit: foottheball

খেলার ধরন

এবারের ইউরো এবং কোপা আমেরিকা একই সময়ে অনুষ্ঠিত হওয়ায় দুই টুর্নামেন্টের খেলার ধরনের পার্থক্যটা খালি চোখেই বেশ ভালোভাবে ধরা পড়েছে। ইউরোতে দেখা গেছে টেকনিক্যাল ফুটবলের লড়াই, সে তুলনায় কোপা আমেরিকার বেশিরভাগ দলগুলোই খেলেছে ফিজিকাল ‘রাফ অ্যান্ড টাফ’ ফুটবল। ইউরোতে যেমন প্রতিটা দলই ‘কম্বিনেশনাল’ ফুটবলের দিকে জোর দিয়েছে, কোপাতে দেখা গেছে তার ঠিক উল্টোটাই।

ফুটবলভক্তদের মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে, লাতিন ফুটবলের এই অধঃপতনের কারণ কী?

লাতিনের দলগুলোর এই শারীরিক ঘরানার ফুটবল দর্শনে অভ্যস্ত হওয়ার পেছনে একটি বড় কারণ হচ্ছে ক্লাসিক নাম্বার টেন ফুটবলারদের পতন। একটা সময় লাতিন আমেরিকা ছিল ক্রিয়েটিভ ফুটবলারদের স্বর্গরাজ্য। খুব বেশিদিন আগের কথা নয় যখন কাকা, রোনালদিনহো-রিকেলমে-ফোরলানের মতো সৃজনশীল লাতিন ফুটবলাররা দুর্দান্ত প্রতাপের সাথেই ইউরোপিয়ান ক্লাব ফুটবলে মাঠ মাতিয়েছেন। কিন্তু নাম্বার টেন রোলে খেলা ফুটবলারদের বিবর্তনের সাথে লাতিনের ফুটবলাররা তেমন খাপ খাওয়াতে পারেননি। এজন্য এখন ইউরোপের মতো লাতিন থেকে ক্রিয়েটিভ নাম্বার টেন ফুটবলাররা উঠে আসছে না।

যেকোনো ফুটবল দলেই আক্রমণের ধার বাড়াতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন নাম্বার টেন বা প্লেমেকার রোলে খেলা ফুটবলার। আগে নাম্বার টেন রোলে খেলা ফুটবলারদের ভূমিকা ছিল আক্রমণ গড়ে তোলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ, রক্ষণে তাদের কোনো ভূমিকা পালন করার প্রয়োজন পড়ত না। কিন্তু মডার্ন ফুটবলের প্রতিটা দলই রক্ষণের দিকে আগের চেয়ে অনেক বেশি মনোযোগী হয়েছে। এজন্য ডিফেন্সে বাড়তি কভারের জন্য দলের প্রত্যেকটা খেলোয়াড়কেই প্রতিপক্ষ খেলোয়ারদের প্রেসিং করতে হয়। তাছাড়া এখন লো-ব্লক ডিফেন্সলাইনে খেলা দলের সংখ্যা অনেক বেশি হওয়ায়, প্রতিপক্ষ অর্ধে আগের মতো ফাঁকা জায়গা পাওয়া যায় না। সে কারণে কাউন্টার অ্যাটাক করার জন্য দলের ফরোয়ার্ড ফুটবলারদেরও সরাসরি প্রেসিংয়ে অংশ নিতে হয়। 

সাধারণত একটা দলে নিজেদের অর্ধে প্রতিপক্ষের ফরওয়ার্ডদের তুলনায় বেশি খেলোয়াড়ই থাকেন। ফলত প্রতিপক্ষ অর্ধেই প্রেসিং করে বল কেড়ে নিতে হলে দলের প্রত্যেকটা ফরোয়ার্ডকেই প্রেসিংয়ে অংশ নিতেই হয়। যার মানে দাঁড়ায়, নাম্বার টেন রোলে খেলা ফুটবলারকেও সরাসরি প্রেসিংয়ে অংশ নিতে হবে; যে পরিবর্তনের সাথে ইউরোপের ফুটবলাররা মানিয়ে নিতে পারলেও লাতিনের ফুটবলাররা ঠিক মানিয়ে নিতে পারেননি। যেমন ইউরোপে খেলা নাম্বার টেন রোলের ফুটবলারদের মধ্যে ডি ব্রুইনা, ব্রুনো ফার্নান্দেস কিংবা গ্রিজমানসহ বেশিরভাগ ফুটবলারই আক্রমণের সাথে সাথে রক্ষণেও সমান সহায়তা করেন। কিন্তু লাতিনের নাম্বার টেন রোলে খেলা ফুটবলারদের মধ্যে এই ব্যাপারটি অনুপস্থিত, যেমন ব্রাজিলের ফিলিপে কৌতিনহো, কলম্বিয়ার হামেস রদ্রিগেজ কিংবা আর্জেন্টিনার পাপু গোমেজ প্লেমেকার হিসেবে বেশ ভালো হলেও ডিফেন্সিভলি বেশ দুর্বল। এজন্য লাতিনের দলগুলোর কোচরা রক্ষণে তুলনামূলক দুর্বল প্লেমেকারদের খেলানোর পরিবর্তে বক্স-টু-বক্স মিডফিল্ডার খেলাতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন যারা আক্রমণভাগের সাথে রক্ষণেও সমানভাবে অবদান রাখতে পারবে। এজন্য খেলায় সৃজনশীলতার অভাব খুব ভালোভাবে ধরা পড়েছে, যার ফলে লাতিনের ফুটবল হয়ে উঠেছে অনেকটাই বোরিং, ম্যাড়ম্যাড়ে ধরনের। আগের সেই ছন্দময় ফুটবলে পতন ধরছে বেশ ভালোভাবেই।

প্রতিযোগিতার মান

প্রতিযোগিতার মানের দিক দিয়েও অনেক এগিয়ে থাকবে ইউরো৷ এবারের ইউরোতে অংশ নিয়েছিল মোট ২৪টি দেশ। মূল পর্বে অংশগ্রহণের টিকেট পেতে বাছাইপর্বে বেশ কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে প্রতিটি দেশকেই, যে কারণে দলগুলার মধ্যে লড়াই করার মানসিকতা অনেক বেশি। বাছাইপর্ব পেরিয়ে মূলপর্বে খেলতে হয় বলে তুলনামূলক শক্তিশালী দলগুলোই মূলপর্বে খেলার সুযোগ পায়।

এবারের ইউরোতে শ্বাসরুদ্ধকর ম্যাচের সংখ্যা অন্যান্য যেকোনোবারের চেয়েই বেশি ছিল। স্পেন-ক্রোয়েশিয়া কিংবা ফ্রান্স-সুইজারল্যান্ডের মধ্যকার ম্যাচগুলোর মতো রোমাঞ্চকর ম্যাচের কথা দর্শকরা মনে রাখবেন বহুদিন। নকআউট পর্বের প্রতিটি ম্যাচই ছিল চরম উত্তেজনাপূর্ণ। আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণের কারণে পলকে পলকেই ছিল রোমাঞ্চ, যার কারণে খেলা থেকে এক মুহূর্তের জন্যেও চোখ ফেরানোর উপক্রম ছিল না।

অন্যদিকে, এত এত শিরোপাপ্রত্যাশী দলের মধ্যেও তথাকথিত আন্ডারডগদের পারফরম্যান্স ছিল চোখে পড়ার মতোই। ইউক্রেন, চেক রিপাবলিক কিংবা ডেনমার্কের মতো দলগুলোর উত্থান ইউরোর আবেদন বাড়িয়েছে বহুগুণ। 

কোপা আমেরিকার প্রতি আসরে দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশের ১০টি দেশ অংশগ্রহণ করে থাকে। এর বাইরে আমন্ত্রিত দুটি দেশসহ মোট ১২টি দেশ নিয়েই সাধারণত আয়োজিত হয় কোপা আমেরিকা। তবে এবারের কোপায় ছিল না কোনো আমন্ত্রিত দল, তাই লাতিনের ১০টি দেশকে নিয়েই অনুষ্ঠিত হয়েছে এবারের কোপা।

বাছাইপর্ব খেলার ঝক্কি পোহাতে হয় না বলে কোপায় খেলা দলগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতামূলক মানসিকতা তুলনামূলকভাবে বেশ কম। শিরোপাপ্রত্যাশী দলের সংখ্যা কম হওয়ায় দলগুলোর মধ্যে লড়াই করার মনোভাবেরও বেশ অভাব দেখতে পাওয়া যায়। এবারের কোপার কথাই ধরা যাক। গ্রুপপর্বের লড়াই শেষে টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে পড়েছে লাতিনের সবচেয়ে দুর্বল দুই দল বলিভিয়া এবং ভেনেজুয়েলা। শিরোপাপ্রত্যাশী দলগুলোর মধ্যে কেবলমাত্র উরুগুয়েই সেমিফাইনালে পৌছাতে পারেনি। ফাইনালে অংশ নিয়েছে লাতিনের দুই পরাশক্তি ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা। এর মাধ্যমেই বোঝা যায়, এবারের কোপা কতটুকু প্রেডিক্টেবল ছিল৷ ইউরো যেখানে একের পর এক চোখধাঁধাঁনো থ্রিলার ম্যাচ উপহার দিয়েছে, সেখানে কোপার বেশিরভাগ ম্যাচই ছিল ম্যাড়ম্যাড়ে। গ্রুপপর্বে ব্রাজিল-কলম্বিয়া, কোয়ার্টার ফাইনালে পেরু-প্যারাগুয়ে এবং তৃতীয় স্থান নির্ধারণী পেরু-কলম্বিয়া ম্যাচ — শুধুমাত্র এই তিনটি ম্যাচেই রুদ্ধশ্বাস লড়াই দেখা গেছে। এর বাইরে প্রায় অধিকাংশ খেলার ফলাফল আগে থেকেই ধারণা করা গেছে।

প্রাইজমানি

প্রাইজমানির দিক দিয়ে কোপার তুলনায় অনেক এগিয়ে ইউরো। ফিফা বিশ্বকাপের পর অন্য যেকোনো আন্তর্জাতিক ফুটবল টুর্নামেন্টের থেকেই প্রাইজমানির দিক দিয়ে অনেক বেশি এগিয়ে। আর্থিক দৃষ্টিকোণ থেকে হিসাব করলে, এবারের ইউরো অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর জন্য আক্ষরিক অর্থেই ‘টাকার গাছ’ হয়ে উঠেছে।

ইউরো ২০২০-এ কোয়ালিফাই করা ২৪টি দলই পেয়েছে ৯.২৫ মিলিয়ন ইউরো করে। গ্রুপপর্বে একটি ম্যাচ জেতার জন্য দলগুলো পেয়েছে ১.৫ মিলিয়ন ইউরো। পরবর্তী রাউন্ডগুলোতে কোয়ালিফাই করা দলগুলো পেয়েছে যথাক্রমে ২ মিলিয়ন, ৩.২৫ মিলিয়ন এবং ৫ মিলিয়ন ইউরো করে। রানার্স আপ হওয়া ইংল্যান্ড পেয়েছে ৭ মিলিয়ন ইউরো এবং শিরোপাজয়ী ইতালি পেয়েছে ১০ মিলিয়ন ইউরো প্রাইজমানি। অর্থাৎ ৭ ম্যাচের প্রত্যেকটি জেতার কারণে ইতালি পেয়েছে মোট ৩৪ মিলিয়ন ইউরো প্রাইজমানি। প্রাইজমানি বাবদ উয়েফা দিয়েছে ৩৭১ মিলিয়ন ইউরো, যেটা ২০১৬ ইউরোতে ছিল ৩০৪ মিলিয়ন।

ইউরো ২০২০ এর প্রাইজমানির তালিকা; Image credit: businessday

অন্যদিকে প্রাইজমানির দিক দিয়ে ইউরোর চেয়ে বহুগুণে পিছিয়ে ছিল এবারের কোপা আমেরিকা। অংশগ্রহণ করা দলগুলোর জন্য বরাদ্দ ছিল না কোন প্রাইজমানি। কোয়ার্টার ফাইনাল খেলা দলগুলো পেয়েছে ১.৫ মিলিয়ন ডলার, তৃতীয় এবং চতুর্থ হওয়া দলগুলো পেয়েছে যথাক্রমে ৩ মিলিয়ন এবং ২.৫ মিলিয়ন ডলার। রানার্সআপ হওয়া ব্রাজিল পেয়েছে ৩.৫ মিলিয়ন ডলার এবং শিরোপাজয়ী আর্জেন্টিনা পেয়েছে ৬.৫ মিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এবারের কোপা আমেরিকায় প্রাইজমানি বাবদ কনমেবল খরচ করেছে মাত্র ২৩ মিলিয়ন ডলার, যা ইউরোর তুলনায় অনেক কম। 

কোপা আমেরিকার প্রাইজমানির তালিকা; Image credit: businessday

দর্শকের উপস্থিতি

কোপা আমেরিকা আর ইউরোর মধ্যে তুলনা করলে খেলার মাঠে দর্শকের উপস্থিতি দিয়ে কোপাকে ছাড়িয়ে গেছে ইউরো। কোপা আমেরিকার কথা মাথায় আসলেই আমাদের সামনে ভাসতো ছন্দময় ফুটবলের সাথে তাল মিলিয়ে দর্শকদের সুরের ঐকতান। কিন্তু এবার কোপায় মাঠের খেলায় ছিল না কোন দর্শক। ফলশ্রুতিতে টিভির পর্দায় ঝিমুতে দেখা গেছে লাতিন আমেরিকার ছন্দময় ফুটবল। খেলার মাঠে প্রতিপক্ষ একদল থাকলেও বিপক্ষ দলকে লড়াই করতে হ্য় দুই পক্ষের সাথে, মাঠের প্রতিদ্বন্দ্বী এবং মাঠের বাইরের দর্শক। কোপার ম্যাচগুলোতে গ্যালারিতে দর্শকের উপস্থিতি না থাকায় খেলোয়াড়দের মাঝে সেই লড়াই করার বাড়তি উত্তেজনার বেশ কমতি ছিল, যার ফলে খেলার মাঠ থেকে ভেসে আসা খেলোয়াড়দের নিঃশ্বাসের শব্দে পাওয়া গেছে দর্শকদের ফিরে পাওয়ার আকুতি। দর্শক না থাকায় পুরো আসরে দৈন্যতার ছাপ স্পষ্টই ছিল। তবে ফাইনালে কিছুসংখ্যক দর্শক থাকলেও তা ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার ম্যাচের কাঙ্খিত আবহ তৈরি করার জন্য যথেষ্ট ছিল না।

অপরদিকে করোনা সংক্রমণ নিম্নমুখী হতে শুরু করায় আর ভ্যাক্সিনের বদৌলতে ইউরোতে দর্শক-উপস্থিতিও ভালোই ছিল, ইউরোর গতিময় ফুটবলকে আরো প্রাণবন্ত করে তুলেছিল দর্শক উপস্থিতি। মাঠের তুলনায় দর্শক কম হলেও দর্শকের সাপোর্ট পেয়ে খেলোয়াড়রা নিজেদের সেরাটা দিয়ে খেলার চেষ্টা করেছে, যার ফলে ইউরোতে দেখা গেছে জমজমাট লড়াই।

 Image credit: Tibor Illyes/Pool/AFP

ব্যবস্থাপনা

মহামারির কারণে কোপা আমেরিকা আয়োজন করা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে বেশ দ্বিধাদ্বন্দ্বে ছিলেন আয়োজকরা। ১ সপ্তাহ আগেও যেখানে আয়োজন অনিশ্চিত ছিল, সেখানে করোনায় বিপর্যস্ত ব্রাজিল কোনোমতে দায়সারাভাবে আয়োজন করে এবারের কোপা। প্রস্তুতির ঘাটতি থাকায় আয়োজনে প্রায় সবখানেই দেখা গেছে বিস্তর গোজামিল। মাঠ নিয়ে ছিল নানা প্রশ্ন। মাঠের দুর্ব্যবস্থার কারণে খেলোয়াড়রা তাদের সবোচ্চটা দিতে পারেননি মাঠের খেলায়। দেখা গেছে অগোছালো খেলা। প্রেস কনফারেন্সে মাঠের মান নিয়ে প্রশ্ন তোলায় ব্রাজিলের কোচ তিতেকে গুনতে হয়েছে ৫০০০ ডলারের জরিমানা।

কোপার তুলনায় আয়োজনে স্বচ্ছতা ছিল ইউরোর। সবকিছুই বেশ ভালোভাবেই সম্পন্ন করা হয়। ইউরোপের ১১টি শহরে আয়োজন করা হলেও উয়েফার আয়োজনে কোনো ঘাটতি ছিল না। মাঠে এবং মাঠের বাইরে সবকিছুই বেশ ভালোভাবেই সামলেছে তারা। সব মিলিয়ে তাদের আয়োজনও প্রশংসা পাওয়ার দাবি রাখে।

মহামারির কারণে এবারের কোপা আমেরিকা আর ইউরো দুটো বড় টুর্নামেন্ট একসাথে হওয়ার ফলে ইউরো নিয়ে ফুটবলপ্রেমীদের আগ্রহের কোনো কমতি না থাকলেও, কোপা নিয়ে তাদের আগ্রহ ছিল সামান্যই। একই সময়ে আয়োজিত হওয়ার ফলে দুই টুর্নামেন্ট নিয়ে নানাজন নানাভাবে তুলনা করেছেন। তবে মাঠের খেলার ধরন, টুর্নামেন্ট আয়োজনসহ বিভিন্ন খুঁটিনাটি মিলিয়ে দেখা যায়, এবারের ইউরোর আসর কোপা’কে ছাড়িয়ে গেছে। লাতিনের ফুটবল সংস্কৃতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন না আসলে ভবিষ্যতে কোপা আমেরিকার জনপ্রিয়তা আরো কমতে থাকবে, সেটা বলাই বাহুল্য।

Related Articles