অবসর আবেদনময় হয়ে উঠবে নাকি বিভীষিকা, সেটা নির্ভর করতে পারে ইংরেজিতে এর পরিশব্দ অনুসারেও! © গেটি ইমেজ

অবসর শব্দটা যেমন দারুণ আবেদন সৃষ্টি করতে সক্ষম, তেমনি কখনো কখনো সেটা হয়ে উঠতে পারে বিভীষিকার মতো কিছু। সেটা যেমন নির্ভর করে অবসরের ধরণের উপর, তেমনি করতে পারে পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতির উপরও। ‘অবসর’ শব্দটাও বেশ ইন্টারেস্টিং, ইংরেজিতে কখনো সেটা ‘Leisure’, আবার কখনো ‘Retirement’। সুতরাং অবসর আবেদনময় হয়ে উঠবে নাকি বিভীষিকা, সেটা নির্ভর করতে পারে ইংরেজিতে এর পরিশব্দ অনুসারেও! দুষ্টুমি করছি কিনা? অবশ্যই!

তবে সব ক্ষেত্রে সবকিছু নিয়ে দুষ্টুমি করা চলে না। আমি এখানে অবশ্যই ‘শখের অবসর’ তথা ‘Leisure’ নিয়ে কথা বলতে চাইছি না, আমার আজকের আলোচনার বিষয়টা কিছুটা অন্যরকম। হ্যা, আমি রিটায়ারমেন্ট নিয়ে কথা বলতে চাইছি ; আরো একটু নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে ক্রিকেটারদের রিটায়ারমেন্ট নিয়ে কথা বলতে চাইছি।

অবসরের পর বক্সিং রিংয়ে ফ্লিনটফ © গেটি ইমেজ

ক্রিকেটাররা সচরাচর অবসর নিয়ে নেন কত বছর বয়সে? বেশিরভাগ সময়েই সেটা হয় মধ্য তিরিশে, হগ-মিসবাহ-ইউনিসদের মতো চল্লিশ পেরিয়ে গিয়েও দাপটের সাথে খেলে যাওয়া ক্রিকেটার গোটা ইতিহাসেই খুবই কম। এর আগে পুরো ক্যারিয়ারে তাঁরা অনেক নাম ছড়ান, কেউ কেউ দারুণ বিখ্যাত হয়ে ওঠেন, কেউ কেউ হয়ে ওঠেন কিংবদন্তী। কিন্তু সবার ভাগ্য এতটা ভালো হয় না, কেউ কেউ ফুটতে চেয়েও ফুটতে না পারা ফুলের আক্ষেপ নিয়ে ঝড়ে পড়েন বড্ড তাড়াতাড়ি।

অন্য যেকোনো পেশায় যেখানে অনায়াসে যে কেউ ষাট বছর বয়স অব্দি অনায়াসে কাজ চালিয়ে যেতে পারেন, সেখানে ক্রিকেটারদের পেশাটা দাবি করে মধ্য-তিরিশে অবসর। এরপর প্রতি মাসে তাঁদের বিদ্যুৎ বিল কীভাবে পরিশোধ করবেন তাঁরা? বাচ্চাদের পড়াশুনা, পরিবারের ভরণপোষন, কিংবা রঙিন জীবন, সবকিছুই তাঁদের কাছে কিছুটা ঘোলাটে হয়ে আসতেই পারে। যে পেশাটাকে এতদিন ভালোবেসে আঁকড়ে ধরেছিলেন, হঠাৎ একদিন আবিষ্কার করলেন, সেই পেশাটা এখন আর আপনাকে ডাকছে না। আপনাকে ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে জিম করতে হচ্ছে না, মাঠে দৌড়ানো লাগছে না, বোলিং মেশিন থেকে বিদ্যুৎগতিতে ছুটে আসা বলগুলোর সামনে আর দাঁড়াতে হচ্ছে না। ড্রেসিংরুমের ছোটখাটো খুনসুটিগুলো হঠাৎ আপনাকে করে তুলছে নস্টালজিক, তবু সেটা এখন আর ছুঁতে চেয়েও যেন আর ছুঁতে পারছেন না। তখন কেমন হবে তাঁদের জীবনটা, কীভাবে কাটে তাঁদের অবসর জীবন?

কীভাবে কাটে ক্রিকেটারদের অবসর জীবন? © গেটি ইমেজ

সাবেক ইংলিশ সিমার টিম লিনলি, সারে কাউন্টির হয়ে খেলতেন। তাঁকে একবার জিজ্ঞেস করা হয়েছিলো তাঁর অবসরপরবর্তী জীবনের লড়াই নিয়ে। লিনলি বলেছিলেন, “ওই সময়টাতেই আমি সবচেয়ে তীব্রভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছিলাম আমার ক্রিকেটার সত্ত্বাটাকে। আমি সেরকম বড় কোনো খেলোয়াড় ছিলাম না, নেহায়েত গড়পড়তা একজন কাউন্টি খেলোয়াড় ছিলাম। কিন্তু তবু সবার মুখে মুখে আমি ক্রিকেট খেলি শুনতে শুনতে মনের মধ্যে কোনো একটা জায়গায় যেন একটা অহমিকা জন্মে গিয়েছিলো। অনেকের জন্যই এটা একটা স্বপ্ন, যেটার স্বাদ তাঁরা আপনার মাধ্যমে হলেও পেতে চায়। অবসরের পর সেটা আর পাবেন না আপনি।”

লেখাটা লিখতে লিখতে ভাবছি, সত্যিই তো! অবসরের আগে শচীনকাব্য লেখা হয়েছে এত এত, অথচ অবসরের পর কেন যেন তাঁর স্মৃতিও সময়ের সাথে সাথে ম্লান হয়ে এসেছে। হয়তো মাশরাফির অবসরের পর তাঁর খোঁজ নিতেও মনে থাকবে না আমাদের। একইভাবে সেই সময়টা আসবে প্রত্যেক খেলোয়াড়ের জীবনেই, কীভাবে কাটাবেন তাঁরা সময়টা? যে বয়সটা তাঁদের ক্যারিয়ারে জাঁকিয়ে বসার, সেই বয়সে তাঁদের মূল পেশা থেকেই তাঁরা অবসরে চলে যাচ্ছেন। সাথে কি কিছুটা হলেও ‘মেন্টাল স্ট্রেস’ সঙ্গী হয় না?

বড্ড অসময়ে ডিপ্রেশনে আক্রান্ত হয়ে অবসরগ্রহণে বাধ্য হন ইংলিশ ব্যাটসম্যান জোনাথন ট্রট © গেটি ইমেজ

অস্ট্রেলিয়ার সাবেক ক্রিকেটারদের নিয়ে করা সাম্প্রতিক এক জরিপ থেকে দেখা গেছে, শতকরা প্রায় ২৫ ভাগ ক্রিকেটারই প্রফেশনাল ক্যারিয়ার শেষ করার পর ডিপ্রেশন কিংবা অসহায়ত্ববোধ করেছেন। শুধু সেটাই নয়, অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটার্স অ্যাসোসিয়েশন (এসিএ) জরিপ করেছে ২০০৫ সাল বা এরপর অবসর নেওয়া খেলোয়াড়দের উপর। তাঁদের সকলের সাথেই যোগাযোগ করে যেসব ফলাফল পাওয়া গেছে, সেগুলো হলো-

  • শতকরা ৩৯ ভাগ খেলোয়াড়ই উচ্চ পর্যায়ের স্ট্রেস এবং উদ্বিগ্নতার স্বীকার হয়েছেন।
  • শতকরা ২৫ ভাগ খেলোয়াড় ডিপ্রেশন কিংবা অসহায়ত্ব অনুভব করেছেন।
  • শতকরা ৪৩ ভাগ খেলোয়াড়ই মনে করছেন ক্রিকেট ছেড়ে দেওয়ার পর তাঁরা নিজের পরিচয় হারিয়ে ফেলেছেন।

ব্যাপারটা শুধু এই অবধি এসেই যদি থেমে যেত, তাহলেও হয়তো হতো। কিন্তু কখনো কখনো এ সমস্যা আরো বড় করে দেখা দেয় বৈকি, কখনো কখনো সেটা মৃত্যু পর্যন্তও চলে যেতে পারে!

চরমভাবে ডিপ্রেশনে ভুগতে ভুগতে মাত্র ৪৬ বছর বয়সে আত্মহত্যা করেন ডেভিড বেয়ারস্টো © গেটি ইমেজ

১৯৯৮ সালের ৫ জানুয়ারি ইংল্যান্ডের জনপ্রিয় একজন ক্রিকেটার ডেভিড বেয়ারস্টোকে তাঁর নিজের বাসায় ঝুলন্ত অবস্থায় যখন পাওয়া যায়, ততক্ষণে তিনি মৃত। এর মাত্রই কয়েক মাস আগেই একটি পাবলিক ডিনার অনুষ্ঠানে ইংল্যান্ডের প্রাক্তন অধিনায়ক মাইক ব্রিয়ারলির সাথে দেখা হয়েছিলো বেয়ারস্টোর, সেখানে তিনি নিজ মুখেই স্বীকার করেছিলেন চরমভাবে ডিপ্রেশনে ভোগার কথা। মাইক ব্রিয়ারলি ততদিনে ‘সাইকো-অ্যানালিস্ট’ হিসেবে বেশ নামডাক ছড়িয়েছেন। তিনি বেয়ারস্টোকে একটি প্রাইভেট সেশনের প্রস্তাব দেন, তবে বেয়ারস্টো বিনীতভাবেই সে প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন। এর কয়েকমাস বাদেই তিনি আত্মহত্যা করেন। তাঁরই সতীর্থ একজন খেলোয়াড় ফিল ক্যারিক বলেন, “বেয়ারস্টো দুর্দান্ত উইকেটকিপার কিংবা অসাধারণ কোনো ব্যাটসম্যান ছিলেন না, তবে দারুণ একজন ক্রিকেটার ছিলেন।”

অবসরের পর পুরোদস্তুর সাইকো-অ্যানালিস্ট বনে যান মাইক ব্রিয়ারলি © গেটি ইমেজ

নাহ, বেয়ারস্টোই প্রথম ব্যক্তি হিসেবে আত্মহত্যা করেননি। এমন আরো অন্তত ১৫০জন ক্রিকেটারের খোঁজ পাওয়া যায়, যারা আত্মহত্যা করেছিলেন। এদের মধ্যে ২০জন ছিলেন অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং নিউ জিল্যান্ডের টেস্ট খেলোয়াড়। ওই দেড়শজনের মধ্যে অধিকাংশই চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ বছর বয়সের মধ্যেই আত্মহত্যা করেন, যেটা নিয়ে ডেভিড ফ্রিথের ‘সাইলেন্স অফ দ্য হার্ট’ বইতে দৃঢ়ভাবে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।

তবে সেখানে ফ্রিথ এমন একটা কথা লিখেছিলেন, যা নিয়ে পরে তাঁর আফসোসের বিশেষ অন্ত ছিলো না।  “ক্রিকেটাররাই কেন এত অপাংক্তেয়? একজন ব্যাটসম্যানের আউট হয়ে যাওয়ার মানে একেবারেই মাঠ ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়া, আর সারাদিন ঘন্টার পর ঘন্টা ‘হোর ডি কমব্যাট’ তথা অপাংক্তেয় হয়ে বসে থাকা। এটা অনেকটা মৃত্যুর সাথেই তুলনা করা যেতে পারে। এটা হয়তো ভবিষ্যতে তাঁদের শক্তি যোগায় অবসরপরবর্তী সময়ে শোক কিংবা অন্য কোনো আবেগী মুহুর্তে!” বেয়ারস্টোর আকস্মিক মৃত্যু নিঃসন্দেহে ছুঁয়ে গিয়েছিলো ডেভিড ফ্রিথকে। পরে ফ্রিথ আফসোস করে লেখেন, “আমি সম্ভবত সেইসব মানুষের একজন, যে খুঁজে ফিরছে সে আরো কিছু করতে পারতো কিনা ওদের জন্য!”

কিন্তু কেন এত এত ক্রিকেটার বারবার আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে বাধ্য হন? সেটা নিয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলার উপায় নেই। তবে সবচেয়ে সংক্ষেপে খুব সুন্দরভাবে একটা ছোট্ট ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন স্যার ভিভ রিচার্ডস, “মানুষ তখনই এমন কিছু করতে বাধ্য হয়, যখন কোনো অশান্তি বা দুর্ভাবনা কোনোভাবেই তাঁকে আর বাঁচতে দেয় না।”

আর্থার মেইলি অবসরের পর কিছুদিন সাংবাদিকতা করেন, এরপর পেটের তাগিদে চাকরি করেন একটি কসাইখানায়। © গেটি ইমেজ

কিছুক্ষণ আগেই বলছিলাম শচীন টেন্ডুলকারের কথা। আচ্ছা, নিউজিল্যান্ডের টেকো মাথার ডিবলি-ডবলি বোলিং করা অলরাউন্ডার ক্রিস হ্যারিসের কথা তো নিশ্চয়ই মনে আছে। বলুন তো, তিনি এখন কি করছেন? আমিই বলে দিচ্ছি। হ্যারিস এখন ক্রিকেট থেকে অনেকটা দূরে, এখন তিনি একজন সামান্য মেডিকেল রিপ্রেজেন্টিটিভ হয়ে চাকরি করছেন। স্যার রিচার্ড হ্যাডলির ওপেনিং বোলিং পার্টনার ইউয়েন চ্যাটফিল্ড এখন একজন বাস ড্রাইভার হয়ে কোনোক্রমে জীবিকানির্বাহ করছেন। ভিক্টোরিয়ার রেকর্ডসংখ্যক ১,০১৭ রান করার সেই বিখ্যাত ইনিংসে প্রতিপক্ষ নিউ সাউথ ওয়েলসের হয়ে সর্বোচ্চ উইকেটসংগ্রাহক আর্থার মেইলি শুরুতে কিছুদিন সাংবাদিকতা এবং যৎকিঞ্চিত লেখালেখির চেষ্টা করেন। সেদিকটায় খুব একটা সুবিধা করে উঠতে না পেরে শেষমেষ পেটের তাগিদে কাজ নেন একটি কসাইখানায়। তাঁর জানালায় বড় করে একটা প্লাকার্ড টাঙানো ছিলো, যাতে লেখা ছিলো, “Mailey: used to bowl tripe; used to write tripe; now he sells tripe.” 

সবাই যেন ক্রিকেট থেকে সরে গেছেন অনেকটাই, বাস্তবতার কষাঘাতে যেন বিদ্ধ হয়েছেন প্রতিনিয়ত। পিটার রোবাক তাহলে সত্যিটাই লিখেছিলেন সেদিন, “ক্রিকেটের নিগুঢ় কিছু বাস্তবতা আছে, গুপ্ত কিছু রহস্য আছে, আছে কঙ্কালসার এক হাড় জিরজিরে রূপও!”

তথ্যসূত্র

১) espncricinfo.com/england/content/player/8954.html

২) dailymail.co.uk/sport/article-41051/Cricket-Why-life-retirement-just-life-all.html

৩) smh.com.au/sport/cricket/retirement-brings-mental-anguish-to-quarter-of-cricket-players-20131222-2zt7t.html

৪) espncricinfo.com/magazine/content/story/1088394.html