ফুটবল একটি জনপ্রিয় খেলা এবং পৃথিবীর সকল দেশের মানুষই কম-বেশি ফুটবল খেলে। শত বছরের অধিক পুরনো এই খেলায় সময়ের সাথে এসেছে আমূল পরিবর্তন। আর পরিবর্তনের ধারা ছড়িয়ে গেছে সবার মাঝেও। যারা ফুটবল খেলা দেখেন তাদের কাছে ব্যাপারটা এখন যেমন মনে হয়, শুরুর দিকে কিন্তু খেলাটা এবং তার নিয়মনীতি মোটেও এরকম ছিল না। সময়ের সাথে এই পরিবর্তনকে তুলে ধরাই এই লেখার মূল উদ্দেশ্য।

শুরুর কথা

ফিফার মতে, ফুটবলের প্রাথমিক এবং প্রারম্ভিক ধারণার অবতারণা হয় সুদূর চীনে। সেখানকার মানুষরা এটাকে ‘Cuju’ নামে চিনত। এছাড়া প্রাচীন রোমান এবং গ্রিক সম্প্রদায়ের মানুষও ফুটবল খেলত। মধ্যযুগে ইউরোপে ফুটবলের জনপ্রিয়তা প্রথম ছড়িয়ে পড়ে। উনবিংশ শতাব্দীতে ফুটবল অনেক জনপ্রিয়তা লাভ করে এবং ইংল্যান্ডের সব পাবলিক স্কুলে ফুটবল খেলার সূচনা ঘটে। প্রত্যেক স্কুলের ছিল নিজস্ব নিয়ম। ১৮৬৩ সালে প্রথম এই নিয়মের পরিবর্তন ঘটে যখন সকল স্কুলের গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়েরা একত্রিত হয় এবং একটি কমিটি গঠন করে। এর নাম দেয়া হয় FA (Football Association)। তারা সকলে মিলে তখন সার্বজনীন কিছু নিয়ম প্রবর্তন করে, যাতে বিভিন্ন স্কুলের বিভিন্ন নিয়মের মাঝে কোনো ঝামেলা বা ভুল বোঝাবুঝি না থাকে।

শেফিল্ড এফ.সি ফুটবলের প্রথম স্বাধীন এবং সবচেয়ে পুরাতন ক্লাব; Source: 90min.com

এরপর থেকেই ক্লাবের উৎপত্তি হতে শুরু করে। ক্লাবগুলোতে সাধারণত অধিক সংখ্যক আক্রমণভাগের খেলোয়াড় থাকতো এবং খুবই কম সংখ্যক মিডফিল্ডার ও ডিফেন্ডার খেলাতো। ঐ সময় খেলোয়াড়রা কখনও কেউ কাউকে বল পাস করত না। বল পায়ে পাওয়া মাত্র তারা ড্রিবল করে এবং দৌড়িয়ে সামনে এগিয়ে যেত যতক্ষণ না পর্যন্ত প্রতিপক্ষের দ্বারা বাধাগ্রস্ত হত কিংবা গোলপোস্টে শট নেয়া যেত। তারা তখনও জানতোই না যে ফুটবলে পাসিং বলে একটা বিষয় থাকতে পারে! তখন এরকম একটি নিয়ম ছিল যে, কোনো খেলোয়াড় তখন বল স্পর্শ করতে পারবে না এবং সামনে এগিয়ে নিতে পারবে না, যখন তার অন্য একজন সতীর্থ তার চেয়ে প্রতিপক্ষের গোলপোস্টের বেশি নিকটে থাকবে।

বুঝতে পারলেন না?

আচ্ছা, সহজ করে বললে ব্যাপারটা হলো এই যে, কোনো খেলোয়াড় সামনের দিকে পাস দিতে পারবে না। উপরে স্পর্শের কথা বলা হয়েছে, কেননা তখন কেউ পাস করত না। সুতরাং বল পাস করার একমাত্র উপায় ছিল ভুলক্রমে। এখন আপনি যদি ভুলক্রমেও সামনের কাউকে পাস দিয়ে ফেলেন, তো খেলা সেখানেই বন্ধ এবং নতুন করে শুরু করা হত। কথাটা হাস্যকর শোনালেওসত্যি। তখন এখনকার মতো স্কিলনির্ভর ড্রিবলিং ছিল না। তাই যারা শারীরিকভাবে শক্তিশালী, তারাই প্রতিপক্ষকে ড্রিবলিংয়ে বেশি পারদর্শী ছিল।

১৮৬৬ সালে ফরোয়ার্ড পাসিং নিষেধের নিয়ম ছিল তুলে নেয়া হয় এবং অফ-সাইডের নিয়ম চালু হয়। তখনকার অফ-সাইডের নিয়ম এখনকার চেয়ে অনেক কঠিন ছিল। কেমন কঠিন?

আপনাকে অবশ্যই তিনজন প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়ের পিছনে থাকতে হবে (গোলকিপার অন্তর্ভুক্ত)। অন্যথায় আপনি অফ-সাইডে চলে যাবেন। অথচ এখন আপনি যেকোনো একজন প্লেয়ারের পিছনে থাকলেই অফ-সাইড হবেন না (গোলকিপার সহ দুজন)। এই কঠিন অফ-সাইডের নিয়ম প্রায় ৬০ বছর বহাল ছিল!

হ্যামিল্টন ক্রিসেন্ট পার্ক- এখানেই অনুষ্ঠিত হয়েছিলো ফুটবল ইতিহাসের প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচ; Source: Wikimedia Commons

আনুষ্ঠানিকভাবে প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচ হয় ১৮৭২ সালে এবং সেটি সংঘটিত হয় ইংল্যান্ড ও স্কটল্যান্ড এর মাঝে। সেই ম্যাচে ইংল্যান্ড ১-২-৭ ফর্মেশনে খেলে, যেখানে একজন ডিফেন্ডার, দুজন মিডফিল্ডার এবং সাতজন ফরোয়ার্ড ছিল। অন্যদিকে প্রতিপক্ষ স্কটল্যান্ড ইংল্যান্ডের মতো এতটা অভিজ্ঞ ছিল না ফুটবলে। তাই তাদের কিছুটা ডিফেন্সিভ খেলতে হয়। সেখানে তাদের ফর্মেশন ছিল ২-২-৬। প্রত্যেক খেলোয়াড়ের ভূমিকা সেখানে খুবই পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করা ছিল, যেমন: শুধু ডিফেন্ডাররাই ডিফেন্স করবে। কোনো ফরওয়ার্ড ডিফেন্ডিংয়ে সাহায্য করতে পারবে না। শুধুমাত্র মিডফিল্ডাররাই ডিফেন্স এবং আক্রমণ উভয় ক্ষেত্রে সাহায্য করতে পারবে।

স্কটল্যান্ডের খেলোয়াড়রা যখন ইংল্যান্ডের খেলোয়াড়দের মুখোমুখি হলো, তখন তারা একটি সমস্যার সম্মুখীন হলো। ইংল্যান্ডের সকল খেলোয়াড়রা স্কটল্যান্ডের খেলোয়াড়দের চেয়ে শারীরিকভাবে শক্তিশালী এবং লম্বা ছিল। তাই তাদেরকে ড্রিবল করতে কিংবা বিট করতে স্কটল্যান্ডের খেলোয়াড়দের প্রচণ্ড বেগ পেতে হচ্ছিল। তাই স্কটল্যান্ডের খেলোয়াড়দের কোনো উপায় ছিল না নিজেদের মাঝে বল পাস করা ছাড়া। সেই ম্যাচের ফলাফল ছিল 0-0। সেখান থেকেই স্কটিশরা তাদের স্কুলগুলোতে পাসিং ফুটবল খেলানো শুরু করলো এবং ফুটবলে ড্রিবলের সাথে পাসিংও একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হিসেবে যোগ হল।

ফুটবলে পিরামিডের আবিষ্কার

১৮৭৮ সালে ওয়েলসের রেক্সহাম নামক এক ফুটবল ক্লাব এক অভূতপূর্ব ট্যাকটিক্যাল পরিবর্তন আনে ফুটবলে। যেহেতু দলগুলো এখন ঐ স্কটল্যান্ড টিমের ন্যায় ২-২-৬ কাঠামোতে খেলছিল এবং নিজেদের মাঝে পাসিং শুরু করেছিল, তারা একটি সমস্যার সম্মুখীন হয়। কী ছিল সেই সমস্যা? যেহেতু তাদের কাঠামোতে ৬ জন ফরওয়ার্ড খেলত, সেই কারণে দেখা যেত প্রতিপক্ষ দলের গোলমুখে অনেকটা ভিড় লেগে আছে সবসময় এই ছয়জনের কারণে। এতে তারা যথেষ্ট জায়গা পেত না।

পিরামিড ফর্মেশন; Source: Mario Ortegon

রেক্সহাম নামক সেই ক্লাবটি তাদের এক ট্যাকটিক্যাল পরিবর্তন দিয়েই ১-০ ব্যবধানে হারায় ড্রুইডস ক্লাবকে এবং জিতে নেয় ওয়েলস কাপ ফাইনাল। তাদের পরিবর্তন ছিল ৬ জন ফরোয়ার্ড থেকে ১ জনকে মধ্যমাঠে শিফট করিয়ে ৫ জন ফরোয়ার্ড এবং ৩ জন মিডফিল্ডার নিয়ে খেলা। ফরোয়ার্ড ৫ জন হবার কারণে সবার মাঝে একজন থাকতো। বাকি দুজন থাকতো ওয়াইড এরিয়াতে। আর মাঝখানের ফরওয়ার্ডের দু’পাশে দুজন ছিল। তারা মাঝের ঐ একজন ফরোয়ার্ডের সাথে একটু নিচে নেমে খেলত। এই দুজনের নাম দেয়া হলো ইনসাইড ফরোয়ার্ড। দু’পাশে ওয়াইডলি যে দুজন ফরোয়ার্ড অবস্থান করত, তাদের নাম দেয়া হলো আউটসাইড ফরওয়ার্ড। অন্যদিকে যে একজন ফরোয়ার্ড মধ্যমাঠে স্থানান্তরিত হলো, তার নাম দেয়া হলো সেন্টার হাফ। আর যে একজন ফরওয়ার্ড সবার মাঝে অবস্থান করত তার নাম দেয়া হলো সেন্টার ফরোয়ার্ড। আউটসাইড ফরওয়ার্ডরা সবসময় ওয়াইড পজিশনে অবস্থান করত আক্রমণভাগের গভীরতা বাড়ানোর জন্য। ইনসাইড ফরওয়ার্ডরা সেন্টার ফরওয়ার্ডকে ঘিরে থাকতো এবং ওয়াইড ফরওয়ার্ডদের সাপোর্ট দিত। এতে করে আগের ৬ জন ফরোয়ার্ড লাইনের চেয়ে ৫ জনের ফরওয়ার্ড লাইনে বেশি স্পেস তৈরি হলো এবং ফরোয়ার্ডরা তাদের দায়িত্ব পালন করে খুব সহজেই নড়াচড়া করতে পারতো।

তবে আসল সুবিধা বের হলো রক্ষণভাগে। কেননা আগে সর্বমোট ৪ জন ডিফেন্স করত। একজন ফরওয়ার্ড কমে যাওয়ায় এখন ৫ জন ডিফেন্স করতে পারে। ফলে প্রতিপক্ষ আক্রমণভাগের খেলোয়াড়দের আটকাতে আগের চেয়ে বেগ কম পেতে হল তাদের। একটু খুলে বললে ব্যাপারটা এরকম দাঁড়ায়, আগে মিডফিল্ডে দুজন ছিল এবং তারা মাঠের মাঝ বরাবর অবস্থান করত, যাতে যেকোনো দিকে যেকোনো সময় তারা মুভ করতে পারে। একজন মিডফিল্ডার বেড়ে যাওয়ায় তাকে মাঝে রেখে বাকি দুজন ডানে এবং বামে স্থায়ীভাবে স্থানান্তরিত হলো। ফলে মিডফিল্ডে রক্ষণভাগের অবস্থান অনেকটাই জোরালো হলো।

রেক্সহাম ক্লাবের তৈরি এই নতুন কাঠামো তখন দাঁড়ায় ২-৩-৫ এবং এটাকে তখন বলা হত ‘দ্য পিরামিড ফর্মেশন’। কেননা আদতে দেখতেও এটা পিরামিডের মতোই লাগত। যে আক্রমণভাগের খেলোয়াড়টি মধ্যমাঠে স্থানান্তরিত হলো, তার ভূমিকা ছিল পিরামিডে সবচেয়ে বেশী। তার কাজ ছিল একইসাথে ডিফেন্ডারদের কাছ থেকে বল নেয়া এবং তা ফরওয়ার্ড লাইনে পৌঁছে দেয়া। তা নিজে হোক কিংবা বাকি দুজন মিডফিল্ডারের সহযোগিতায় হোক। অর্থাৎ মাঠে খেলা ১১ জনের ভেতর সবচেয়ে ভালো খেলোয়াড়টি হতো সেন্টার হাফ।

এরপর থেকেই এই পিরামিড ফর্মেশন ফুটবল জগতে সুনামের বার্তা ছড়িয়ে দিল এবং অধিকাংশ ক্লাব এ কাঠামো ব্যবহার শুরু করল। ঐ সময় এটাই ছিল সবচেয়ে বেশী ব্যবহৃত ফর্মেশন এবং তা দীর্ঘদিন বজায় ছিল। পিরামিড ফর্মেশন আসার পরেই ফুটবলে অফ দ্য বল মুভমেন্টের শুরু হয়। কেননা এই কাঠামোতে খেলোয়াড়রা মাঠের বেশি জায়গা দখল করত এবং নিজেকে সবসময় এমন জায়গায় রাখার চেষ্টা করত যাতে তার বল রিসিভ করতে এবং তা পাস করতে সুবিধা হয়।

কাউন্টার অ্যাটাকের সূত্রপাত

উনবিংশ শতাব্দীর শেষ থেকে শুরু করে বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি পর্যন্ত এই পিরামিড ফর্মেশন খুবই জনপ্রিয় ছিল। তবে বিপত্তি ছিল একটাই, ওই কঠিন অফসাইড নিয়ম। এর ফলে খুব সহজেই প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডাররা আক্রমণভাগের খেলোয়াড়দের অফসাইডের ফাঁদে ফেলতে পারত। কেননা পিরামিড ফর্মেশনে প্রধান ডিফেন্ডার ছিল মাত্র ২ জন, যাদের বিপক্ষে আক্রমণভাগের খেলোয়াড় ছিল ৫ জন। এতে করে ম্যাচগুলোতে গোলও খুব কম হত, যেটা একটা সময় ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের নজরে আসে। ফলশ্রুতিতে তারা ১৯২৫ সালে আগের অফসাইড নিয়ম পরিবর্তন করে নতুন নিয়ম প্রবর্তন করেন, যেখানে গোলকিপার সহ ২ জন প্রতিপক্ষের অধীনে কোনো খেলোয়াড় থাকলেই সে আর অফসাইড হবে না (বর্তমানেও একই নিয়ম চালু রয়েছে)। ফলে নতুন অফসাইড নিয়মে প্রচুর গোল হওয়া শুরু করলো ম্যাচগুলোতে।

ফুটবল জগতে ঐ সময়ে সেরা ম্যানেজার ছিলেন হারবার্ট চ্যাপম্যান। তিনি ছিলেন হাডার্সফিল্ডের ম্যানেজার এবং তার দল ছিল খুবই শক্তিশালী ও সাফল্যমণ্ডিত। এরপর তিনি আর্সেনালের ম্যানেজার হন এবং তার অধীনে আর্সেনালও ছিল দুর্দান্ত। এই চ্যাপম্যান ফুটবলে নতুন কিছুর সূচনা ঘটান। কী ছিল সেটা? সেটা হলো ফুটবলের সর্বকালের অন্যতম সৌন্দর্যময় কাউন্টার অ্যাটাক। সেই সময়ে যে দলের কাছে বল বেশিক্ষণ থাকতো, সাধারণত ম্যাচের ফলাফল তাদের দিকেই যেত। কেননা যত বেশি বল আপনার পায়ে থাকবে আপনি ম্যাচ তত বেশি ডমিনেট করবেন যা খুবই সাধারণ কথা। কাউন্টার অ্যাটাক তখন ব্যবহার করা হত ভুলবশত। এই হারবার্ট চ্যাপম্যানই প্রথম ম্যানেজার, যিনি কাউন্টার অ্যাটাককে ট্যাকটিক্স হিসেবে খেলানোর সূচনা করেন।

হারবার্ট চ্যাপম্যান; Source: Thesefootballtimes.com

নতুন অফসাইড নিয়মে ঐ পিরামিড ফর্মেশন বিরাজমান রেখে ডিফেন্স করা অনেক কঠিন ছিল। ফলে চ্যাপম্যান ঐ পিরামিড কাঠামোতে সেন্টার হাফকে ডিফেন্স লাইনে নামিয়ে দিলেন, যার নাম দেয়া হলো সেন্টার ব্যাক। এখন ডিফেন্সে ৩ জন হবার কারণে তা আগের চেয়ে বেশ শক্ত হলো। কিন্তু মিডফিল্ডে সেন্টার হাফের অনুপস্থিতিতে ক্রিয়েটিভিটি এবং বল সাপ্লাইয়ে বেশ বড় রকমের ঝামেলায় পড়লেন চ্যাপম্যান। ফলে তিনি ঐ সেন্টার ফরওয়ার্ডের দুই পাশে খেলা দুজন ফরোয়ার্ডকে একটু নিচে নামিয়ে দিলেন, যাতে তারা দুজন একইসাথে মিডফিল্ডের সাথে সংযোগ রেখে বল ফরোয়ার্ড লাইনে সাপ্লাই করতে পারে এবং প্রয়োজন মতো নিচে নেমে ডিফেন্স করতে পারে। এতে দেখা গেল তার দল বেশ ভালোভাবে ডিফেন্স করতে পারছে। তখন চ্যাপম্যান তার দলকে বল পজেশনে না খেলিয়ে নিচে নেমে ডিফেন্সের কাজে লাগিয়ে দিলেন, যাতে প্রতিপক্ষ দল বলের দখল বেশি রেখে আক্রমণ করে। কাঠামোতে পরিবর্তন এনে চ্যাপম্যান পুরোই ভেল্কি দেখালেন প্রতিপক্ষকে বল পায়ে ধরে না রেখেও। কেননা তখন চ্যাপম্যানের দলের কাঠামো ছিল ৩-২-২-৩। ফলে তার দল ডিফেন্স করার সময় বেশ নিচে থাকলেও উপরের ৩ জন অ্যাটাকার প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডারদের ঘেঁষে অবস্থান করত। এতে করে তার দল বল দখল করা মাত্র দ্রুতগতিতে আক্রমণ করত এবং প্রতিপক্ষ দল ডিফেন্স করার জন্য সঠিক জায়গায় ফেরার আগেই চ্যাপম্যানের খেলোয়াড়রা বল তাদের জালে ঢুকিয়ে দিত। কাউন্টার অ্যাটাককে এভাবে ব্যবহার করা শুরু করলেন চ্যাপম্যান এবং আবিষ্কার হলো বিখ্যাত ‘দ্য W-M কাঠামো’। কেননা তার ৩-২-২-৩ দলকে দেখতে ইংরেজির W এবং M অক্ষরের মতো লাগত।

W-M ফর্মেশন; Source: Wikimedia Commons

তার এই বিখ্যাত কাঠামোতে সেন্টার ফরওয়ার্ডের পাশে থাকা সেই দুজন ফরওয়ার্ড, যাদের কিছুটা নিচে নামিয়ে দেয়া হলো, তারা ক্রিয়েটিভ রোলের দায়িত্ব নিলো পুরোপুরি। ফলে ৩ জনের নতুন ডিফেন্স লাইনের সামনে যে দুজন মিডফিল্ডার ছিল তারা অ্যাটাকিং বা বল সাপ্লাইয়ে না গিয়ে ডিফেন্ডিংয়ে বেশি মনোযোগ দিল। এতে করে দলের যে দুজন ওয়াইড ফরওয়ার্ড ছিল, তাদের নাম পরিবর্তন হয়ে উইঙ্গার হয়ে গেল এবং তারা ফরওয়ার্ড সাপোর্ট রোল থেকে বেরিয়ে গোল স্কোরিংয়ে মনোযোগ দিল। তখন যেহেতু সবচেয়ে প্রচলিত ছিল পিরামিড ফর্মেশন, সেহেতু চ্যাপম্যানের দলকে ৫ জনের ফরওয়ার্ড লাইনকে ডিফেন্স করতে হত। আগের দুজন ওয়াইড মিডফিল্ডার, যারা এখন ডিফেন্সের বেশি সাহায্য করত, তারা মার্ক করত প্রতিপক্ষ দলের দুজন ইনসাইড ফরোয়ার্ডকে। নিচে ডিফেন্স লাইনের মাঝেরজন অর্থাৎ সেন্টার-ব্যাক মার্ক করত প্রতিপক্ষের সেন্টার ফরোয়ার্ডকে এবং সেন্টার ব্যাকের পাশের দুজন ডিফেন্ডার মার্ক করত প্রতিপক্ষ দলের বাকি দুজন ওয়াইড ফরওয়ার্ডকে। ফলাফল ছিল খুবই শক্তিশালী আর্সেনাল টিম, যারা অনেক টাইটেল জিতে নেয় সেই সময় চ্যাপম্যানের অধীনে এই অভূতপূর্ব পরিবর্তনে। তখন থেকে পিরামিড ফর্মেশনের নাম-ডাককে হটিয়ে এই W-M ফরমেশনের নাম-ডাক ছড়িয়ে পড়ে এবং দীর্ঘদিন এই কাঠামো বিশ্ব ফুটবলে রাজত্ব করে। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝির পর থেকে একবিংশ শতাব্দীর শুরু পর্যন্ত অনেক ফর্মেশনের পেছনের প্রধান কারিগর ছিল এই W-M কাঠামো। ফুটবল বিশ্বকে পাল্টে দেয়ার এক অনন্য নাম চ্যাপম্যান এবং তার এই যুগান্তকারী আবিষ্কার।

তথ্যসূত্র

Jonathan Wilson, Inverting the Pyramid: The History of Soocer Tactics (2013)