কিলিয়ান এমবাপে: নতুন প্রজন্মের ফরাসি প্রডিজি

খুব কাছ থেকে ফুল ফুটতে দেখার তাৎক্ষণিক, স্বর্গীয়, এবং রোমাঞ্চকর অনুভূতিটা অবিশ্বাস্য, বিস্ময়কর। আর্সেন ওয়েঙ্গার তার ফুটবল ক্যারিয়ারে এমন কিছু বিরল অথচ অবিস্মরণীয় মুহূর্ত দেখেছেন, যাদের মধ্যে অন্যতম ছিল একদম ছোটবেলায় কিলিয়ান এমবাপেকে প্রথমবার দেখা।

এমবাপে তখন খেলতেন মোনাকোর হয়ে। তার তখনকার খেলা নিয়ে আর্সেন ওয়েঙ্গার বলেছিলেন,

“যখন প্রথমবার আমি তাকে খেলতে দেখলাম আমি বলেছিলাম, ‘এই ছেলে তো সাক্ষাৎ পেলে’র মতো খেলে!’”

এই ঘটনার বহু বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো ওয়েঙ্গারের সেই বিস্ময়ের ঘোর কাটেনি।

এমবাপে এবারের ইউরো ২০২০ এ এসেছিলেন যখন ফুটবল বিশ্বে তার নামটি ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠিত কয়েকজন খেলোয়াড়ের সাথে উচ্চারিত হচ্ছে। আর্সেন ওয়েঙ্গারের মতে, এমবাপের যাত্রা এখনো চলমান রয়েছে তার এই প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পথে। এই সেরা খেলোয়াড় হওয়ার পথটিতে প্রচুর উঁচু-নিচু ধাপ রয়েছে, যার মধ্যে এমবাপে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধাপে রয়েছেন।

“আপনি যদি ১৭ থেকে ২০ বছর বয়সী কিছু প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের নিয়ে কাজ করেন, তবে খেয়াল করবেন যে তারা যখন বিশে পা দেবে, তখন তাদের মধ্যে কয়েকজনকে আপনি আলাদা করে চিনতে পারবেন। এই আলাদা হওয়া দলটি যখন আবার বাইশ বা তেইশে পা দেবে তখন আপনি আবার দেখবেন যে সেই দলের কয়েকজন খেলোয়াড়ও বাকিদের থেকে অনেক আলাদা। শুরুতে যে বড় দলটি ছিল, তাদের মধ্য থেকে খুব অল্প কয়েকজনই এভাবে অন্যদের ছাড়িয়ে এই পর্যায়ে এসেছে। এমবাপে এখন রয়েছে এই বয়সটাতেই। তার সামনে আর মাত্র একটি ধাপ রয়েছে যেখানে সেরা খেলোয়াড়েরা তাদের সমসাময়িকদের ছাড়িয়ে যায়। সেখান থেকে তাদের ক্রমাগত উন্নতি হতে থাকে। কিন্তু এর জন্য প্রয়োজন দৃঢ সংকল্প, নিজেকে উজাড় করে দেয়ার মানসিকতা এবং বুদ্ধিমত্তা। এমবাপের মধ্যে এই সকল গুণই বিদ্যমান।”

২০১৮ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে এমবাপের সেই বিখ্যাত দৌড়; Image Credit: Getty Images

এমবাপে তার ক্যারিয়ারের বিকাশের এমন একটি মুহূর্তে রয়েছেন, যাকে বলা যায় সদ্য অঙ্কুরিত একটি কূড়ি অপেক্ষা করছে একটি পূর্ণাঙ্গ ফুল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার। এই সময়ে এসে ফ্রান্সের হয়ে এমবাপের কীর্তি দেখে আর্সেন ওয়েঙ্গার রীতিমতো বিমুগ্ধ হয়েছিলেন। সদ্য কৈশোর পেরোনো এমবাপে নিজের ক্যারিয়ারকে ততদিনে একটি ভাল জায়গায় নিয়ে গিয়েছেন ২০১৮ সালের বিশ্বকাপে চোখ জুড়ানো প্রদর্শনীর মাধ্যমে।

তিনি আরো বলেন,

“সে এখন অত্যন্ত পরিণত এবং তার দায়িত্বের প্রতি খুবই সচেতন। দৌড়ের সময় তার টাইমিং সবসময়ই ভাল ছিল। নিজের ক্ষিপ্রতার মাধ্যমে শুরুতেই অন্যদের পেছনে ফেলে দিতে পারে। সেই সাথে তার ফিনিশিং একদম দুর্দান্ত। তার এই ক্ষিপ্রতা ও শক্তিমত্তা দিয়ে যেকোনো সময় সে অন্যদের চমকিয়ে দিতে পারে। যদিও ফুটবল তার জন্য একদম সহজাত ছিল, তবুও সে যখন থেকে নেইমারের সাথে ভাল বোঝাপড়া রেখে খেলা শুরু করেছে, তখন থেকে সে নিজেকে একজন ‘পরিপূর্ণ ফুটবলার’ হওয়ার পথে নিয়ে গিয়েছে। এটি তাকে অন্যদের সাথে বোঝাপড়া ঠিক রেখে, নিজের গতিকে আয়ত্ত্বে রেখে খেলতে অনেক সাহায্য করেছে।”

প্রত্যাশার পারদ স্বাভাবিকভাবেই উপরে ওঠে। ওয়েঙ্গার মনে করেন, এমবাপেই হবেন একবিংশ শতাব্দীর এখন অব্দি সেরা দুই ফুটবলারের উত্তরসূরী। তিনি বলেন,

“আমরা এমন দু’জন ফুটবলারকে দেখেছি যারা গত ১৫ বছর ধরে শ্রেষ্ঠত্বের এক অন্যরকম মানদণ্ড নির্ধারণ করেছে। মেসি-রোনালদো ফুটবল বিশ্বে এতদিন নিজেদের আধিপত্য ধরে রেখেছে। তাদের এই কীর্তিগুলো অস্বীকার করা সম্ভব নয়। এভাবে টানা ১৫ বছর একইভাবে পারফর্ম করে চলা রীতিমতো অবিশ্বাস্য। কিন্তু তারা চলে গেলে এরপর কে আসছে? আমার মনে হয়, নিঃসন্দেহে একজনকে পাওয়া গেছে।”

এমবাপের বয়স যখন ৩ বছর, তখন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর স্পোর্টিং লিসবনের হয়ে অভিষেক হয়। আর ৫ বছর বয়সের সময় দেখেন মেসিকে প্রথমবারের মতো বার্সেলোনার হয়ে খেলতে। ওয়েঙ্গার তাই মনে করেন, এই দুই ফুটবলার এমবাপের ফুটবলার হিসেবে গড়ে ওঠার পেছনে দারুণভাবে প্রভাব রেখেছেন। তারা দু’জন যেভাবে অন্যদের থেকে নিজেদের আলাদা করে চেনাতে পেরেছেন, এমবাপেও সেভাবে নিজেকে তৈরি করার চেষ্টা করেছেন। নিজের সমসাময়িক অন্যদের চাইতে এমবাপে ফুটবলার হিসেবে নিজের দক্ষতা ফুটিয়ে তুলেছিলেন। এই সংকল্প তাকে একটি লম্বা সময়ের জন্য অন্যদের থেকে আলাদা করে তুলেছে।  

এমবাপের জন্য এই অন্তর্নিহিত অনুপ্রেরণা কীভাবে কাজ করত? এই নিয়ে কাজ করেছিলেন ক্যানাল প্লাসের প্রখ্যাত সাংবাদিক আঁতোয়ান লে রয়। তিনি একটি ছোট তথ্যচিত্রে ব্যাপারটি তুলে এনেছিলেন।

এমবাপের সাথে তার খুব ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। তো একদিন তারা দু’জন এমবাপের বাসায় যান ভিডিও গেম খেলতে। হঠাৎ এমবাপে লক্ষ্য করেন, বন্ধুবর ঠিকমতো গেমটি খেলতে পারছেন না। এটি দেখে এমবাপে তাকে জিজ্ঞেস করেন যে তিনি কোন গেমটি খেলতে ইচ্ছুক। লে রয় তখন এনবিএ-২কে গেমটির কথা বলেন। এই গেমটি লে রয় অনেকদিন ধরেই খেলে আসছেন, তাই গেমে নিজের কারিকুরি এমবাপেকে দেখাতে চেয়েছিলেন। স্বভাবতই, এই গেমটিতে এমবাপে খুব বাজেভাবে হেরে যান বন্ধু লে রয়ের কাছে। হেরে যাওয়ার পর এমবাপে তাকে বলেন, এভাবে কোনো প্রস্তুতি ছাড়া খেলতে বসে যাওয়াটা ঠিক হয়নি। তিনি লে রয়ের কাছে এক সপ্তাহ সময় চাইলেন। লে রয় আপত্তি করেননি; এতদিন ধরে হাত পাকিয়েছেন যে গেমে, সেই আধিপত্যে সপ্তাহখানেকের প্রস্তুতিতে কী-ই বা করতে পারবেন! 

একসপ্তাহ পর এমবাপে নিজেই লে রয়কে ফোন দিয়ে এই গেমটি খেলার কথা বলেন। এবার লে রয় দেখলেন অন্যরকম এমবাপেকে, জিততে পারলেন না প্রাণপণ চেষ্টায়ও। লে রয়ের আক্কেল গুড়ুম; হচ্ছেটা কী! ১০ বছর ধরে টানা খেলার পরও ‘অর্বাচীন’ এমবাপের কাছে হারছেন তিনি! এমনটা ভাবতেই পারেননি তিনি। রহস্যটা কী?

রহস্য বলতে আর কিছুই নয়; এমবাপে ওই এক সপ্তাহ নিজের সবটুকু দিয়ে গেমটি অনুশীলন করেছিলেন। সেই সাথে ইন্টারনেটে ঘেঁটেছিলেন অন্যান্য খেলোয়াড়দের টুকিটাকি বিষয় নিয়ে। এত কিছুর পর তাকে কীভাবে হারানো সম্ভব?

তার এই ধারাবাহিক অগ্রগতির পেছনে আলাদা করে বলতে হয় পরিবার থেকে পাওয়া অনুপ্রেরণার দিকটিকে। পেছন ফিরে তাকালে দেখা যাবে, তার ক্যারিয়ারের পুরোটাই ছিল তার পরিবারের সাহায্যে একদম সুন্দরভাবে পরিকল্পিত। তার এই ক্যারিয়ারে তার বাবা-মা’র প্রচণ্ড প্রভাব রয়েছে, ওয়েঙ্গার যেটিকে বলেছিলেন “লিমিটলেস”।

তার পরিবার ফুটবলের দুনিয়ায় এমবাপেকে একদম একটি নিখুঁত পরিকল্পনার মধ্যে দিয়ে নিয়ে গিয়েছে। অনেকটা এমন যেন তাকে একদম ছোটবেলাতেই প্রোগ্রাম করা হয়েছে এভাবে চলার জন্য। এই পারিবারিক ভিত্তির সাথে ছোটবেলা থেকে তার প্রতি পরিবারের আলাদা যত্নই তাকে আজকের এমবাপেতে পরিণত করেছে।

তার জীবনে বাবা-মা দুজন আলাদা আলাদা ব্যাপারগুলি দেখতেন। তার বাবা উইলফ্রিড এমবাপ্পে ছিলেন এএস বন্ডির কোচ, তিনি এমবাপের খেলাধুলার ব্যাপারে খেয়াল রাখতে। আর অন্যদিকে তার মা ফাইজা লামারি-এমবাপে ছিলেন একজন পেশাদার হ্যান্ডবল খেলোয়াড়, যিনি এমবাপের ব্যাক্তিগত জীবনের ব্যাপারগুলো দেখতেন। তাদের সাহায্য করতেন একজন চৌকষ ক্রীড়া-আইনজীবী ডেলফিন ভারহাইডেন। তিনি ছিলেন এই পরিবারের খুব বিশ্বস্ত একজন মানুষ। এতে করে সব কাজ তারা গুছিয়ে রাখতে পারতেন। কোনোকিছুতেই তাড়াহুড়োটা করতে হতো না।

বাবা ও ভাইয়ের সাথে কিলিয়ান এমবাপে;  Image Credit: 90min

এমবাপের মধ্যে নিহিত এই সম্ভাবনাটি তার পিতামাতা ছাড়াও খেয়াল করেছিলেন বেশ কয়েকজন ফুটবল বিষয়ক প্রতিনিধি। তারা এমবাপের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করে। এমবাপে পরিবারের সামনে সুযোগ ছিল তাদের ছেলেকে আরো বড় তারকা হিসেবে ফুটবল বিশ্বে হাজির করার, সুযোগ ছিল আরো অনেক অর্থ উপার্জনের।  কিন্তু তারা এজেন্টদের মানা করে দেন। তারা চেয়েছিলেন ছেলেকে এসব থেকে দূরে রাখতে। তাদের বিশ্বাস ছিল তাদের ছেলে একদিন বাইরের কারোর হস্তক্ষেপ ছাড়াই একজন তারকা হবে।

এমবাপের পরিবারকে বিভিন্ন ক্লাব থেকেও কিন্তু ভাল কিছু চুক্তির প্রস্তাবনা দেয়া হয়। জিনেদিন জিদানের পক্ষ থেকে তৎকালীন এই তরুন পেশাদারকে রিয়াল মাদ্রিদে এক সপ্তাহের একটি পারিবারিক ভ্রমণের সুযোগ দেয়া হয়েছিল। মাদ্রিদ থেকে তারা যান লন্ডনে, সেখানে চেলসি এবং আর্সেনাল দুই পক্ষের সাথেই তাদের কথা হয়। স্বয়ং আর্সেন ওয়েঙ্গার এসে তাদের সাথে কথা বলেন। এমবাপে পরিবার জানতেন, এভাবে বড় ক্লাবগুলো এগিয়ে আসবে। কিন্তু কিশোর বয়সে ছিলেন বলে পরিবার তাকে অন্যত্র পাঠানোর ব্যাপারে কোনো চাপ নেয়নি। সিদ্ধান্তগুলো সবসময়ই তার ভালো-মন্দ বিবেচনা করে নেয়া।

ক্লাবগুলোর প্রস্তাবের পাশাপাশি বাড়তে থাকে বিভিন্ন স্পন্সর থেকে পাওয়া প্রস্তাবের সংখ্যা। ২০১৮ বিশ্বকাপের পর স্পন্সরদের কাছে চাহিদাও বেড়ে যায় এমবাপের। তবে ২০০টিরও বেশি প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন তার প্রতিনিধি। সুইজারল্যান্ডের ঘড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান হাবলটের সাথে এমবাপের মা ও তার আইনজীবীর কথা চলে প্রায় ১ বছর, এমনকি সুইজারল্যান্ডে প্রতিষ্ঠানটির অফিসেও যান তারা। এই প্রতিষ্ঠানের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করেন উসাইন বোল্টের মতো সর্বকালের সেরাদের একজন। এমবাপে যে তার কাতারে গিয়ে একই সাথে কাজ করবেন, সেটা ছিল একদম অবিশ্বাস্য রকমের কিছু।

হাবলট ওয়াচের অফিসে এমবাপে; Image Credit: Hublot

 

 

আবার একটু ফ্ল্যাশব্যাকে যাওয়া যাক। বড্ড লিনিয়ার গল্প বলা হয়ে যাচ্ছে। 

এমবাপের উত্থান হয়েছিল প্যারিসের উপকণ্ঠে অবস্থিত শহরতলির বন্ডি নামক এলাকা থেকে। সেখান থেকে তাকে একটি লম্বা পথ পাড়ি দিয়ে আজকের অবস্থানে আসতে হয়েছে। তাকে বর্তমান রূপে এনেছে তার এই শহরটিই। বাইরে না গিয়ে তার এই এলাকায় থেকে যাওয়া তার বাবা-মাকে খুবই সাহায্য করেছে তার ক্যারিয়ারের উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে।

কান পাতলে ছোটবেলার বেশ কিছু দুষ্টুমির কথাও শোনা যায় তার ব্যাপারে, বিশেষ করে সমবয়সী অন্য বাচ্চাদের মতোই পড়াশোনা বিষয়ক। তার স্বভাব-প্রকৃতি মূল্যায়নের জন্য তার মা তাকে প্রতিদিন স্কুলে তার শিক্ষকদের জন্য তাকে একটি রিপোর্ট শিট নিয়ে যেতে বলতেন, যেখানে তার শিক্ষকরা তার ব্যাপারে বিভিন্ন মন্তব্য লিখে দিতেন। মেধা থাকলেও লেখাপড়ার প্রতি তার ছিল প্রচণ্ড অনীহা। ফুটবল আর লেখাপড়ার পাশাপাশি তার শৈশব কেটেছে টেনিস, সাঁতার, সঙ্গীত, এবং ইংরেজি ভাষা শেখা নিয়ে। কিলিয়ানের বাবা উইলফ্রাইড এমবাপে ছেলের শুরুর গল্পটা নিয়ে ২০১৯ সালে সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন লা পেরিসিয়েনকে। সেখানে তিনি বলেন,

“কিলিয়ান যখন ২-৩ বছর বয়সের ছিল, তখন থেকে সে ফুটবল খেলতে চাইত। কিন্তু আমি আরেকটু অপেক্ষা করেছি। আমি যখন প্রথমবার তাকে আমার সাথে মাঠে নিয়ে যাই, সেখানে আমি ফুটবলের প্রতি তার প্রচণ্ড ঝোঁক দেখতে পাই। আমাদের মধ্যে একটি অলিখিত নিয়ম ছিল; মাঠে যা শুরু হবে, তা মাঠেই শেষ হবে, খুব বেশি হলে ড্রেসিংরুম অব্দি। বাসায় গেলে আমি শুধুই একজন বাবা, কোনো কোচ নই। মজার ব্যাপার হচ্ছে, অন্যদের এটা বুঝতেও দেড় বছরের বেশি সময় লেগেছিল যে কিলিয়ান আমার ছেলে। কারণ, কিলিয়ান মাঠে কখনো আমাকে বাবা বলে ডাকত না। সেই সাথে আমাকে স্টেডিয়ামে কাজ করতে হত সকাল ১০টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত। তাই তাকে আনা-নেয়ার কাজ সবসময় আমার স্ত্রী-ই করত। একদিন হঠাৎ করেই সে আমাকে ‘বাবা’ ডেকে ফেলে, আর সেদিনই সবাই আমাদের সম্পর্কের কথা জানতে পারে।”

উইলফ্রাইড আরো যোগ করেন,

“আমরা খুব দ্রুতই খেয়াল করলাম যে অন্যদের তুলনায় সে আলাদা। শৈশব থেকেই কিলিয়ান তার থেকে ২-৩ বছরের বড় ছেলেদের সাথে খেলার সময়ও দারুণ খেলত। নিজেকে সে কোন পেশায় দেখতে চায়, তা ঠিক করার ভার আমি তাকেই দিয়েছিলাম। আর কিলিয়ান নিজের পথটা নিজেই বেছে নিয়েছে।”

ক্লেয়ারফন্টেইনে অবস্থিত আইএনএফ ­— ফ্রান্সের জাতীয় ফুটবল ইন্সটিটিউটে তার প্রবেশ ছিল তার ক্যারিয়ারের জন্য একটি বড় পদক্ষেপ। ‘Live, breathe, and think football’ – এই প্রতিষ্ঠানের মোটো ছিল এটাই। এখানে ফুটবল শেখার জন্য কেবল পাঁচটি প্রাথমিক নীতি রয়েছে, ফরাসি ভাষায় যেগুলোকে বলা হয় Five R’s: সম্মান, নিয়ম, কঠোরতা, দক্ষতা ও হাসি (Respect, Regles, Rigeur, Rendement, Rire)। কিন্তু এখানে এসে শেখার সুযোগ সবাই পায় না। খুব কমসংখ্যক শিশুই এ ধরনের অভিজাত একাডেমিতে আমন্ত্রণ পেয়ে থাকে। এমবাপে ছিলেন এই গুটিকয়েক প্রতিভাবানদের মধ্যে একজন।

স্পষ্টতই তৎকালীন ফ্রান্সের অনন্যসাধারণ একজন প্রতিভা ছিলেন এমবাপে। তাই যখন ক্লাব বেছে নেওয়ার সময় আসে, তার সামনে ঘরোয়া এবং বিদেশি অনেক ক্লাবেই যাওয়ার সুযোগ ছিল। কিন্তু তখন তার বয়স ছিল মাত্র ১৪। তাই তার পরিবার প্লেয়িং টাইম আর স্থিতির উপরই প্রাধান্য দিয়েছিল গ্ল্যামার ও নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেয়ার নতুন চ্যালেঞ্জের চাইতে। দেশের বাইরের ক্লাবগুলোতে এই ধরণের অসুবিধা ছিল আরো বেশি। পরিবার চেয়েছিল তাদের আশেপাশের কোনো ক্লাবেই কিলিয়ান তার ক্যারিয়ার শুরু করুক। এজন্য তাদের প্রাথমিক পছন্দ শুনলে খুবই আশ্চর্য হবেন, ফ্রান্সের একটু নিচু সারির ক্লাব ‘কান’ (Caen) ছিল তাদের প্রথম পছন্দ। সেখানে তাদের সাথে কোনো লিখিত চুক্তি স্বাক্ষর হয়নি, স্রেফ একটি মৌখিক সমঝোতা ছিল। পরে সেটা বাতিল হয় যখন চুক্তির প্রধান শর্ত ভেঙে কান রেলিগেটেড হয়ে যায়। তাই এমবাপের পরিবারকে ক্লাব নিয়ে আবার নতুন করে ভাবতে হয়।

মোনাকোতে এমবাপে; Image Credit: Getty Images

এরই মাঝে মোনাকো ২০১৩ সালের গ্রীষ্মের ট্রান্সফারের মৌসুমে খুব ভাল ব্যবসা করে। তারা একঝাঁক নতুন খেলোয়াড় কিনেছিল সে সময়, যাদের মধ্যে ছিলেন রাদামেল ফ্যালকাও, হামেস রদ্রিগেজ, রিকার্ডো কারভালহো, হোয়াও মৌতিনহো, ও এরিক আবিদালের মতো খেলোয়াড়। খেলোয়াড় কেনা বাবদ তাদের প্রায় ১৭০ মিলিয়ন ইউরো খরচ হয় সেই বছর। সেই সময়ই এমবাপে এই দলের একাডেমিতে ঢোকেন। কে চিন্তা করেছিল, ওই সময় ১৪ বছর বয়সী মোনাকোর একাডেমিতে সদ্য ঢোকা খেলোয়াড়টিই পরবর্তীতে ঐ সময়ে দলের আসা অন্য যেকোনো খেলোয়াড়ের চাইতে বেশি সফল হবেন?

মোনাকোর প্রথম বছরে এমবাপে তারা বাবার সাথে একটি অ্যাপার্টমেন্টে থাকতেন। তার বাবা তাকে এখানে সাহায্য করার জন্য অন্য সব কাজ থেকে ছুটি নিয়েছিলেন। মোনাকোতে তাকে প্রথমে অনুর্ধ্ব-১৭ দলে পাঠানো হয়। কিন্তু কিছুদিন পর সেখানে তার সাথে ঝামেলা হয় দলের কোচ ব্রুনো ইহলা‘র, যেটি তার নবীন ক্যারিয়ারে ভাল একটি ধাক্কা দেয়। ইহলা এমবাপের উপর খুবই অসন্তুষ্ট ছিলেন তার ডিফেন্ডিংয়ের কমতি দেখে। উইলফ্রাইড এমবাপে তাই নিজে এসে এবার ট্রেইনিং সেশনে এমবাপের খেলা দেখেন। সেখানে তিনি বুঝতে পারেন, তার ছেলের প্রতি দলের কোচের আলাদা একটি বিদ্বেষ রয়েছে। তাই তিনি ইহলাকে একটি শিক্ষা দিতে চান।

কিন্তু এর কিছুদিন পরই মূল দলের কোচ লিওনার্দো জারলিম এমবাপ্পেকে মোনাকোর মূল দলে খেলানোর সিদ্ধান্ত নেন। এতে করে এমবাপে ইহলা’র ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যান। তাকে মূল দলে খেলানোর সিদ্ধান্ত যে কতটা ইমপ্যাক্ট ফেলে দলে, তা সেই মৌসুমের মোনাকোর পারফরম্যান্স দেখলেই বোঝার কথা। ১৬ বছর বয়সে মোনাকোর মূল দলে অভিষেক হয়ে তিনি হয়ে যান ক্লাবের ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড়, ১৭ বছর বয়সে প্রথম গোল করে হয়ে যান ক্লাবের ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ গোলদাতা। এভাবেই ফুটবলের আকাশে এমবাপে তার ডানা মেলে ধরেন।

মোনাকোর সাথে চুক্তির শেষ বছরে একটি নাজুক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এমবাপের জন্য তখন আরো বেশি ক্লাব ভীড় করতে থাকে তার চারপাশে। মোনাকোর তখনকার ফুটবল ডিরেক্টর ছিলেন লুইস ক্যাম্পোস। তিনি এমবাপেকে মোনাকোতে রাখার জন্য তার মা’কে বুঝাতে চেষ্টার কিছু বাকি রাখেননি। তার ছেলের বেড়ে ওঠার জন্য যে মোনাকোই সেরা জায়গা হবে, তা তিনি বোঝানোর চেষ্টা করেন। তিনি তার অভিজ্ঞতা দিয়ে তাদের বোঝান, এইভাবে হুট করে বড় ক্লাবে যাওয়া কেন এমবাপের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। যদি এভাবে এই বয়সে এমবাপে একটি বড় ক্লাবে চলে আসে, তবে তার মধ্যে আত্ম-অহংকার চলে আসবে। এবং নতুন সেই ক্লাবের লকার রুমের পরিবেশও হবে অন্যরকম। সেখানে অন্য বড়দের সাথে তার খাপ খাওয়াতেও সমস্যা হবে। তারা বলতেই পারে যে, এই বাচ্চাটি তাদের সাথে সেখানে কী করছে!

এর আগে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর সাথে কাজ করা ক্যাম্পোস আরো বলেন, রোনালদো আর এমবাপে মানসিক দিক দিয়ে প্রায় একই রকম। তাদের জন্মই হয়েছে একজন চ্যাম্পিয়ন হওয়ার জন্য।

ক্যাম্পোসের কথা মেনে নিয়ে ২০১৬ সালে এমবাপে মোনাকোর সাথে প্রথম পেশাদার চুক্তি স্বাক্ষর করেন। চমক ঘটে ২০১৬-১৭ মৌসুমে। ক্লাবের হয়ে সেই মৌসুমে এমবাপে করেন ২৬টি গোল। তার এই অনন্য প্রদর্শনীর সাথে কিছু দলগত নৈপুন্যে মোনাকো সেই মোসুমে জিতে নেয় লিগ-১ এর শিরোপা। সেই সাথে তারা পৌছে যায় চ্যাম্পিয়ন্স লিগের সেমিফাইনালে। এত কিছুর পরও টিনএজ বয়সে থাকা এমবাপে নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারাননি। তার জীবনীর লেখক মার্টিন লেপ্রিন্স এই নিয়ে সেই বইয়ে লিখেছিলেন যে মোনাকোর এই শিরোপা জয়ের উৎসব করতে অন্য খেলোয়াড়দের সাথে এমবাপ্পে রাতভর পার্টি করতে শহরে যাননি। এর পরিবর্তে তিনি নৈশভোজের পরই বাসায় ফিরে যান এবং সেখানে নিজের পরিবারের সাথেই উদযাপন করেন।

সদ্য শেষ হওয়া চ্যাম্পিয়নস লিগের খেলায় এমবাপেকে পেছন থেকে জার্সি টেনে আটকানোর চেষ্টায় জেরার্ড পিকে; Image Credit: Lluis Gene / AFP

এমবাপে একজন পারফেকশনিস্ট। আদর্শগত কিছু দিক কিছুতেই হারাতে চান না। দ্য প্লেয়ার্স ট্রিবিউনে লেখা এক কলামে তিনি বলেছিলেন সেটা নিয়েই,

“বন্ডিতে একটি অলিখিত নিয়ম আছে, খুব ছোট্ট বয়স থেকেই মানুষ সেটা শিখে যায়। রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়ার পথে যদি সামনে ১৫ জনের একটি দল দাঁড়িয়ে থাকে, আর আপনি তাদের মধ্যে কেবল একজনকেই চেনেন, তবে আপনার সামনে তখন দু’টি রাস্তা রয়েছে — হয় তাদেরকে “হাই” বলে হেঁটে বেরিয়ে যাবেন, নতুবা ১৫ জনের সাথেই করমর্দন করবেন। কেবল একজনের সাথেই করমর্দন করলেন, বাকি ১৪ জন সেটা মোটেই ভালো চোখে দেখবে না। হাস্যকর মনে হলেও বন্ডি থেকে শেখা এই জিনিসটি আমি এখনো মেনে চলি।”

১৭-২০ বছর বয়সে খেলোয়াড়দের আলাদা করে চেনার যে কথাটি আর্সেন ওয়েঙ্গার বলেছেন, এমবাপের ক্ষেত্রে তা অনেকাংশেই মিলে গিয়েছে। মাত্র ১৮ বছর বয়সে তিনি মোনাকো থেকে প্যারিস সেন্ট জার্মেইতে পাড়ি জমান একজন টিনেজার হিসেবে রেকর্ড ট্রান্সফার ফি’র বিনিময়ে। সেই বছরেই ফ্রান্সের হয়ে তার অভিষেক হয়। এরপর ১৯ বছর বয়সে ফরাসি জাতীয় ফুটবল দলের এক অপরিহার্য সদস্য হিসেবে জিতে নেন বিশ্বকাপ। শুধু জিতেছেন বলা ভুল হবে, সেই বয়সেই রীতিমতো ঝলসে দিয়েছিলেন ঔজ্জ্বল্যে। পেলের পর দ্বিতীয় টিনেজার হিসেবে বিজয়ী দলের হয়ে ফাইনালে গোল করেন ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে। নিজের টুইটার একাউন্টে পেলে যখন নিজেই লেখেন “Welcome to the club”, সেটা উড়িয়ে দেওয়ার জো নেই। এই কৃতিত্ব যে এখন অব্দি কেবল এই দু’জনেরই রয়েছে! 

মোনাকো থেকে পিএসজিতে আসার পর এমবাপের ধার যেন আরো বেড়েছে। আগের থেকে অনেক বেশি আক্রমণাত্মক এমবাপে এরই মধ্যে ফরাসি লিগের অন্যতম সেরা ফরোয়ার্ডে পরিণত হয়েছেন। আর্সেন ওয়েঙ্গার মনে করেন, এমবাপের এমন উন্নতির যেমন দলের খেলা বোঝার দক্ষতা রয়েছে, সেই সাথে রয়েছে একদম চাপের মুহূর্তেও অনবদ্য নৈপুন্যের পসরা সাজানোর ক্ষমতা। তিনি বলেন, এমবাপের যখন খারাপ সময় যায়, সে সময়েও একদম শেষ সময়ে এসে এমবাপে খুব দারুণভাবে নিজের রূপে ফিরে আসতে পারে। তার বয়স কেবল মাত্র ২২, এটি ভুলে গেলে চলবে না। ২০২০-২১ মৌসুমে পিএসজির হয়ে ৪৭টি খেলায় তার গোল ৪২টি। আমরা যদি এই গোলগুলোর সাথে তার ১১টি অ্যাসিস্ট যোগ করি, তবে দেখব যে প্রতিটি খেলায় একটিরও বেশি গোলে তার প্রত্যক্ষ অবদান রয়েছে।  

এমবাপের ২০১৭-১৮ মৌসুমের পারফরম্যান্সের সাথে ২০২০-২১ মৌসুমের পারফরম্যান্সের তুলনা; Image Credit: The Athletic

এই গোল করার ক্ষুরধার ক্ষমতার সাথে লিঙ্কআপ প্লে’র উত্তরোত্তর উন্নতিই বুঝিয়ে দেয়, এমবাপে কীভাবে প্রতিনিয়ত নিজেকে আরো দক্ষ করে তুলছেন। আর্সেন ওয়েঙ্গারের ‘ফেইজ অফ সেপারেশন’-এর দ্বিতীয় ধাপটিই এখন আমাদের চোখের সামনে ঘটছে। এমবাপে কেবল একজন ফরাসি ‘প্রডিজি’ হিসেবে নয়, বরং অধিষ্ঠিত করেছেন বৈশ্বিক ফুটবলের সর্বোচ্চ মানে। 

ইউরোপ ২০২০, উয়েফা নেশন্স লিগ, সবগুলো প্রতিযোগিতাতেই তিনি ছিলেন ফ্রান্সের মূল আশাভরসার প্রতীক। এখন ফ্রান্সের সাজানো আক্রমণভাগে রয়েছেন বেনজেমা, গ্রিজমান আর এই এমবাপে। নিজেদের পারস্পরিক বোঝাপড়া দিয়ে তারা যে কতটা ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারেন, সেটা তারা ইউরো ২০২০ ও নেশন্স লিগেই দেখিয়েছেন। দূর্ভাগ্যজনকভাবে টাইব্রেকারে পেনাল্টি মিস করে ফ্রান্সের ইউরো যাত্রাভঙ্গের জন্য এমবাপে দায়ী থাকলেও সেটি পুষিয়ে দিয়েছেন নেশন্স লিগে। ২০১৮ সালের বিশ্বকাপের পর আবারও একটি শিরোপা তুলে ধরেছে ফ্রান্স। ফাইনালে পিছিয়ে পড়েও স্পেনকে হারিয়ে দেয় তারা। খেলায় ফিরে আসতে দাঁতে দাঁত চেপে লড়েছিলেন সেদিন এমবাপে-বেনজেমারা। ফলাফলও পেয়েছিলেন হাতেনাতে। তাদের চোখ যে এবার ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপের দিকে, সেটা তো বলাই বাহুল্য! 

Related Articles