এই লেখাটি লিখেছেন একজন কন্ট্রিবিউটর।চাইলে আপনিও লিখতে পারেন আমাদের কন্ট্রিবিউটর প্ল্যাটফর্মে।

দক্ষিণ আমেরিকা, ১২টি দেশের বিশাল এক মহাদেশ। আমাজন, আতাকামা মরুভূমি কিংবা বলিভিয়ার সল্ট ফ্লাটের সৌন্দর্য্য ছাড়াও এই মহাদেশকে মানুষ চেনে আরেকটি জিনিসের মাধ্যমে, তা হলো ফুটবল। ছন্দময় লাতিন সৌন্দর্য্য মিশে থাকা এই মহাদেশের ফুটবল ফ্যান বিশ্বজুড়ে অগণিত। শত বছরেরও বেশি সময় ধরে ইউরোপের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় টিকে থাকার যোগ্যতা একমাত্র এই মহাদেশের দেশগুলোই দেখিয়েছে। কিন্তু কীভাবে এলো এখানে ফুটবল? যে মহাদেশ কি না যুগ যুগ ধরে লোকচক্ষুর আড়ালে ছিল, তারাই কীভাবে উন্নত ইউরোপকে টেক্কা দেবার সাহস করেছে? আর এই দেশগুলোর এত সমর্থকই বা কীভাবে হলো? চলুন, উত্তর খোঁজার চেষ্টা করা যাক।

আন্দিজ পর্বতমালা; Image Credit: Shutterstock

পঞ্চাদশ শতকের শেষে ও ষোড়শ শতকের প্রথম দিকে পর্তুগীজ আর স্প্যানিশদের আগমন ঘটতে থাকে দক্ষিণ আমেরিকার মাটিতে। মূলত স্বর্ণের দেশ 'এল ডোরাডো'র খোঁজেই ইউরোপীয়দের পা পড়ে এখানে। ইউরোপীয়রা সাথে করে আনতো আফ্রিকান ক্রীতদাসদের, একটি নতুন সভ্যতা বিনির্মাণের লক্ষ্যে। পরবর্তীতে স্প্যানিশ আর পর্তুগীজ কলোনি হিসাবে দুইটি বড় অংশ আলাদা হয়ে যায়। ১৯ শতকের দিকে এই দেশগুলো স্বাধীন হতে শুরু করে। একে একে জন্ম নেয় চিলি, আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের মতো দেশগুলো। স্বাধীন রাষ্ট্র হলেও তখনও তারা ফুটবল দুনিয়ার সংস্পর্শে আসার সুযোগ পায়নি।

আর্জেন্টিনায় ফুটবল

পুরো দক্ষিণ আমেরিকার মধ্যে সর্বপ্রথম ফুটবলের আগমন ঘটে আর্জেন্টিনায়, ব্রিটিশ নাবিকদের মাধ্যমে। বাণিজ্য, বসবাস, গবেষণা ও রেলওয়ে কনস্ট্রাকশনের কাজে যেসব ব্রিটিশ কোম্পানি ও জাহাজ রিও ডি লা প্লাটায় আসতো, তারা দীর্ঘদিনের প্রস্তুতি নিয়েই এই অঞ্চলে আসতো। তাই অবসর সময় কাটানোর জন্য তারা সাথে করে আনে ফুটবল। বুয়েন্স আয়ার্স বন্দরে নোঙর করে নাবিকেরা ফুটবল খেলতেন। এখান থেকেই প্রথম ফুটবল খেলা স্বচক্ষে দেখার স্বাদ পায় স্থানীয়রা। ক্রমে ব্রিটিশ নাবিকদের সাথে স্থানীয় কিশোর তরুণেরা দলে ভাগ হয়ে খেলতে শুরু করে। তখন থেকেই স্থানীয়রা বুঝলো, এই গোলাকার বলটির মাঝে কোনো এক মোহনীয় শক্তি আছে। ১৮৬০-এর দিকে শুরু হওয়া এই শখের ফুটবল থেকে ১৮৬৭ সালে 'বুয়েন্স আয়ার্স ফুটবল ক্লাব' নামে দক্ষিণ আমেরিকার প্রথম ফুটবল ক্লাবের যাত্রা শুরু হয়।

বুয়েন্স আয়ার্স ফুটবল ক্লাব; Image Credit: The Standard newspaper

এই ক্লাব গঠনের পেছনে ব্রিটিশ কমিউনিটির কিছু মানুষ, বিশেষ করে থমাস হগ এবং তার ভাই জেমস হগ মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। ধীরে ধীরে সমগ্র আর্জেন্টিনায় ফুটবলের উন্মাদনা ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে, যার ফলশ্রুতিতে ১৮৯৩ সালে প্রথম আর্জেন্টাইন লিগ চ্যাম্পিয়নশিপ অনুষ্ঠিত হয়। এমনকি ব্রিটেন নিজেও তখনো সেভাবে ফুটবলের উন্নয়ন শুরু করেনি। বেলজিয়াম, সুইডেনের মতো পার্শ্ববর্তী দেশগুলো ক্লাব পর্যায়ের ফুটবলকে ঢেলে সাজানো শুরু করার পরই ব্রিটেন সেদিকে মনোযোগ দেয়। আর্জেন্টিনাতে লিগ চ্যাম্পিয়নশিপ শুরু হওয়ার পর ঐ একই বছর আর্জেন্টাইন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন গঠন করা হয়, এবং উরুগুয়ের বিপক্ষে ১৯০১ সালে প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলে আর্জেন্টাইন একাদশ।

১৯২৮ অলিম্পিকের আর্জেন্টিনা একাদশ; Image Credit: Wikimedia Commons

ব্রাজিলে ফুটবল

আর্জেন্টিনার পর দ্বিতীয় দেশ হিসাবে ফুটবল উন্মাদনার জোয়ারে গা ভাসানো দেশটির নাম ব্রাজিল। জন মিলার নামের এক ইংরেজ ১৮৭০ এর দিকে সাও পাওলো শহরের মানুষকে ফুটবলে উদ্বুদ্ধ করেন।

মূলত ঊনবিংশ শতকের মাঝামাঝিতে ব্রাজিলে ফুটবল গেলেও তা পূর্ণতা পায় ১৮৮৮ সালে। এই বছর সাও পাওলো অ্যাথলেটিক ক্লাবের প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ব্রাজিলে ক্লাব ফুটবলের যাত্রা শুরু হয়। ১৯১৪ সালে ব্রাজিলের জাতীয় দল প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলে ইংল্যান্ডের ক্লাব এক্সেটার সিটির বিপক্ষে। পরবর্তীতে ঐ একই বছর আর্জেন্টিনা ও চিলির বিপক্ষে দুইটি ম্যাচ খেলে ব্রাজিল। আর এভাবেই ফুটবল দুনিয়ায় আরো একটি নক্ষত্রের আবির্ভাব।

এক্সেটার সিটির বিপক্ষে ব্রাজিলিয়ান একাদশের ম্যাচ, ১৯১৪; Image Credit: theexeterdaily.

উরুগুয়েতে ফুটবল

উরুগুয়েতে প্রথম ফুটবল কবে আসে, নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব না হলেও তা যে আর্জেন্টিনা থেকেই সে দেশে যায়, এটা নিশ্চিতভাবে বলা যায়। মূলত ব্রিটিশ রেলওয়ে কোম্পানি সেন্ট্রাল উরুগুইয়্যান রেলওয়ে ক্লাব নামে মন্তেভিডিওতে একটি ক্লাবের যাত্রা শুরু করে ১৮৮০ সালের দিকে। এই ক্লাবে ক্রিকেট ও ফুটবল দুই রকম খেলাই খেলা হতো।

উরুগুয়েতে অনুষ্ঠিত প্রথম অফিসিয়াল ফুটবল ম্যাচ মূলত একটি ক্রিকেট ক্লাবের সাথে অপর একটি ক্লাবের ম্যাচের মাধ্যমে হয়। সেটি ছিল মন্তেভিডিও রোয়িং ক্লাবের সাথে মন্তেভিডিও ক্রিকেট ক্লাবের একটি ম্যাচ। এরপর এই দুই ক্লাব থেকে ১৮৯১ সালে জন্ম নেয় এফসি অ্যালবিয়ন নামের ফুটবল ক্লাব, যা উরুগুয়ের প্রথম ফুটবল ক্লাব। এরপর ১৯০০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় উরুগুইয়ান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন। ১৯০১ সালে জাতীয় দল তৈরির মাধ্যমে সেই বছরই আর্জেন্টিনা একাদশের সাথে প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলে উরুগুয়ে।

১৯৩০ বিশ্বকাপজয়ী উরুগুয়ে দল; Image Credit: Popperfoto via Getty Images/Getty Images

চিলিতে ফুটবল

আর্জেন্টিনা থেকেই পাশের দেশ চিলিতে পৌঁছায় ফুটবল। সেখানেও ফুটবল নিয়ে যাবার পেছনে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন ব্রিটিশ নাবিকেরা। তারা ভ্যালপারাইসো বন্দর থেকে প্রথম ফুটবল ক্লাবের যাত্রা শুরু করেন, যা ভ্যালপারাইসো এফসি নামে প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে নাম পরিবর্তন করে এই ক্লাব এখন 'এফসি সান্তিয়াগো ওয়ারিয়র্স' নামে পরিচিত।চিলির ফুটবলের অভিভাবক হিসেবে ১৮৯৫ সালে যাত্রা শুরু হয় 'Federación de Fútbol de Chile'-এর।

১৯১০ সালে চিলির ন্যাশনাল টিম প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলে। তবে চিলির ফুটবল উত্থানের পেছনের কারিগর অবশ্যই ১৮৮৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়া এফসি ভ্যালপারাইসো। এই ক্লাব থেকেই পরবর্তীতে চিলির ফুটবল ডিভিশনের অন্যান্য ক্লাবের পথচলার শুরু হয়।

প্যারাগুয়েতে ফুটবল

প্যারাগুয়েতে ফুটবলের প্রথম যাত্রা শুরু হয় বিংশ শতকের প্রথম দিকে। প্যারাগুয়েতে যে ভদ্রলোক প্রথম প্যারাগুইয়ান ক্লাব অলিম্পিয়া প্রতিষ্ঠা করেন, তিনি মূলত আর্জেন্টিনার বুয়েন্স আয়ার্সে ১৯০২ সালে অনুষ্ঠিত একটি ফুটবল ম্যাচ দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে এই ক্লাবের ভিত্তি তৈরি করেন। এই স্বপ্নদ্রষ্টা ব্যক্তির নাম উইলিয়াম প্যাটস, যিনি একজন ডাচ নাগরিক ছিলেন।

প্যারাগুয়ের এই ক্লাবের দেখদেখি আরো কিছু ক্লাবের প্রতিষ্ঠা হয়, এবং তারই ধারাবাহিকতায় ১৯০৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় প্যারাগুইয়ান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন, যা এখনো পর্যন্ত প্যারাগুয়ের ফুটবলের অভিভাবক হিসেবে কাজ করছে। ১৯১০ সালে প্যারাগুয়ের জাতীয় দল তাদের প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলে আর্জেন্টাইন ক্লাব হারকিউলিসের বিপক্ষে।

বলিভিয়া ও পেরুতে ফুটবল

এই দুই দেশেই ঊনবিংশ শতকে ফুটবলের যাত্রা শুরু হয়। ১৯১২ সালে পেরুভিয়ান ফুটবল লিগ শুরু হওয়ার মাধ্যমে পেরুতে ফুটবল বিস্তৃত হয়। ১৯২২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় পেরুভিয়ান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন ও ১৯২৭ সালে পেরুর জাতীয় দল প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলে।

বলিভিয়াতেও একইভাবে ঊনবিংশ শতকের মাঝামাঝিতে ফুটবলের জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে। ১৯২৫ সালে তারা ফুটবল ফেডারেশন প্রতিষ্ঠা করে, ও ১৯২৬ সালে আন্তর্জাতিক ম্যাচের মাধ্যমে বলিভিয়ান জাতীয় দলের যাত্রা শুরু হয়।

মূলত ফুটবলীয় শক্তি ও ঐতিহ্যে এই দুই দেশ বাকি লাতিন দেশগুলির তুলনায় কিছুটা পিছিয়ে থাকলেও সেখানেও ফুটবল অন্যদের মতোই সমান জনপ্রিয়।

***

সর্বশেষ কোপা আমেরিকাজয়ী ব্রাজিল দল; Image Credit: CARL DE SOUZA/AFP/Getty Images

দিনকে দিন ফুটবলের জনপ্রিয়তা এতটাই বাড়ছিল যে, প্রধান খেলুড়ে দেশগুলো একটা কনফেডারেশন গঠনের চিন্তা করলো। একটি 'গার্ডিয়ান প্রতিষ্ঠান' তৈরি করার লক্ষ্য ছিল দক্ষিণ আমেরিকার ফুটবলপ্রিয় জাতিগুলোকে এক করা। সেই লক্ষ্যে ১৯০৯ সালে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, উরুগুয়ে ও চিলি মিলে দক্ষিণ আমেরিকান ফুটবল ফেডারেশন (SAF) গঠন করে, যা এখন CONMEBOL নামে পরিচিত (স্প্যানিশে CONfederación SudaMEricana de FútBOL এর সংক্ষিপ্ত রূপ হলো CONMEBOL)। এই সংগঠনের প্রথম কৃতিত্ব হলো ১৯১৬ এর জুলাইতে দক্ষিণ আমেরিকান ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপ 'কোপা আমেরিকা' টুর্নামেন্ট চালু করা। এই কোপা আমেরিকা বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন আন্তর্জাতিক ফুটবল টুর্নামেন্ট। স্বাভাবিকভাবেই বোঝা যায়, ঐতিহ্য আর গৌরবের দিক দিয়ে এটি কতটুকু এগিয়ে।

সবচেয়ে বেশি ১৫ বার এই ট্রফি জিতেছে উরুগুয়ে। যদিও প্রথম দিকে ভৌগোলিক কারণে শুধু দক্ষিণ আমেরিকান দেশগুলো অংশ নিত, কিন্তু ১৯৯৩ সাল থেকে এই মহাদেশের বাইরের দেশও অংশগ্রহণ শুরু করে। ফলে কোপা আমেরিকা এখন একটি বৈশ্বিক টুর্নামেন্টে পরিণত হয়েছে বলা যায়। কোপা আমেরিকার পর আরেকটি মর্যাদাপূর্ণ চ্যাম্পিয়নশিপ হলো ১৯৬০ থেকে শুরু হওয়া 'কোপা লিবার্তোদোরেস'। CONMEBOL-এর আওতাধীন লিগসমূহের প্রথম সারির দলগুলোকে নিয়ে এই চ্যাম্পিয়নশিপ হয়, যা মূলত উয়েফা চ্যাম্পিয়নশিপের আদলে অনুষ্ঠিত হয়।

কোপা লিবার্তোদোরেসের ফাইনাল চলাকালীন উন্মত্ত দর্শক; Image Credit: Marcelo Endelli/Getty Images

ফুটবলীয় উত্থানের পর সেটা লাতিনদের নিত্যদিনকার খাবারের সমান হয়ে গেছে। সদ্য জন্ম নেয়া শিশুকে অনেকে প্রথম উপহার হিসাবে ফুটবল দেন। এতে করে সেই শিশু জন্মের পর থেকেই ফুটবল নিয়ে বড় হতে থাকে। হাঁটতে, বসতে এমনকি ঘুমাতেও অনেকে ফুটবল রাখে। পায়ের সাথে এই ফুটবল লেগে থাকা যেন তাদের রক্তে মিশে থাকা এক প্রতিভা।

এ পর্যন্ত যত লাতিন মহাতারকাকে বিশ্ব চিনেছে, তাদের অধিকাংশেরই দিন কাটতো রাস্তায় ফুটবল খেলে। সূর্যোদয়ের সাথে সাথে রোজারিও, বুয়েন্স আয়ার্স, রিও ডি জেনেইরো, ব্রাসিলিয়া, সান্তোস, মন্তেভিডিওর অলিগলি-রাস্তাগুলো যেন একেকটা জীবন্ত স্টেডিয়ামে পরিণত হয়। অন্ধকার নামার আগ পর্যন্ত এই 'স্টেডিয়াম' ঠিক একই রকম জীবন্ত থাকে। এত প্রাণচাঞ্চল্য বোধহয় ইউরোপের আলো-ঝলমলে সত্যিকারের স্টেডিয়ামগুলোতে খুব কমই খুঁজে পাওয়া যাবে।

ছোট থেকে পায়ের অসামান্য কারুকার্য রপ্ত করা এই শিল্পীদের সবাই হয়তো লক্ষ্যকে ছুঁতে পারেনা। খুব কম কিশোরই শেষ পর্যন্ত টিকে থাকতে পারে। এর প্রধান কারণ হলো দারিদ্র্য। দারিদ্র্যের কাছে হার মেনে প্রতিদিন হাজারো লাতিন কিশোর-তরুণ তার স্বপ্নকে ঐ শহরগুলোর ধুলোমাখা রাস্তার কাছে বিসর্জন দিয়ে আসে। খুব বেশি ভাগ্যবান যারা, তারাই প্রকৃতির এই বাছাইপর্বে টিকে যায়। কিন্তু তারপরও তাদের পাড়ি দিতে হয় প্রচণ্ড বন্ধুর পথ।

Image Credit: Urban Pitch

লাতিন ফুটবলের প্রধান সৌন্দর্য্য হলো ড্রিবলিং। ছোটবেলা থেকে ফুটবল নিয়ে কসরত করা ছেলেমেয়েদের প্রধান টার্গেট থাকে কীভাবে ড্রিবল করে বিপক্ষকে কাটাতে হবে। ছোট ছোট পাসে খেলে নিচ থেকে ড্রিবল করে ওপরে ওঠা, আর সুন্দর শটে ফিনিশিং হলো লাতিন ফুটবলের ঐতিহ্য। এই ঐতিহ্যকে আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল দুই দলই ধারণ করে আসছে। যদিও ইদানিংকালে ইউরোপের পাওয়ার ফুটবলের কাছে মাঝে মাঝেই এই অসাধারণ সৌন্দর্য্যকে হার মানতে হয়, তারপরও অধিকাংশ লাতিন দলগুলো চেষ্টা করে তার ঐতিহ্য ধরে রাখতে।

একদম শুরু থেকেই প্রতিটা দলের একজন মধ্যমণি থাকাও আরেকটি ধাঁচ। অর্থাৎ, সেই একজন খেলোয়াড়কে দলের সেরা বলে বিবেচনা করা হয়, আর সে একাই পুরো দলকে জেতাতে সক্ষম, এমন একটা মনোভাব থাকে। ছন্দময় ফুটবল পুরো ৯০ মিনিট ধরে রাখার কারণেই আজকে লাতিন ফুটবলের ভক্ত বিশ্বজুড়ে।

ফুটবল এখানে পেশার পাশাপাশি আবেগ। এর সাথে জড়িয়ে আছে সম্মান, রাজনীতি, হাসি-কান্না, এমনকি জীবন-মৃত্যুও। রেফারির একটা ভুল সংকেত বা খেলোয়াড়ের একটি ভুল পাস যে তাকে মৃত্যুর মুখে ফেলে দিতে পারে, সেই উদাহরণ যেমন আছে, তেমনি একাই একটি দেশকে বিশ্বকাপ জিতিয়ে দেশের নায়ক হওয়ার রেকর্ডও আছে। এখানে ফুটবলটাই যেন তাদের মূল ধর্ম। বিশ্বকাপ তো অনেক দূরের কথা, স্থানীয় ঘরোয়া টুর্নামেন্ট হলেই সেই জায়গার মানুষকে আর ঘরে রাখা সম্ভব হয় না। ছেলে-বুড়ো সবাই দল ধরে বেরিয়ে পড়ে প্রিয় দলের সমর্থনের জন্য। এমন কয়েকটি বিশ্বখ্যাত ডার্বির একটি হলো 'বুয়েন্স আয়ার্স ডার্বি', যেখানে বোকা জুনিয়র্স এবং রিভারপ্লেট ক্লাব প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। এই ম্যাচ 'সুপার ক্ল্যাসিকো' নামেও পরিচিত। ব্লিচার রিপোর্টের তথ্যমতে, এই ডার্বি শুধু দক্ষিণ আমেরিকাই নয়, পুরো পৃথিবীরই ষষ্ঠ বৃহত্তম ডার্বি। এছাড়াও ব্রাজিলের করিন্থিয়ান্স-পালমেইরাস, ফ্ল্যামেঙ্গো-ফ্লুমিনেন্স ও এতলেটিকো মিনেইরো-ক্রুজেইরো আরো কিছু বড় ম্যাচের নাম।

বোকা জুনিয়র্স বনাম রিভারপ্লেট ম্যাচের সমর্থকদের একাংশ; Image Credit: STR/AFP via Getty Images

ইউরোপের সাথে তুলনা করলে হয়তো গতির কাছে শিল্প পরাস্ত হবে। কিন্তু তারপরও এখন পর্যন্ত মোট ২১ বিশ্বকাপে ১৩ বার ফাইনাল খেলে ৯ বার লাতিন দল চ্যাম্পিয়ন হয়েছে, আর বাকি ১২ বার ইউরোপীয়রা সেরা হয়েছে। এর ভেতর গত ৪ বিশ্বকাপ শুধু ইউরোপীয় দলই জিতেছে।

তবে কি লাতিন ফুটবলের শিল্প ক্ষয়ে যেতে শুরু করেছে? হয়তো না, শূন্য থেকে শুরু করা এই মহাদেশের ফুটবল আবারও মাথা তুলে দাঁড়িয়ে যাবে। মেসি হয়তো পারেননি, কিন্তু কয়েক বছর পর অন্য কোনো লাতিন মহাতারকা এসে স্বর্ণের ট্রফিটা উঁচু করে ধরবেন হয়তো। শিল্প কখনো নষ্ট হয় না, তা পরিবর্তিত হয়ে নতুন মাত্রায় প্রকাশিত হয় মাত্র। আর এই পরিবর্তনটা লাতিন ফুটবলে খুব দরকার এখন।

This article is in Bangla language. It is about the history of Latin American Football. 

Featured Image: Alex Livesey/Getty Images

References: 

1. www.academia.edu/8371819/Football_in_Latin_America_Origins_Culture_and_Globalization

2. www.statista.com/topics/5426/soccer-in-latin-america

3. https://www.britannica.com/sports/football-soccer/South-America