মরিনহোর এল ক্ল্যাসিকো রেকর্ড

৩১ মে, ২০১০ তারিখে মরিনহো যখন রিয়ালের কোচ হয়ে এলেন, তখন রিয়াল মাদ্রিদ টানা দুই সিজন ধরে ট্রফির মুখদর্শন থেকে বঞ্চিত ছিল। তার চেয়েও বড় কথা, বার্সেলোনার সর্বজয়ী দলটির দাপটে এল ক্ল্যাসিকো তার উত্তাপ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা দুটোই হারাতে বসেছিল। ইউনাইটেড থেকে রোনালদো, মিলান থেকে কাকা এসেও রিয়ালকে তাদের চিরাচরিত আভিজাত্যের আসনে বসাতে পারছিলেন না।

মরিনহো এলেন। পর্তুগাল, ইংল্যান্ড, ইতালি হয়ে শেষমেশ থিতু হলেন স্পেনের রাজধানী শহরে। খাড়া চিবুক, আধপাকা চুল আর চোখেমুখে চিরস্থায়ী একটা বিদ্রূপের আভাস নিয়ে শুরু করলেন তার ‘শেষ মহাযাত্রা’। শুরুটা ভালোই হয়েছিল। লিগে মোটামুটি অনেকদিনই টপে ছিলেন। কিন্তু হঠাৎই ঘনিয়ে এলো কালো দিন। পায়ে পায়ে এগিয়ে এলো সর্বনেশে তারিখটা। ২৯ নভেম্বর, ২০১০। মরিনহোর প্রথম এল ক্ল্যাসিকো।

ক্ল্যাসিকো ১ (২০১০-১১): বার্সা ৫-০ রিয়াল

মাস ছয়েক আগে এই বার্সার বিরুদ্ধেই চ্যাম্পিয়নস লিগের সেমিতে এক মহাকাব্য রচনা করেছিলেন তিনি। অপ্রতিরোধ্য স্প্যানিশ তিকিতাকার দাপট থামিয়ে দিয়েছিলেন সেদিন ইতালিয়ান বাস পার্কিং দিয়ে। সেই আত্মবিশ্বাসেই তিনি বাঘের ডেরায় আক্রমণ শাণাতে গেলেন, সাজালেন হাই ডিফেন্সিভ লাইন। সুযোগ পেয়ে বাঘের মতোই বিদ্যুৎ গতিতে হামলা করল মেসি-ভিয়া-পেদ্রোদের নিয়ে তৈরি আক্রমণভাগ। আলভেজ দমিয়ে রাখলেন রোনালদোকে, জাভি পেছন থেকে অর্কেস্ট্রার যাদুতে নাচিয়ে ছাড়লেন রিয়াল খেলোয়াড়দের, আর তার ধরানো সলতেয় আগুন ধরানোর জন্য মেসিরা তো ছিলেনই।

ফলাফল, মুড়িমুড়কির মতো গোল উৎসব চললো। শুরুটা করে দিলেন ‘মিডফিল্ড জেনারেল’ জাভি স্বয়ং, এরপর একে একে যোগ দিলেন পেদ্রো, ডেভিড ভিয়া, জেফরেন। যোগ্য সঙ্গত দিলেন ইনিয়েস্তা-মেসি-কিরকিচরাও। 

‘হাতের পাঁচ’ দেখিয়ে দিল বার্সা; Image Source: David Ramos

ক্ল্যাসিকো ২ (২০১০-১১): রিয়াল ১-১ বার্সা

এবার তৈরিই ছিলেন মরিনহো। আগেরবারের মতো শুধু তলোয়ার নিয়েই নেমে যাননি, সাথে ঢালটাও তৈরি ছিল। এই ঢাল ছিলেন পেপে। না, সেন্টারব্যাক পেপে নয়, মিডফিল্ডার পেপে। হোল্ডিং মিড হিসেবে খেলেছিলেন সেদিন এই নামকরা সেন্টারব্যাক। সেদিন তিনি আক্ষরিক অর্থেই ছিলেন ‘ডেস্ট্রয়ার’ মুডে। ট্যাকল আর ইন্টারসেপ্ট করে বার্সার অন্তহীন ট্রায়াঙ্গল পাসের জালকে ছিন্নভিন্ন করে দেন তিনি। আর যথারীতি ছিলেন ক্রিস্টিয়ানো। বাম দিক থেকে তার ‘ফেরারি স্প্রিন্ট’ আর ত্বরিৎ কাট-ইনের যন্ত্রণায় আলভেজের পিঠ আক্ষরিক অর্থেই নিজেদের গোললাইনে ঠেকে যায়। পেনাল্টি স্পট থেকে নিজের প্রথম ক্ল্যাসিকো গোল করেও আদ্রিয়ানোর ডিফেন্সিভ বীরত্বে জেতাতে পারেননি দলকে।

ক্ল্যাসিকো ৩ (২০১০-১১): রিয়াল ১-০ বার্সা

অবশেষে এলো দিনটি। সেদিন অপরাজেয় ‘কাতালান’দের বিরুদ্ধে দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া গ্রিকদের মতো করেই দেয়াল হয়েই দাঁড়িয়ে গেল রিয়াল মাদ্রিদ। মরিনহো এলেন অ্যাকিলিসের বেশে, ট্রয়রাজ হেক্টরের দুর্বলতা খুঁজে বের করে মোক্ষম তীরটি ছুঁড়ে দিলেন। মহাকাব্যের মঞ্চটাও ছিল প্রস্তুত। কোপা ডেল রে ফাইনাল।

পেপে আগের মতোই ‘অ্যাঙ্কর’ রোলে, তবে রোনালদোকে দেয়া হলো ফলস্‌ নাম্বার নাইনের গুরুভার। সেদিন ১২০ মিনিট ধরে রিয়াল তাদের সবটুকু নিংড়ে দিলো। পজেশনের ঘাটতি পূরণে বেশি ডিসট্যান্স কভার করলো, বাতাসে হারিয়ে দিলো বার্সা প্লেয়ারদের – মেস্তায়ায় সেদিন যেন তাদের স্ট্যামিনার চূড়ান্ত প্রদর্শন হলো।

১১০ মিনিট। এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। বাম প্রান্ত থেকে ডি মারিয়ার ক্রস, উড়লেন রোনালদো। থমকে গেল স্টেডিয়াম, থমকে গেল সময়। রোনালদোর ‘টাওয়ারিং হেডার’ পিন্টোর হাত গলে একেবারে বার্সার জালে। কর্নার ফ্ল্যাগের কাছে রোনালদোর স্লাইডিং সেলিব্রেশন, সমর্থকদের গগনবিদারী গর্জন – ফ্লাডলাইটের আলোয় ভ্যালেন্সিয়ার হোম গ্রাউন্ড সেদিন যেন হয়ে উঠল স্বপ্নালোক।

ফলাফল? রিয়াল মাদ্রিদ কোপা দেল রে ২০১১ চ্যাম্পিয়ন!

রিয়ালের হয়ে প্রথম ট্রফি জয় নাম্বার সেভেনের; Image Source: Felix Ausin Ordonez / REUTERS

ক্ল্যাসিকো ৪ (২০১০-১১): রিয়াল ০-২ বার্সা

চ্যাম্পিয়ন্স লিগের সেমিফাইনাল। ১ম লেগ বার্নাব্যুতে। ‘হোমে রিয়াল ভালো খেলে না’- এই ঐতিহ্যের প্রতি সুবিচার করতে ভুলল না তারা। মিডফিল্ড থেকে রান শুরু করলেন মেসি। একে একে পেরিয়ে এলেন চার-চারটি চ্যালেঞ্জ, শেষে তার ডান পায়ের আলতো টোকায় ক্যাসিয়াসকে বিট করে বল আশ্রয় নিল বটম কর্নারে। স্বপ্নালোক থেকে বাস্তবের পৃথিবীতে আছড়ে পড়লেন মরিনহো।

ক্ল্যাসিকো ৫ (২০১০-১১): বার্সা ১-১ রিয়াল

সেকেন্ড লেগ ন্যু ক্যাম্পে। আগের ম্যাচে রেফারির সমালোচনা করে টাচলাইন ব্যানের শিকার মরিনহো সেদিন স্টেডিয়ামেই এলেন না। এই ম্যাচে মাদ্রিদের বিশুদ্ধবাদীদের চাপে বেশ পজিটিভ ফুটবল খেলালেন দলকে। ডান প্রান্ত দিয়ে রোনালদো তার গতি দিয়ে বার্সার ব্যূহ ভেদ করতে চেষ্টা চালিয়েছেন বটে, কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে পেদ্রোর গোল মাদ্রিদের ফাইনালে যাওয়ার সম্ভাবনা শেষ করে দেয়। শেষমেশ মার্সেলোর গোলে সান্ত্বনার ড্র নিয়ে ঘরে ফিরে রিয়াল। এই ম্যাচ নিয়ে ভালোই বিতর্ক হলো। হিগুয়েনের গোল বাতিল করা নিয়ে বেশ একটা লঙ্কাকাণ্ড হয়ে গেল। মৌসুমের শেষ ক্ল্যাসিকোতে একরাশ হতাশা সঙ্গী হলো মরিনহোর। দুই লেগ মিলিয়ে ৩-১ ব্যবধানে হারিয়ে ফাইনালে চলে গেল বার্সা।

ক্ল্যাসিকো ৬ (২০১১-১২): রিয়াল ২-২ বার্সা

চ্যাম্পিয়নস লিগের ক্ষত শুকায়নি তখনও। আবারও দেখা দুই স্প্যানিশ জায়ান্টের। উপলক্ষ, স্প্যানিশ সুপার কাপ। ১ম লেগ আগের মতোই বার্নাব্যুতে। প্রিয় ৪-২-৩-১ ফর্মেশনে মরিনহো ‘ডাবল পিভট’ হিসেবে ব্যবহার করেন স্যামি খেদিরা ও জাবি আলোনসোকে। রীতিবিরুদ্ধভাবে এই ম্যাচে আগ্রাসনের সঙ্গে খেলে রিয়াল। গুনে গুনে ১৯টি শট নেয় রিয়াল, যার ৮টাই অন-টার্গেট।

রিয়ালের মুহুর্মুহু আক্রমণের মুখে বার্সা মাটি কামড়ে সুযোগের অপেক্ষায় থাকে, পেয়েও যায় সেই সুযোগ। মেসিকে গোল উপহার দেন খেদিরা, তবে এর আগেই ডেভিড ভিয়া আগুন ঝরানো শটে রিয়ালের জাল ভেদ করেন। ম্যাচে বার্সার অন-টার্গেট শট এই দুটিই ছিল। ওজিল শুরুতেই গোল করেন, পরে বার্সা এগিয়ে যাবার পর আলোনসো সমতা এনে জমজমাট সেকেন্ড লেগের প্রেক্ষাপট তৈরি করেন। ড্র হলেও এটি ছিল টিকিটাকার বিরুদ্ধে মরিনহোর আরেকটি মাস্টারস্ট্রোক।

ক্ল্যাসিকো ৭ (২০১১-১২): বার্সা ৩-২ রিয়াল

আরেকটি দুর্দান্ত ফুটবলের রাত। আরেকবার হতাশা সঙ্গী মরিনহোর। আরেকবার মেসির ভূত রিয়ালকে তাড়া করা।

রাতটাই ছিল অন্যরকম। এদিকে ইনিয়েস্তা গোল করেন, তো ওদিকে ক্রিস্টিয়ানো; আবার এদিকে মেসি গোল করেন, তো ওদিকে বেনজেমা করিৎকর্মা হয়ে বার্সার জালে ঢুকিয়ে দেন একবার। অতিরিক্ত সময়ের দিকে গড়াবে ভেবে সবাই যখন আয়েশ করে বসল টিভির সামনে, তখনই বজ্রপাত – মানে, মেসির গোল! রেগেমেগে মার্সেলো করে বসলেন ভয়াবহ এক ট্যাকল, পা ভাঙলো ফ্যাব্রেগাসের। বার্সাই বা কিছু কম যাবে কেন? ওদিকে ডেভিড ভিয়া মুহূর্তের উত্তেজনায় থাপ্পড় মেরে বসলেন সদাসৌম্য মেসুত ওজিলকে।

শিষ্যরা যুদ্ধে ব্যস্ত, সেনাপতিই বা বসে থাকেন কীভাবে! মরিনহো বার্সার অ্যাসিস্ট্যান্ট কোচ টিটোর চোখ মুচড়ে দিলেন। সেদিন যেন নরকের ধ্বংসস্তূপ থেকে ট্রফি জয় করে নিল বার্সেলোনা। অ্যাগ্রেগেট ৫-৪; বার্সা স্প্যানিশ সুপার কাপ ২০১১ চ্যাম্পিয়ন!

আরও একটি ট্রফি বার্সেলোনার; Image Source: Albert Gea / REUTERS

ক্ল্যাসিকো ৮ (২০১১-১২): রিয়াল ১-৩ বার্সা

এই ম্যাচের আগে প্রেস কনফারেন্স রুমটা বিস্ময়করভাবে ঠান্ডাই ছিল। কিন্তু বার্নাব্যুতে ম্যাচটা শুরু হতে না হতেই উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ে। এল ক্ল্যাসিকোর দ্রুততম গোল করতে বেনজেমা সময় নেন মাত্র ২১ সেকেন্ড। ম্যাচের শুরুতে রিয়াল প্রতিপক্ষের ওপর ছড়ি ঘোরালেও মাদ্রিদের পালে হাওয়া আসেনি। উল্টো সানচেজের গোলের পর জাভির ডিফ্লেকটেড গোল মাদ্রিদে হতাশা ছড়িয়ে দেয়। শেষে ফ্যাব্রেগাসের গোলটা রিয়ালের দীর্ঘশ্বাসটাই কেবল বাড়ায়। আরও একবার হোমে স্প্যানিশ অভিজাতদের পতন ঘটে।

ক্ল্যাসিকো ৯ (২০১১-১২): রিয়াল ১-২ বার্সা

মরিনহোর শনির দশা যেন কাটছিলই না। আরও একটি কাপ কম্পিটিশনের নকআউট স্টেজে বার্সার সাথে দেখা। এবার উপলক্ষ কোপা দেল রে কোয়ার্টার ফাইনাল। আগের মাসে হোমেই তিন-তিনটা গোল হজম করে রিয়াল, আবারও সেই হোমেই খেলা।

প্রথম লেগ। শুরুটা ভালোই হলো। বেনজেমার পাস, দৃশ্যপটে রোনালদো; জেরার্ড পিকে’কে অবলীলায় স্টেপওভার করে পিন্টোর দু’পায়ের ফাঁক দিয়ে গোল! কিন্তু বিরতির পর বার্সা তাদের খেল দেখায়। পেপের বিভ্রান্তির সুযোগ নিয়ে পুয়োলের গোল, রিয়ালের অফসাইড ট্র‍্যাপ ভেঙে আবিদালের মারণথাবা – আবারও এগিয়ে গিয়েও ডিফেন্সের ভুলে হারতে হলো রিয়াল মাদ্রিদকে। এই ম্যাচেই পেপে মেসির হাতের ওপর নিজের বুট তুলে দেন।

ক্ল্যাসিকো ১০ (২০১১-১২): রিয়াল ১-২ বার্সা

২৫ জানুয়ারি, ২০১২। মরিনহোর সমৃদ্ধ কোচিং ক্যারিয়ারে এরকম দিন আর এসেছে কি না, সন্দেহ। এই দিনটি নিছক কোপা ডেল রে কোয়ার্টার ফাইনালের সেকেন্ড লেগ ছাপিয়ে আরও বৃহত্তর অর্থ বয়ে এনেছিল স্প্যানিশ ফুটবলে। মেসিকে বুট দিয়ে আঘাত করা পেপেকে বাদ দেয়ার দাবি এসেছিল খোদ মাদ্রিদ শিবির থেকেই – যদিও মরিনহো এর ধার ধারেননি। রিয়াল ড্রেসিংরুমে ভাঙনের খবরটি ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হিসেবেই এসেছিল। তার ওপর ন্যু ক্যাম্প সেদিন হয়ে উঠেছিল অগ্নিগর্ভ। পেপের ‘ওয়ান্টেড’ পোস্টারে ছেয়ে গিয়েছিল স্টেডিয়ামের বাইরের গাছগুলো। ম্যাচের সময় পেপে যতবার বল টাচ করেন, ঠিক ততবারই ‘অ্যাসাসিন’ বলে চেঁচিয়ে ওঠে কিউলরা।

তবে সেদিন মরিনহো নেমেছিলেন আঁটঘাঁট বেধেই। কাকা-ওজিল-রোনালদোরা চারদিক থেকে আক্রমণের ঢেউ বইয়ে দিয়েছিলেন। রিয়ালের প্রেসিংয়ে বার্সার শ্বাসরোধ হয়ে গিয়েছিল প্রায়। বার্সার সেন্টারব্যাকরা পজিশন হোল্ড করতে পারছিল না, অভাবনীয়ভাবে বলের বাউন্স ও গতি বুঝতে ভুল করছিল। প্রথমার্ধ শেষের আগেই রিয়ালের পাঁচটি অন-টার্গেট শট , ওদিকে বার্সার ‘ভাঁড়ে মা ভবানী’। কিন্তু বরাবরের মতোই খেলায় ফিরে আসতে সময় নেয়নি তারা। তিন মিনিটের এক ঝড়ে পেদ্রো আর আলভেজের গোলে দুই গোলের লিড নিয়ে নিল বার্সেলোনা।

আর যায় কোথায়! বার্সা ফ্যানরা সমস্বরে স্লোগান দেয়া শুরু করে, ‘Mourinho, Stay’! একদল সমর্থক একটি ব্যানার উঁচিয়ে ধরে, যাতে খবরের কাগজের বিজ্ঞাপনের মতো করে লেখা: ‘ওয়ান্টেড: ক্ল্যাসিকোর জন্য যোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বী চাই। বিস্তারিত জানতে এখানে যোগাযোগ করুন’। ওদিকে মরিনহোর অবস্থা তথৈবচ। তার সাজানো দাবার চাল গার্ডিওলার কাছে এভাবে নস্যাৎ হয়ে যাবে, ভাবতেই পারেননি।

তখনই রিয়ালকে বাঁচাতে আবারও দৃশ্যপটে রোনালদো। তখন বার্সার নিয়মিত ঘাতক হয়ে যাওয়া রোনালদো গোল করে ম্যাচে প্রাণ ফিরিয়ে আনেন। এরপর বেনজেমা যখন গোল করেন, বার্সা তখন পুরোপুরি ব্যাকফুটে। কিন্তু বাকিটা সময় বার্সা তাদের গোলপোস্ট যক্ষের ধনের মতো পাহারা দিলো, রিয়ালেরও আর গোল দেওয়া হলো না। বার্সা দুই লেগ মিলিয়ে সেমিফাইনালে গেল বটে, কিন্তু ততক্ষণে বার্সা সমর্থকদের সুর বদলে গেছে – সঙ্গে করে আনা ব্যানার-ফেস্টুনগুলোও আর দেখা গেল না। মূলত এই ম্যাচের মাধ্যমেই ক্ল্যাসিকোতে নতুন এক মরিনহো দেখা দিলেন। এরপর থেকে বার্সা সমর্থকদের যোগ্য ক্ল্যাসিকো প্রতিদ্বন্দ্বী নিয়ে আর ভাবতে হয়নি।

ক্ল্যাসিকো ১১ (২০১১-১২): বার্সা ১-২ রিয়াল

বাজারে একটা কথা প্রচলিত ছিল খুব যে, মরিনহোকে আনা হয়েছে বার্সাকে হারানোর জন্যই। কিন্তু গত দশ ম্যাচে মাত্র একবারই এই কাজটি করতে পেরেছেন তিনি। তবে সিজনের শেষ ক্ল্যাসিকোর প্রাক্কালে মরিনহোকে আনার যৌক্তিকতা নিয়ে বিন্দুমাত্র সন্দেহ ছিল না রিয়াল সমর্থকদের কাছে। লা লিগায় যে তখন রিয়াল ৪ পয়েন্ট এগিয়ে বার্সার চেয়ে! কিন্তু এবার বার্সার ঘরের মাঠে ম্যাচ। নিজেদের হোমে অবলীলায় ম্যাচ জিতে পয়েন্ট ব্যবধান এক-এ নামিয়ে আনার সম্ভাবনাটা তখন খুব বাস্তব হয়েই দেখা দিচ্ছিল।

মরিনহো তার চিরাচরিত ৪-২-৩-১ ফর্মেশনে নামলেও চমক দেখান গার্দিওলা – সেদিন তিনি ৩-৪-৩ ফর্মেশন ব্যবহার করেন। রাইটব্যাক আলভেজ সেদিন উইঙ্গার বনে যান। নিয়মিত একাদশের বুস্কেটস-ইনিয়েস্তা-জাভির সাথে মিডফিল্ড সামলাতে নামেন একাডেমির থিয়াগো আলকান্তারা। কাগজে-কলমে মিডফিল্ডে খেলার কথা থাকলেও রিয়ালের চারজন ফরোয়ার্ডকে সামলানোর জন্য নিজেদের তিনজন সেন্টারব্যাককে সঙ্গ দিতে নিচে নেমে যেতে হয় বুস্কেটসকে। ফলে তার যাকে মার্ক করার কথা ছিল, সেই ওজিল ফ্রি হয়ে যান।

ওদিকে রিয়াল তাদের চারজন ফরোয়ার্ডকে সবসময় প্রস্তুত রাখছিল যাতে যেকোন সময় তাদেরকে কাউন্টার অ্যাটাকে ব্যবহার করা যায়। প্রতিপক্ষের কোনো ফুলব্যাক না থাকায় দুই পাশ দিয়ে ডি মারিয়া আর রোনালদো দুর্গভেদ করার চেষ্টা করছিলেন। এর মধ্যেই রিয়াল এগিয়ে যায় খেদিরার গোলে। বার্সা জবাবে তাদের চিরাচরিত কৌশলই ব্যবহার করছিল। বল ধরে রেখে মেসিকে দিয়ে রিয়ালের পেনাল্টি বক্সে খালি জায়গা বের করার চেষ্টা করছিল। কিন্তু সেদিন গার্দিওলার এই বিখ্যাত ‘ফলস নাইন’ স্ট্র্যাটেজিও কাজে এলো না। মেসি রিয়ালের একজন ডিফেন্ডারকে তার জায়গা থেকে বের করে নিয়ে আসলেও সেই খালি জায়গা ব্যবহার করার মতো কেউ ছিল না। তবে সানচেজ নামার পর বদলে যায় এই সমীকরণ। বদলি হিসেবে মাঠে নেমেই গোল করে বার্সাকে ম্যাচে ফিরিয়ে আনেন। কিন্তু মরিনহোর হাতে আরেকটি ট্রাম্পকার্ড ছিল।

ডি মারিয়া বদলি হওয়ার পর থেকে মাঠের ডান প্রান্তে মিডফিল্ডের কাছেই নিঃশব্দ আততায়ীর মতো অপেক্ষা করে ছিলেন মেসুত ওজিল। বল তার কাছে আসতেই ফার্স্ট টাচেই তিনি ছুঁড়ে দিলেন তার ব্রহ্মাস্ত্র – ক্ল্যাসিক ‘ডায়াগোনাল বল’। মিডফিল্ড থেকে কোণাকোণি যাওয়া এই পাস বার্সার মিড ও ডিফেন্স বাইপাস করে খুঁজে নিল ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোকে – স্নাইপারের অব্যর্থ নিশানায় ভালদেসের রিফ্লেক্সকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বল মিশিয়ে দিলেন বার্সার জালে। বার্সার ৯৯,০০০ দর্শককে আক্ষরিক অর্থেই স্তব্ধ করে দিয়ে তার সেই বিখ্যাত ‘ক্যালমা ক্যালমা’ সেলিব্রেশন করেন। ২৮ শতাংশ পজেশন নিয়েও বার্সার দ্বিগুণ অন-টার্গেট শট (৬) নিয়ে ‘সিংহের গুহা’ থেকে বিজয়ীর বেশে ফিরে আসা – আরেকটি মরিনহো মাস্টারক্লাসের শিকার হলো ওই সময়ের বিশ্বসেরা দলটি। এই ম্যাচ জিতেই চার বছর পর লিগ জয়ের কাছাকাছি চলে গেল রিয়াল।

ন্যু ক্যাম্প পুড়ে ছারখার; Image Source: Denis Doyle

ক্ল্যাসিকো ১২ (২০১২-১৩): বার্সা ৩-২ রিয়াল

আবারও স্প্যানিশ সুপার কাপে দেখা দুই আর্চ-রাইভালের। ১ম লেগ ন্যু ক্যাম্পে। ততদিনে অনেক কিছুই বদলে গেছে। পেপ গার্দিওলা এখন আর বার্সায় নেই। তার পরিবর্তে দায়িত্ব নিয়েছেন টিটো ভিলানোভা। কোচ বদলালেও বার্সার খেলার ধার বদলায়নি। আগের মতোই পজেশন ধরে রেখে প্রতিপক্ষকে ক্লান্ত করে তুলল তারা, যার মূলে ছিল জাভি-ইনিয়েস্তার অসাধারণ কম্বিনেশন। তবে প্রথমার্ধে রিয়ালের ডিফেন্স টলানো যায়নি। উল্টো, দ্বিতীয়ার্ধে ৫৫ মিনিটে ওজিলের কর্নার থেকে মার্কার বুস্কেটসকে হারিয়ে হেডে গোল করে বসেন রোনালদো।

তবে ন্যু ক্যাম্পে পরপর চার ক্ল্যাসিকোতে গোল করার আনন্দ মিইয়ে যায় পরের মিনিটেই, আলভেজের পাস থেকে গোল করেন পেদ্রো। এরপর মেসির পেনাল্টি আর জাভির অসাধারণ গোলে চোখের পলকে বার্সা দুই গোলের লিড নিয়ে নেয়। যখন রিয়াল ক্যাম্প ন্যু থেকে রীতিমতো লেজ তুলে পালাতে পারলেই বাঁচে, ঠিক তখনই তাদের সাহায্যে এগিয়ে এলেন ভিক্টর ভালদেস – হ্যাঁ, বার্সার গোলকিপার ভালদেসই। ডি মারিয়াকে উপহার দিলেন একটি মূল্যবান অ্যাওয়ে গোল। তিনটি গোল দিয়েও এক ধরনের শঙ্কা ঝুলে রইল কাতালোনিয়ার আকাশে।

ক্ল্যাসিকো ১৩ (২০১২-১৩): রিয়াল ২-১ বার্সেলোনা

দ্বিতীয় লেগ। আগের লেগে কোনোমতে দুই শটে দুই গোল করে ‘মানে মানে কেটে পড়েছে’, কিন্তু এবার ঘরের মাঠে রীতিমতো শার্টের হাতা গুটিয়ে নামল রিয়াল। পাঁচ মিনিটের মাথায় হিগুয়েনের শট ভালদেস দুর্দান্তভাবে সেভ করলেও পরের মিনিটে তা আর হয়নি। মাশচেরানোর ‘বদান্যতায়’ বল পেয়ে জালে ঢুকাতে কিপটেমি করেননি হিগুয়াইন। গোল পেয়ে আরও হিংস্র হয়ে ওঠে মরিনহোর শিষ্যরা। দ্রুতগতির আক্রমণ আর লং বল ব্যবহার করে বার্সার নাভিঃশ্বাস তুলে ফেলেছিল।

এরকমই একটি লং বল এসেছিল ১৯তম মিনিটে। বলের জন্য ছুটছিলেন পিকে আর রোনালদো, বাউন্স বুঝতে ভুল করে দু’জনেই চলে এলেন বলের সামনে। যখন মনে হচ্ছিল পিকেই বুঝি একটু সুবিধাজনক অবস্থানে আছেন, ঠিক তখনই বুটের কানা দিয়ে তার মাথার ওপর দিয়ে রোনালদোর অবিশ্বাস্য ফ্লিক। এরপর কোনোমতে বল কন্ট্রোল করে ডান পায়ের জোরালো শট, ভালদেসের বাড়ানো হাত ভেঙেচুরে বল সোজা জালে। তবে বিরতির আগে ফ্রি-কিক থেকে গোল করে মেসি বার্সাকে ম্যাচে ফিরিয়ে আনেন।

বিরতির আগে ম্যাচে রিয়ালের আধিপত্য থাকলেও বিরতির পর সেই ভারটা বার্সাই নিয়ে নেয়। রিয়াল তখন পিছু হটে নিজেদের হাফে অবস্থান নেয়। বার্সা তখন রীতিমতো বুলডোজার চালাতে থাকে রিয়ালের ওপর। কিন্তু রিয়ালের ডিফেন্স তখন চীনের প্রাচীর। স্রোতের মত আসা আক্রমণগুলো ঠেকিয়ে দেয় প্রাণপণ চেষ্টায়। শেষদিকে মেসির শট গোলপোস্টের বাইরে দিয়ে গেলে রিয়ালের জয় নিশ্চিত হয়। সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে প্রথম এল ক্ল্যাসিকো জয়ের সাথে রিয়ালের হয়ে তৃতীয় ও শেষ ট্রফি জিতে নেন মরিনহো।

অ্যাগ্রেগেট ৪-৪, রিয়াল মাদ্রিদ অ্যাওয়ে গোলের হিসেবে স্প্যানিশ সুপার কাপ ২০১২ চ্যাম্পিয়ন।

ক্ল্যাসিকো ১৪ (২০১২-১৩): বার্সা ২-২ রিয়াল

লিগে রিয়াল মাদ্রিদ বার্সা থেকে ৮ পয়েন্ট পিছিয়ে তখন। এর মধ্যেই ন্যু ক্যাম্পে ম্যাচ মানে জ্বলন্ত কড়াই থেকে এক লাফে উত্তপ্ত উনুনে আরকি। তবে ম্যাচের প্রথম পঁচিশ মিনিট রিয়ালের পরিবর্তে বার্সেলোনাই উনুনের তাপটা অনুভব করছিল বেশি।

বেনজেমা আর রামোস প্রতিপক্ষের প্রতি ‘সদয়’ হওয়ার কারণে বুলেটগুলো কানের পাশ দিয়েই যায় বার্সার। তবে রোনালদো একটু ‘বেয়াড়া’ হয়ে ওঠেন। বেনজেমার পাস থেকে বল পেয়ে আলভেজ ধেয়ে আসার আগেই বাম পায়ের জোরালো শটে কাছের পোস্টে ভালদেসকে পরাস্ত করেন তিনি। এই নিয়ে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো টানা ছয় এল ক্ল্যাসিকোতে গোল করেন রোনালদো।

Image Source: Bleacher Report

 

তবে বরাবরের মতোই ‘পার্টি-ক্র‍্যাশার’ হিসেবে হাজির হয়ে গেলেন তার আর্চ-নেমেসিস; প্রথমে পেপের ভুল থেকে পাওয়া একটি সহজ ট্যাপ-ইন, এরপর কঠিন ফ্রি-কিক থেকে গোল করেন মেসি। কিন্তু ‘পার্টি’ যাতে পুরোপুরি ভেস্তে না যায়, তাই রোনালদোকেই আবার এগিয়ে আসতে হলো। ওজিলের কাছে বল, তাকে থামাতে বীরদর্পে এগিয়ে এলেন মাশচেরানো। কিন্তু ওদিকে ফ্রি হয়ে গেলেন রোনালদো, ওজিলের থ্রু বল থেকে তড়িঘড়ি করে ভালদেসকে বেশি কষ্ট না দিয়ে গোল দিয়ে দিলেন।

এরপরের কাহিনীটা জয়ের কাছাকাছি গিয়েও বার্সার তীরে এসে তরী ডুবানোর। জাভির শট ক্রসবারে লাগে, পেদ্রোর শট আরেকটু বাইরে দিয়ে চলে যায়। আর রিয়াল এক পয়েন্ট নিয়েই ঘরে ফিরে যায়।

ক্ল্যাসিকো ১৫ (২০১২-১৩): রিয়াল ১-১ বার্সা

শেষ দেখা হয়েছিল সেই অক্টোবরের শুরুতে। এর তিন মাস পর জানুয়ারির শীতের আমেজে আবার তাদের দেখা। সময়ের আবর্তনে ক্ল্যাসিকোও তার চিরাচরিত উত্তাপ হারিয়ে শীতের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে। অসুস্থ হয়ে পড়েছেন টিটো ভিলানোভা, ক্যাসিয়াসের সাথে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে মরিনহোর কন্ঠেও আর ঝাঁঝ নেই। এবার উপলক্ষ কোপা ডেল রে’র সেমিফাইনাল।

প্রথম লেগ রিয়ালের মাঠে। গত কয়েক বছরের ঐতিহ্য মেনে প্রথমদিকে রিয়ালই আধিপত্য বিস্তার করছিল ম্যাচে, তাদের হুমকি-ধামকিতে কেঁচো হয়ে রইল বার্সা ডিফেন্স। বরাবরের মতোই রোনালদোর ভূত তাড়া করে বেড়ালো পিকে’কে। পিকেও ভবিতব্য মেনে রোনালদোকে ফাউল করে রিয়ালকে ফ্রি-কিক উপহার দিলেন। রোনালদোর ফ্রি-কিক পিন্টো সেভ করলেন বটে, কিন্তু রিয়াল তাতে ক্ষান্তি দেয়নি। বল বেশিরভাগ সময় বার্সার পায়েই থাকল, কিন্তু রিয়াল তাতে থোড়াই কেয়ার করে। তারা সুযোগ বুঝে বল ডাকাতি করে নিয়ে দ্রুত প্রতি-আক্রমণ করে বেড়াল। বার্সার ডিফেন্স তাসের ঘরের রূপ ধারণ করলেও রিয়ালের ডিফেন্স অটল রইল। চার ডিফেন্ডারের সাথে খেদিরা আর আলোনসো মিলে দুর্গ পাহারায় যোগ দিলেন। রোনালদো আর হোসে কায়েহন মিলে এদিকে ফুলব্যাকদের সুরক্ষা দেন, তো ওদিকে ওজিলের সহায়তায় কাউন্টার অ্যাটাক করেন। বার্সেলোনা রিয়াল-দুর্গের মধ্যে ফাঁকফোকর খুঁজে পেলেও তা দ্রুতই বন্ধ করে দেয়া হয়। 

বিরতির পর অবশ্য দৃশ্যপট পাল্টে গেল। এবার কেঁচো হওয়ার পালা রিয়ালের। ৫০ মিনিটে মেসির দুর্বল কন্ট্রোলে বিরক্ত হয়ে বল আশ্রয় নিল ফ্যাব্রেগাসের পায়ে, তিনিও বলকে ঠিকঠাকমত জালে পাঠিয়ে তার আস্থার প্রতিদান দিলেন। জাভির শট গোললাইন থেকে ফিরিয়ে দিলেন ‘বেরসিক’ রাফায়েল ভারান। ম্যাচের শেষ দিকে এই ভারানই হেডে গোল করে রিয়ালের ফাইনালে ওঠার সম্ভাবনা বাঁচিয়ে রাখেন।

ক্ল্যাসিকো ১৬ (২০১২-১৩): বার্সা ১-৩ রিয়াল

রিয়ালে মরিনহোর সময় ঘনিয়ে আসছে তখন। সময়টা ২০১৩ এর ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে। কাতালোনিয়ায় শীত-শীত ভাবটা রয়েই গেছে। কোপা দেল রে সেমিফাইনালের দ্বিতীয় লেগ। লা-লিগার আশা প্রায় ছেড়েই দিয়েছে রিয়াল। কোপা দেল রে’র প্রথম লেগেও অ্যাওয়ে গোল নিয়ে বেশ সুবিধাতেই আছে বার্সেলোনা। তার ওপর দ্বিতীয় লেগ ন্যু ক্যাম্পে। ম্যাচের আগে রিয়ালের খেলোয়াড়রা যখন টানেল দিয়ে এরেনায় ঢুকছিল, তখন বার্সেলোনা সমর্থকরা প্রায় ৯০,০০০ লাল-নীল-হলুদ পতাকা উড়িয়ে তাদের বিতৃষ্ণা জানান দিচ্ছিল। বার্তাটা ছিল পরিষ্কার: ম্যাচের সময় বড় ধরনের ভোগান্তিই অপেক্ষা করছে রিয়ালের জন্য।

কিন্তু ম্যাচের সময় শ্বেত-সর্পের আক্রমণের বিষ হাড়ে হাড়ে অনুভব করে কাতালান সৈন্যরা। মরিনহো পাকা দাবাড়ুর মতো দক্ষভাবে তার দাবার চাল প্রয়োগ করেন। টিকিটাকার ‘কালো জাদু’ যাতে কাজ করতে না পারে, সেজন্য তার ডিফেন্স ও মিডের মধ্যে খুবই কম জায়গা রাখেন। বার্সেলোনার আক্রমণগুলোকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করে দেয়ার ‘দুর্বুদ্ধি’ না করে ওগুলোকে হজম করার চেষ্টা করে রিয়াল মাদ্রিদ। এরপর বল পেলেই হিংস্র চিতার মতো চোখের পলকে হানা দেয় বার্সা শিবিরে। এই কাউন্টার অ্যাটাকের দায়িত্ব ছিল ডি মারিয়া আর রোনালদোর ওপর, যাদের গোলাবারুদ সরবরাহ করেছিলেন মেসুত ওজিল।

আগের পাঁচ দেখাতেই ন্যু ক্যাম্পে গোল পেয়েছিলেন রোনালদো – সংখ্যাটা ছয়ে নিতে এবার সময় লাগল মাত্র ১৩ মিনিট। কাট-ইন করে পেনাল্টি বক্সে ঢুকে গিয়েছিলেন, পাহারায় ছিলেন পিকে। নিউ ইয়র্ক টাইমসের পরিভাষায়,

‘যেন একটি গন্ডার দ্রুতগতির কোনও কোবরাকে আটকানোর মিশনে নেমেছে।’

রোনালদো আবার আউটসাইডে কাট করতেই ভজঘট পাকিয়ে ফেললেন কাতালান ডিফেন্ডার, যেন শ্রদ্ধাভরেই রোনালদোকে পেনাল্টি ‘নিবেদন’ করলেন। এভাবে নিবেদন করলে কি আর গোল না করে থাকা যায়! রোনালদোও গোল করে রিয়ালকে এগিয়ে দেন।

Image Credit: Jasper Juinen/Getty Images

 

সেদিন ন্যু ক্যাম্পের রাতটি ছিল অস্বাভাবিকভাবে শীতল। রাত বাড়ার সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে শীত। এর মধ্যেই হিমশীতল শিহরণ বয়ে গেল বার্সা সমর্থকদের কোট-ওভারঅল ভেদ করে। বইয়ে দিলেন ডি মারিয়া। কাউন্টার অ্যাটাকে বল নিয়ে বার্সা শিবিরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন এই আর্জেন্টাইন উইঙ্গার, সামনে কার্লোস পুয়োল। রোনালদোর মতোই প্রথমে কাট-ইন করার ভান করে তারপর বাইরের দিকে কাট করেন ‘ম্যাটাডোরস সুইপ’। ড্রিবলিং-এর ধাক্কা সামলাতে না পেরে হাঁটু গেড়ে বসে পড়েন পুয়োল। ডি মারিয়ার শট পিন্টু ঠেকিয়ে দিলেও রিবাউন্ডে বলটি এসে পড়ে সমুদ্রের ভয়ঙ্করতম শিকারি ‘গ্রেট হোয়াইট শার্ক’ এর পায়ে – শিকারির মতোই ঠাণ্ডা মাথায় লক্ষ্যভেদ করেন রোনালদো। এরপর আগের লেগের হিরো ভারানই শেষ পেরেকটি ঠুকে দেন বার্সার কফিনে। অতিরিক্ত সময়ে জর্ডি আলবার গোলটি শুধুই ব্যবধান কমিয়েছে। বিদায়ের আগে বার্সার কাছ থেকে কোপার মুকুট ছিনিয়ে নিয়েই ছাড়েন মরিনহো। অ্যাগ্রেগেট ২-৪, রিয়াল কোপা দেল রে’র ফাইনালে।

ক্ল্যাসিকো ১৭ (২০১২-১৩): রিয়াল ২-১ বার্সা

তিন দিন আগেই বার্সার মাঠে গিয়ে তিন-তিনটা গোল দিয়েছিল মরিনহোর রিয়াল, এবার তাদের সাথেই ঘরের মাঠে দেখা। ২ মার্চ, ২০১৩। মরিনহোর শেষ ক্ল্যাসিকো।

দিন কয়েক পরই ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের সাথে চ্যাম্পিয়নস লিগের মহাগুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ, তাই মরিনহো বসিয়ে রাখলেন রোনালদো-ওজিল-হিগুয়াইনদের মতো তারকাদের। কাকা-বেনজেমার সাথে আনকোরা আলভিরো মোরাতা ফ্রন্টলাইন সামলাতে নামলেন। অপেক্ষাকৃত দুর্বল দল নিয়ে নামলেও রিয়ালই প্রথমে লিড নিয়ে নিল। থিয়াগোর পাস মেসির কাছ থেকে চুরি করে নিলেন রামোস, পাস দিলেন লেফট উইংয়ে ওৎ পেতে থাকা মোরাতাকে। মোরাতার লম্বা ডায়াগোনাল ক্রস খুঁজে নিল ফার পোস্টের নিঃসঙ্গ আততায়ীকে – ফার্স্ট টাচেই বল জালে জড়িয়ে দিলেন বেনজেমা।

এই ম্যাচে বর্ণবাদী আচরণের শিকার হয়েছিলেন দানি আলভেস। সেটার শোধ নিতেই যেন মাদ্রিদ ডিফেন্সের পিছনে একরকম খালি জায়গা ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নিলেন। তার দুর্দান্ত পাসটি টেলিপ্যাথির মাধ্যমেই যেন খুঁজে নিল মেসিকে। আগের ১৫টি লিগ ম্যাচে গোল করেছেন তিনি, এই ম্যাচেও গোল না করলে ব্যাপারটা কেমন যেন দেখায়- তাই ‘কষ্ট করেই’ দিয়ে দিলেন সমতাসূচক গোলখানা। এরপর যা হলো- তাকে আর যাই হোক ‘ক্ল্যাসিকোসূচক’ বলা যায় না। বার্সা বল দেয়া-নেয়া করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল, রিয়ালও এই ব্যাপারে খুব একটা আপত্তি করল না। দর্শকরা অধৈর্য হয়ে পড়ছিল। তাদের সান্ত্বনা দিতেই যেন মরিনহো ওয়ার্ম-আপ করতে পাঠালেন রোনালদোকে।

খেলা শুরুর এক ঘণ্টার মাথায় নামলেন তিনি। ব্যাকব্রাশ করা চুল, ভাবলেশহীন চেহারা- নব্বইয়ের দশকের ‘টার্মিনেটর’ যেন ভবিষ্যতের পৃথিবীতে ফিরে এলেন। নামার সাথে সাথেই লেফট উইং বরাবর ট্রেডমার্ক দৌড়, কপালে খারাবি আছে জেনেও পিকে এগিয়ে এলেন। ফলাফল, রোনালদো পপাত ধরনীতল, বিনিময়ে পিকের হলুদ কার্ড। এর কিছুক্ষণ পরই রোনালদোর গোলার মতো ফ্রি-কিক ভালদেসকে কৃপা করে তার হাতে জ্বালা ধরিয়েই বেরিয়ে গেল। এর পরপরই দুরূহ কোণ থেকে তার শট গোলপোস্টের সাইডনেট কাঁপিয়ে দিল।

গোল না হলেও বার্সার খেলার ছন্দ হারিয়ে গেল। পাসিংয়ে কিছুক্ষণ আগের আত্মবিশ্বাস হারিয়ে সে জায়গায় আশ্রয় নিল স্নায়ুচাপ আর অনিশ্চয়তা। ওদিকে এলাকার ‘বড় ভাই’কে পেয়ে রিয়াল শার্টের হাতা গুটিয়ে নতুন উদ্যমে মাঠে নামল। পেপের পাস থেকে মোরাতার শট ভালদেস সেভ করলেন, মদ্রিচের লব পাস থেকে রোনালদোর হেড বাইরে দিয়ে চলে গেল।

মাদ্রিদ জয়সূচক গোলের জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ল, পেয়েও গেল শেষমেশ। ৮২তম মিনিটে সার্জিও রামোসের বুলেট হেডার মিসাইলের মত ভেদ করে দিল বার্সার জাল। শেষ মুহূর্তে গোল করে ম্যাচ জেতানোর দীক্ষাটা বুঝি এখান থেকেই নিয়েছিলেন স্প্যানিশ ডিফেন্ডার।

রোনালদো কিন্তু থামলেন না। তার ফ্রি-কিকটা গোল হতে হতে শেষমেশ কী মনে করে গোলবার কাঁপিয়েই সন্তুষ্ট থাকল। গোল না পেয়েও সেদিনের ম্যাচটাতে স্পটলাইট থাকল সে বছরের ব্যালন ডি’অর উইনারের ওপরেই। আর নিজের শেষ ক্ল্যাসিকোতে জয় নিয়েই সান্তিয়াগো বার্নাব্যুর শেষ বিকেলের আলোয় বিদায় নিলেন মরিনহো।

মরিনহোর বিদায়ী ক্ল্যাসিকোতে রামোসের থাবা; Image Source: DANI POZO/AFP via Getty Images

এবার একটুখানি পরিসংখ্যান। মরিনহো রিয়ালের হয়ে ১৭টি এল ক্ল্যাসিকোর দেখা পেয়েছিলেন। হেরেছেন ৬টিতে, ড্র-ও করেছেন সমসংখ্যক ম্যাচে। আর জয়মাল্য পেয়েছেন ৫টি ম্যাচে। একটু এদিক-ওদিক হলে এই সংখ্যাটা ৬-৭ পর্যন্তও হতে পারত।

তিনি এল ক্ল্যাসিকোতে এনেছিলেন উত্তাপ-শিহরণ-বিতর্ক। তার সময়ে রিয়াল পরিণত হয়েছিল ওয়ারমেশিনে। প্রতিপক্ষের দুর্বল দিকগুলোকে টার্গেট করে মোক্ষম সময়ে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে সফলভাবে হামলা চালাতো মরিনহোর সৈন্যরা। ট্যাকটিকস ও কম্বিনেশনে অধিকতর শক্তিশালী বার্সেলোনাকে হারানোর জন্য মাইন্ডগেমের আশ্রয় নিতেন। এটাতে তেমন একটা কাজ না হলেও একবার গার্দিওলার মতো ঠাণ্ডা মাথার মানুষও প্রেস কনফারেন্সে তার মেজাজ হারিয়ে অশ্রাব্য শব্দ ব্যবহার করেছিলেন।

আরেকটি ব্যাপার হলো, ওই সময় বার্সাকে হারালেও ম্যাচের খুব কম সময়ই আধিপত্য বিস্তার করার সুযোগ পেত অন্য দলগুলো। কিন্তু মরিনহোর ‘ওয়ারমেশিন’ এই ধারা ভেঙে অনেক ম্যাচেই বার্সাকে শক্ত হাতে শাসন করে। কিন্তু তার এই অতি আক্রমণাত্মক আদর্শ ক্ষণিকের জন্য ‘অ্যাড্রেনালিন রাশ’ জাগালেও, দীর্ঘ মেয়াদে এটি রিয়ালের খেলোয়াড়-সমর্থকদের মনোবল নিঃশেষ করে দেয়। অনেকটা যেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ফ্যাসিজমের পরিণতির মতো, ‘It burns too hot, but quickly goes away’। রিয়ালে তিন বছরের সেই স্পেল শেষে মরিনহোও নিয়মমাফিক উবে যান কর্পূরের মত। শেষ হয় বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম আলোচিত-সমালোচিত একটি রাজত্বের।

This article is in Bangla language. It is about the records of Jose Mourinho in El Classico. 

Featured Image Accreditation: Image found on https://wallpapersafari.com/w/2lZjy7

Related Articles