নিদেনপক্ষে খুব গরীব না হলে বিখ্যাত হওয়ার পর খ্যাতিটা ঠিক টের পাওয়া যায় না। অনেকে আবার এই খ্যাতির বিড়ম্বনায় পড়ে তাল হারান। কিন্তু বিখ্যাত হওয়ার জন্য যে পথটা পাড়ি দিতে হয়, সেটাকে খ্যাতি বলে না, অর্জন বলে। যেমনটা নিক পোপ। ইংল্যান্ড জাতীয় ফুটবল দলের এই গোলরক্ষক প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ খেলবেন এবার রাশিয়াতে। অথচ হতাশ হয়ে ফুটবলই ছাড়তে হয়েছিল তাকে। বিধাতার ইশারা আর ভাগ্যের মানচিত্র  ঠিক জায়গামতো ফিরিয়ে এনেছে পোপকে। এখন তিনি দলের অন্যতম নির্ভরযোগ্য সদস্য। অভাব আর তাড়নাকে পেছনে ফেলে তিনি আজ সফল।

অপ্রতিরোধ্য পোপ; Image Source: inews

যে পোপ দুধ বিক্রি করতেন, রাশিয়া বিশ্বকাপে সেই নিক পোপের দুই হাতের তালুতে নির্ভর করছে ইংল্যান্ডের বিশ্বকাপ ফুটবলের ভাগ্য। দায়িত্বটা অনেক বড়। সেই দায়িত্ব একই সঙ্গে সম্মানেরও। তাই পোপ খুশি। ২০০৮-১৮ সাল পর্যন্ত যে অভাব-অনটন আর কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে আজকের অবস্থানে তিনি এসেছেন, একটুখানি পেছনে ফিরে তাকালেই হয়তো দেখতে পান নিজের শেকড়কে। মনে রাখেন সেই কলেজ শিক্ষককে, যার জোরাজুরিতে ফিরেছিলেন ফুটবলে। ব্যস, মোড়টা ঘুরেছিল সেদিনই। ভোর ৪টায় ঘুম থেকে উঠে কাজ শুরু করে আবার গভীর রাত পর্যন্ত কষ্ট করা, অনুশীলন, পরিবার; সব মিলিয়ে বলা যায় ভাগ্য পোপকে তার জন্য সেরা উপহারটাই দিয়েছে।

এসব অর্জনে যারপরনাই খুশি তিনি। এত কষ্ট করেছেন নিজ দেশের প্রতিনিধিত্ব করতে। ভাগ্য তাকে সেখানেই নিয়েছে। লক্ষ্য কেবল বিশ্বকাপের মিশনে নামা, সেখানেও কিছু করে দেখানো।

১.

নিক পোপ কখনও ভাবেননি এমন কিছু হবে। ১০ বছর আগেও দুধ বেচতে হতো তাকে। হাঁটতে হতো ১০ কিলোমিটার পথ। একটা সময়ে সেলস এসিস্টেন্টের কোর্স করলেন, কারণ ফুটবল ছাড়তে হচ্ছে তাকে। কাজ করেছেন চেঞ্জিং রুম, কাপড়ের দোকানেও। দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে থেকে রাস্তা দিয়ে যাওয়া মানুষদের ডেকেছেন দোকানে যাওয়ার জন্য, কিছু কেনার জন্য। এসব কাজই করতে হয়েছে তাকে।

একটা সময়ে তিনি বলতেন, “আমি খুব বেশি অর্থ উপার্জন করতে পারছি না! এখান থেকে খুব বেশি অর্থ পাওয়া যায় না।“

ইপসুইচ টাউন যুব দলে পোপ সুযোগ পান ২০০৮ সালে। তখন বয়স তার ১৬ বছর। একই বছরে ইপসুইচ তাকে ছেড়েও দেয়। অথচ এই ক্লাবের গোলরক্ষক রিচার্ড রাইট, যিনি কিনা সাবেক ইংলিশ গোলরক্ষকও, তাকে দেখেই গোলরক্ষক হওয়ার স্বপ্ন দেখা শুরু করেন পোপ।

ওই কিশোর বয়সে প্রিয় খেলোয়াড়ের ক্লাবে জায়গা পাওয়া, আবার বের হতে হওয়া; সব মিলিয়ে খুব বাজে সময় গিয়েছিল পোপের জীবনে। বলা চলে এককথায় বিপর্যয়।

পোপের ভাষায়, “আমার আইডল হলেন রিচার্ড রাইট। আমি যেবার ক্লাবে সুযোগ পেলাম, সেবারই তাকে প্রথম দেখি। তাছাড়া ইপসুইচ এমন একটা ক্লাব, যাদের বলতে গেলে তেমন সমর্থকই ছিল না। অথচ, আমি আমার সেরাটা দিয়ে চেষ্টা করেছি।“

সতীর্থদের সঙ্গে খুনসুটিতে নিক পোপ; Image Source: The Independent

আক্ষেপ ভরা কন্ঠে তিনি আরও বলেছেন, “কখনও কখনও আমার মনে হতো আমাকে তারা চায় না। আমি আসলে যোগ্যই না। এমন একটা ধারণা আমার সেই ১৬ বছর বসয়ে হয়েছিল। আমি খুব কষ্ট পেয়েছিলাম।“

এরপর ফুটবল ছেড়ে কেবল পেটের দায়ে অন্য রাস্তা খুঁজতে হয় তাকে। আসলে ফুটবলের প্রতি তার অভিমান হয়েছিল। কারণটা কেবলই অবহেলা। এ সময়েই বারি শহরে ওয়েস্ট স্পোর্টস একাডেমিতে দুই বছর মার্কেটিং বিষয়ে পড়াশোনা করেন। এক বছর পড়েন ক্রীড়া বিজ্ঞান। সত্যি বলতে, তার অর্থের প্রয়োজন ছিল।

পোপের ভাষায়, “আমি যখন ইপসুইচ থেকে এখানে এলাম, আমি খুব হতাশ ছিলাম। নিজেকে নিয়ে কোনো সম্ভাবনাই দেখছিলাম না। কিন্তু আমি আসলে ভাগ্যবান ছিলাম। কলেজে আমি বড় একটা সমর্থন পেয়েছিলাম। আমি মাঠে ফিরতে পেরেছিলাম। কেবল তা-ই না, সেখানে নিজের পারফরম্যান্স প্রমাণ করে ১৫০টির বেশি ম্যাচ খেলি এই তিন বছরে। একাডেমিতে ফুটবলার হিসেবে এত ম্যাচ খেলা এককথায় অসম্ভব। আমি পেরেছিলাম। আর এগুলোই আমাকে এখন খেলোয়াড় হিসেবে বেড়ে উঠতে সাহায্য করেছিল।“

২.

২৬ বছর বয়সী পোপ সেই যে দ্বিতীয়বার শুরু করলেন, থামা হয়নি আর। তিনি এমন একজন ফুটবলার, যিনি কিনা ফুটবল পিরামিড তথা প্রতিটি পর্যায় খেলে এসে জায়গা করেছেন শীর্ষে। ৬ ফুট ৩ ইঞ্চি উচ্চতার এই পোপ ইংল্যান্ড দলে ডাক পাওয়ার পর সবার আগে মনে করেছেন তার শেকড়কে। বারি ও হ্যারোর হয়ে রিম্যান প্রিমিয়ারে খেলা, সেখান থেকে এসেক্স ও সাফক বর্ডার লিগে খেলা, সেটাও হয়েছিল এই বারি (বারি টাউন রিজার্ভ) দলের হয়ে।

নিজের সেই পুরনো স্মৃতি রোমন্থন করলেন পোপ, “সাফক সিনিয়র কাপ জিতেছিলাম। ক্লাব ট্রফি জিতলো। আমার জন্য মেডেল।”

চলছে অনুশীলন; Image Source: Telegraph

এখানে খেলার সময় যেসব জায়গায় পোপ আর তার দলকে খেলতে যেতে হতো, সেটা নিয়ে অবশ্য আক্ষেপ আছে এই তরুণের। তিনি ইংলিশ গণমাধ্যমকে এক বক্তব্যে বলেছিলেন, “ওসব মাঠে যাওয়ার জন্য মানচিত্রের সাহায্য নিতে হতো।” দর্শকও নাকি ছিল না বললেই চলে। তিনি বলেছেন, “কখনও কখনও ১০ জন মানুষ আর একটা কুকুর, এই ছিলো দর্শক।”

তারপরও গিয়েছেন নিক পোপ। বারি থেকে চার্ল্টন ক্লাবে যোগ দিলেন ২০১১ সালে। ছিলেন পাঁচ বছর। এই সময়ের পুরোটা কেবল চার্ল্টন ক্লাবের হয়েই খেলেছেন তিনি, এমনটাও নয়। তাকে পাঁচ ক্লাবে লোনে খেলতে হয়েছে। মজার ব্যাপার হলো, যে বারি ক্লাব থেকে এসেছিলেন, তাদের হয়েও একবার ধারে খেলতে হয়েছে তাকে।

ঝড়, খারাপ আবহাওয়া, দর্শকহীন মাঠ কিংবা এক ক্লাবের হয়ে ক্লান্তিহীন, টানা অন্যান্য ক্লাবের হয়ে লোনে খেলা; কোনোকিছুই দমাতে পারেনি তাকে। কারণ ততদিনে নিজের দিশা খুঁজে পেয়েছেন তিনি। নিজের প্রতিষ্ঠিত হতে কী কী করতে হবে, সেটাও বুঝে গেছেন। তাই এগিয়েছেন সে পথেই।

৩.

সেই বারি টাউন রিজার্ভ, সাফক; নিক পোপকে তার সামর্থ্য বিচার করার সুযোগ দিয়েছে। তবে মূল জায়গাটা করে দিয়েছে বার্নলি। ২০১৬ সালে তিনি ইংলিশ ক্লাবটিতে জায়গা পান।

মজার ব্যাপার হলো, ক্লাবে সুযোগ ২০১৬ সালে হলেও, ম্যাচ পেতে পেতে অপেক্ষা করতে হয়েছে ২০১৭ সাল পর্যন্ত। সেটাও তাকে কেন্দ্র করেই এমনও নয়। মূলত দলের প্রধান গোলরক্ষক, যার নাম টম হিটন, তিনি ইনজুরিতে পড়েন। ব্যস, পথ খুলে যায় পোপের সামনে। টানা খেলতে থাকেন বার্নলির হয়ে। একইসঙ্গে দেখাতে থাকেন একের পর এক সব চমক। ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে প্রথম ম্যাচ খেলেন। ২০১৮ মৌসুম পর্যন্ত তার নামের পাশে যোগ হয় ৩৫টি ম্যাচ। আর পারফরম্যান্স? ফুটবলের ভাষায়, ক্লিন শিট রেখেছেন ১১ ম্যাচে। হজম করেছেন ৩৫ গোল।

সবকিছু মিলিয়েই পোপের উপর নজর পড়ে ইংল্যান্ড জাতীয় দলের কোচ গ্যারেথ সাউথগেটের। ৭২ ম্যাচ খেলা গোলরক্ষক জো হার্টকে সরিয়ে বিশ্বকাপের স্কোয়াডে নাম লেখেন নিক পোপের।

যে হতাশায় ক্লাব থেকেই ছিটকে যেতে হয়েছিল, জীবিকার তাগিদে দুধ বিক্রির কাজে নামতে হয়েছিল, সেই ছেলেটি নিজের জীবন গড়েছেন নিজ হাতে। শত বাধা-বিপত্তিকে রুখে দিয়ে নিজের ভাগ্য গড়েছেন নিজ হাতে। এখন কেবল সময় দেশকে কিছু দেওয়ার।

ফিচার ইমেজ- iNews