ডেল স্টেইন। ফাস্ট বোলিংয়ে গতি আর সুইংয়ের অন্য নাম বলা যায় তাকে। দক্ষিণ আফ্রিকার এই তারকা বোলার ক'দিন আগেই ঘোষণা দিয়েছেন, ২০১৯ বিশ্বকাপের পর সীমিত ওভারের ক্রিকেট থেকে বিদায় নেবেন। তবে খেলে যাবেন সাদা পোশাকের টেস্ট ম্যাচ। টেস্ট ক্রিকেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক করা স্টেইন এখন পর্যন্ত ৮৮টি টেস্টে নিয়েছেন ৪২১ উইকেট। ওয়ানডে খেলেছেন ১১৮টি, উইকেট ১৮০টি। টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলেছেন ৪২টি। সেখানে উইকেট আছে ৫৮টি।

শুধু মাঠের পারফরম্যান্স নয়, দক্ষিণ আফ্রিকার ভবিষ্যৎ ক্রিকেটের অবস্থা, বর্তমান আর বিশ্ব ক্রিকেটে ফাস্ট বোলিংয়ের ভবিষ্যৎ নিয়েও ভাবনা রয়েছে স্টেইনের। এসব নিয়েই মুখোমুখি হয়েছেন এক সাক্ষাতকারে।

সাম্প্রতিক দক্ষিণ আফ্রিকার পেসারদের বিপক্ষে ভারতীয় ব্যাটসম্যানরা অনেক ভুগেছেন। ঠিক যেভাবে ২০১৪ সালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ভুগেছিলেন। আপনার কী মনে হয়? ভারত কেন বিদেশের মাটিতে পেস বোলিংয়ের মুখে বিপদে পড়ে? সমস্যাটা কি সামর্থ্যে নাকি মানসিক?

ডেল স্টেইন- দু'টোই হতে পারে। আপনি যদি ঘরের মাটিতে বেশি খেলেন, তাহলে অবশ্যই বিদেশে খেলার জন্য আপনাকে বিশেষ প্রস্তুতি নিতে হবে। এটা আপনাকে আপনার খেলার তাড়নাকে আরও বাড়িয়ে দেবে। কারণ আপনি যদি বেশি বেশি নিজের দেশেই খেলেন, তাহলে একটি নির্দিষ্ট ঘরানার খেলার সঙ্গে আপনি পরিচিত হয়ে উঠবেন। যেমন, আপনি যদি ভারতের মাটিতে একটি হাফ-ভলিবল পেলে জোরে শট নেন, তাহলে ৯৯% নিশ্চয়তা থাকে যে সেটাতে আপনি রান পাচ্ছেন।

কিন্তু একই ব্যাপার যদি দক্ষিণ আফ্রিকায় হয় তাহলে আপনি স্লিপে ক্যাচ আউট হয়ে যাবেন। এক্ষেত্রে কোচও একটি কারণ। কে কোচ, তার আগের ক্যারিয়ার, অভিজ্ঞতা সবকিছুই দলের ব্যাপারে প্রভাব রাখে। তাদেরকে সমস্যাগুলো বুঝতে হয়, সবকিছু করতে হয়। তবে মূল কাজটা অবশ্যই ক্রিকেটারদের। যেমন পূজারার কথাই ধরুন, তিনি ইংল্যান্ডে কাউন্টি খেলেছেন ইংল্যান্ড ট্যুরের আগে। এটা তাকে অনেক বড় প্রস্তুতি এনে দিয়েছে।

তো এগুলো আসলে লক্ষ্য করার বিষয়। আমার মনে হয়, এসব সমস্যা সমাধান করতে পারলে বাইরেও তারা ভালো করতে পারবে। তাছাড়া বিরাট কোহলির মতো একজন ক্রিকেটার দলে থাকলে ভালো গেমপ্ল্যান পাওয়া যায়, সেটার বাস্তবায়নও হয়।

উইকেট নেওয়ার পর উদযাপনে ডেল স্টেইন; Image Source; Cricket Australia

বিরাট কোহলির কথা বললেন, তাকে কিভাবে থামানো যায়?

ডেল স্টেইন- তার যেমন শক্তির জায়গা আছে, তেমনই দুর্বলতাও আছে। আপনি যদি তার সেসব দুর্বলতাগুলোকে লালনপালন করতে পারেন, তাহলে সে ভুল করবে সেই সম্ভাবনা আছে। সাধারণত যেটা হয়, একটি ভালো বল যেমন টেলএন্ডারের জন্যও ভালো বল তেমনি টপ অর্ডারের জন্যও ভালো বল। কিন্তু দু'টি আলাদা হয়ে যায় কেবল চাপের কারণে।

অবশ্যই তুলনামূলক স্বল্প দক্ষ একজন ব্যাটসম্যান টপ অর্ডারের মতো চাপ নিতে পারবেন না। আপনি যদি খেয়াল করে দেখেন, শেষ ১০ ম্যাচে কোহলি কিভাবে আউট হয়েছেন? হতে পারে সেখানে কিছু ধারাবাহিক ধরন আছে। হতে পারে, বিরাট কোহলি শেষ ১০ বারের ৮ বারই মিড-উইকেটে ক্যাচ তুলে ফিরেছেন। তিনি যখন ফিরে যাবেন, আপনি যদি তাকে বলেন, ‘তুমি জানো, এই জায়গাটায় তুমি শেষ ১০ ম্যাচে ৮ বার আউট হয়েছ?’ তিনি কিন্তু ভড়কে যাবেন। অর্থাৎ, আপনি তার মনের মধ্যে খেলবেন। তাকে চাপে রাখবেন। কিন্তু তিনি তো ভালো খেলোয়াড়। আপনি কিভাবে তাকে আউট করবেন? আমার জানা নেই! (হাসি)

ক্রিকেটটা প্রতিনিয়ত ব্যাটসম্যানদের  খেলায় পরিণত হচ্ছে। কী করলে ব্যাটসম্যানদের পাশাপাশি বোলারদেরও হতে পারে?

ডেল স্টেইন- দেখুন, আমি কিন্তু এমসিসি (মেরিলিবোন ক্রিকেট ক্লাব) কিংবা আইসিসির প্যানেলের কর্মকর্তা নই। তবে একজন বোলার হিসেবে বলবো, ক্রিকেটের কয়েকটি জিনিসের দিকে নজর দেওয়া উচিত। আমার মনে হয় ওয়ানডে ক্রিকেট আবারও একটি বলে ফিরে যাওয়া উচিত। বল আরও পুরোনো হবে, আপনি বেশি রিভার্স সুইং পাবেন। এটি বিশাল একটি গুণ। কিন্তু দু'প্রান্ত থেকে দু'টি নতুন বল দেওয়ার কারণে সেই সুযোগটা, সেই শিল্পটা আমরা হারাচ্ছি।

আমি ওয়াসিম আকরাম, ওয়াকার ইউনিস, অ্যালান ডোনাল্ড, শোয়েব আখতার; এদেরকে দেখে বেড়ে উঠেছি। তাদের বলে যেমন গতি ছিল তেমন সুইংও ছিল। আমিও আমার বোলিংয়ে এগুলো বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করি। কিন্তু নতুন এই নিয়ম সেটাকে অনেক কঠিন করে দিয়েছে। আমরা সম্প্রতি শ্রীলঙ্কায় গিয়েছিলাম। সেখানে আমরা খেয়াল করেছি রিভার্স সুইং প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে চরম অস্ত্র হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু সেটা আমরা করতে পারিনি।

হ্যাঁ, এটা সত্য যে সবকিছু শ্রীলঙ্কা করেছে। তাদের মতো করে সাজিয়েছে। কারণ তাদের ঘরের মাঠে খেলা হচ্ছে। 'হোম এডভান্টেজ' যেকোনো দলই নেবে। তারপরও তো আমাদের খেলতে হবে, জিততে হবে। সেটা কী করে? আমাদের বোলারদের এই অস্ত্রগুলো দিয়ে, আমাদের ব্যাটসম্যানদের ব্যাটিং পারফরম্যান্স দিয়ে। সবকিছু মিলিয়েই আমি বলবো ওয়ানডে ক্রিকেট এক বলের খেলায় ফিরে যাওয়া উচিত।

দলের জুনিয়র পেসারদের পরামর্শ দিচ্ছেন স্টেইন; Image Source; ESPN

কোন ব্যাপারটা বর্তমান প্রোটিয়া ফাস্ট বোলারদের স্পেশাল বানিয়েছে?

ডেল স্টেইন- তারা এখন তরুণ, অর্থাৎ এসব ফাস্ট বোলাররা জানেন তারা আরও লম্বা সময়ের জন্য খেলতে পারবেন। এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ক্রিকেট বিশ্বের সব ক্রিকেটারেরই দক্ষতা আছে, মেধা আছে; আছে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পারফর্ম করার জন্য লড়াই করার মানসিকতা। কিন্তু আপনি তরুণদের মধ্যে কী দেখবেন? কাগিসো রাবাদার কথাই ধরুন না! আগামী ১০ বছর পর তার অবস্থা কল্পনা করুন। তিনি এখনই বিশ্বের এক নম্বর বোলার। আপনি এনগিডি লুঙ্গিকে দেখুন, আগামী ১০ বছরে তিনিও লড়াই করবেন নিজের অবস্থানকে আরও উপরে নিতে।

এগুলো অনেক বড় ব্যাপার। কিন্তু আপনি যদি এদেরকে ৩০ বছর বয়সে দেখতেন, আমার মতো; তাহলে এটা খুব দুঃখজনক হতো। কারণ আপনি জানতেন খুব অল্প সময়ের জন্য আপনি তাদেরকে দেখতে পাবেন। কিন্তু তারা তরুণ, অর্থাৎ তাদেরকে আমরা অনেকদিনের জন্য পাচ্ছি।

তরুণরা যখন ভালো করে আপনার উপর কি বাড়তি চাপ আসে?

ডেল স্টেইন- না, সত্য বলতে এটা আমাকে আরও সাহায্য করে। কারণ তাদের (তরুণ বোলার) এমন একজনকে দরকার যে কিনা এই ছোট ছেলেগুলোকে দিক নির্দেশনা দেবে। তাদের এমন একজনকে দরকার যে কিনা তাদের বোলিংয়ের সময় মিড-অফ, মিড-অনে থাকবে। অথবা অন্য পাশ থেকে বোলিং করবে। যেটা আমি আমার ক্যারিয়ার জুড়ে পেয়েছি।

আমার পাশে মাখায়া এনটিনি, শন পোলক আর একজন কিংবদন্তি কোচ অ্যালান ডোলান্ড ছিল। আমার পাশে আরও একজন সেরা বোলিং কোচ ছিলেন, গ্যারি কারস্টেন; যার দিক নির্দেশনা আমি পেয়েছি। নতুনদের আমি এগুলোই দিতে পারি। আমি তাদেরকে দিক নির্দেশনা দিতে পারি যেটা আমি বছরের পর বছর ধরে পেয়ে এসেছি। একজন বড় মাপের বোলার হওয়ার জন্য তাদেরকে সাহায্য করতে পারি।

এই ইনজুরিই ভুগিয়েছে বারবার। তারপরও ফিরেছেন ডেল স্টেইন; Image Source; AFP

শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে টেস্ট সিরিজের পর ফাফ ডু প্লেসিস বলেছিলেন, স্পিন এখন একটা ‘গ্লোবাল প্রবলেম’। আপনার কী মনে হয়, কিভাবে এটার সমাধান করা যায়?

ডেল স্টেইন- দক্ষিণ আফ্রিকার দিক থেকে বলতে গেলে, এটা খুব কঠিন ছিল। যখন আমরা শ্রীলঙ্কায় যায়, প্রস্তুতিই ছিল আমাদের চাবিকাঠি। আমরা আমাদের সেরা প্রস্তুতি নিয়ে সেখানে গিয়েছিলাম। কিন্তু আমরা চেয়েছিলাম তা আমরা পাইনি। ট্রেনিংয়ে আমরা ফাস্ট বোলারদের পক্ষে সুযোগ সুবিধা পাচ্ছিলাম। বোলাররা ভালো ছিল, কিন্তু সেরা ছিল না। আর আমরা যে উইকেটে অনুশীলন করতাম সেটা বাস্তবিকভাবে ম্যাচের উইকেটের মতো ছিল না। অর্থাৎ, আমরা সেখানে গিয়ে দুর্ভাগ্যজনকভাবে নিজেদের সেরা প্রস্তুতিটা হারিয়ে ফেলি। তাছাড়া শ্রীলঙ্কা যে উইকেট অনুশীলন করতো সেটা আবার আলাদা, মূল উইকেটের মতো। অর্থাৎ তাদের আলাদা গেম প্ল্যান ছিল। তো সব মিলিয়ে আপনি কিভাবে ভালো করবেন? এরকম কিছু সমস্যা তো থেকেই যায়।

ফিচার ইমেজ- circleofcricket.com