পিয়েরলুইজি কলিনা: গলায় বাঁশি ঝোলানো এক ফুটবল সৈনিক

শীতকাল পড়লেই চাঁদা তুলে সন্ধ্যাবেলা আলো জ্বালিয়ে ব্যাডমিন্টন প্রতিযোগিতা শুরু করে দেয় কিশোর-কিশোরীরা। বছর শেষ করার আগে কিংবা নতুন বছরকে স্বাগত করার জন্য শুরু হয়ে যায় সীমিত ওভারের ক্রিকেট প্রতিযোগিতা। বর্ষাকালের কাদামাঠে তেমনই শুরু হয়ে যায় মিনিবার প্রতিযোগিতা কিংবা খেপের খেলা, ক্লাবঘরের দেওয়ালে হাতে লেখা কিংবা জেরক্স কাগজের কালো অক্ষরে লেখা নিয়মাবলীর প্রথমেই লেখা থাকে, “রেফারির সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত”। ঠিক হোক অথবা ভুল, ফুটবলে রেফারির সিদ্ধান্তই শেষ কথা।

প্রযুক্তির উন্নতির সাথে সাথে এসেছে গোল লাইন টেকনোলজি, ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি বা ভার। কিন্তু এসবই রেফারিকে সাহায্য করার জন্য। সময় যত এগিয়েছে, দক্ষ রেফারির গুরুত্ব তত বেড়েছে ফুটবলে। ভালো ফুটবলারের সাথে সাথে উঠে এসেছেন ভালো রেফারিও। আজ আমরা আলোচনা করব এখন অবধি জন্মানো অন্যতম শ্রেষ্ঠ একজন রেফারি, পিয়েরলুইজি কলিনার কথা, যার শীতল দৃষ্টিকে ভয় পেত তাবড় তাবড় ফুটবলাররা।

ব্রাজিলের বিখ্যাত রি-রো-রো ত্রয়ীর সাথে কলিনা; Image Source: Pinterest.com

বেড়ে ওঠা

১৯৬০ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি কলিনার জন্ম উত্তর ইতালির বোলোনিয়া শহরে। মা লুসিয়ানা কলিনা ছিলেন শিক্ষিকা। বাবা এলিয়া কলিনা ছিলেন ইতালির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে নিযুক্ত। সন্ন‍্যাসিনীদের অধীনে কঠোর অনুশাসনের মধ্যে বড় হতে থাকেন পিয়ের। তার বেড়ে ওঠা ছিল ইতালির আর পাঁচটা ছেলের মতোই, রাস্তায় কিংবা পার্কে বন্ধুদের সাথে দৌড়ে বেড়িয়ে, ফুটবল খেলে। পরবর্তী সময়ে নিজের ছোটবেলার কথা স্মরণ করে কলিনা বলেছেন,

আমি যখন ছোট ছিলাম,ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটাতাম বন্ধুদের সাথে ফুটবল খেলে। আমি এখনও মনে করতে পারি, পার্কে খেলা সেসব অন্তহীন ফুটবল ম্যাচের কথা, যখন আমরা পোস্ট বানাতাম পাথরের টুকরো অথবা নিজেদের সোয়েটার দিয়ে।

ফুটবলার হওয়ার স্বপ্নকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য কলিনা স্থানীয় ফুটবল একাডেমিতে ভর্তি হন এবং ১৭ বছর বয়স পর্যন্ত ফুটবল খেলা চালু রাখেন। কিশোর পিয়ের কেবলমাত্র ফুটবলের ভক্ত ছিলেন না। তার হৃদয়ের বাকি অর্ধেক জুড়ে ছিল বাস্কেটবল। শুধু তিনি কেন, বাস্কেটবলের প্রেমে আচ্ছন্ন ছিল সমগ্র বোলোনিয়া শহর।

বোলোনিয়া-কলিনার ছেলেবেলার শহর; Image Source: Alamy

ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন থাকলেও ১৭ বছর বয়সে এসে কলিনা বুঝতে পারেন, পেশাদার ফুটবলার হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতার অভাব আছে তার মধ্যে। এমন সময়ই এক বন্ধুর পরামর্শে স্থানীয় রেফারি সংঘ আয়োজিত রেফারিং কোর্সে ভর্তি হয়ে যান কলিনা। রেফারিং কোর্সে নাম লেখানো নিয়ে তিনি বলেছেন,

ষোলো-সতেরো বছর বয়সে কোনো নির্দিষ্ট কারণ ছাড়াই কেবলমাত্র অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য আমরা অনেক কাজ করে থাকি। সেই সময় রেফারিংকে আমি যথেষ্ঠ গুরুত্ব দিইনি। রেফারিং করার কোনো ইচ্ছা আমার ছিল না। এর তেরো বছর পরে আমি আমার প্রথম সিরি-আ ম্যাচে রেফারিং করি, আর এ কাজ চালিয়ে যাই ২০০৫ সাল পর্যন্ত।

রেফারিংয়ে আসার বছর দুয়েকের মধ্যেই কলিনাকে দেশের মিলিটারিতে যেতে হয় বাধ্যতামূলক সামরিক দায়িত্ব পালনের জন্য। কথায় আছে, জীবনের দান কিছুই যায় না ফেলা; সেনাবাহিনীতে থাকাকালীন অভিজ্ঞতা কলিনা পরবর্তী সময়ে কাজে লাগান ম্যাচ পরিচালনার কাজে।

সিঁড়ি বেয়ে ওঠার গল্প

ম্যাচ পরিচালনার মতো একটি কঠিন কাজে কলিনার সহজাত ক্ষমতার প্রকাশ পায় ১৯৮৮ সালে সেনাবাহিনী থেকে ফিরে আসার পর। পৃথিবীর খুব কম রেফারিই পারেন পুরো ৯০ মিনিট সমানভাবে দৌড়ে যেতে। ছোটবেলায় ফুটবল খেলার কারণে কিংবা মিলিটারিতে দৈহিক পরিশ্রমের ক্ষমতা বাড়ানোর কারণে, যেজন্যই হোক না কেন, কলিনা সবসময় থাকতেন বলের কাছাকাছি।

স্থানীয় অপেশাদার খেলায় কলিনাকে বেশিদিন বদ্ধ থাকতে হয়নি, ইতালিয়ান ফুটবল লিগের তৃতীয় বিভাগের ম্যাচ পরিচালনার দায়িত্ব এসে পড়ে কলিনার কাঁধে। এখান থেকেই শুরু হয় একজন অন্যতম শ্রেষ্ঠ রেফারির পথচলা। অভিজ্ঞ লোকেরা বলেন, গুণীরা সুযোগের সদ্ব্যবহার করে। পেশাদার ফুটবলে এসে কলিনা আরও উন্নত করতে থাকেন নিজেকে। মাত্র তিন মৌসুম ইতালির তৃতীয় বিভাগে থাকার পর উঠে আসেন সেকেন্ড বিভাগ বা সিরি-বি এবং তারপর সিরি-আ, অর্থাৎ প্রথম ডিভিশনে।

মাঠের বাইরের জীবনটা কিন্তু বাঁশি বাজিয়ে খেলা থামিয়ে দেওয়ার মতো সহজ ছিল না। এ সময়েই কলিনা আক্রান্ত হন অ্যালোপেশিয়া রোগে। এ রোগের কারণেই চুল পড়ে যায় তার। মাঠের বাইরের কলিনা হয়তো কষ্ট পেয়েছিলেন, কিন্তু মাঠের মধ্যে থাকা মানুষটা, যিনি ভেতর থেকে কঠোর ছিলেন; অ্যালোপেশিয়া রোগ এসে তার চেহারাকেও ভয় পাওয়ার মতো বানিয়ে দেয়।

১৯৯৫ সালে, ইতালির ফার্স্ট ডিভিশন ফুটবলে মাত্র ৪৩টি ম্যাচে রেফারিং করার পরেই কলিনা ফিফা রেফারির পরিচিতি পান। সিরি-আর গণ্ডি ছেড়ে কলিনা আসেন আন্তর্জাতিক ফুটবলের পরিসরে। আন্তর্জাতিক ফুটবলে কলিনা প্রথম বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন ১৯৯৬ সালের অলিম্পিকে। ইতালিতে হওয়া এ টুর্নামেন্টে তিনি পাঁচটি ম্যাচে রেফারিং করেন। আর্জেন্টিনা এবং নাইজেরিয়ার মধ্যে হওয়া ফাইনাল ম্যাচের রেফারিও ছিলেন তিনি। আর্জেন্টিনাকে ৩-২ গোলে হারিয়ে স্বর্ণপদক জিতে নেয় আফ্রিকার দেশটি।

বিশ্বকাপে কলিনা

১৯৯৮ ফ্রান্স বিশ্বকাপ ছিল কলিনার প্রথম বিশ্বকাপ। গ্রুপ লিগের দুটি ম্যাচ পরিচালনার দায়ভার ন্যস্ত হয়েছিল এই ৩৮ বছর বয়সী ইতালিয়ানের উপরে। ৪ বছর পর, অর্থাৎ ২০০২ সালে আবারও ফেরেন কলিনা। এশিয়া মহাদেশে হওয়া এই টুর্নামেন্টে তিনটি ম্যাচ পরিচালনা করেন তিনি।

জার্মানি এবং ব্রাজিলের মধ্যে হওয়া ফাইনালের রেফারিও ছিলেন তিনিই। জার্মানিকে ২-০ গোলে হারিয়ে পঞ্চমবারের মতো চ্যাম্পিয়ন হয় ব্রাজিল।

বিশ্বকাপ ফাইনাল মঞ্চে অলিভার কানের সাথে কলিনা; Image Source: Getty Images

কেন তিনি শ্রেষ্ঠ?

নিজের রেফারিং ক্যারিয়ারে মোট ১১টি ফাইনাল ম্যাচের পরিচালনা করেছেন এই ইতালীয়। এর মধ্যে আছে চারটি কোপা ইটালিয়া ফাইনাল, দুটি সুপারকোপা ইটালিয়ানা ফাইনাল, আফ্রিকান ক্লাবগুলো নিয়ে হওয়া তিউনিশিয়ান কাপের ফাইনাল, ১৯৯৬ অলিম্পিক ফাইনাল, ২০০৪ উয়েফা কাপ ফাইনাল, ২০০২ বিশ্বকাপ ফাইনাল এবং বায়ার্ন মিউনিখ ও ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের মধ্যে হওয়া ১৯৯৯ চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনাল। ইউরোপের সর্ববৃহৎ স্টেডিয়াম ক্যাম্প ন্যুতে হওয়া এই ম্যাচের মাত্র ছয় মিনিটের মাথায় গোল করে এগিয়ে যায় জার্মান দল।

ম্যাচের একদম শেষ প্রান্তে, ইনজুরি টাইমে ম্যানচেস্টারের হয়ে প্রথম গোল করেন টেডি শেরিংহ্যাম। এর ঠিক পরেই নরওয়েজিয়ান সোলজকিয়েরের গোলে ২-১ এ এগিয়ে যায় ইংল্যান্ডের ক্লাবটি। এমন সময় হতাশ বায়ার্ন মিউনিখের ফুটবলারদের বেঁচে থাকা কুড়ি সেকেন্ড লড়াই করতে বলার এবং সমস্ত শক্তি হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়া স্যামুয়েল কাফোরকে তুলে ধরার দৃশ্য ফুটবলের ইতিহাসে অন্যতম শক্তিশালী ছবি হয়ে রয়ে যাবে।

হতাশ স্যামুয়েল কফোরকে তুলে ধরার দৃশ্য; Image Source: Bongrats/Getty Images

অবসর

২০০৫ সালে কলিনা যখন রেফারিদের বাধ্যতামূলক অবসর নেওয়ার বয়সে পৌঁছান, তখন ইতালির ফুটবল অ্যসোসিয়েশন ২০০৬ বিশ্বকাপে কলিনাকে পেতে রেফারিদের অবসর নেওয়ার বয়স এক বছর বাড়িয়ে ৪৬ করে দেয়।

২০০৫ সালে আগস্ট মাসে কলিনা জার্মান গাড়ি প্রস্তুতকারক সংস্থা ওপেল-এর সাথে একটি চুক্তি করেন। ওপেল সে সময়ে ইতালির অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফুটবল ক্লাব এসি মিলানের স্পনসর হওয়ার কারণে ইতালীয় ফুটবল নিরপেক্ষতার প্রশ্নচিহ্নের সামনে এসে দাঁড়ায়। Fedarazione Italiana Giuoco Calcio (FIGC) কলিনাকে সিরি-আ ম্যাচ পরিচালনা থেকে বয়কট করে। নিজের সুনাম বজায় রাখতে পৃথিবীখ্যাত এই রেফারি নিজের ইস্তফাপত্র জমা দেন এবং নিজের সুবিশাল ক্যারিয়ারের ইতি ঘোষণা করেন।

কলিনার শেষ ম্যাচ ছিল ২৪ আগস্ট ২০০৫ সালে। ইংলিশ ক্লাব এভার্টন এবং স্পেনের ফুটবল ক্লাব ভিলারিয়ালের মধ্যে হওয়া ম্যাচের পরপরই অবসর নেন এই রেফারি।

জীবনের শেষ অফিসিয়াল ম্যাচে ফার্গুসনের ন্যায্য গোল বাতিল করেন কলিনা; Image Source: Photo by Phil Cole/Getty Images

শেষ হইয়াও হইল না শেষ

একটি তেতো ঘটনার সামনে পড়ে অবসর নিতে বাধ্য হলেও কলিনার রেফারিং কিন্তু এখানেই থেকে থাকেনি। অবসর নেওয়ার পরেও ২০০৬, ২০০৮ এবং ২০১০-এ চ্যারিটি ম্যাচে রেফারিং করেন তিনি। তিনি বর্তমানে ইতালিয়ান ফুটবল রেফারি অ্যাসোসিয়েশনের উপদেষ্টা কমিটির একজন সদস্য। এছাড়াও ফিফা রেফারি কমিটির চেয়ারম্যানের পদ অলংকৃত করে আছেন পিয়েরলুইজি কলিনা।

Related Articles