গ্রুপ ই: পরের রাউন্ডে উত্তীর্ণ হবে কোন দুই দল?

বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের ম্যাচগুলো শেষ হওয়ার পথে। তবে এখনো বেশ কিছু গ্রুপের ভাগ্য ঝুলে আছে। এমনই একটা গ্রুপ হলো গ্রুপ ই। এই গ্রুপের শেষ দুটি ম্যাচের ফলাফল না দেখে বলার উপায় নেই এই গ্রুপ থেকে কোন দুইটি দল পরের রাউন্ডের টিকিট কাটবে। সবার আগে চলুন এই গ্রুপের পয়েন্ট টেবিলের অবস্থাটা একবার দেখে নিই। 

প্রথম দুই রাউন্ড শেষে ই গ্রুপের পয়েন্ট টেবিল; Image Source : Whoscored

পয়েন্ট টেবিল থেকে দেখা যাচ্ছে, দুই রাউন্ড শেষে এক ড্র ও এক জয়ে চার পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপের শীর্ষে আছে ব্রাজিল। সমান পয়েন্ট আরেক দল সুইজারল্যান্ডেরও। তবে গোল ব্যবধানে পিছিয়ে থাকায় তারা রয়েছে দ্বিতীয় স্থানে। এক জয় ও এক হারে তিন পয়েন্ট নিয়ে তৃতীয় অবস্থানে আছে সার্বিয়া। আর দুটি ম্যাচেই হেরে পয়েন্ট টেবিলের তলানীতে আছে কোস্টারিকা। কোস্টারিকা বাদে এই গ্রুপের বাকি তিন দলের জন্যই পরের রাউন্ডে যাওয়ার দরজা খোলা আছে। এখন এই তিন দলের পরের রাউন্ডে যাওয়ার সমীকরণ দেখে নেওয়া যাক।

কী সেই সমীকরণ?

ব্রাজিল, সুইজারল্যান্ড ও সার্বিয়া- এই তিন দলের মধ্যে সুইজারল্যান্ডের রাউন্ড অফ সিক্সটিনে যাওয়ার পথটা তুলনামূলক সহজ। শেষ রাউন্ডে তারা মুখোমুখি হবে এই গ্রুপের দূর্বলতম দল কোস্টারিকার বিপক্ষে। এ ম্যাচে ন্যূনতম ড্র পেলেই পরের রাউন্ডের টিকিট পেয়ে যাবে সুইজারল্যান্ড। তবে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হতে চাইলে সুইসদের এ ম্যাচে জয়ের কোনো বিকল্প নেই। কোস্টারিকার কাছে হারলেও সুইসদের পরের রাউন্ডে যাওয়ার সম্ভাবনা টিকে থাকবে। তবে সেরকম হলে সুইসদের তাকিয়ে থাকতে হবে ব্রাজিল বনাম সার্বিয়া ম্যাচের ফলাফলের দিকে। 

সার্বিয়ার বিপক্ষে জয় পাওয়ায় শেষ রাউন্ডে ভালো অবস্থানে রয়েছে সুইজারল্যান্ড; Image Source : Mirror

ব্রাজিলের জন্যেও রাউন্ড অফ সিক্সটিনের পথটা খুব একটা কঠিন নয়, শেষ ম্যাচে সার্বিয়ার বিপক্ষে হার এড়ালেই সেলেসাওদের রাউন্ড অফ সিক্সটিনে যাওয়াটা নিশ্চিত। তবে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হতে চাইলে ব্রাজিলের জন্যও জয়ের কোনো বিকল্প নেই। এ ম্যাচ হারলেও ব্রাজিলের পরের রাউন্ডে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। তবে সেক্ষেত্রে সুইজারল্যান্ডকে কোস্টারিকার কাছে হারতে হবে। বাস্তবতার খাতিরে সেরকমটা হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। তাই ব্রাজিলের পরের রাউন্ডে যাওয়ার পথটা তাদের নিজেদের তৈরি করে নেওয়াটাই উত্তম। 

সার্বিয়ার বিপক্ষে ন্যূনতম ড্র করলেই ব্রাজিলের পরের রাউন্ড নিশ্চিত; Image Source : Next Media

তিন দলের মধ্যে সার্বিয়ার পরের রাউন্ডে যাওয়ার পথটাই সবচেয়ে কঠিন। পরের রাউন্ডে যেতে হলে ব্রাজিলের বিপক্ষে ম্যাচটা সার্বিয়াকে জিততেই হবে। ড্র করলেও সার্বিয়ার পরের রাউন্ডে যাওয়ার আশা টিকে থাকবে। তবে সেক্ষেত্রে সুইজারল্যান্ডকে কোস্টারিকার কাছে হারতেই হবে। এরকমটা হলে গোল ব্যবধানই সুইজারল্যান্ড ও সার্বিয়ার ভাগ্য গড়ে দেবে। আর ব্রাজিলের কাছে হেরে গেলে সার্বিয়ার বাদ পড়াটা নিশ্চিত। তাই সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে পরের রাউন্ডে যেতে গেলে সার্বিয়ার সামনে জয়ের কোনো বিকল্প নেই। 

সুইসদের বিপক্ষে হার সার্বিয়াকে বেশ কঠিন পরীক্ষায় ফেলে দিয়েছে; Image Source : Sputniknews

এবার চলুন এই দুটি ম্যাচে দলগুলোর একাদশ, ফর্মেশন কিংবা ফলাফল কেমন হতে পারে সেটা নিয়ে আলোচনা করা যাক।

সুইজারল্যান্ড বনাম কোস্টারিকা

আগের দুই ম্যাচের মতো এ ম্যাচেও সুইজারল্যান্ডের ৪-২-৩-১ ফর্মেশনে নামার সম্ভাবনাই বেশি। আগের দুই ম্যাচেই অপরিবর্তিত একাদশ নিয়ে নেমেছিল সুইজারল্যান্ড। এ ম্যাচেও সেই একাদশ নিয়ে নামার সম্ভাবনাই বেশি। সেক্ষেত্রে কোস্টারিকার বিপক্ষে সুইসদের একাদশটা হবে এরকম-

ইয়ান সোমার;

স্টিফেন লিখস্টেইনার, ফ্যাবিয়ান শিয়ার, ম্যানুয়েল আকানি, রিকার্ডো রদ্রিগুয়েজ;

ভ্যালন বেহরামি, গ্রান্ট জাকা;

জেরদান শাকিরি, ব্লেরিম জেমাইলি, স্টিভেন জুবের;

হারিস সেফেরোভিচ

অন্যদিকে আগের দুই ম্যাচে হেরে কোস্টারিকার বিদায় নিশ্চিত হয়ে যাওয়ায় এ ম্যাচে তারা হয়তো কিছুটা আক্রমণাত্মক খেলবে। সেটা হলে আগের ৫-৪-১ ফর্মেশন ভেঙ্গে এ ম্যাচে হয়তো ৩-৫-২ ফর্মেশনে খেলবে। সব মিলিয়ে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে কোস্টারিকার একাদশটি হতে পারে অনেকটা এরকম- 

কেইলর নাভাস;

জনি আকস্তা, জিয়ানকার্লো গঞ্জালেস, অস্কার ডুয়ার্ট;

ক্রিশ্চিয়ান গাম্বোয়া, সেলসো বোরজেস, ডেভিড গুজম্যান, ফ্রান্সিস্কো ক্যালভো;

জোহান ভেনেগাস, ব্রায়ান রুইজ;

মার্কো ইউরেনা

কোস্টারিকা বিশ্বকাপ থেকে বাদ পড়ে গেছে। তাই তাদের হারানোর কিছু নেই। এমন পরিস্থিতিতে শেষ ম্যাচটা হয়তো পুরোপুরি আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে খেলবে কোস্টারিকা। অন্যদিকে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হতে চাইলে সুইসদের জন্যও এ ম্যাচে বড় জয়ের বিকল্প নেই। সেক্ষেত্রে তারাও আগের দুই ম্যাচের তুলনায় এ ম্যাচে একটু বেশি আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে খেলবে। এমনটা হলে এ ম্যাচে হয়তো গোলের বন্যা দেখতে পাব আমরা।

তবে দুই দলের খেলার কৌশল যাই হোক এ ম্যাচে সুইজারল্যান্ডের জয়ের সম্ভাবনাই বেশি। কোস্টারিকাকে জিততে হলে কেইলর নাভাসকে আগের দুই ম্যাচের মতো এ ম্যাচেও অসাধারণ পারফর্ম করতে হবে। এছাড়া আক্রমণভাগে ব্রায়ান রুইজকে আরেকটু দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। অন্যদিকে সুইসরা জয়ের জন্য তাদের সেরা দুই তারকা গ্রান্ট জাকা ও জেরদান শাকিরির দিকেই তাকিয়ে থাকবে। সবমিলিয়ে জমজমাট একটা ম্যাচের প্রত্যাশা করাই যায়। 

সুইসদের জয়ের পথে বাঁধার দেয়াল হতে পারে কোস্টারিকার ব্রায়ান রুইজ ও কেইলর নাভাস; Image Source : Zimbio

সার্বিয়া বনাম ব্রাজিল

যেহেতু এ ম্যাচে সার্বিয়ার জয়ের কোনো বিকল্প নেই তাই এ ম্যাচেও তারা সম্ভবত ৪-২-৩-১ ফর্মেশনেই খেলবে। এই ফর্মেশনে খেললে সার্বিয়ার একাদশটা হবে অনেকটা এরকম-

ভ্লাদিমির স্টয়কোভিচ;

ব্রানিস্লাভ ইভানোভিচ, নিকোলা মিলেনকোভিচ, দুসকো টসিচ, আলেকজান্ডার কোলারভ;

লুকা মিলিভোয়েভিচ, নেমাঞ্জা ম্যাটিচ;

দুস্যান ট্যাডিচ, সের্গেই মিলিনকোভিচ-সাভিচ, আদেম লিয়াইক;

আলেকজান্ডার মিত্রোভিচ

অন্যদিকে ব্রাজিলের একাদশ কেমন হবে এটা নিয়ে এক ধরনের ধূম্রজাল সৃষ্টি হয়েছে। ব্রাজিল কোচ টিটে সাধারণত ম্যাচের একদিন আগেই নিজের একাদশ সবাইকে জানিয়ে দেন। কিন্তু এবার তিনি একাদশের ব্যাপারে কাউকে ধারণা দেননি। শুরুতে ধারণা করা হয়েছিল টিটে বুঝি গ্যাব্রিয়েল জেসুসকে বাদ দিয়ে ফার্নান্দিনহোকে একাদশে এনে মিডফিল্ড শক্তিশালী করবেন। সেক্ষেত্রে নেইমার ফলস নাইনে খেলতেন। কিন্তু এখন আবার শোনা যাচ্ছে টিটে নাকি তার আগের একাদশই নামাবেন এবং ৪-৩-৩ ফর্মেশনে তার দলকে খেলাবেন। এক্ষেত্রে ডগলাস কস্তা ফিট থাকলে তিনি হয়তো উইলিয়ানের বদলে খেলতে পারতেন, কস্তা যেহেতু ফিট নেই তাহলে ব্রাজিলের একাদশ দাঁড়াচ্ছে-

এলিসন;

ফ্যাগনার, থিয়াগো সিলভা, মিরান্ডা, মার্সেলো;

পাউলিনহো, ক্যাসেমিরো, কৌতিনহো;

উইলিয়ান, গ্যাব্রিয়েল জেসুস, নেইমার জুনিয়র

আগের দুই ম্যাচেই প্রতিপক্ষ নিজেদের রক্ষণভাগ জমাট করে রাখায় ব্রাজিলের গোল পেতে বেশ অসুবিধা হয়েছিল। কোস্টারিকার বিপক্ষে তো একদম ইনজুরি সময়ে গোল করে ব্রাজিলকে জয় ছিনিয়ে আনতে হয়েছিল। কিন্তু এ ম্যাচে ব্রাজিলের চেয়ে সার্বিয়ার জয়ের তাগিদ বেশি। তাই আগের দুই ম্যাচের তুলনায় এ ম্যাচে ব্রাজিলের ফরওয়ার্ডরা স্পেস বেশি পাবে। এই স্পেস কাজে লাগানোর গুরু দায়িত্ব দুই উইঙ্গার উইলিয়ান ও নেইমারের উপর বর্তাবে।

তবে উইলিয়ানের বাজে ফর্ম এক্ষেত্রে ব্রাজিলের জন্য চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়াবে। তাছাড়া আগের দুই ম্যাচে ব্রাজিলের স্ট্রাইকার গ্যাব্রিয়েল জেসুস গোল পায়নি, জেসুসের গোলখরাটাও ব্রাজিলকে আলাদা চাপে রাখবে। ব্রাজিলের জন্য সবচেয়ে বড় ভয় সার্বিয়ার এই দলটি এরিয়াল ডুয়েলে বেশ ভালো, ব্রাজিলের রক্ষণভাগকে এ ব্যাপারে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে। যতদূর শোনা যাচ্ছে এ ম্যাচে ব্রাজিল কাউন্টার অ্যাটাক বেসড ফুটবল খেলবে, দেখা যাক এই কৌশলে তারা কতটুকু সফল হয়।  

কৌতিনহো ও নেইমারের কাছ থেকে এম্যাচেও ভালো পারফর্মেন্স প্রত্যাশা করবে ব্রাজিল; Image Source : Evening Standard

অন্যদিকে সার্বিয়াকে এ ম্যাচে আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতেই হবে। এমনিতেই ব্রাজিলের চেয়ে শক্তিমত্তায় কিছুটা পিছিয়ে আছে সার্বিয়া, তার উপর তাদের দরকার জয়, তাই নিঃসন্দেহে বেশ চাপেই থাকবে সার্বিয়া। সার্বিয়ার শক্তির জায়গা তাদের মিডফিল্ড। এই শক্তিশালী মিডফিল্ড কাজে লাগিয়ে সার্বিয়াকে ম্যাচে আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করতে হবে। তবে এক্ষেত্রে বড় সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে স্যাভিচের অফ ফর্ম। ব্রাজিলকে হারাতে গেলে স্যাভিচের সেরা খেলাটা সার্বিয়ার জন্য খুব দরকার। তাছাড়া স্ট্রাইকার মিত্রোভিচকেও নিজের সেরাটা দিতে হবে কারণ এ ম্যাচে সার্বিয়া যে সুযোগ পাবে তার সিংহভাগই মিত্রোভিচের কাছেই আসবে।

সবমিলিয়ে গ্রুপ ই বেশ জমজমাট অবস্থায় আছে, শেষ রাউন্ডের নাটকে যেকোনো কিছু ঘটে যাওয়া সম্ভব। এখন দেখার পালা ব্রাজিল, সুইজারল্যান্ড, সার্বিয়া- এই তিন দলের মধ্যে কোন দুই দল রাউন্ড অফ সিক্সটিনের টিকিট নিশ্চিত করে। 

ফিচার ইমেজ : Soccer Laduma 

Related Articles