কথায় আছে রেকর্ড গড়া হয় ভাঙার জন্য, কিন্তু ক্রিকেট ইতিহাসে এমন কিছু রেকর্ড আছে যা আদৌ কেউ ভাঙতে পারবে কিনা সেটা নিয়ে দর্শকদের মনে প্রশ্ন থেকেই যাবে। এরকম কিছু রেকর্ডের তালিকা করতে গেলে সবার উপরে থাকবে ডন ব্রাডম্যানের ৯৯.৯৪ রানের ব্যাটিং গড় কিংবা মুরালির ১৩৪৭ টি আন্তর্জাতিক উইকেট।

এছাড়া শচীনের ১০০ সেঞ্চুরি, ব্রায়ান লারার অপরাজিত ৪০০ রানের ইনিংস সহ এমন আরও অসাধারণ কীর্তি রেকর্ডবুকে চিরস্থায়ী জায়গা দখল করে রাখবে। এমনি একটি অসাধারণ কীর্তি গড়ে গেছেন ইংল্যান্ডের ইয়র্কশায়ারে জন্মগ্রহণ করা অফব্রেক বোলার জেমস চার্লস লেকার।

১৯৫৬ সালের জুলাই মাসে ওল্ড-ট্রাফোর্ডে এক টেস্টে ১৯ উইকেট শিকার করেছিলেন লেকার। ওই ম্যাচের পরে এবং ম্যাচ চলাকালীন সময়ে পিচে ধুলাবালি নিয়ে কম কানাঘুষো হয়নি। ম্যাচের কয়েক দিন আগে পত্রপত্রিকায় বলা হচ্ছিল পিচ পেস সহায়ক হবে, এমতাবস্থায় নির্বাচকরা কাকে রেখে কাকে বাদ দেবেন সেটা নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়েছিলেন, গত ম্যাচেই জিম লেকার আর টনি লক মিলে ১৮ উইকেট শিকার করেছিলেন। এদেরকে তো আর বাদ দেওয়া যায় না।

কিন্তু মূলত পিচ বানানো হয়েছিলো ইংল্যান্ডের স্পিনারদের সুবিধার্থে, ম্যাচের আগের দিন ইংল্যান্ড চেয়ারম্যানের নির্দেশে ঘাস কেটে ফেলা হয়, আর তাতে পিচে অনেক ধুলাবালিও দেখা যায়।

কেটে ফেলা হচ্ছে ঘাস

ম্যাচ শুরু হওয়ার কয়েক ঘন্টা আগে এমন সিদ্ধান্তের কারণে অনেক কথা উঠে। তবুও জিম লেকারের এই কীর্তি ক্রিকেট ইতিহাসে অম্লান হয়ে থাকবে।

অ্যাশেজ সিরিজে ১-১ এ সমতায় ম্যাচ শুরু করে দুইদল। ম্যাচের প্রথম দিনে ৩ উইকেটে ৩০৭ রান করে দিন শেষ করে ইংল্যান্ড, শেষ পর্যন্ত ইংল্যান্ড প্রথম ইনিংসে ব্যাট করে ৪৫৯ রান সংগ্রহ করে। জবাবে জিম লেকারের বোলিং তোপের মুখে পড়ে মাত্র ৮৪ রানেই গুটিয়ে যায় অস্ট্রেলিয়া।

১৯০৫ সালে পর ১৯৫৬ সালে ওল্ড-ট্রাফোর্ডে অ্যাশেজ ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়, এর মধ্যে কোনো ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়নি। পিচের অবস্থা ছিলো বাজে, তবুও সে পিচে ৪৫৯ রান করে বোলারদের কাজ সহজ করে ইংলিশ ব্যাটসম্যানরা। অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটসম্যানরাও স্বাচ্ছন্দ্যে তাদের ইনিংস শুরু করেছিল, কিন্তু বিনা উইকেটে ৪৮ রান থেকে ৮৪ রানেই অল আউট হয়ে যায় অস্ট্রেলিয়া, জিম লেকার শেষ ৯ উইকেট তুলে নেয় মাত্র ১৬ রান দিয়ে। ইংলিশ বোলারদের মধ্যে টনি লক অজি ওপেনার বার্কের উইকেটটি শিকার করেন, এছাড়া বাকি ৯ উইকেট জমা পড়ে লেকারের ঝুলিতে।

সব মিলিয়ে প্রথম ইনিংসে জিম লেকার ১৬.৪ ওভার বল করে ৩৭ রান দিয়ে ৯ উইকেট শিকার করে অস্ট্রেলিয়াকে ফলো অনে ব্যাট করতে পাঠান।

Image Source: espncricinfo..

ফলোঅনে পড়ে দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে নেমে আবারও বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয় অস্ট্রেলিয়া। ঠিক বিপর্যয় নয়, জিম লেকারের সামনে অসহায় আত্মসমর্পণ করে অজি ব্যাটসম্যানরা। অজি ব্যাটসম্যানরা দ্বিতীয় ইনিংসে ১৫০.২ ওভার ব্যাট করে ২০৫ রান করলেও তাদের সব কজন ব্যাটসম্যান জিম লেকারের শিকার হয়ে প্যাভিলিয়নে ফিরে যায়।

ঐ ম্যাচে অস্ট্রেলিয়াকে ইনিংস ও ১৭০ রানে হারিয়ে ২-১ এ সিরিজ জিতে নেয় ইংল্যান্ড। প্রথম ইনিংসে ৯ উইকেট শিকারের পর দ্বিতীয় ইনিংসে ৫১.২ ওভার বল করে মাত্র ৫৩ রান দিয়ে পুরো ১০ উইকেট নিজের দখলে নিয়ে নেন লেকার। অন্যপ্রান্ত থেকে টনি লক ৫৫ ওভার বল করেও ছিলেন উইকেট শূন্য। ঐ ম্যাচে টনি লক দুর্দান্ত বল করে ব্যাটসম্যানদের চাপে রেখেছিলেন ঠিকই, কিন্তু ভাগ্য সহায় ছিলো না বলে উইকেট পাওয়া হয়নি কিংবা লেকারের ভাগ্য একটু বেশিই ভালো ছিলো। ম্যাচের অন্য উইকেটটি টনি লকের ঝুলিতে জমা পড়লেও সেটি তার মৌসুমের সবচেয়ে বাজে বল ছিলো বর্ণনা করেন।

ঐ ম্যাচে ৯০ রান দিয়ে ১৯ উইকেট শিকার করেন লেকার, প্রথমশ্রেণীর ক্রিকেটেও ১৭ উইকেটের বেশি কেউ শিকার করতে পারে নি। তার রেকর্ড ভাঙার শঙ্কা এখনো দেখা দেয়নি।

জিম লেকার ৪৬ টি টেস্টে ১৯৩ টি উইকেট এবং ৪৫০ টি প্রথমশ্রেণীর ম্যাচে ১৯৪৪ টি উইকেট শিকার করেছেন।

.


আন্তর্জাতিক টেস্ট ক্রিকেট ম্যাচে ১৯ উইকেট কিংবা ১৮ টি উইকেটের ইতিহাস দ্বিতীয়টি না থাকলেও ইনিংসে ১০ উইকেট নেওয়ার কীর্তি গড়ে দেখিয়েছেন ভারতের কিংবদন্তি লেগ স্পিনার অনিল কুম্বলে। ১৯৯৯ সালে পাক-ইন্দো দ্বিপাক্ষিক টেস্ট সিরিজের ২য় ম্যাচের চতুর্থ ইনিংসে এই কীর্তি গড়েন কুম্বলে। নিজেদের মাটিতে প্রথম টেস্ট হেরে চাপের মুখে ছিলো আজহার উদ্দিনের দল।

দিল্লীর লো এবং স্লো উইকেটে ম্যাচে ফলাফল আসার সম্ভাবনা ছিলো আগে থেকেই। দুই দলের স্পিনাররা পিচের সাহায্যে নিয়ে ব্যাটসম্যানদের পরাস্ত করতে পারবে সেটা পিচ রিপোর্টেই বলা হয়েছিলো, পাকিস্তানের সাকলাইন মুশতাক এবং মুশতাক আহমেদের মতো স্পিনাররা সিরিজের প্রথম ম্যাচে ভারতীয় ব্যাটসম্যানদের বেশ ভুগিয়েছেন।

দিল্লী টেস্টের প্রথম ইনিংসেও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে, ওপেনার রামেশের ৬০ রান এবং অধিনায়ক আজহারউদ্দীনের ৬৭ রান ছাড়া আর কেউই উল্লেখযোগ্য রান সংগ্রহ করতে পারেন নি, যার ফলে প্রথম ইনিংসে ২৫২ রানেই গুটিয়ে যায় ভারত। ঐ সিরিজে ম্যান অব দ্যা সিরিজের পুরস্কার পাওয়া সাকলাইন মুশতাক শিকার করেন ৫ উইকেট।

দিল্লীর স্লো উইকেটে এই রানকে পাহাড়সম বানিয়ে পাকিস্তানকে ১৭৮ রানে অল আউট করে দেয় ভারতীয় বোলাররা। অনীল কুম্বলে ৪ টি এবং হরভজন সিং শিকার করেন ৩ উইকেট। প্রথম ইনিংসের ৮০ রানের লিড নিয়ে ২য় ইনিংসে ব্যাট করতে নেমে আবারো ইনিংসের হাল ধরেন রামেশ, সেঞ্চুরি থেকে মাত্র ৪ রান দূরে থাকতে মুশতাক আহমেদের বলে আউট হয়ে সাজঘরে ফিরে যান। অন্যান্য ব্যাটসম্যানরা কেউই বড় ইনিংস গড়তে পারেনি, সবাই ২০-৩০ রান করে অবদান রেখেছিলেন। কিন্তু ৮ম উইকেট জুটিতে ঠিকই দাঁড়িয়ে যান গাঙ্গুলি এবং শ্রীনাথ, তারা ৮ম উইকেটে ১০০ রান যোগ করেন।

শেষপর্যন্ত ভারত ৩৩৯ রানে অল আউট হয়, ততক্ষণে পাকিস্তানের সামনে লক্ষ্য দাঁড়ায় ৪২০ রানের। বিশাল রানের টার্গেটে ব্যাট করতে নেমে শুরু থেকেই ভারতীয় বোলারদের উপর চড়াও হন সাঈদ আনোয়ার এবং শহিদ আফ্রিদি।

উদ্বোধনী উইকেট জুটিতে সাঈদ আনোয়ার এবং এবং শহিদ আফ্রিদি ২৪ ওভারেই ১০০ রান যোগ করে বসেন। প্রথম সেশনে কোনো উইকেট না পাওয়ার কারণে ড্রেসিংরুম থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় অনিল কুম্বলেকে দিয়ে টানা ওভার করানো হবে। এই পিচে তার বলই কার্যকরী হওয়ার কারণে তাকে টানা বল করানো হয়। দলীয় ১০১ রানের মাথায় কুম্বলের বলে আফ্রিদি বিতর্কিত আউটের শিকার হয়ে প্যাভিলিয়নে ফিরে গেলে আর ম্যাচে ফিরতে পারেনি পাকিস্তান। সাঈদ আনোয়ার এবং ওয়াসিম আকরাম কিছুটা চেষ্টা করলেও তা যথেষ্ট ছিল না।

আফ্রিদিকে ফিরানোর পর মাত্র ২৭ রানের ব্যবধানে ইজাজ আহমেদ, ইনজামাম-উল হক, মঈন খান, ইউসুফ ইয়ুহানা এবং সাঈদ আনোয়ারকে আউট করে ২য় সেশনেই ভারতের জয় একপ্রকার নিশ্চিত করে দেন কুম্বলে।

Image Source: espncricinfo

শেষদিকে ওয়াসিম আকরাম এবং সেলিম মালিক কিছুটা প্রতিরোধ গড়ার চেষ্টা করেন, কিন্তু কুম্বলের বিধ্বংসী স্পেলের সামনে কেউই দাঁড়াতে পারেননি।

শেষ ব্যাটসম্যান হিসাবে যখন ওয়াকার ইউনুস ক্রিজে আসে তখন অপরপ্রান্তে থাকা ওয়াসিম আকরামের পরামর্শ ছিলো কুম্বলেকে উইকেট দেওয়া যাবে না, তাই নিজেই বেশি স্ট্রাইক রাখার চেষ্টা করছিলেন। শেষপর্যন্ত ওয়াসিম নিজেই কুম্বলের ফাঁদে পা দিয়ে লক্ষণের হাতে ক্যাচ দিয়ে কুম্বলের ১০ম শিকারে পরিণত হন। ওয়াসিম আকরামকে আউট করে ভারতের ২১২ রানে জয়ের পাশাপাশি ২৬.৩ ওভার বল করে ৭৪ রান দিয়ে ১০ উইকেট শিকারের কীর্তি গড়েন কুম্বলে।

 


টেস্ট ক্রিকেটে ইনিংসে ১০ উইকেট শিকারের কীর্তি  জিম লেকার এবং কুম্বলের থাকলেও এর কাছাকাছি আরো ১৫ জন বোলার ১৬ বার গিয়েছিলেন। যার মধ্যে মুত্তিয়া মুরালিধরন ২ বারের চেষ্টায় ব্যর্থ হয়েছিলেন। ২০০২ সালে ক্যান্ডি টেস্টের প্রথম দিনে জিম্বাবুইয়ান ব্যাটসম্যানদের নিজের বিষাক্ত স্পিনে কুপোকাত করেন মুরালিধরন। ঐদিন জিম্বাবুয়ের ৯ জন ব্যাটসম্যান প্যাভিলিয়নে ফিরে যায়, যার সবকটি শিকার করেন মুরালি। ২য় দিনের শুরু থেকেই অপরপ্রান্ত থেকে চামিন্দা ভাস অফ স্ট্যাম্পের অনেক বাহিরে বল করে কোনোরকমে নিজের ওভার শেষ করছিলেন, আর মুরালি ১০ম উইকেট শিকারের সন্ধানে ছিলেন। জিম্বাবুয়ের ১০ ও ১১ নাম্বার ব্যাটসম্যান ফ্রেন্ড এবং ওলোংগা বাধা হয়ে দাঁড়ায়। দুইজনে মিলে শেষ উইকেটে প্রায় ১২ ওভার ব্যাট করেন।

শেষপর্যন্ত ওলোংগা ভাসের ওয়াইড বল খেলতে গিয়ে সাঙ্গাকারার হাতে ক্যাচ দিয়ে ফেলে। স্লিপ থেকে আবেদন করতে গিয়েও থেমে যায় সবাই, নিশ্চিত আউট ছিলো জেনে আম্পায়ারও আউট দিতে বাধ্য ছিলেন। শেষপর্যন্ত মুরালির কাছে অধরাই থেকে যায় জিম্বাবুয়ের শেষ উইকেটটি।

Image Source: espncricinfo


১৯৯৮ সালে ওভালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচের তৃতীয় এবং ইংল্যান্ডের ২য় ইনিংসে ৯ উইকেট শিকার করেছিলেন মুরালিধরন। সেইবার অ্যালেক্স স্টুয়ার্ট রান আউট হলে মুরালির আর ১০ উইকেট শিকার করা হয় নি। এছাড়া ইংল্যান্ডের ৯ ব্যাটসম্যানই মুরালির বলে আউট হয়ে প্যাভিলিয়নে ফিরে যায়। মুত্তিয়া মুরালিধরন ঐ ম্যাচের প্রথম ইনিংসেও ৭ উইকেট শিকার করেছিলেন।

মুরালিধরন ছাড়াও আরো ১৪ জন বোলারের ১ উইকেটের আফসোস ছিলো। জর্জ লেহম্যান, রিচার্ড হ্যাডলি, জিম লেকার, রঙ্গনা হেরাথ, কপিল দেব, আবদুল কাদির, সরফরাজ নেওয়াজ, ডেভন ম্যালকম, হাগ টায়ফিল্ড, আর্থার মেইলি, সিডনি বার্নেস, শুভাস গুপ্তে, জ্যাক নোরেইগা এবং জাশুভাই প্যাটেল নিজেদের ক্যারিয়ারে এক ইনিংসে ৯ উইকেট শিকার করেছেন।

Image Source: espncricinfo

দিনদিন ক্রিকেট ব্যাটসম্যানদের খেলায় পরিণত হচ্ছে, দর্শকরাও চার-ছয় দেখতেই স্টেডিয়ামে আসে। এইরকম বিধ্বংসী স্পেলের সচরাচর দেখা যায় না, বিস্ফোরক ব্যাটিং ই দর্শক টানে।

 
 

This article is in Bangla language. It's about record of jim laker and anil kumble in cricket.

References:

1.www.espncricinfo.com/magazine/content/story/389554.html

2.http://www.espncricinfo.com/ci/engine/match/63829.html

Featured Image: gettyimags/Prakash Shing