সন্দ্বীপ লামিচানে: নেপালের বিস্ময় বালকের উত্থান

আইপিএলের একাদশ আসরের নিলামে আইসিসির সহযোগী দেশ থেকে দুজন নাম লিখিয়েছিলেন। কানাডার উইকেটরক্ষক ব্যাটসম্যান তারিক হামজা ও নেপালের লেগস্পিনার সন্দ্বীপ লামিচানে। তারিক হামজাকে দলে ভেড়াতে কেউ আগ্রহ প্রকাশ না করলেও লামিচানেকে তার বেস প্রাইজ ২০ লাখ রুপি দিয়ে দলে অন্তর্ভুক্ত করে দিল্লি ডেয়ার ডেভিলস। নিলামে অনেক নামকরা ক্রিকেটারের নাম উঠলেও অনেকেই অবিক্রীত ছিলেন। কিন্তু অখ্যাত লামিচানের প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করে দিল্লি।

নেপালের প্রথম ক্রিকেটার হিসাবে আইপিএলে দল পেলেন সন্দ্বীপ লামিচানে; Image Source – NeoStuffs

মাত্র সতেরো বছর বয়সী সন্দ্বীপ লামিচানে নেপালের প্রথম ক্রিকেটার হিসেবে আইপিএলে খেলার সুযোগ পেলেন। এ নিয়ে নেপালের ক্রিকেট ভক্তদের আনন্দ উদ্দীপনার কমতি নেই। নেপাল ক্রিকেটখেলুড়ে দেশ হিসাবে খুব বেশি জনপ্রিয় নয়। তাদের একজন ক্রিকেটারের আইপিএলের মতো মঞ্চে সুযোগ পাওয়াটা তাদের ক্রিকেট দলকে পরিচিতি দেবে। বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের ড্রাফটেও ছিলেন লামিচানে, কিন্তু তার প্রতি কোনো দল আগ্রহ দেখায়নি।

২০০০ সালের ২ আগস্ট নেপালের স্যাঙ্জা জেলায় জন্মগ্রহণ করেন সন্দ্বীপ লামিচানে। ক্রিকেটে নেপালের উল্লেখযোগ্য তেমন কোনো সফলতা নেই। ১৯৯৬ সালে আইসিসির সহযোগী সদস্য হওয়ার পর ২০১৪ সালে আন্তর্জাতিক টি-টুয়েন্টি স্ট্যাটাস পায় নেপাল। তবে তা খুব বেশিদিন ধরে রাখতে পারেনি তারা। ২০১৫ সালের জুলাইতে টি-টুয়েন্টি স্ট্যাটাস হারায় নেপাল। এই সময়ের মধ্যে ১১টি টি-টুয়েন্টি ম্যাচ খেলে তিনটিতে জয় পায় নেপাল। আফগানিস্তান, হংকং এবং নেদারল্যান্ডের বিপক্ষে জয় তুলে নেয় এভারেস্টের দেশ নেপাল। নেপালের আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার যোগ্যতা না থাকার দরুন প্রতিভাবান লেগস্পিনার সন্দ্বীপ লামিচানের এখনও আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার সুযোগ হয়নি। বর্তমানে তিনি নামিবিয়ায় ওয়ার্ল্ড ক্রিকেট লিগের দ্বিতীয় বিভাগের ম্যাচ খেলার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। হয়তো তার হাত ধরেই নেপাল আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলার যোগ্যতা অর্জন করবে।

সন্দ্বীপ লামিচানে প্রথম শিরোনামে আসেন ২০১৬ সালে বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত অনুর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ ক্রিকেটের মধ্য দিয়ে। টুর্নামেন্টে ছয় ম্যাচে ১৪ উইকেট নিয়ে তিনি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি ছিলেন। আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে হ্যাটট্রিক সহ ২৭ রানে পাঁচ উইকেট শিকার করেছিলেন। তার লেগস্পিন এবং গুগলি দেখে অনেকেই তার সাথে শেন ওয়ার্নের তুলনা করেছিলেন। বাংলাদেশের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে তার গুগলিতে বিভ্রান্ত হয়ে তার হাতে ক্যাচ তুলে দিয়েছিলেন অনুর্ধ্ব-১৯ ক্রিকেট ইতিহাসের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক নাজমুল হাসান শান্ত। শেষপর্যন্ত অবশ্য ম্যাচে ছয় উইকেটে পরাজিত হয় নেপাল। তার দুর্দান্ত পারফরমেন্সে নেপাল অনুর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে অষ্টম স্থান লাভ করে। দক্ষিণ আফ্রিকা, নিউ জিল্যান্ড, জিম্বাবুয়ে এবং আফগানিস্তানের মতো দলগুলোকে পেছনে ফেলে অষ্টম স্থান লাভ করেছিলো নেপাল।

বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত ২০১৬ সালের অনুর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ ক্রিকেট আসরে ১৪ উইকেট শিকার দ্বিতীয় সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি ছিলেন লামিচানে; Image Source: fukuokanepal.news

অনুর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে দুর্দান্ত পারফর্ম করার তিন মাস পর হংকংয়ে দুই দিনের টুর্নামেন্ট টি-টুয়েন্টি ব্লিটজে কাউলুন ক্যান্টনসের হয়ে খেলার জন্য আমন্ত্রণ পান সন্দ্বীপ লামিচানে। সেখানে তার দলের পরামর্শদাতা এবং অধিনায়ক ছিলেন অস্ট্রেলিয়ার বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক মাইকেল ক্লার্ক। তার সতীর্থ হিসেবে ছিলেন পাকিস্তানের সাবেক অধিনায়ক শহীদ আফ্রিদিও। ঐ টুর্নামেন্টে লামিচানের দুর্দান্ত লেগব্রেক এবং গুগলি ক্লার্কের নজরে পড়ে।

মাত্র ১৬ বছর বয়সী সন্দ্বীপ লামিচানেকে সিডনি গ্রেড লিগে ওয়েস্টার্ন সাবার্বস ক্রিকেট ক্লাবের হয়ে খেলার আমন্ত্রণ জানান মাইকেল ক্লার্ক। একজন ১৬ বছরের যুবকের জন্য এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি হতে পারে না, বিশেষত যখন তার ক্রিকেট ব্যাকগ্রাউন্ড নেপাল হয়।

মাইকেল ক্লার্ক বলেন, “লামিচানে অসাধারণ তরুণ ক্রিকেটার যে ক্রিকেটকে উপভোগ করে। এবং সে খেলা সম্পর্কে অত্যন্ত উৎসাহী।” লামিচানেকে নিজের একাডেমিতে আনতে পেরে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছিলেন। একজন আনকোরা নেপালের বোলারকে তার ক্লাবে এনে অনুশীলন করার সুযোগ করে দিতে পেরে ক্লার্ক অত্যন্ত উচ্ছ্বসিত ছিলেন।

সন্দ্বীপ লামিচানের উত্থানের পেছনে বড় ভূমিকা রয়েছে অস্ট্রেলিয়ার সাবেক অধিনায়ক মাইকেল ক্লার্কের; Image Source – Cricket Australia

ওয়েস্টার্ন সাবার্বসের হয়ে খেলার সময় বিগ ব্যাশে খেলার ইচ্ছা প্রকাশ করেন লামিচানে। বিগ ব্যাশে এখন পর্যন্ত খেলার সুযোগ না পেলেও বিশ্বসেরা টি-টুয়েন্টি লিগ আইপিএলে দল পেয়েছেন তিনি। ওয়েস্টার্ন সাবার্বসের হয়ে খেলার সময়ে নজরে চলে আসেন দিল্লি ডেয়ার ডেভিলসের কোচ রিকি পন্টিংয়ের। যার সুবাদে লামিচানে আইপিএলের মঞ্চে নিজের লেগস্পিনের ভেলকি দেখানোর সুযোগ পেয়েছেন।

আইসিসির সহযোগী দেশ নেপালের ক্রিকেটার সন্দ্বীপ লামিচানের আইপিএলে সুযোগ নেপালের ক্রিকেট অগ্রগতিতে বড় ভূমিকা পালন করবে। রশিদ খান এবং মোহাম্মদ নবী বিশ্বের নানা প্রান্তে ফেরিওয়ালার মতো ক্রিকেট খেলে আফগান ক্রিকেটের উন্নতি ক্রিকেট বিশ্বকে দেখাচ্ছেন। গতবছর আইপিএলে খেলার সুযোগ পেয়েছিলেন রশিদ খান এবং মোহাম্মদ নবী। রশিদ খান দুর্দান্ত বোলিং করেছিলেন আইপিএলের গত আসরে। এরা দুজন আইপিএল, বিবিএল, সিপিএল, বিপিএলও মাতাচ্ছেন কয়েক বছর ধরে।

বর্তমানে গ্লোবাল টি-টুয়েন্টি লিগগুলোতে রশিদ খান যেকোনো দলের কাছে পছন্দের নাম। আইপিএলের নিলামে তাকে নিয়ে রীতিমতো কাড়াকাড়ি হয়েছে। এবারের আইপিএলের নিলামে রশিদ খানকে নয় কোটি রূপি দিয়ে তার আগের দল সানরাইজার্স হায়দ্রাবাদ রেখে দিয়েছে। তার পাশাপাশি আইপিএলের নিলামে মোহাম্মদ নবী, মুজীব জাদরান এবং জহির খানও দল পেয়েছেন।

নেপাল ক্রিকেটের অগ্রগতিতে বড় ভূমিকা পালন করবেন সন্দ্বীপ লামিচানে ; Image Source – PahiloPost

আফগান ক্রিকেটারদের বিভিন্ন গ্লোবাল লিগে দল পাওয়াতে তাদের দেশের ক্রিকেটও দ্রুততার সাথে উন্নতি করছে। গতবছর আয়ারল্যান্ডের সাথে টেস্ট স্ট্যাটাস পেয়ে আইসিসির পূর্ণ সদস্যের দেশের যোগ্যতা অর্জন করেন। আন্তর্জাতিক টি-টুয়েন্টি ক্রিকেটের র‍্যাংকিংয়ে বর্তমানে বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কার উপর অবস্থান করছে আফগানিস্তান।

সন্দ্বীপ লামিচানের দল পাওয়াতে তার দেশের অন্যান্য প্রতিভাবান ক্রিকেটাররাও আলোচনায় আসবে। নেপালের দুই আক্রমণাত্মক ব্যাটসম্যান অধিনায়ক পারাস খাদকা এবং সহ-অধিনায়ক মাল্লাও ফোকাসে আসবেন।

সন্দ্বীপ লামিচানে আইপিএলে দল পাওয়ার পর মাইকেল ক্লার্ককে কৃতিত্ব দিতে ভোলেননি। তিনি বলেন, আইপিএলের নিলামের আগেও আমার সাথে তার কথা হয়েছিলো। তার সাথে কথা বললে আমি নির্ভার থাকি। মাইকেল ক্লার্কের নেতৃত্বে সিডনি গ্রেড লিগে ওয়েস্টার্ন সাবার্বস ক্রিকেট ক্লাবের হয়ে খেলতে পারাটা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।

মাইকেল ক্লার্ক তাকে দেখার পর থেকেই তার উপর নজর রেখেছিলেন, এমনটাই জানিয়েছেন তিনি। তবে ক্লার্ক নিজে কৃতিত্ব নিতে চাননি। ক্লার্ক বলেন, “আমি কিছুই করিনি। শুধু ও যখন বল করেছে হাসিমুখে দেখেছি।” লামিচানেকে দেখে স্বয়ং শেন ওয়ার্নও ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন। লামিচানের ছোটবেলার আইডল ছিলেন শেন ওয়ার্ন ও শচীন টেন্ডুলকার। এই দুজনের মধ্যে শেন ওয়ার্নের পদাঙ্ক অনুসরণ করেন লামিচানে।

সন্দ্বীপ লামিচানে এবং মাইকেল ক্লার্ক; Image Source – Twitter

সন্দ্বীপ লামিচানের সাম্প্রতিক পারফরমেন্সও আশাজাগানিয়া। ওয়ার্ল্ড ক্রিকেট লিগ চ্যাম্পিয়নশিপে নেপালের হয়ে নয় ম্যাচে ২৮.২৫ বোলিং গড়ে ১২ উইকেট শিকার করেছেন তিনি। গত মাসে নেপালের ফ্রাঞ্চাইজি ভিত্তিক টি-টুয়েন্টি টুর্নামেন্ট দ্য এভারেস্ট প্রিমিয়ার লিগে সাত ম্যাচে নয় উইকেট শিকার করেছেন।

আইপিএলে দল পাওয়ার পর সন্দ্বীপ লামিচানেকে নেপালের মন্ত্রী হতে করে শুরু করে সাধারণ জনগণও শুভেচ্ছা জানিয়েছেন লামিচানের বাবা তাকে বলেছেন, “আইপিএলের মাধ্যমে তুমি সুযোগ পাচ্ছ নিজের দেশকে গর্বিত করার। তাই এটি দু’হাতে কাজে লাগানো উচিত।”

ফিচার ইমেজ – Sportswallah

Related Articles