আলফ্রেডো ডি স্টেফানো: সর্বজয়ী এক দুর্ভাগার গল্প

আলফ্রেডো ডি স্টেফানো, ২০১৪ সালে ৮৮ বছর বয়সে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চলে গেছেন এই ব্যক্তি। তিনি ছিলেন দুনিয়ার সফলতম ফুটবল দল রিয়াল মাদ্রিদের অগ্রযাত্রার পথ প্রদর্শক। ‘৫০-এর দশকের কালজয়ী রিয়াল মাদ্রিদ টিম শুধু সময়ের সেরা দল ছিলো না, সর্বকালের সেরা ফুটবল দলগুলোর একটি তালিকা তৈরি করলে বেশ উপরের দিকেই থাকবে সেই দলটির নাম। সেই টিমের কান্ডারী ছিলেন এই আর্জেন্টাইন কিংবদন্তী। তাকে দলে ভিড়ানোর মাধ্যমেই রিয়াল মাদ্রিদ ইউরোপিয়ান কাপের প্রথম আসরসহ টানা ৫টি ইউরোপিয়ান কাপ জিতে নিয়েছিলো।

কাগজে-কলমে একজন স্ট্রাইকার হলেও আদতে তিনি শুধু গোলই করতেন না। প্লে-মেকিং থেকে শুরু করে ডিফেন্ডিং মাঠের প্রতিটি পজিশনেই তিনি প্রভাব বিস্তার করতেন। এমন এক যুগে তিনি খেলেছিলেন যখন মাঠে প্লেয়ারদের পজিশন ছিলো ফিক্সড করা, কিন্তু তিনি ছিলেন তার যুগের চেয়ে আরো কয়েক যুগ এগিয়ে। স্টেফানো প্রায় সব সেন্ট্রাল পজিশনেই খেলতে পারতেন; সেন্টার ফরোয়ার্ড, সেকেন্ড স্ট্রাইকার, নাম্বার টেন, সিক্স, এইট এমনকি সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার হিসেবে। অনেকে ভাবতে পারেন এরকম সব্যসাচী খেলোয়ার তো অনেকেই আছেন! কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে, তিনি একেক ম্যাচে একেক পজিশনে খেলতেন বিষয়টি এমন নয়, বরং সবগুলো ভূমিকা একইসাথে একই ম্যাচে পালন করতেন।

সেন্ট্রাল ফরোয়ার্ড হিসেবে ৩-২-৫ কাঠামোতে প্রায় সময়েই ডিফেন্ডারদের মাঝে এসে বল নিয়ে যেতেন নিজেদের পেনাল্টি বক্স থেকে এবং মিড দিয়ে বল নিয়ে টান দিতেন প্রতিপক্ষের বক্স বরাবর। লং বল খেলে গেম ওপেন অথবা একে একে ড্রিবল করে এগিয়ে যেতেন এক, দুই, এমনকি তিনজনকেও। এ যে একেবারেই অত্যুক্তি হচ্ছে না তার প্রমাণও আছে তখনকার মাদ্রিদ কোচের তার সম্পর্কে করা মন্তব্যেই–

The great thing about De Stefano was that when he was on your team, you had two players at any position” – Miguel Munoz

ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো এবং ডি স্টেফানো; ছবিসূত্রঃ Realmadrid.com

সাম্প্রতিক সময়ে রোনালদোর সাথে ডি স্টেফানোর তুলনা দেয়া হয়েছে। যদিও রোনালদোর সাথে তার অনেকগুলো বৈশিষ্ট্যের মিল আছে; যেমন- ফিজিকাল ডমিনেন্স, দুই পায়েই পারদর্শিতা, পেনাল্টি বক্সে শিকারি মুভমেন্ট, হেডিং ইত্যাদি, কিন্তু ডি স্টেফানো ছিলেন আরো বেশি স্বয়ংসম্পূর্ণ। রোনালদোর এই বৈশিষ্ট্যগুলোর সাথে যোগ করুন লুকা মদ্রিচের গেম কন্ট্রোল স্ট্র্যাটেজিকালি এবং ট্যাক্টিকালি। এ দুজন যৌথভাবে পারবেন শুধুমাত্র ডি স্টেফানোকে বোঝাতে। এমনকি মাঠে তার স্ট্যামিনাও ছিল প্রচুর। শেষ বয়সে এসেও নিজের ডি বক্সে স্লাইডিং ট্যাকল করে পরের মিনিটেই প্রতিপক্ষের বক্সে গিয়ে বল রিসিভ করে শট মারতেন। স্ট্যামিনা, ফিনিশিং, গেম রিড করার ক্ষমতা, হেডিং এবং ড্রিবলিং- এ সবকিছু মিলিতভাবে তাকে বানিয়েছিলো সময়ের সেরা খেলোয়াড়।

১৯৫৭ সালে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের কিংবদন্তী এবং ইংল্যান্ডের সর্বকালের সেরা খেলোয়াড স্যার ববি চার্লটন যুবক বয়সে মাদ্রিদের মাঠ সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে মাদ্রিদের খেলা দেখতে গিয়েছিলেন। তার মুখ থেকেই শোনা যাক কেমন ছিলেন ডি স্টেফানো-

“ Who is this man? He takes the ball from the goalkeeper, he tells the full-backs what to do; wherever he is on the field he is in position to take the ball, you can see his influence on everything that is happening… . I had never seen such a complete footballer. It was as though he had set up his command center at the heart of the game. He was as strong as he was subtle. You just could not keep your eyes off him.”

ডি স্টেফানো ম্যারাডোনা অথবা পেলের মতো গিফটেড প্লেয়ার ছিলেন না ঠিকই, তবে স্যার ববি চার্লটন ছিলেন অনেকের মাঝে একজন, যিনি ডি স্টেফানোকে সর্বকালের সেরা অল রাউন্ডার হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন।

ক্যারিয়ারে মোট ৫টি ইউরোপিয়ান কাপ জিতেছেন ডি স্টেফানো; ছবিঃ Realmadrid.com

তার ২০ বছরের ফুটবল ক্যারিয়ারে দুই মহাদেশের তিনটি দেশের তিনটি ক্লাবকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। নিজের দেশ আর্জেন্টিনার ক্লাব রিভার প্লেটকে কিছু সময়ের জন্য, কলম্বিয়ার বোগোতায় অবস্থিত মিলোনারিওসকে এবং সর্বশেষ যেখানে খেলে বিখ্যাত হয়েছিলেন সেই রিয়াল মাদ্রিদকে। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হচ্ছে, তিনি এই তিনটি দেশের জাতীয় দলের হয়েও খেলেছিলেন। তবে দুর্ভাগ্যজনকভাবে ক্লাব ফুটবলে একের পর এক ট্রফি জিতে ইতিহাস গড়লেও কখনো বিশ্বকাপের মূল পর্বে খেলা হয়ে ওঠেনি তার।

ডি স্টেফানোর জন্ম আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েন্স আয়ার্সের এক মধ্যবিত্ত পরিবারে। তার দাদা ইতালি থেকে এসে আর্জেন্টিনায় বসত গড়েছিলেন। বাবা আলফ্রেডো সিনিয়রও ফুটবল খেলোয়াড় ছিলেন রিভার প্লেট ফুটবল ক্লাবের। মা ইউলাইলা ছিলেন ফ্রেঞ্চ এবং আইরিশ বংশদ্ভুত। বুয়েন্স আয়ার্সের রাস্তায় রবারের ফুটবল দিয়ে খেলার মাধ্যমেই তার ফুটবলে হাতেখড়ি হয়।

ছোটবেলা থেকেই বেশ প্রতিভাবান হলেও আশ্চর্যজনকভাবে ১৯ বছর বয়সেও তখনো রিভার প্লেটের ৩য় দলেই পড়ে ছিলেন আলফ্রেডো ডি স্টেফানো। টাকা-পয়সা নিয়ে ক্লাবের সাথে গন্ডগোল হওয়ায় তাকে ধারে খেলতে পাঠানো হয় পাশেরই আরেক ক্লাব এটলেটিকো হারিকেনে। কিন্তু তার প্রতিভার কথা বুঝতে পেরে রিভার প্লেট আর দেরি না করে পরের সিজনেই তাকে ফিরিয়ে নিয়ে আসে। এসেই রাতারাতি তারকা বনে যান স্টেফানো। ১৯৪৭ সালে লীগে টপ স্কোরার পাশাপাশি লীগও জেতান রিভার প্লেটকে। অসাধারণ গতির জন্য তাকে ডাকা শুরু হয় ‘স্বর্ণকেশী তীর’ নামে। ৬ ম্যাচে ৬ গোল করে একই বছরে কোপা আমেরিকা জেতান আর্জেন্টিনাকে। এটিই ছিল স্বদেশের হয়ে তার শেষ টুর্নামেন্ট।

১৯৪৯ সালে আর্জেন্টিনাতে ফুটবলরারা ধর্মঘটে গেলে আরো বেশ কয়েকজন আর্জেন্টাইন প্লেয়ারের সাথে ডি স্টেফানোও পাড়ি জমান ফিফার আওতার বাইরে থাকা কলম্বিয়ান লীগে খেলা দল মিলোনারিওসে। ফিফা চুক্তি বাইরে থাকায় কলম্বিয়ান দলগুলোকে কোনো ট্রান্সফার ফি দিতে হতো না। ফলে তারা সেরা খেলোয়াডদেরকে বেশি বেতন প্রদান করতে পারতো। সেখানে ৪ বছরে ৩টি লীগ জিতে নেন তিনি।

১৯৫৩ সালে কলম্বিয়া আবার ফিফার সদস্য হলে ডি স্টেফানো আবারো ক্লাব ছাড়া হন এবং মিলোনারিওসের শেষ ইউরোপ ভ্রমণে রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষে একটি ম্যাচে পুরো মাদ্রিদ ডিফেন্সকে একাই টালমাটাল করে দেন। এরকম নজড়কাড়া পারফর্মেন্স চোখ এড়ায়নি রিয়াল মাদ্রিদেরও।

তার উল্লেখযোগ্য অর্জনগুলোর সাথে ছবি; ছবিসূত্রঃ Realmadrid.com

ডি স্টেফানো স্পেনে আসেন অনেক নাটকীয়তার মাধ্যমে। তার পায়ের জাদুতে মুগ্ধ হয়ে রিয়াল মাদ্রিদ তার তখনকার ক্লাব মিলোনারিওসের সাথে ট্রান্সফার ফির ব্যাপারে সম্মত হয়। এদিকে বসে থাকেনি মাদ্রিদের চিরশত্রু বার্সেলোনাও, তারাও চুক্তি করে স্টেফানোর সাবেক ক্লাব রিভার প্লেটের সাথে। ডি স্টেফানো তখন আইনত রিভার প্লেটের সাথে চুক্তিবদ্ধ ছিলো। রিভার প্লেটের দাবি ডি স্টেফানো তখনো তাদের খেলোয়াড়, কারণ কলম্বিয়াতে যাওয়ার পন্থা ছিলো অবৈধ। অবশেষে দুই ক্লাবের এই দ্বন্দ্ব গিয়ে গড়ায় আদালত এবং ফিফা পর্যন্ত। শেষে এই মর্মে রায় দেয়া হয় যে, ডি স্টেফানো এক বছর মাদ্রিদের হয়ে খেলবেন, আরেক বছর খেলবেন বার্সেলোনার হয়ে। ডি স্টেফানোকে প্রথম বছর খেলানোর সুযোগ পায় রিয়াল মাদ্রিদ এবং শুরুর দিকে মানিয়ে নিতে একটু সময় নিলে বার্সালোনার তৎকালীন ম্যানেজমেন্ট তাকে দায়মুক্তি দেয়, যেটির জন্য তারা আজও দুঃখ প্রকাশ করে। ফলে তিনি পুরোপুরোভাবে রিয়াল মাদ্রিদের খেলোয়াড় হয়ে যান।

৪ দিন পরেই তিনি রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে বার্সেলোনার বিপক্ষে এক দুর্দান্ত হ্যাটট্রিক করে বসেন এবং সেটি ছিলো সবেমাত্র শুরু। মাত্র ৩০ ম্যাচে ২৭ গোল করে ১৯৫৩-৫৪ সিজনে রিয়াল মাদ্রিদকে ২১ বছর পর লীগ জেতান। শুরু হয় রিয়াল মাদ্রিদে তার জাদুকরী অধ্যায়। মাদ্রিদে কাটানো ১১ সিজনে রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে ৮টি লীগসহ টানা ৫টি ইউরোপিয়ান কাপ জেতেন। ২৮২ ম্যাচে তিনি করেন ২১৮ গোল এবং টানা ৪ সিজন লীগের সর্বোচ্চ গোলদাতাও হন। ইউরোপিয়ান প্রতিযোগিতায় মোট ৪৯ গোল করতে তার খেলতে হয়েছিলো ৫৮ ম্যাচ। তার খেলা ৫টি ইউরোপিয়ান কাপের ফাইনালের প্রতিটিতে গোল এবং একটিতে হ্যাটট্রিকসহ করেন মোট ৮ গোল। মাঠে নৈপুণ্যের বদৌলতে ১৯৫৭ এবং ১৯৫৯ সালে মোট দু’বার সেরা ইউরোপিয়ান খেলোয়াড়ের (ব্যালন ডি অর) স্বীকৃতি পান স্টেফানো।

ইউরোপিয়ান কাপ হাতে; ছবিসূত্রঃ Realmadrid.com

ক্লাব ফুটবলে সাফল্য তার পায়ে লুটোপুটি খেলেও জাতীয় দলের হয়ে নিজেকে সেভাবে মেলে ধরতে পারেননি তিনি। আর্জেন্টিনার হয়ে খেলার সুযোগ থাকলেও ১৯৫০ এবং ১৯৫৪ সালের বিশ্বকাপ থেকে আর্জেন্টিনা নিজেদেরকে সরিয়ে নেয়। পরবর্তীতে স্পেনের নাগরিকত্ব গ্রহণ করলে ১৯৫৮ সালের বিশ্বকাপে স্পেন মূল পর্বের খেলার যোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি। পরের বিশ্বকাপে ৩৫ বছর বয়সে স্পেনকে চিলিতে বিশ্বকাপের মূল পর্বে নিয়ে গেলেও বিশ্বকাপ শুরুর ঠিক আগে ইনজুরির কারণে আর খেলা হয়নি। সেই ইনজুরির পর স্পেনের হয়ে খেলতে নামেননি আর। আন্তর্জাতিক ফুটবলে বেশ দুর্ভাগাই বলা যায় তাকে।

১৯৬৪ সালে ৩৮ বছর বয়সে মাদ্রিদকে বিদায় জানিয়ে খেলতে জান বার্সেলোনাতে। তবে বার্সেলোনা ফুটবল ক্লাব নয়, বরং বার্সেলোনা শহরের আরেক ক্লাব এস্পানিয়লে। সেখানে দু’বছর কাটিয়ে ইতি টানেন নিজের বর্ণিল খেলোয়াড়ি জীবনের।

অবসর নেয়ার আগে এভাবেই প্রতিপক্ষের জালে জড়িয়েছেন একের পর এক গোল; ছবিসূত্রঃ Realmadrid.com

অবসরে যাওয়ার পর ফুটবল থেকে বেশিদিন দূরে থাকেননি। বোকা জুনিয়র্সের হয়ে আবারো মাঠে নামেন, তবে এবার সাইডলাইনে কোচ হিসেবে। ২৫ বছরের সাফল্যমন্ডিত কোচিং ক্যারিয়ারে মোট ৮টি ক্লাবকে কোচিং করিয়েছেন। জিতিয়েছিলেন বোকা জুনিয়র্স এবং রিভার প্লেটকে আর্জেন্টাইন লীগ টাইটেল এবং স্প্যানিশ ক্লাব ভ্যালেন্সিয়াকে ইউরোপিয়ান কাপ উইনারস কাপ এবং লীগ টাইটেল। ১৯৮২ সালে ফেরেন তার ভালোবাসার রিয়াল মাদ্রিদে। কিন্তু সেই সিজন খুব একটা ভালো কাটেনি। রিয়াল মাদ্রিদ রানার্স আপ হিসেবে সিজন শেষ করে পাঁচ পাঁচটি প্রতিযোগিতায়- স্প্যানীশ লীগ, কোপা দেল রে, স্প্যানিশ সুপার কাপ, কোপা দে লা লীগা এবং সর্বশেষ ইউরোপিয়ান কাপ উইনার্স কাপে আন্ডারডগ আবেরদিনের কাছে হেরে বসে মাদ্রিদ।

২০০০ সালে তাকে মাদ্রিদের আজীবন প্রেসিডেন্টের পদে ভূষিত করে সম্মাননা দেয়া হয় এবং ২০০৬ সালে মাদ্রিদের ট্রেনিং গ্রাউন্ডের একটি স্টেডিয়ামের নাম তার নামে নামকরণ করা হয়।

ফিচার ইমেজ- Defensecentral.com

Related Articles