Welcome to Roar Media's archive of content published from 2014 to 2023. As of 2024, Roar Media has ceased editorial operations and will no longer publish new content on this website.
The company has transitioned to a content production studio, offering creative solutions for brands and agencies.
To learn more about this transition, read our latest announcement here. To visit the new Roar Media website, click here.

চ্যাম্পিয়নস লিগের গোড়াপত্তনের গল্প

যেকোনো ফুটবল সমর্থক, যিনি নিয়মিত ক্লাব ফুটবল দেখেন না, কিন্তু সামান্য হলেও এই ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করেন, সেই ব্যক্তিটিকেও দেখা যায় উয়েফা আয়োজিত ক্লাব ফুটবলের শক্তিমত্তার বিচারে সর্বোচ্চ পর্যায়ের টুর্নামেন্ট চ্যাম্পিয়নস লিগে তার পছন্দের দলের শক্তিমত্তার বিচার করতে। এমনকি কোনো তর্কে দলের সাফল্য-ব্যর্থতা নিয়ে আলোচনা করতে দেখা যাওয়াটাও খুব একটা অসম্ভব নয় বৈকি।

ঠিক এতটাই জনপ্রিয় বর্তমানে ‘চ্যাম্পিয়নস লিগ’ নামক টুর্নামেন্টটি, যাকে আমরা তর্কাতীতভাবে ফুটবল বিশ্বকাপের পরই স্থান দিতে পারি জনপ্রিয়তার মানদণ্ডে। সন্দেহাতীতভাবেই চ্যাম্পিয়নস লিগ পৃথিবীর ফুটবল ইতিহাসে অন্যতম সেরা এক আয়োজন। আচ্ছা, কখনো কি মনে হয়েছে, চ্যাম্পিয়নস লিগের জন্ম কীভাবে হয়েছে? উয়েফা কেন প্রয়োজন বোধ করলো এমন কিছু আয়োজনের?

কৌতুহলবশত জাগ্রত এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গিয়ে পাওয়া তথ্যগুলো দেখবো আমরা এই লেখাটিতে। 

Inside the article
চ্যাম্পিয়নস লিগ ট্রফি; Image Credit: Real Madrid

কারো সাথে চ্যাম্পিয়নস লিগের জন্মকথা নিয়ে আলোচনা করতে হলে সবার প্রথমে যেই ব্যক্তির সাথে শুরুতে পরিচয় করিয়ে দেয়া উচিৎ, তিনি হচ্ছেন সাবেক ফরাসি ফুটবলার গ্যাব্রিয়েল হ্যানট। ঠিক চেনা চেনা ঠাহর হচ্ছে না বোধহয়। সে অবশ্য না হওয়ারই কথা, নিজের জীবদ্দশায় তিনি ফ্রান্স জাতীয় দলের হয়ে মাত্র ১২টি ম্যাচ খেলেছেন। একটা সময় ফ্রান্স জাতীয় দলের কোচ হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন তিনি, এবং L’Équipe পত্রিকায় নিজের বিরুদ্ধে পরিচয় গোপন করে নিজেই সমালোচনা করে কোচের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নিয়েছিলেন! এই ভদ্রলোকই বর্তমান ফুটবলের সবচেয়ে জাঁকজমকপূর্ণ ফুটবল আসরের অন্যতম চ্যাম্পিয়নস লিগ এবং ফুটবলের সবচেয়ে সম্মানজনক পুরষ্কারগুলোর অন্যতম ব্যালন ডি’অর-এর উদ্ভাবক।

তবে এখানে একটি মজার বিষয় যেটা না বললেই নয়, চ্যাম্পিয়নস লিগের বীজ সর্বপ্রথম বুনেছিলেন কিন্তু লাতিন আমেরিকানরাই। ঠিক ধরেছেন, বহুজাতিক ক্লাবভিত্তিক এমন চ্যাম্পিয়নশিপের গোড়াপত্তন হয় পেলে-ম্যারাডোনার মহাদেশেই। চল্লিশের দশকে চিলির একটি ক্লাব সর্বপ্রথম আয়োজন করলো সাউথ আমেরিকান দেশগুলোর জাতীয় লিগের বড় সাতটি ক্লাব নিয়ে একটি টুর্নামেন্ট, গালভরা একটা নাম দেওয়া হলো ‘সাউথ আমেরিকান চ্যাম্পিয়নশিপ অফ চ্যাম্পিয়নস’। ক্রীড়া প্রতিযোগিতাটি যেমন জনপ্রিয়তা পেয়েছিল ফুটবল সমর্থকদের মাঝে, তার থেকেও বেশি ব্যবসাসফল হয়েছিল। 

Inside the article
১৯৪২-৪৩ মৌসুমে একটি জনসভায় উপস্থিত বক্তৃতা দিচ্ছেন গ্যাব্রিয়েল হ্যানট; Image Credit: L’Equipe/Offside

সাংবাদিক বন্ধু জ্যাকস ফেরানের মাধ্যমে সফলতার খবর পৌছে যায় তৎকালীন ফরাসি L’Équipe পত্রিকার দূরদর্শী সম্পাদক গ্যাব্রিয়েল হ্যানটের কানে। অতঃপর দু’জন মিলে উয়েফার কাছে প্রস্তাব দিয়ে বসেন ইউরোপে মর্যাদাপূর্ণ রাজকীয় একটি প্রতিযোগিতা আয়োজনের, যার মাধ্যমে বিজয়ী দল বসবে ইউরোপের রাজসিংহাসনে। তারপর রচিত হয় ইতিহাস; সাউথ আমেরিকায় আন্তঃমহাদেশীয় ক্লাব ফুটবল প্রতিযোগিতার নতুন যে বীজ বুনেছিল চিলি, তার অঙ্কুরোদ্গম ঘটলো ইউরোপে, ফরাসি দুই সাংবাদিকের হাত ধরে। এভাবেই জন্ম নিল তৎকালীন ইউরোপিয়ান কাপ, কিংবা হালের চ্যাম্পিয়নস লিগ।

তবে প্রতিযোগিতাটিকে ‘কিক-অফ’ করাতে দুই সাংবাদিককে অনেক দুর্গম পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। ইউরোপের ফুটবল কমিউনিটিতে নতুন প্রস্তাবিত প্রতিযোগিতাটি নিয়ে পক্ষে বিপক্ষে এতই উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছিল যে, ফুটবল বিশ্বের সর্বোচ্চ সংস্থা ফিফাকে এসে হস্তক্ষেপ করতে হয়েছিল প্রস্তাবিত চ্যাম্পিয়নস লিগ নিয়ে সমাধান দেয়ার জন্য। 

মূল গল্পে আসি।

তৎকালীন সময়ে হাঙ্গেরিয়ান ফুটবল ছিল অনেক শক্তিশালী। তাদেরকে হারিয়ে দেয়া মানে রীতিমতো এলাহী কাণ্ড। সেই সময় ব্রিটিশ ক্লাব উলভারহ্যাম্পটন বিভিন্ন দেশের ক্লাবের সাথে প্রীতি ম্যাচ খেলা শুরু করে দেয় নিজেদের শক্তিমত্তার পরিচয় দিতে, সবার সাথে বীরদর্পে জয়ীও হচ্ছিল তারা। কিন্তু এই নিয়ে দম্ভটা শুরু হয় হাঙ্গেরিয়ান একটি ক্লাবকে হারানোর পর, যেখানে হাঙ্গেরি জাতীয় ফুটবলের দলের অধিকাংশ খেলোয়াড় ছিল। দাম্ভিকতার এক পর্যায়ে বরাবরের মতোই নাক-উঁচু ব্রিটিশ মিডিয়া আর উলভের কোচ নিজেদের ফুটবল বিশ্বের সেরা দল হিসেবে দাবি করা শুরু করে দিল। ঠিক এতেই চটে যান আমাদের গ্যাব্রিয়েল হ্যানট। তিনি পাল্টা জবাব দেন, ইউরোপিয়ান কোনো টুর্নামেন্টে জয়ী হলেই আপনারা নিজেদের সেরা বলতে পারেন, তাছাড়া নয়। 

শুধু মুখের বুলিতেই ক্ষান্ত হননি হ্যানট, তাৎক্ষণিকভাবে নতুন ইউরোপিয়ান প্রতিযোগিতাটির নিয়ম-নীতিমালা সাজিয়ে ইউরোপের স্বনামধন্য ১৬টি ক্লাবে প্রস্তাবনা পাঠিয়ে দেন। দলগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: রিয়াল মাদ্রিদ, চেলসি, এসি মিলান, এফসি পোর্তো ইত্যাদি। কিন্তু তখনও প্রস্তাবটি উয়েফার কাছে উত্থাপিত হয়নি। বস্তুত, আমাদের হ্যানট মশাই সঠিক সময়ের অপেক্ষায় ছিলেন, এবং পেয়েও গেলেন।

১৯৫৫ সালের ২রা মার্চ, ভিয়েনায় আয়োজিত উয়েফার একটি সাংগঠনিক অধিবেশনে হ্যানটের পত্রিকা L’Équipe তাদের প্রস্তাবনাটি পেশ করে। কিন্তু বিধি বাম, দুই-একজন কর্মকর্তা ছাড়া অধিকাংশ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারাই বিষয়টিকে কোনো পাত্তাই দিলেন না।

অন্যদিকে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পূর্বে আয়োজিত সবচেয়ে সফল প্রথম ও গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক ফুটবল প্রতিযোগিতা ‘মিত্রোপা কাপ’ পুনরোত্থাপনের তোড়জোড় শুরু হয়ে গেল। হ্যানট বুঝে গিয়েছিলেন, এটি যদি আবার শুরু হয়ে যায়, তাহলে ইউরোপিয়ান কাপ আর আলোর মুখ দেখবে না। তাই তিনি আবারও নিজের দূরদর্শিতার পরিচয় দিলেন, গোটা ইউরোপ এবং স্পেনের সবচেয়ে প্রভাবশালী দল রিয়াল মাদ্রিদের প্রেসিডেন্টকে ভাইস-প্রেসিডেন্ট করে মোট ১৮টি দল নিয়ে ইউরোপিয়ান কাপ প্রতিযোগিতাটির প্রথম আনুষ্ঠানিক কার্যনির্বাহী পরিষদ গড়ে তুললেন। একইসাথে সব দল যাতে আর্থিকভাবে লাভবান হয়, সেই কথা চিন্তা করে তৈরি করে ফেললেন সুবিধাজনক একটি অর্থনৈতিক কাঠামো। 

Inside the article
বর্তমান পিএসজির হোমগ্রাউন্ডেই সর্বপ্রথম চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনাল ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়; Image Credit: Getty Images

কিন্তু তৎকালীন ‘বুদ্ধির ঢেঁকি’ উয়েফার কর্মকর্তাগুলো হ্যানটের নতুন প্রস্তাবনাকে জলে ফেলে দিয়ে ‘ইন্টার সিটি ফেয়ারস কাপ’ নামে একটি নতুন প্রতিযোগিতা আয়োজনের পক্ষে সমর্থন দেন, যার উদ্দেশ্য ছিল শুধুই ব্যবসা করা। কেননা, এটি শুধু সেই শহরগুলোতেই মাঠে গড়াবে, যেসব শহরে বার্ষিক বাণিজ্য মেলা অনুষ্ঠিত হবে। উয়েফা্র অনুমতি পাওয়া এই টুর্নামেন্টটির সাথে একাত্মতা ঘোষণা করেছিল বার্সেলোনা, ফ্রাঙ্কফুর্ট, লিপজিগ, লন্ডনের মতো শহরগুলো। এতে করে মহাদেশীয় একটি প্রতিযোগিতা আয়োজনের জন্য ইউরোপ তিন ভাগে ভাগ হয়ে যায়। নিজেদের মধ্যে উত্তাপ ছড়িয়ে যায় মিত্রোপা কাপ, ইউরোপিয়ান কাপ, ইন্টার সিটি ফেয়ার কাপ নামে একই ধাঁচের তিনটি ভিন্ন প্রতিযোগিতাকে বাস্তবায়নের জন্য।

শেষমেশ তিন জোটের মাঝে মধ্যস্থতা করতে ফিফাকেই এগিয়ে আসতে হয়, এবং তারা ফয়সালা দেন যে, তিনটি প্রতিযোগিতাই মাঠে গড়াবে, সেই সাথে সবগুলোই উয়েফা পরিচালনা করবে। ইউরোপিয়ান কাপ প্রতিযোগিতাটি নাম পরিবর্তন করে ‘ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন ক্লাবস কাপ’ রাখা হয়, কারণ ফিফা চাচ্ছিল ‘ইউরোপিয়ান কাপ’ নামটি অব্যবহৃত রাখতে। উদ্দেশ্য একটাই, যাতে পরবর্তীতে এই নামে ইউরোপের জাতীয় দলগুলো নিয়ে নতুন একটি আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট আয়োজন করা যায়।

Inside the article
সর্বপ্রথম ইউরোপিয়ান কাপের বিজয়ী দল রিয়াল মাদ্রিদের ট্রফি উদযাপন; Image Credit: Wikimedia Commons

সব অনিশ্চয়তার অবসান ঘটিয়ে ইউরোপিয়ান কাপ যাত্রা শুরু করে ‘৫৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে, এফসি পোর্তো আর যুগোস্লাভিয়ার মধ্যকার উদ্বোধনী খেলার মাধ্যমে। ইউরোপিয়ান কাপের এরপরের সাফল্য আমরা সবাই জানি। ইউরোপিয়ান কাপের প্রতিদ্বন্দ্বী বাকি দু’টি প্রতিযোগিতা কতটুকু সফল ছিল, সেটা বর্তমানে চ্যাম্পিয়নস লিগের অবস্থান দেখেই পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে। কিন্তু ভবিষ্যতের এই সাফল্য তৎকালীন সময়ে শুধু একজন দেখতে পেয়েছিলেন বলেই আমরা বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ক্লাবগুলোকে দেখি নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ দিতে, তার অটল মনোবলের কারণেই আমরা প্রতি বছরই সাক্ষী হয়ে থাকি কিছু শিহরণ জাগানিয়া মুহূর্তের।

তবে একটা বিষয় বরাবরই বিস্ময়কর। শুরু থেকেই চ্যাম্পিয়নস লিগের বিরোধিতা করে আসছিলো উয়েফা স্বয়ং, আর পরিকল্পনা থেকে বাস্তবে রূপান্তর পর্যন্ত পুরো ইউরোপের সাথে যুদ্ধ করেছিল স্রেফ একটি ফরাসি সংবাদপত্র ও তার এক অদম্য সম্পাদক!

This article is in Bangla language. It is about the history of the UEFA Champions Trophy.

References:

  1. https://www.theguardian.com/football/2015/jun/30/gabriel-hanot-france-coach-journalist

  2. https://www.oxfordreference.com/view/10.1093/oi/authority.20110803095919624

  3. https://www.footballhistory.org/tournament/european-cup.html

  4. https://lastwordonsports.com/2016/05/20/year-one-1955-56-european-cup-story/

  5. http://www.linguasport.com/futbol/internacional/clubes/c1/history.htm

Related Articles