প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটের যাত্রা শুরু হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত ২৫ জন ক্রিকেটার এই ধারার ক্রিকেটে শতকের শতক পূর্ণ করেছেন। বর্তমানে খুব বেশি প্রথম শ্রেণীর ম্যাচ খেলতে চান না ক্রিকেটাররা। ফেরিওয়ালার মতো এদেশ থেকে ও’দেশ ঘুরেফিরে টি-টুয়েন্টি খেলতেই পছন্দ করেন। একটা সময় আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের বাইরে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় ছিল কাউন্টি ক্রিকেটে। বর্তমানেও কাউন্টি ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা অনেক। তবে টি-টুয়েন্টি আসরগুলো খুব দ্রুত দর্শকপ্রিয়তা লাভ করছে। আস্তে আস্তে প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা কমছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে শতকের শতক পূর্ণ করা তো এককথায় অসাধ্য কাজ। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সবচেয়ে বেশি শতক হাঁকানো ব্যাটসম্যান শচীন টেন্ডুলকারের প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে শতকের সংখ্যা ৮২টি। তার সমসাময়িক আরেক কিংবদন্তী রিকি পন্টিংয়ের শতকের সংখ্যা তার চেয়ে একটি বেশি।

প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে শতকের শতক পূর্ণ করা ব্যাটসম্যানদের মধ্যে বেশিরভাগই ইংলিশ ব্যাটসম্যান। কাউন্টি ক্রিকেটের কারণেই এই তালিকায় ইংলিশ ক্রিকেটারদের জয়জয়কার। প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে সবচেয়ে বেশি শতক হাঁকানো ব্যাটসম্যানদের তালিকায় প্রথম ১৩ জনই ইংলিশ ক্রিকেটার। আন্তর্জাতিক টেস্ট ক্রিকেটে সবচেয়ে বেশি বয়সে শতক হাঁকানো জ্যাক হবস প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে ১৯৯টি শতক হাঁকিয়ে সবচেয়ে বেশি শতক হাঁকানো ব্যাটসম্যানদের তালিকায় শীর্ষে আছেন। দ্বিতীয়তে থাকা প্যাটসি হেন্ড্রেনের শতকের সংখ্যা ১৭০টি। শতকের শতক হাঁকানো ২৫ জন ব্যাটসম্যানদের মধ্যে এই শতকে খেলেছেন তিন ক্রিকেটার। গ্রায়েম হিক এবং মার্ক রামপ্রকাশ এই শতকে আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেললেও গ্রাহাম গুচ ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত আন্তর্জাতিক টেস্ট ম্যাচ খেলেছিলেন। তিনি নিজের শেষ প্রথম শ্রেণীর ম্যাচ খেলেন ২০০০ সালে। এই তিন ক্রিকেটারের বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ার নিয়েই এই লেখা সাজানো।

গ্রায়েম অ্যাশলি হিক

গ্রায়েম হিক

প্রথমে শুরু করা যাক ওরচেস্টারশায়ার এবং ইংল্যান্ডের ব্যাটসম্যান গ্রায়েম হিককে দিয়ে। গ্রায়েম অ্যাশলি হিক ১৯৬৬ সালের মে মাসের ২৩ তারিখে বর্তমানে জিম্বাবুয়ের শহর হারারেতে জন্মগ্রহণ করেন। ক্রিকেটে তার পথচলা শুরু হয় জিম্বাবুয়েতেই। শুরুর দিকে ব্যাটসম্যানের চেয়ে বোলার হিসাবে তিনি বেশি পরিচিত ছিলেন। ১৯৮৩ সালের ক্রিকেট বিশ্বকাপের আগে জিম্বাবুয়ের যুব দলের হয়ে কয়েকটি ম্যাচ খেলেছিলেন। এরপর ১৯৮৩ সালে জিম্বাবুয়ের বিশ্বকাপের প্রাথমিক দলেও ছিলেন তিনি। জিম্বাবুয়ের হয়ে কোনো আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলা হয়নি গ্রায়েম হিকের।

১৯৮৩ সালে প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে অভিষেক হয় তার। পরের বছর জিম্বাবুয়ে ক্রিকেট ইউনিয়ন থেকে বৃত্তি পেয়ে ইংল্যান্ডে পাড়ি জমান হিক। ওরচেস্টাশায়ারের সেকেন্ড ইলেভেনে সুযোগ মিলে তার। সেখানে নিয়মিত পারফর্ম করার পর ওরচেস্টারশায়ারের মূল একাদশে সুযোগ পেয়ে যান। মূল একাদশে সুযোগ পেয়ে মাত্র ২০ বছর বয়সে এক মৌসুমে ২,০০০ রান করেন হিক। এক মৌসুমে সবচেয়ে কম বয়সে ২,০০০ রান পূর্ণ করার কীর্তি গড়েন তিনি। ১৯৮৭ সালে উইজডেন বর্ষসেরা ক্রিকেটারের শর্ট লিস্টেও জায়গা করে নেন তিনি। ১৯৮৭-৮৮ এবং ১৯৮৮-৮৯ মৌসুমে খেলেন নিউজিল্যান্ডের ঘরোয়া ক্লাব নর্দান ডিসট্রিক্টসের হয়ে। সেখানে দুই মৌসুমে তিনি ১০টি শতক হাঁকান।

বোলারদের উপর তাণ্ডব চালানোতেও তার বেশ নামডাক ছিল। অকল্যান্ডের বিপক্ষে একটি ম্যাচে শুধুমাত্র দিনের তৃতীয় সেশনে ১৭৩ রান করে বিশ্বরেকর্ড গড়েন। গ্রায়েম হিক ১৯৯১ সালে ইংল্যান্ড জাতীয় দলে ডাক পান। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলার আগেই প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে তার ৫৭টি সেঞ্চুরি ছিল। জাতীয় দলে সুযোগ পাওয়ার দুই মৌসুম আগে ৯০.৪৬ ব্যাটিং গড়ে ৪,০০০ এর বেশি রান করেন। জাতীয় দলে ডাক পাওয়ার আগেই তাকে নিয়ে অনেক মাতামাতি চলছিল ক্রিকেট পাড়ায়। জিম্বাবুয়ে থেকে এসে নিজের নতুন ঠিকানার হয়ে অভিষেক হওয়ার আগে নিজেকে নিয়ে গিয়েছিলেন অনন্য উচ্চতায়। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক হওয়ার পর প্রথম মৌসুমে ছিলেন নিষ্প্রভ। সেইবার মাত্র ৩২.৯১ ব্যাটিং গড় ছিল প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে।

গ্রায়েম হিক স্বভাবসুলভ স্টাইলে

টেস্ট ক্রিকেটে না পারলেও ওডিআইতে কিছুটা হলেও নিজের জাত চেনাতে পেরেছিলেন। ১৯৯২ সালের বিশ্বকাপে হাঁকিয়েছিলেন তিনটি অর্ধশতক। তারপর থেকে টেস্ট ক্রিকেটেও রান পাচ্ছিলেন। ক্যারিয়ারের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি করেন বোম্বেতে। বোম্বের ঐ ১৭৮ রানের ইনিংসটিই তার ক্যারিয়ার সেরা ইনিংস। টানা তিন-চার বছর কাউন্টি এবং আন্তর্জাতিক দু’জায়গায়তেই সন্তোষজনক গড়ে রান পেয়েছিলেন। এরপর ১৯৯৬ সালে আবারো ছন্দপতন। দল থেকে বাদ পড়েন বাজে ফর্মের কারণে। এরপর ১৯৯৭ সালে কাউন্টি ক্রিকেটে ট্রিপল সেঞ্চুরি হাঁকান হিক। ঐ মৌসুমে ৬৯ ব্যাটিং গড়ে ১,৫০০ এর বেশি রান করেন তিনি। কাউন্টিতে নিয়মিত রান পাওয়ার কারণে তাকে ইংল্যান্ড ওডিআই দলে ফিরিয়ে আনা হয়।

গ্রায়েম হিক তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে টেস্ট ক্রিকেটের চেয়ে ওডিআই ক্রিকেটে তুলনামূলক সফল ছিলেন। ৬৫টি টেস্টে ৩১.৩২ ব্যাটিং গড়ে ৩,৩৮৩ রান করেছেন ৬টি শতক এবং ১৮টি অর্ধশতকের সাহায্যে। বিপরীতে ১২০টি ওডিআইতে ৩৭.৩৩ ব্যাটিং গড়ে ৩,৮৪৬ রান করেছেন ৫টি শতক এবং ২৭টি অর্ধশতকের সাহায্যে। গ্রায়েম হিক ২০০১ সালে ইংল্যান্ডের হয় শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেন। ২০০২ মৌসুমে ইনজুরির কারণে মাঠের বাইরেই তাকে বেশি সময় কাটাতে হয়েছিল।

ব্যাটিংয়ের পাশাপাশি অফস্পিন বলও করতেন তিনি। কিন্তু ২০০১ সালের পর তাকে আর বল হাতে দেখা যায়নি। অফস্পিন করে টেস্ট ক্রিকেটে ২৩টি এবং ওডিআইতে ৩০টি উইকেট শিকার করেছিলেন। এছাড়া প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে ২৩২ উইকেট এবং লিস্ট-এ ক্রিকেটে ২২৫ উইকেট শিকার করেছেন। ব্যাটিং এবং বোলিংয়ের পাশাপাশি দুর্দান্ত স্লিপ ফিল্ডার ছিলেন তিনি। গ্রাহাম গুচ তার জীবনীতে গ্রায়েম হিককে অন্যতম সেরা স্লিপ ফিল্ডার হিসাবে আখ্যায়িত করেছিলেন। হিক দুই যুগের ক্রিকেট ক্যারিয়ারে খেলেছেন অসংখ্য ম্যাচ। প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে ৫২৬ ম্যাচে ৫২.২৩ ব্যাটিং গড়ে ৪১,১১২ রান করেছেন। ১৩৬টি শতক এবং ১৫৮টি অর্ধশতক আছে তার ক্যারিয়ারে।

দর্শকদের অভিনন্দনের জবাব দিচ্ছেন হিক

প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে সবচেয়ে বেশি শতক হাঁকানো ব্যাটসম্যানদের তালিকায় ৮ম স্থানে আছেন হিক। তার ৪০৫* রানের ইনিংসটি প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে ৯ম সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংস। সীমিত ওভারের ক্রিকেটেও তার কীর্তি ছিল অকল্পনীয়। ৬৫১টি লিস্ট-এ ম্যাচে ৪১.৩০ ব্যাটিং গড়ে করেছেন ২২,০৫৯ রান। ৪০টি শতক এবং ১৩৯টি অর্ধশতক আছে তার ক্যারিয়ারে। লিস্ট-এ ক্রিকেটে সর্বকালের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহকদের তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে অবস্থান করছেন হিক। ক্রিকেটের আধুনিক সংস্করণ টি-টুয়েন্টি ম্যাচেও রান পেয়েছেন তিনি। ২০০৮ সালে আইসিএলেও তাকে খেলতে দেখা যায়। ৩৭টি টি-টুয়েন্টি ম্যাচে হাঁকিয়েছেন দুটি শতক। ১৫৬.১৭ স্ট্রাইক রেটে করেছেন ১,২০১ রান। গ্রায়েম হিক ২০০৮ সালে সব ধরনের প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেট থেকে অবসরের ঘোষণা দেন।

গ্রাহাম অ্যালান গুচ

গ্রাহাম গুচ

গ্রাহাম গুচ এই শতকে আন্তর্জাতিক ম্যাচ না খেললেও নিজের শেষ প্রথম শ্রেণীর ম্যাচ খেলেছেন ২০০০ সালে। তাই গ্রায়েম হিক এবং মার্ক রামপ্রকাশের সাথে তার নামটিও এই শতকে শতকের শতক হাঁকানো ক্রিকেটারদের সাথে উচ্চারণ করা যায়। গুচ শুধুমাত্র প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে নন, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটেও তার সময়কার সেরা ব্যাটসম্যানদের একজন ছিলেন। ১৯৭৩ সালে গুচের প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে অভিষেক হয়। দুই বছর পর ইয়ান চ্যাপেলের নেতৃত্বে ইংল্যান্ড দলে অভিষেক ঘটে তার। ক্যারিয়ারের শুরুটা ছিল সাদামাটা। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে নিজের অভিষেক ম্যাচের দুই ইনিংসেই রানের খাতা খোলার আগে প্যাভিলিয়নে ফিরে যান। দুই ম্যাচ খেলার পরেই দল থেকে বাদ পড়েন। তারপর এসেক্সের হয়ে দুর্দান্ত ফর্মে থাকার কারণে ১৯৭৮ সালে পুনরায় দলে জায়গা করে নেন। দ্বিতীয় সুযোগটা ভালোভাবেই কাজে লাগিয়েছিলেন তিনি।

গ্রাহাম গুচ

১৯৮০ সালে উইজডেনের বর্ষসেরা ক্রিকেটার নির্বাচিত হন গ্রাহাম গুচ। সময়টা বেশ ভালো যাচ্ছিলো তার। কিন্তু ১৯৮২ সালে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নির্বাসনে থাকা সাউথ আফ্রিকায় খেলতে যান তিনি। সাউথ আফ্রিকান রেবেল ট্যুরে খেলতে যাওয়ার কারণে গুচকে তিন বছরের জন্য আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। ১৯৮৫ সালে আবারো ইংল্যান্ড জাতীয় দলে ডাক পান গ্রাহাম গুচ। এরপর দলের অনিবার্য সদস্যে পরিণত হন।

১৯৮৯-৯০ মৌসুমে তাকে ইংল্যান্ড দলের অধিনায়কের দায়িত্ব দেওয়া হয়। অধিনায়ক হিসাবেও তিনি বেশ সফল ছিলেন। ১৯৯০ সালে ভারত এবং নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে তিনি তার ক্যারিয়ারের সোনালি সময় কাটান। ভারতের বিপক্ষে লর্ডস টেস্টের প্রথম ইনিংসে করেন ৩৩৩ রান। যা এখন পর্যন্ত লর্ডস ক্রিকেট গ্রাউন্ডে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত রানের ইনিংস। একই টেস্টের দ্বিতীয় ইনিংসে ১২৩ রান করে এক টেস্টে ৪৫৬ রান করার বিশ্বরেকর্ড গড়েন।

গ্রাহাম গুচ ১৯৭৫ সাল থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত টেস্ট ক্রিকেটে ইংল্যান্ডের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করেন। ২০ বছরের টেস্ট ক্যারিয়ারে ১১৮ ম্যাচে ৪২.৫৮ ব্যাটিং গড়ে ২০টি শতক এবং ৪৬টি অর্ধশতকের সাহায্যে ৮,৯০০ রান করেছেন। মিডিয়াম পেস বল করে শিকার করেছেন ২৩ উইকেট। একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটেও তার সাফল্য উল্লেখযোগ্য। ১২৫ ম্যাচে প্রায় ৩৭ ব্যাটিং গড়ে ৪,২৯০ রান করেছেন ৮টি শতক এবং ২৩টি অর্ধশতকের সাহায্যে। বল হাতে তার ঝুলিতে জমা আছে ৩৬ জন ব্যাটসম্যানের উইকেট। ঘরোয়া ক্রিকেটে তার ক্যারিয়ার আরো সমৃদ্ধ। প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে শতকের শতক পূর্ণ করা গ্রাহাম গুচ লিস্ট-এ ক্রিকেটের সর্বকালের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক।

বল মাঠের বাইরে পাঠাচ্ছেন গ্রাহাম গুচ, তাকিয়ে দেখছেন বাকিরা

গুচের ১৯৭৩ সালে এসেক্সের হয়ে প্রথম শ্রেণী এবং লিস্ট-এ ক্রিকেটে অভিষেক ঘটে। ২৭ বছরের প্রথম শ্রেণীর ক্যারিয়ারের ইতি টানেন ২০০০ সালে। এর আগে ৫৮১ ম্যাচে ৪৯.০১ ব্যাটিং গড়ে করেছেন ৪৪,৮৪৬ রান। ১২৮টি শতক এবং ২১৭টি অর্ধশতক হাঁকিয়েছেন প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে। দলের প্রয়োজনে মিডিয়াম পেস বল করে শিকার করেছেন ২৪৬ উইকেট।

এ তো গেলো প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটের কীর্তি। কিন্তু তার লিস্ট-এ ক্রিকেটের কীর্তি আরো বেশি সমৃদ্ধ। যদিও লেখার মূল বিষয় এই শতকে শতকের শতক হাঁকানো ক্রিকেটারদের নিয়ে, তবুও তার লিস্ট-এ ক্যারিয়ারের পরিসংখ্যান না বললেই নয়। গ্রাহাম গুচ তার ক্যারিয়ারে ৬১৩টি লিস্ট-এ ম্যাচ খেলেছেন। তিনি দুই যুগ আগেও লিস্ট-এ ক্রিকেটের এক ম্যাচে ১৯৮* রানের ইনিংস খেলা কীর্তি গড়েছেন। তিনি ৬১৩ ম্যাচে ৪০.১৬ ব্যাটিং গড়ে ২২,২১১ রান করেছেন। লিস্ট-এ ক্রিকেটে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক তিনি। হাঁকিয়েছেন ৪৪টি শতক, এক্ষেত্রে তার উপরে আছেন শচীন টেন্ডুলকার। তার শতকের সংখ্যা ৫৯টি! গ্রায়েম হিকের সাথে ১৩৯টি অর্ধশতক নিয়ে যৌথভাবে লিস্ট-এ ক্রিকেটে সর্বোচ্চ অর্ধশতকের মালিক গ্রাহাম গুচ।

গ্রাহাম গুচ এখন

মার্ক র‍্যাভিন রামপ্রকাশ

মার্ক রামপ্রকাশ

মার্ক রামপ্রকাশের ক্রিকেট ক্যারিয়ারও গ্রায়েম হিকের মতোই। দুজনে মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। গ্রায়েম হিক এবং রামপ্রকাশের ১৯৯১ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে একই ম্যাচে অভিষেক ঘটে। এবং দুজনেই প্রায় একই সময়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে বিদায় জানিয়েছিলেন। প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে দুর্দান্ত ব্যাটিং করে জাতীয় দলে আসা গ্রায়েম হিক এবং রামপ্রকাশ দুজনেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ছিলেন প্রায় নিষ্প্রভ। মার্ক রামপ্রকাশ মাত্র ১৭ বছর বয়সে মিডলেসেক্সের হয়ে প্রথম শ্রেণীর ম্যাচ খেলেন। ১৯৮৯ সালে অনুর্ধ্ব-১৯ দলের অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করার পর মাত্র ২১ বছর বয়সে ১৯৯১ সালে ইংল্যান্ড জাতীয় দলে ডাক পান তিনি। কাউন্টি ক্রিকেটে প্রতি মৌসুমে রানের বন্যা বয়ে দেওয়ার পর জাতীয় দলে এসে নিজেকে হারিয়ে খুঁজতেন তিনি। তার ক্যারিয়ারও একই চক্রে ঘুরত।

মার্ক রামপ্রকাশ

১৯৯১ সালে অভিষেক হওয়ার পর বাজে পারফর্ম করে ১৯৯২ সালে দল থেকে বাদ পড়েন রামপ্রকাশ। তারপর কাউন্টিতে দুর্দান্ত পারফরমেন্স করে ১৯৯৩ সালের অ্যাশেজ দলে ডাক পান। তখনো দলে থিতু হতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত ১৯৯৮ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ১৫৪ রান করে পরবর্তী কয়েক বছরের জন্য দলে থিতু হন। কাউন্টি ক্রিকেটে যে রামপ্রকাশের দেখা মিলত সে রামপ্রকাশকে জাতীয় দলে খুঁজেই পাওয়া যেত না। তাই তো দলে জায়গা নিশ্চিত হবার পরেও ৫২টি টেস্টে ২৭.৩২ ব্যাটিং গড়ে ২,৩৫০ রান করেছেন। প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে ১১৪টি শতকের মালিক মার্ক রামপ্রকাশ আন্তর্জাতিক টেস্ট ক্রিকেটে ৫২টি টেস্টে মাত্র দুটি শতক হাঁকিয়েছেন। রামপ্রকাশ ইংল্যান্ডের হয়ে সর্বশেষ টেস্ট ম্যাচ খেলেছিলেন ২০০২ সালে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে। এর আগের বছরেই কাউন্টি ক্লাব মিডলেসেক্স ছেড়ে যোগ দেন সারিতে। সারিতে যোগ দেওয়ার পর রামপ্রকাশ আরো ভয়ংকর হয়ে উঠেন। ২০০৩ সালে নিজের পুরানো দল মিডলেসেক্সের বিপক্ষে শতক হাঁকিয়ে প্রথম ব্যাটসম্যান হিসাবে ১৮টি কাউন্টি দলের বিপক্ষে শতক হাঁকানোর অনন্য রেকর্ড গড়েন। ২০০৬ এবং ২০০৭ সাল কাটান স্বপ্নের মতো। এই দুই পঞ্জিকাবর্ষে তিনি দুই সহস্রাধিক করে রান করেন।

২০০৬ সালে মে মাসে গ্লৌচেস্টারশায়ারের বিপক্ষে ২৯২ রানের ইনিংস খেলে প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে নিজের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত রানের ইনিংস খেলেন রামপ্রকাশ। একই বছরের আগস্টে নর্থাম্পটনশায়ারের বিপক্ষে ৩০১* রানের ইনিংস খেলেন। ২০০৬ সালে মাত্র ২০ ইনিংসে দুই সহস্রাধিক রান করেন মার্ক রামপ্রকাশ। ঐ বছর ১০৩.৫৪ ব্যাটিং গড়ে ২,২৭৮ রান করেন তিনি। প্রথম ক্রিকেটার হিসাবে টানা ৫ ম্যাচে ইনিংসে ১৫০+ রান করার কীর্তিও গড়েন রামপ্রকাশ।

দর্শকদের অভিনন্দনের জবাব দিচ্ছেন রামপ্রকাশ

দুর্দান্ত ফর্মে থাকার পর এবং মার্কস ট্রেসকোথিক্সের ইনজুরি সমস্যায় দলে না থাকার কারণে কয়েকজন ধারাভাষ্যকার তাকে অ্যাশেজ দলে অন্তর্ভুক্তি করানোর জন্য পরামর্শ দিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত তার আর খেলা হয়নি। ২০০৬ সাল যেখানে শেষ করেছেন ২০০৭ সালে সেখান থেকেই শুরু করেছেন রামপ্রকাশ। এই পঞ্জিকাবর্ষে ১০১.৩০ ব্যাটিং গড়ে করেছিলেন ২,০২৬ রান। যার মধ্যে শতক ১০টি। ২০০৬ সালে উইজডেনের বর্ষসেরা ক্রিকেটারের সেরা ৫ জনের একজন হলেও ২০০৭ সালে উইজডেন বর্ষসেরা ক্রিকেটার নির্বাচিত হন তিনি।

মার্ক রামপ্রকাশ ২০০৮ সালের আগস্টের ২ তারিখে ইয়র্কশায়ারের বিপক্ষে শতকের মধ্য দিয়ে ২৫তম এবং শেষ ক্রিকেটার হিসাবে প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে শতকের শতক পূর্ণ করেন। ২০০৯ সালে ৯০ এর উপর গড়ে রান করার পর মিডিয়াতে আবারো আলোচনায় চলে আসেন মার্ক রামপ্রকাশ। তাকে অ্যাশেজ দলে রাখার জন্য অনেকেই পরামর্শ দেন। চল্লিশ বছরের মার্ক রামপ্রকাশকে দলে না রেখে শেষপর্যন্ত জনাথন ট্রটকে দলে নেওয়া হয়। মার্ক রামপ্রকাশের ২৫ বছরের প্রথম শ্রেণীর ক্যারিয়ার শেষ হয় ২০১২ সালের জুনে। কাউন্টি ক্রিকেটের অন্যতম সেরা এই ব্যাটসম্যান তার ক্যারিয়ারে ২০ বার এক মৌসুমে সহস্রাধিক এবং ৩ বার দুই সহস্রাধিক রান পূর্ণ করেছিলেন।

রামপ্রকাশ যখন কোচ

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিজের প্রতিভার সদ্ব্যবহার করতে পারেননি মার্ক রামপ্রকাশ। কিন্তু প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে তিনি কিংবদন্তি ক্রিকেটার হিসাবেই আখ্যায়িত হবেন। প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে ৪৬১ ম্যাচে ৫৩.১৪ ব্যাটিং গড়ে ৩৫,৬৫৯ রান করেছেন ১১৪টি শতক এবং ১৪৭টি অর্ধশতকের সাহায্যে। লিস্ট-এ ক্রিকেটেও রানের মধ্যে ছিলেন তিনি।  ৪০৭ ম্যাচে ৪০.২২ ব্যাটিং গড়ে তিনি করেছেন ১৩,২৭৩ রান।

একসাথে মার্ক রামপ্রকাশ ও গ্রায়েম হিক

মার্ক রামপ্রকাশ, গ্রাহাম গুচ এবং গ্রায়েম হিক তিনজনেই নিজেদের বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ার শেষে অস্ট্রেলিয়া এবং ইংল্যান্ডের ব্যাটিং কোচ হিসাবে নিযুক্ত ছিলেন। ব্যবসা বাণিজ্যে ভরপুর ক্রিকেটের মডার্ন যুগে আর কোনো ক্রিকেটার শতকের শতক হাঁকাতে পারেন কিনা সেটা বলা মুশকিল। এই তিন ক্রিকেটারসহ ২৫ জন ক্রিকেটারের নাম ঠিকই মনে রাখবে ক্রিকেট বিশ্ব।

তথ্যসূত্র

১. espncricinfo.com/ci/content/player/19323.html

২. en.wikipedia.org/wiki/Mark_Ramprakash

৩. espncricinfo.com/ci/content/player/14187.html

৪. en.wikipedia.org/wiki/Graham_Gooch

৫. en.wikipedia.org/wiki/Graeme_Hick

৬. espncricinfo.com/ci/content/player/13399.html