ভার্নন ফিল্যান্ডার: ব্যর্থতার এপিটাফ মুছে সফলদের কাতারে

আপনার দলে মূল ফাস্ট বোলার তিনজন। প্রথমজন ডেল স্টেইন, তিনি একজন কমপ্লিট ফাস্ট বোলারের মতোই নিয়মিত বাইশ গজে হুংকার তুলছেন। দ্বিতীয়জন হালের কাগিসো রাবাদা, তাকে দেখছেন ফাস্ট বোলারের সহজাত আগ্রাসী মনোভাব দিয়ে প্রতিপক্ষকে দুমড়ে-মুচড়ে দিচ্ছেন। কিন্তু আরেকজন? পরিচিত সবুজাভ উইকেট আর বলের লাইন লেংথের উপর সহজাত নিয়ন্ত্রণ, সাথে অসাধারণ অ্যাকুরেসি এবং নতুন বলে উভয় দিকে সুইং করানোর ক্ষমতা দিয়ে ব্যাটসম্যানের নাভিশ্বাস তুলে ছাড়ছেন।

নাহ, যতই স্যুগারকোটিং করা হোক না কেন, ঠিক যেন আগের দু’জনের মতো আকর্ষণীয় ঠেকছে না। সেটা ছিলেন না বলেই হয়তো এতটা ‘সেলেব্রেটেড’ ফাস্ট বোলারও ছিলেন না, কিন্তু ছিলেন দুর্দান্ত রকমের কার্যকর। ছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকার বিখ্যাত পেসত্রয়ীর একজন। তিনি ভার্নন ড্যারিল ফিল্যান্ডার। 

আন্তর্জাতিক অঙ্গনের মহাসাগরে এসে খাবি খেয়েছেন, এমন ক্রিকেটারের সংখ্যাটা অগণিত। ক্যারিয়ারের শুরুতে ভার্নন ফিল্যান্ডার ছিলেন সেই ক্যাটেগরিরই একজন। যদিও তার শুরুটা ঠিক সেই কথা বলে না। নিজের বাইশতম জন্মদিনে ২০০৭ সালে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে ওয়ানডে অভিষেক ঘটে। বেলফাস্টে সেদিন ক্যারিয়ারের দুর্দান্ত শুরু দিয়ে – ম্যাচটা শেষ করেছিলেন ক্যারিয়ারসেরা বোলিং ফিগার নিয়ে (৫.৫-১-১২-৪)। সেই শুরু দিয়ে জায়গা করে নিয়েছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকার ২০০৭ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের দলে। সেখানেও শুরুটা একদম খারাপ হলো না, ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ৪ ওভারে ৩৫ রানে ২ উইকেট নিয়ে শুরু করলেন। পরের ম্যাচে বাংলাদেশের বিপক্ষেও নিলেন দুইটি উইকেট।

ব্যস, মধুচন্দ্রিমা কেটে এবার শুরু হলো ভার্ননের ক্যারিয়ারের কিঞ্চিৎ বিভীষিকার। ম্যাচের পর ম্যাচ খেলে চলেছেন, উইকেটের দেখা আর মেলে না। অগত্যা ২০০৮ সালের মাঝামাঝি দল থেকেই বাদ পড়লেন। এরপর দ্বিতীয়বার দলে ফিরতে সময় লেগেছিল সাড়ে তিন বছর।

Image Credit: Hamish Blair/Getty Images

সেই ফেরা দিয়ে টেস্ট ক্রিকেটে তিনি আলোড়ন তুলেছিলেন। ‘কেইপ কোবরাস’-এর হয়ে ঘরোয়া ক্রিকেটে প্রথম থেকেই তিনি তৈরি হয়েছিলেন সেই বনেদি টেস্ট ফরম্যাটের জন্য। একটা ‘ভুল’ ফরম্যাট দিয়ে তার আগমন ঘটানো হয়েছিল, যেটা কি না ক্যারিয়ার শুরুর এক বছরের মাথায় দল থেকে ছিটকে দিয়েছিল ফিল্যান্ডারকে। কেন ‘ভুল ফরম্যাট’ বলা হচ্ছে? দল থেকে বাদ পড়ার পর ভার্ননের ক্যারিয়ারের প্রথম মেন্টর এবং টাইজারবার্গ ক্রিকেট একাডেমির চেয়ারম্যান হ্যান্স অ্যাডামসের কথাটাই তুলে ধরা যাক,

‘এটা আমাকে মোটেও অবাক করে না। আমি অনুভব করেছি, তারা তাকে (ফিল্যান্ডার) ভুল ফরম্যাটের দিকে ঠেলে দিয়েছে। ভার্ননের খেলার শুরু থেকেই আমি তাকে লঙ্গার ভার্সনের জন্য দেখতে চেয়েছিলাম, এবং টেস্ট ক্রিকেটই তার খেলার জন্য সেরা ফরম্যাট।’

তবে সব পেছনে ফেলে ফিল্যান্ডার পেরেছেন নিজের ‘লেগ্যাসি’ রেখে যেতে।

দক্ষিণ আফ্রিকা অনূর্ধ্ব-১৯ দলের হয়ে ফিল্যান্ডারের প্রথম বিদেশ যাত্রা ছিল ইংল্যান্ড, সালটা ২০০৩। পরের বছর এসেছিলেন বাংলাদেশে। উপলক্ষ, ২০০৪ অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ। ‘কেইপ কোবরাস’-এর হয়ে ২০০৬-০৭ সিজনে ব্যাটে-বলে অসাধারণ পারফরম্যান্স দিয়ে নজর কেড়ে জায়গা করে নেন জাতীয় দলে। 

শুরুতে লেখা দেখে, যতটা মসৃণ মনে হচ্ছে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পর্দাপনের গল্পটা ঠিক ততটা মসৃণ ছিল না ভার্নন ফিল্যান্ডারের জন্য। দক্ষিণ আফ্রিকার নিম্ন আয়ের অঞ্চল কেইপ ফ্ল্যাটসের র‍্যাভেন্সমিডে ভার্ননের বেড়ে ওঠা। জাতীয় দলে সুযোগ পাওয়ার পরও র‍্যাভেন্সমিডে ঠিক কীরকম অবস্থার মধ্যে ছিলেন, সেটা বোঝার জন্য বয়সভিত্তিক দলে ফিল্যান্ডারের আরেক মেন্টর এবং ওয়েস্টার্ন প্রভিনেন্স টিমের ম্যানেজার নাবিল ডিয়েনের কথাটায় চোখ বুলানো যাক,

“If you went to the place [Ravensmead], you may find it hard to understand that a national cricketer is living there but he stuck it out there for a long time because he felt a responsibility.”

ক্যারিয়ারের প্রথম শুরু আবার পুনরোজ্জীবন পেয়ে স্বপ্নের যাত্রায় তখন অবধি মা আর ছোট তিন ভাই সহ ছিলেন দাদা-দাদির বাড়ি 7de Laan-এ। ‘লাকি সেভেন’ শব্দদ্বয়ের সাথে তার আরো একটা লাকি যোগসূত্র রয়েছে। ক্যারিয়ারের প্রথম সাত টেস্টেই শিকার করেছিলেন ৫০ উইকেট – যেটি টেস্ট ক্রিকেটে যৌথভাবে দ্বিতীয় দ্রুততম ৫০ উইকেট। ‘7de Laan’ থেকে খেলাটা যখন শুরু করেন, বয়স সবে আট। সেখান থেকেই খেলেছেন বয়সভিত্তিক ক্রিকেট এবং দক্ষিণ আফ্রিকা অনূর্ধ্ব-১৯ দলের হয়ে।

অভিষেকের এক বছরের মাথায় বাদ পড়ার পর খারাপ সময়ের সংগ্রাম চালিয়েছেন সেখান থেকে। টেস্ট অভিষেকের সিরিজে ঘরের মাঠে যখন অজিদের ধ্বংস করছেন, তখনও ‘7de Laan’-এ থাকছেন ভার্নন। ‘7de Laan’-এর সাথে ভার্ননের রয়েছে আত্মার সম্পর্ক!

ফিল্যান্ডারের ক্রিকেটার হওয়ার একদম শুরুর দিকে দৃষ্টিপাত করা যাক। ভার্নন ফিল্যান্ডারকে র‍্যাভেন্সমিডের রাস্তায় প্রথম বল করতে দেখেন দক্ষিণ আফ্রিকার ঘরোয়া ক্রিকেটের পরিচিত মুখ মিডিয়াম ফাস্ট বোলার এবং তখনকার টাইজারবার্গ ক্রিকেট একাডেমির খেলোয়াড় আলফন্সো থমাস। তিনিই প্রথম ক্লাবের চেয়ারম্যান হ্যান্স অ্যাডামসের সাথে ভার্ননের সাক্ষাৎ করিয়ে দেন। ফিল্যান্ডারের ক্যারিয়ার গড়ে উঠার পেছনে যেই ক’জনের অবদান ছিল, অ্যাডামস তাদের মধ্যে অন্যতম। 

২০০৯-২০১০ এবং ২০১০-২০১১ দুই মৌসুমে কেইপ কোবরাসের হয়ে ৮০ উইকেট নিয়ে পুনরায় জায়গা করে নেন জাতীয় দলে। তবে এবার ওয়ানডে নয়, নিজের পরিচিত টেস্ট ফরম্যাটে। নভেম্বর ২০১১, অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্ট অভিষেক। যে ফরম্যাট তাকে খেলাটার একজন তারকা তকমা দিয়েছে। যে ফরম্যাট তাকে টেস্ট ক্রিকেটে নতুন বলে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর এবং একটা সময় দক্ষিণ আফ্রিকার বিধ্বংসী বোলিং লাইনআপের নেতা বানিয়েছে। 

শুরুটা এবার রাঙিয়ে তুললেন অন্য মাত্রায়। প্রথম টেস্টের দ্বিতীয় ইনিংসে পাঁচ উইকেট নিয়ে একাই ধ্বসিয়ে দেন শক্তিশালী অস্ট্রেলিয়ান ব্যাটিং লাইনআপকে। একটা সময় অজিদের স্কোর ছিল ২১ রানে ৯ উইকেট। হুমকি দিচ্ছিল ১৯৫৪-৫৫ মৌসুমে অকল্যান্ডে নিউ জিল্যান্ডের ২৬ রানের সর্বনিম্ন স্কোরের রেকর্ড ভেঙে ফেলার। শেষ পর্যন্ত নাথান লায়ন এবং পিটার সিডলের কল্যাণে অজিরা থামে ৪৭ রানে। ১৯০২ সালের পর টেস্টের কোনো ইনিংসে অজিদের সর্বনিম্ন স্কোর। ফিল্যান্ডারের বোলিং ফিগারটা ছিল এরকম: ৭-৩-১৫-৫। দুই ইনিংস মিলিয়ে ফিল্যান্ডারের বোলিং ফিগার দাঁড়ায় ২৬-৬-৭৮-৮!

Image Credit: AFP

অভিষেক টেস্টে ম্যাচসেরা হয়ে আরো একবার বিশ্বকে নিজের আগমনী বার্তা দেন ফিল্যান্ডার। দুই টেস্টের সিরিজে দুইবার পাঁচ উইকেটসহ ১৩.৯২ গড়ে চৌদ্দ উইকেট শিকার করে হয়েছিলেন সিরিজসেরা। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিজের দ্বিতীয় শুরু এবং অভিষেক টেস্ট সিরিজ এতটুকু বোধহয় ফিল্যান্ডার নিজেও আশা করেননি! 

এক মাস পরে ঘরের মাঠে নিজের তৃতীয় টেস্টে সফরকারী শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে প্রথম টেস্টের দুই ইনিংসেই নেন পাঁচ উইকেট করে, যেটার মাধ্যমে বিশ্বের মাত্র পঞ্চম বোলার হিসেবে ব্যক্তিগত প্রথম তিন টেস্টেই পাঁচ উইকেট নেওয়ার রেকর্ড গড়েন ফিল্যান্ডার। এর মাধ্যমে টেস্টে প্রথমবার দশ উইকেটের দেখাও পান ফিল্যান্ডার।

দ্বিতীয় টেস্ট মিস করেন ফিল্যান্ডার। কেপটাউনে তৃতীয় টেস্টে ফিরে দুই ইনিংসে তিন উইকেট করে নেন ছয় উইকেট, তাতে খরচ করেন ১০০ রান। ১-১ সমতার সিরিজ দক্ষিণ আফ্রিকা জিতে নেয় ২-১ ব্যবধানে।

জানুয়ারি, ২০১২। পারফরম্যান্সের ধারাবাহিকতায় প্রথমবারের মতো ক্রিকেট দক্ষিণ আফ্রিকার জাতীয় চুক্তির আওতায় আসেন ফিল্যান্ডার।

মার্চ, ২০১২। নিউ জিল্যান্ডের বিপক্ষে ডানেডিনে প্রথম টেস্টে আবারও পাঁচ উইকেটের দেখা পান ফিল্যান্ডার, যদিও প্রথম টেস্ট ড্র হয়। হ্যামিল্টনে দ্বিতীয় টেস্টে ক্যারিয়ারে দ্বিতীয়বার দশ উইকেট নেন ফিল্যান্ডার। দুই ইনিংসে বোলিং ফিগার যথাক্রমে ৪-৭০ ও ৬-৪৪। ওয়েলিংটনে তৃতীয় টেস্টের প্রথম ইনিংসে ৮১ রান খরচায় শিকার করেন ছয় উইকেট। ডগ ব্রেসওয়েলের উইকেটের মাধ্যমে মাত্র সপ্তম টেস্টে যৌথভাবে বিশ্বের দ্বিতীয় দ্রুততম বোলার হিসেবে অভিষেকের ১৩৯ দিনের মাথায় ৫০ উইকেট নেওয়ার আরেকটি রেকর্ড নিজের ঝুলিতে জমা করেন। 

উপরে শুধু একটা নাম, চার্লি টার্নার – যিনি ছয় টেস্টে ৫০ উইকেট নিয়েছিলেন। সাত টেস্ট শেষে ফিল্যান্ডারের ক্যারিয়ার দাঁড়ায় ১৪.১৫ গড়ে ৫১ উইকেট – স্ট্রাইকরেটটাও দুর্দান্ত, ২৬.৭। ইনিংসে ছয়বার পাঁচ উইকেট এবং দু’বার দশ উইকেট! নাহ, চোখ কচলে কোনো লাভ নেই, সংখ্যাগুলো এমনই! 

জুলাই, ২০১২ – প্রতিপক্ষ এবার ইংল্যান্ড। দক্ষিণ আফ্রিকা খেলবে ইংলিশদের ঘরের মাঠে। তিন টেস্টের সিরিজ – প্রথম দুই টেস্টে ফিল্যান্ডার আশানুরূপ পারফর্ম করতে পারেননি। প্রথম দুই টেস্টে উইকেট নিতে পারেন সাকুল্যে পাঁচটি। দুই ম্যাচ শেষে দক্ষিণ আফ্রিকা সিরিজে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে।

লর্ডসে তৃতীয় টেস্ট, জেমস অ্যান্ডারসনের সুইং আর স্টিফেন ফিনের বাউন্সারে কুপোকাত দক্ষিণ আফ্রিকার স্কোর ছিল এক পর্যায়ে ১৬৩ রানে ছয় উইকেট। সেখান থেকে ৯১ বলে ফিল্যান্ডার খেলেন ৬৩ রানের দুদান্ত এক ইনিংস। দক্ষিণ আফ্রিকা থামে ৩০৯ রানে। স্টেইন আর মরকেল দু’জন চারটি করে উইকেট এবং সাথে ফিল্যান্ডারের দুই উইকেটে ইংল্যান্ড থামে ৩১৫ রানে। দ্বিতীয় ইনিংসে আবারও ব্যাট হাতে খেলেন ৬৫ বলের ৩৫ রানের সময়োপযোগী একটি ইনিংস। ইংল্যান্ডের সামনে টার্গেট ৩৪৬ রানের।

নতুন বল হাতে নিয়ে ফিল্যান্ডার যেন ইংলিশ ব্যাটসম্যানদের চোখেমুখে শর্ষে ফুল দেখাচ্ছেন। সুইং এবং সুইংয়ের দুর্দান্ত প্রদর্শনীতে প্রথম চার উইকেটের তিনটিতেই ফিল্যান্ডারের নাম। তারপরও ৮ উইকেটে ২৮২ রান নিয়ে ম্যাচে তখনও টিকে ছিল ইংলিশরা। পঞ্চম দিনের শেষ সেশনের ৮২ ওভার শেষে ক্রিকইনফো’র কমেন্ট্রি দেখাচ্ছে, 

Philander to snake in menacingly from the Nursery End. He started all this last night … can he finish it now?

৮৩তম ওভারে বল হাতে ফিল্যান্ডারের প্রথম দুই বলে সেই মুহূর্ত এলো না। তৃতীয় বলের আগে ক্রিকইনফো’র কমেন্ট্রি, 

“A pair of balls will do it for SA, wouldn’t it?!” Are you talking about deliveries or character, CricFan?

চতুর্থ বলে ইংলিশদের আশার সারথি ম্যাট প্রায়রকে স্লিপে অধিনায়ক স্মিথের ক্যাচ বানিয়ে নবম উইকেটের পতন ঘটান। উইকেট পতনের পর ক্রিকইনফো’র কমেন্ট্রি ছিল, 

Majestic stuff from Philander. Finn to the wicket – can Vernon claim his five-for?

ক্যারিয়ারজুড়েই তো ফিল্যান্ডার হাতে জাদুমন্ত্র নিয়ে নামতেন প্রতিপক্ষকে ধ্বংস করে দিতে। সেটারই ধারাবাহিকতায় পঞ্চম বলে স্টিফেন ফিনকে জ্যাক ক্যালিসের হাতে ক্যাচ দিতে বাধ্য করে ফিল্যান্ডার ম্যাচের শেষ মন্ত্র পাঠ করিয়ে দিলেন। দক্ষিণ আফ্রিকা সিরিজ জিতে নেয় ২-০ ব্যবধানে। ইনিংসে পাঁচ উইকেট নিয়ে ফিল্যান্ডার ম্যান অফ ম্যাচ নির্বাচিত হন। ফিল্যান্ডারের টেস্ট ক্যারিয়ারের একটা প্রতীকী চিত্রই যেন ফুটে ওঠে লর্ডস টেস্টে!

Image Credit: Mike Hewitt/Getty Images

জানুয়ারি, ২০১৩। ঘরের মাঠে কেপটাউনে নিউ জিল্যান্ডের ফিরতি সফরে প্রথম টেস্টের প্রথম ইনিংসে ছয় ওভারের স্পেলে মাত্র সাত রান খরচে শিকার করেন পাঁচ উইকেট – নিউ জিল্যান্ড অলআউট হয় ৪৫ রানে। টেস্ট ক্রিকেটের সহস্রাব্দ বছরের ইতিহাসে সর্বনিম্ন স্কোর!

ফেব্রুয়ারি, ২০১৩। এবার পাকিস্তানের পালা। প্রথম টেস্ট, জোহানেসবার্গে সেই ম্যাচে স্টেইন এবং ফিল্যান্ডার তোপে পাকিস্তান অলআউট হয় ৪৯ রানে। এ নিয়ে ছয় মাসের ব্যবধানে তিনবার প্রতিপক্ষকে পঞ্চাশের নিচে অলআউট করে দক্ষিণ আফ্রিকা। উভয় ইনিংসে দুইয়ে দুইয়ে মাত্র চার উইকেট নিতে পারলেও ফিল্যান্ডারের ইকোনমি ছিল অসাধারণ, দুই ইনিংসে যথাক্রমে ১.৭৭ এবং ২.৭২! কেপটাউনে দ্বিতীয় টেস্টে তিনি আরো দুর্দান্ত। দুই ইনিংসে শিকার করেন যথাক্রমে ৫/৫৯ এবং ৪/৪০। সেঞ্চুরিয়নে শেষ টেস্টে মাত্র দুই উইকেট পেলেও ব্যাট হাতে করেন ১১৩ বলে ৭৪ রান।

মে, ২০১৩। আইসিসি র‍্যাঙ্কিংয়ের দ্বিতীয় সেরা টেস্ট বোলার এবং তৃতীয় সেরা অলরাউন্ডারের নামটা দেখাচ্ছে ভার্নন ফিল্যান্ডার! 

Image Credit: Daniel Kalisz/Getty Images

ডিসেম্বর, ২০১৩। জোহেনাসবার্গে ভারতের বিপক্ষে প্রথম টেস্ট। ফিল্যান্ডারের ১৯তম টেস্টে যৌথভাবে বিশ্বের চতুর্থ এবং দ্রুততম দক্ষিণ আফ্রিকান বোলার হিসেবে টেস্টে একশ উইকেট নেওয়ার আরেকটি রেকর্ডে ভাগ বসান। একই দিন দলের বিপর্যয়ের মুখে আট নাম্বারে নেমে ৮৫ বলে ৫৯ রানের কার্যকরী একটি ইনিংস খেলে নিজের অলরাউন্ডার সত্ত্বার একটা ঝলক দেখান। দারুণ পারফরম্যান্সে একই বছর প্রথমবারের মতো উঠে আসেন আইসিসির টেস্ট বোলিং র‍্যাঙ্কিংয়ের এক নাম্বারে।

সফলতার সাথে লাল বলের ফরম্যাটেও ব্যর্থতা দেখেছেন ফিল্যান্ডার। যখনই নিজের পরিচিত সবুজাভ উইকেট পাননি, তাকে রীতিমতো যুঝতে হয়েছে নিজেকে মানিয়ে নিতে; সাথে ইনজুরির থাবা তো ছিলই। তবুও ২০১৬ সালে অস্ট্রেলিয়াকে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ২-১ ব্যবধানে সিরিজ হারানোয় রেখেছেন মুখ্য ভূমিকা। তিন টেস্টের সিরিজে একবার পাঁচ উইকেটসহ নিয়েছেন চৌদ্দ উইকেট। দ্বিতীয় টেস্টে হোবার্টে সেই বিখ্যাত স্পেল, তাতে সকালের সেশনেই স্বাগতিক অজি ব্যাটিং লাইনআপকে ধ্বসিয়ে দেন মাত্র ৮৫ রানে। ঘরের মাঠে ৩২ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন স্কোরে আটকা পড়ে অজিরা। ফিল্যান্ডার নিয়েছিলেন ২১ রান খরচে পাঁচ উইকেট। 

ফিল্যান্ডার-স্টেইন-মরকেল সমৃদ্ধ দক্ষিণ আফ্রিকা বোলিং লাইনআপ কতটা বিধ্বংসী ছিল, ফিল্যান্ডারের পরিসংখ্যান সেটারই একটা ঝলক মাত্র। ফিল্যান্ডারের নামটা সচেতনভাবেই প্রথমে রাখা। ফিল্যান্ডারের শুরু থেকে শেষ – নভেম্বর ২০১১ থেকে জানুয়ারি ২০২০, এই সময়ে ৬৪ টেস্টে ফিল্যান্ডার নিয়েছেন ২২৪ উইকেট, বোলিং গড় ২২.৩২। নতুন বলে ফিল্যান্ডারের সঙ্গী ডেল স্টেইন এই সময়ে ৪৭ টেস্টে নিয়েছেন ২০১ উইকেট, বোলিং গড় ২২.৬৪। ঠিক পরের নামটা পেসত্রয়ীর আরেকজন, মরনে মরকেল। তিনি ৫৫ টেস্টে নিয়েছেন ১৯৬ উইকেট, বোলিং গড় ২৬.১৯।

নতুন বলের সঙ্গী ডেল স্টেইনের সাথে 
Image Credit: AFP

নয় বছরের টেস্ট ক্যারিয়ারে নতুন বলে উভয় দিকে সুইং, লেট মুভমেন্ট আর শর্ট অফ অ্যা গুড লেংথ ডেলিভারিতে ব্যাটসম্যানকে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ফেলে ৬৪ ম্যাচে ২২.৩২ গড়ে শিকার করেছেন ২২৪ উইকেট, আগেই বলেছি। সেই ভার্নন ফিল্যান্ডারের নিজের শেষ টেস্টে নতুন বলের স্পেল স্থায়িত্ব পায় মাত্র নয় বল। তারপরই হ্যামস্ট্রিংয়ের ব্যথায় কাতরাতে কাতরাতে বেরিয়ে যাওয়া। শরীরও যেন বলে দিল,

I’m done for the day, done for the Test, and done for your time at the top.

ক্যারিয়ারের এই শেষ সিরিজে খারাপ সময়ের বৃত্তে বন্দী দক্ষিণ আফ্রিকার মতো ফিল্যান্ডারও ছিলেন নিজের ছায়া হয়ে। নিজের শেষ সিরিজে উইকেট নিতে পারেন সাকুল্যে নয়টি। ঘরের মাঠে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে  চার ম্যাচের টেস্ট সিরিজ দক্ষিণ আফ্রিকাও হারে ৩-১ ব্যবধানে। ১৯১৩-১৪ মৌসুমের পর ইংল্যান্ডের প্রথম কোনো দল দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে তিনটি টেস্ট জিতে যায়। ক্যারিয়ারজুড়েই মুড়িমুড়কির মতো উইকেট নেয়া ফিল্যান্ডার নিজের শেষ ইনিংসে ইনজুরির থাবায় পড়ে কি না নয় বল করে থাকলেন উইকেটশূন্য! বোলিং ফিগারটা: ১.৩-১-১-০।

Image Credit: Getty Images

বিদায়ের পর দক্ষিণ আফ্রিকার চিরন্তন আক্ষেপের ‘কোলপাক’ চুক্তিতে ফিল্যান্ডার খেলবেন কাউন্টি ক্লাব সমারসেটের হয়ে। এই ‘কোলপাক’ চুক্তির কবলে দক্ষিণ আফ্রিকা হারিয়েছে অনেক অসাধারণ খেলোয়াড়, যেমন হালের কাইল অ্যাবোট, ডুয়ান অলিভিয়ের। কিন্তু ফিল্যান্ডারের কোলপাক চুক্তিতে প্রোটিয়া ফ্যানরা মনে শান্তি নিয়ে অন্তত বলতে পারবে,

‘Sixty-four matches across nine years have gifted 224 wickets, while the lowly average of 22.32 outdoes his great partner-in-crime Dale Steyn’s 22.95. This goodbye doesn’t feel premature.’ 

২০০৮ সালে যেবার দল থেকে বাদ পড়লেন, তখন পর্যন্ত ফিল্যান্ডার নামটা বলতেই চোখের সামনে ভেসে উঠতো ২০০৭ বিশ্বকাপে রবিন উথাপ্পার ক্যাচ মিস, বাদ পড়ার সেই সিরিজের প্রথম ওয়ানডেতে ম্যাট প্রায়রের সহজ ক্যাচ মিস। হয়তো এই লেখাটির নামটাও হতে পারতো ‘মুখে চুইংগাম, ক্যাচ মিস; র‍্যাভেন্সমিড থেকে উঠে আসা গড়পড়তা এক ক্রিকেটার’। হয়তো লেখারই প্রয়োজন বোধ করতেন না কেউ। সেটা হতে দিলেন না ফিল্যান্ডার, পরবর্তী গল্পটা সাজালেন নিজের মতো করে!

কথায় আছে, ‘When life gives you lemon, make a lemonade out of it’। ফিল্যান্ডার লেমনেড করতে পেরেছিলেন। গড়পড়তা ক্রিকেটার না হয়ে ফিল্যান্ডার পাখি হয়ে উন্মুক্ত আকাশে উড়তে চেয়েছিলেন। প্রথম দফায় ধাক্কা খেয়েও যদি ফিল্যান্ডার সফলতার মুখ খুঁজে নিতে পারেন, দিনশেষে আপনিও থাকবেন সফলদের কাতারে!

This article is in Bangla language. It is about Vernon Philander, a South African former international cricketer.

Featured Image: LAKRUWAN WANNIARACHCHI/AFP/Getty Images

Related Articles