ওয়াসিম আকরাম নাকি গ্লেন ম্যাকগ্রা: ওয়ানডের সেরা বোলার কে?

দু’জন খেলোয়াড়ের তুলনা করাটা বিভিন্ন কারণেই বেশ কঠিন। সিদ্ধান্তে পৌঁছানোটা আরো কঠিন। তুলনার সময় বিভিন্ন ফ্যাক্ট কাজ করে। কোনো বোলার হয়তো পাওয়ার প্লে’তে বল করলেন, আর কোনো বোলার হয়তো ৩ উইকেট পড়ে যাবার পর বল করতে এলেন… দুইজনের প্রেক্ষাপট একই হবে না। প্রথম ক্ষেত্রে ব্যাটসম্যান রানের গতি বাড়াতে চাইবেন, দ্বিতীয় ক্ষেত্রে ব্যাটসম্যান উইকেট ধরে খেলতে চাইবেন। সত্তরের দশকের বোলারদের চেয়ে বর্তমান বোলাররা সুবিধা অনেক কম পায়, সেটাও মাথায় রাখতে হবে। তবে এর পরও সব ফ্যাক্টর বিবেচনা করে মানুষ একটা সমাধানে আসার চেষ্টা করে।

অবশ্য ওয়াসিম আর ম্যাকগ্রার তুলনাটা সেই বিচারে কিছুটা সহজ হওয়ার কথা। কারণ দু’জনের ক্ষেত্রেই কিছু ফ্যাক্টর এক। দুজনেই ওপেনিং বোলার, দু’জনেই প্রায় একই সময়ে ক্যারিয়ারের অনেকটা পার করেছেন, দু’জনের সময়ে ক্রিকেটীয় নিয়মও মোটামুটি একই ছিল।

টেস্ট ক্রিকেটের তুলনায় ওয়ানডে ক্রিকেটে সুযোগ থাকে অনেক কম; Image Source: Cricket Australia

আরেকটা বিষয় হচ্ছে, টেস্ট ক্রিকেটে একজন বোলার অনেকগুলো ওভার করার সুযোগ পায়, কিন্তু ৫০ ওভারের ওয়ানডে ক্রিকেটে একজন বোলার সর্বোচ্চ দশ ওভার বল করার সুযোগ পান। কাজেই ওয়ানডে ক্রিকেটে একজন বোলারকে সীমিত সুযোগের সর্বোচ্চ ব্যবহারটা নিশ্চিত করতে হয়। 

পরিসংখ্যান সবসময় সত্য বলে না বটে, তবে পরিসংখ্যান এমন একটা জিনিস যেটাকে আপনি চাইলেও উপেক্ষা করতে পারবেন না। পারফরম্যান্স বিশ্লেষণ করার আগে প্রথমে তাই দু’জনের পরিসংখ্যানের দিকে একটু চোখ বুলিয়ে নেওয়া যাক।

  • ওয়ানডেতে ম্যাকগ্রার ২৫০ ম্যাচে ২২.০২ গড় আর ৩.৮৮ ইকোনমিতে উইকেট ৩৮১টি। ম্যাচে চারটির বেশি উইকেট পেয়েছেন ১৬ বার, ম্যাচপ্রতি উইকেট ১.৫২। অন্যদিকে ওয়াসিম ৩৫৬ ম্যাচে ২৩.৫২ গড় আর ৩.৮৯ ইকোনমিতে উইকেট পেয়েছেন ৫০২টি। ম্যাচে চারটির বেশি উইকেট পেয়েছেন ২৩ বার, ম্যাচপ্রতি উইকেট ১.৪১।

  • শুধুমাত্র ফাইনাল ম্যাচ হিসেব করলে ম্যাকগ্রার ২৭ ম্যাচে ১৬.৪৩ গড় আর ৩.৯২ ইকোনমিতে উইকেট ৫৫ টি। ম্যাচে চারটির বেশি উইকেট পেয়েছেন ৪ বার, ম্যাচপ্রতি উইকেট ২.০৩। অন্যদিকে ওয়াসিম ৩৬ ম্যাচে ২৪.১৮ গড় আর ৩.৭৭ ইকোনমিতে উইকেট পেয়েছেন ৪৯টি। ম্যাচে চারটির বেশি উইকেট পেয়েছেন ১ বার, ম্যাচপ্রতি উইকেট ১.৩৬।

  • জয় পাওয়া ১৭১টি ম্যাচে ম্যাকগ্রা ১৭.৯৪ গড় আর ৩.৬৫ ইকোনমিতে ৩০১টি উইকেট। ম্যাচে চারটির বেশি উইকেট পেয়েছেন ১৫ বার। অন্যদিকে জয় পাওয়া ওয়াসিম ১৯৯টি ম্যাচে ১৮.৮৬ গড় আর ৩.৭০ ইকোনমিতে ৩২৬ উইকেট। ম্যাচে চারটির বেশি উইকেট পেয়েছেন ১৮ বার।

ওয়াসিম আর ম্যাকগ্রার কিছু তুলনামূলক পরিসংখ্যান; Image Credit: Rasel Ahmed
  • বিশ্বকাপে ম্যাকগ্রার ৩৯ ম্যাচে ১৮.১৯ গড় আর ৩.৯৬ ইকোনমিতে উইকেট ৭১টি। ম্যাচে চারটির বেশি উইকেট পেয়েছেন ২ বার, ম্যাচপ্রতি উইকেট ১.৮২। অন্যদিকে, ওয়াসিম ৩৮ ম্যাচে ২৩.৮৩ গড় আর ৪.০৪ ইকোনমিতে উইকেট পেয়েছেন ৫৫টি। ম্যাচে ৪+ উইকেট পেয়েছেন ৩ বার, ম্যাচপ্রতি উইকেট ১.৪৪।

  • ম্যাকগ্রা ব্যাটিং অর্ডারের টপ থ্রি’র উইকেট পেয়েছেন ১৮১টি, যা তার ক্যারিয়ার উইকেটের ৪৭.৫০%। মিডল অর্ডারের ৪ জনের উইকেট পেয়েছেন ১১৮টি, যা তার ক্যারিয়ার উইকেটের ৩১.০০% এবং লোয়ার থ্রি’র উইকেট পেয়েছেন ৮২টি, যা তার ক্যারিয়ার উইকেটের ২১.৫০%। অন্যদিকে, ওয়াসিম ব্যাটিং অর্ডারের টপ থ্রি’র উইকেট পেয়েছেন ২২৯টি, যা তার ক্যারিয়ার উইকেটের ৪৫.৬০%, মিডল অর্ডারের ৪ জনের উইকেট পেয়েছেন ১৪৬টি, যা তার ক্যারিয়ার উইকেটের ২৯.১০% এবং লোয়ার থ্রি’র উইকেট পেয়েছেন ১২৭টি, যা তার ক্যারিয়ার উইকেটের ২৫.৩০%।

ব্যাটিং অর্ডার অনুযায়ী ম্যাকগ্রার উইকেট; Image Source: Howstat
ব্যাটিং অর্ডার অনুযায়ী ওয়াসিম আকরামের উইকেট; Image Source: Howstat
  • ওয়ানডেতে ম্যাকগ্রা ম্যান অফ দ্য ম্যাচ হয়েছেন ২৫০ ম্যাচে ১৫ বার, অর্থাৎ গড়ে প্রতি ১৬.৬৬ ম্যাচে ১ বার। অন্যদিকে, ওয়াসিম হয়েছেন ৩৫৬ ম্যাচে ২২ বার, গড়ে প্রতি ১৬.১৮ ম্যাচে ১ বার।

  • ম্যাকগ্রা ৫৩টি সিরিজ খেলে ম্যান অফ দ্য সিরিজ হয়েছেন ১ বার, ওয়াসিম ৯৩টি সিরিজ খেলে ম্যান অফ দ্য সিরিজ হয়েছেন ৩ বার।

উপরের পরিসংখ্যানগুলো দেখলে এটা পরিষ্কার বোঝা যায় যে, অন্তত পরিসংখ্যানে ওয়াসিম কিছুটা হলেও পিছিয়ে গ্লেন ম্যাকগ্রার চেয়ে। কিন্তু কেবল পরিসংখ্যান দিয়ে তো আর সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। এজন্য পরিসংখ্যানগুলোকে বিশ্লেষণ করতে হয়। এবার একটু সেই চেষ্টা করা যাক।  

ম্যাকগ্রা আর ওয়াসিমের তুলনার সময় একটা বিষয় অবধারিতভাবে চলে আসে। ওয়াসিমকে বেশিরভাগ সময় বল করতে হয়েছে উপমহাদেশের পিচে, যা কিনা বেশিরভাগ সময়ই স্পিনবান্ধব। অন্যদিকে ম্যাকগ্রা বেশিরভাগ সময়েই বল করেছেন অস্ট্রেলিয়া কিংবা দক্ষিণ আফ্রিকার পেস বোলিংবান্ধব পিচে। যুক্তিটা একেবারে ভুল নয়। কিন্তু বাস্তবে কি আমরা কখনো বিশ্লেষণ করে দেখেছি, এই ফ্যাক্টরটা দু’জনের পারফরম্যান্সে কতটুকু প্রভাব ফেলেছে?    

প্রথমে উপমহাদেশের বিষয়টা লক্ষ্য করা যাক: 

  • ভারতের মাটিতে পেস বোলারদের জন্য সবচেয়ে বদ্ধভূমি হিসেবে বিবেচিত। সেখানে ২১ ম্যাচ খেলে ম্যাকগ্রার সংগ্রহ ৩০ উইকেট। গড় ২৮.৬৭, স্ট্রাইক রেট ৩৭.৯৩ আর ইকোনমি ৪.৫৩। ওয়াসিমের সংগ্রহ ১৮ ম্যাচে ২২ উইকেট। গড় ২৯.৮২, স্ট্রাইক রেট ৪৩.৩২ আর ইকোনমি ৪.১৩।

  • পাকিস্তানের মাটিতে ৮ ম্যাচ খেলে ম্যাকগ্রার উইকেট ১৫টি; গড় ১৯.৮, স্ট্রাইক রেট ২৮.৯৩ আর ইকোনমি ৪.১১। ওয়াসিমের সংগ্রহ ৬৭ ম্যাচে ৭২ উইকেট; গড় ৩১.১৩, স্ট্রাইক রেট ৪২.৮৫ আর ইকোনমি ৪.৩৬।

  • শ্রীলংকার মাটিতে ১২ ম্যাচ খেলে ম্যাকগ্রার সংগ্রহ ২১ উইকেট; গড় ২০.৯৫, স্ট্রাইক রেট ২৮.৮১ আর ইকোনমি ৪.৩৬। ওয়াসিমের সংগ্রহ ১৪ ম্যাচে ২২ উইকেট; গড় ১৬.১৮, স্ট্রাইক রেট ৩০.১৪ আর ইকোনমি ৩.২২।

এই তিন দেশে ম্যাকগ্রার সংগ্রহ ৪১ ম্যাচে ৬৬ উইকেট, ম্যাচ প্রতি ১.৬০। ওয়াসিমের সংগ্রহ ৯৯ ম্যাচে ১১৬ উইকেট, ম্যাচ প্রতি ১.১৭। বলা বাহুল্য, যে দেশগুলোতে দুইজনই খেলেছেন, সেগুলো বিবেচনায় আনা হয়েছে। যেহেতু শারজাহ এবং বাংলাদেশে ম্যাকগ্রা খেলেননি তাই এই দুই দেশের পরিসংখ্যান ওয়াসিমের ক্ষেত্রেও বাদ দেওয়া হয়েছে। যদি শারজাহ এবং বাংলাদেশ বিবেচনায় আনা হয়, তাহলে ওয়াসিমের সংগ্রহ ১৮৪ ম্যাচে ২৫০ উইকেট, ম্যাচপ্রতি ১.৩৫।

যে কোন কন্ডিশনেই পরিসংখ্যানে ম্যাকগ্রা এগিয়ে; Image Source: gettyimages.co.uk

এখন উপমহাদেশের বাইরে পেস বান্ধব এলাকা গুলোতে একটু লক্ষ্য করা যাক:

  • অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ৯৬ ম্যাচ খেলে ম্যাকগ্রার সংগ্রহ ১৬১ উইকেট; গড় ২০.২৩, স্ট্রাইক রেট ৩২.১২ আর ইকোনমি ৩.৭৮। ওয়াসিমের সংগ্রহ ৬৪ ম্যাচে ৮৭ উইকেট; গড় ২৪.৯৭, স্ট্রাইক রেট ৩৯.৪০ আর ইকোনমি ৩.৮০।

  • দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে ২৭ ম্যাচ খেলে ম্যাকগ্রার উইকেট ৩৭টি; গড় ২২.০৮, স্ট্রাইক রেট ৩৭.০৮ আর ইকোনমি ৩.৫৭। ওয়াসিমের সংগ্রহ ২৪ ম্যাচে ৪৩ উইকেট; গড় ১৯.৪০, স্ট্রাইক রেট ২৯.৮১ আর ইকোনমি ৩.৯০।

  • ইংল্যান্ডের মাটিতে ২৭ ম্যাচ খেলে ম্যাকগ্রার সংগ্রহ ৩৮ উইকেট; গড় ২৩.৭৪, স্ট্রাইক রেট ৩৮.৩২ আর ইকোনমি ৩.৭২। ওয়াসিমের সংগ্রহ ২৩ ম্যাচে ২৮ উইকেট; গড় ৩১.৩২, স্ট্রাইক রেট ২৮.৩৬ আর ইকোনমি ৪.০৫।

  • ওয়েস্ট ইন্ডিজের মাটিতে ২২ ম্যাচ খেলে ম্যাকগ্রার সংগ্রহ ৩৬ উইকেট; গড় ২০.৫০, স্ট্রাইক রেট ২৮.৩৬ আর ইকোনমি ৪.৩৪। ওয়াসিমের সংগ্রহ ১২ ম্যাচে ১৪ উইকেট; গড় ৩২.৪৩, স্ট্রাইক রেট ৪৫.৬৪ আর ইকোনমি ৪.২৬।

  • নিউজিল্যান্ডের মাটিতে ১৫ ম্যাচ খেলে ম্যাকগ্রার সংগ্রহ ২১ উইকেট; গড় ২৪.৭৬, স্ট্রাইক রেট ৩৫.২৪ আর ইকোনমি ৪.২২। ওয়াসিমের সংগ্রহ ২০ ম্যাচে ৩৭ উইকেট, গড় ১৫.৪৬, স্ট্রাইক রেট ২৭.০৮ আর ইকোনমি ৩.৪৩।

পেস বান্ধব পিচগুলোতে ম্যাকগ্রার সংগ্রহ ১৮৭ ম্যাচে ২৯৩ উইকেট, ম্যাচপ্রতি ১.৫৬। বিপরীতে ওয়াসিমের সংগ্রহ ১৪৩ ম্যাচে ২০৯ উইকেট, ম্যাচ প্রতি ১.৪৬।

তার মানে, উপমহাদেশের স্পিনবান্ধব পিচে বল করার কারণে ওয়াসিম আকরাম পরিসংখ্যানে পিছিয়ে আছেন, এই কথাটাও পুরোপুরি সত্য নয়।  

কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে পরিসংখ্যানে এতটা এগিয়ে থাকার পরেও দুইজনের মুখোমুখি হয়েছেন কিংবা দু’জনের সাথেই খেলেছেন এমন খেলোয়াড়দের কাছে ওয়াসিম আকরাম অনেকখানি এগিয়ে। কয়েকজনের মন্তব্য দেখে নেওয়া যাক।

স্টিফেন ফ্লেমিং বলেছিলেন,

‘আমি যতজন বোলারদের মুখোমুখি হয়েছি, তাদের মাঝে ওয়ার্ন হচ্ছেন সেরা স্পিনার এবং ওয়াসিম সেরা পেসার।’

ডোনাল্ডের মতে,

‘যখন আমি খেলা শুরু করেছি, তখন পেস বোলারদের মাঝে সেরা ছিলেন ওয়াসিম আকরাম। আমি যাদের দেখেছি এবং যাদের বিরুদ্ধে খেলেছি, তাদের মাঝে ওয়াসিম ছিলেন সবচেয়ে স্কিলফুল এবং সম্পূর্ণ।’  

ডোনাল্ডের চোখেও ওয়াসিম আকরাম এগিয়ে; Image Source: ESPNcricinfo com

অ্যামব্রোস বলেন,

‘ফিট থাকলে সে বল নিয়ে যা খুশী করতে পারে। ফাস্ট বোলারদের মাঝে সে-ই সেরা।’

কপিল দেবের মতেও ওয়াসিম আকরাম সর্বকালের সেরা পেস বোলার।

জ্যাক ক্যালিস বলেছিলেন, 

‘আমার মতে, আমি যত বোলারের মুখোমুখি হয়েছি, তাদের মাঝে সেরা হচ্ছেন ওয়াসিম আকরাম। দুই দিকেই সুইং করতে পারার দক্ষতাই তাকে ভয়ংকর বানিয়েছে।’

সমসাময়িক খেলোয়াড় বাদে পরের যুগে যাকে সেরা ব্যাটসম্যান ধরা হয় সেই বিরাট কোহলিও ওয়াসিম সম্পর্কে বলতে গিয়ে শ্রদ্ধায় অবনত। 

‘যদি কখনো কোনো বোলারের মুখোমুখি হতে আমার ভয়ের অনুভূতি হয়, তাহলে সেটা হচ্ছে ওয়াসিম আকরাম।’

আধুনিক যুগের ব্যাটিং কিংবদন্তী ভিরাট কোহলিও ওয়াসিম সম্পর্কে শ্রদ্ধাশীল; Image Source: The Pioneer

তবে কোনো খেলোয়াড়ের ব্যক্তিগত মতামত দ্বারা সবসময় সত্যি ফলাফলটা না-ও আসতে পারে। এজন্য বিশেষজ্ঞদের সম্মিলিত মতামতের ফলাফলের দিকে নির্ভর করাটা ভালো। সেখানে লক্ষ্য করলেও দেখতে পাওয়া যায়, কেন যেন ম্যাকগ্রা সবসময়ই কিছুটা পেছনে থাকেন ওয়াসিমের তুলনায়। উইজডেন কর্তৃক গত শতাব্দীর সেরা ওয়ানডে বোলারদের তালিকায় ওয়াসিম আকরাম ছিলেন ১ নম্বরে, আর ম্যাকগ্রা ছিলেন ৪ নম্বরে। অবশ্য যে সময়টাতে তালিকা করা হয়েছিলো, ম্যাকগ্রার তুখোড় ফর্মের অনেকটাই ছিল এর পরবর্তী সময় থেকে।

তবে ২০১৫ সালে ক্রিকেট মান্থলির দ্বারা ৫০ জন ক্রিকেটার এবং ক্রিকেট লেখকদের সমন্বয়ে একটা জুরি বোর্ড গঠন করে ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ ওয়ানডে ক্রিকেটার বের করার একটা চেষ্টা করা হয়। জহির আব্বাস, রাসেল আর্নল্ড, ইয়ান বিশপ, মার্ক বুচার, ইয়ান চ্যাপেল, ডিন জোন্স, রাহুল দ্রাবিড়দের মতো খেলোয়াড়রাও সেই বোর্ডে ছিলেন। সেই তালিকায় ২৬ জনের ভোটে ৬৬ পয়েন্ট পেয়ে তালিকার তৃতীয় স্থানে ছিলেন ওয়াসিম আকরাম। আর মাত্র ১ জনের ভোটে ৫ পয়েন্ট পেয়ে তালিকার ১৪ নম্বর অবস্থানে ছিলেন গ্লেন ম্যাকগ্রা।

পরিসংখ্যানের প্রায় প্রতিটা জায়গাতেই এতটা পরিষ্কার ব্যবধানে এগিয়ে থাকার পরও কেন ম্যাকগ্রাকে পেছনে রাখা হয় সেটা সত্যিই ভাবার বিষয়। সেটা একটু বের করার চেষ্টা করা যাক।  

সমসাময়িক সেরা ব্যাটসম্যানদের বিপক্ষে সফলতা এবং তার কারণ 

দুইজন বোলারের বিপক্ষে তুলনা করার সময় এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর যে, তারা তাদের সমসাময়িক সেরা ব্যাটসম্যনদের বিপক্ষে কতটা সফল ছিলেন। ম্যাকগ্রা এবং ওয়াসিম আকরামের সময় যে সেরা ব্যাটসম্যানগুলো কমন ছিলেন, তারা হলেন শচীন টেন্ডুলকার, ব্রায়ান লারা, ইনজামাম উল হক, সাঈদ আনোয়ার, রিকি পন্টিং প্রমুখ। ওয়াসিম কিছুদিন পেয়েছেন গ্রেট মার্টিন ক্রো আর ডেসমন্ড হেইন্সকেও।

এখন ব্রায়ান লারা এবং শচীন টেন্ডুলকারকে ম্যাকগ্রা এবং ওয়াসিম কতবার আউট করেছে সেটা একটু দেখা যাক।

গ্রেট ব্যাটসম্যানদের বিপক্ষে ম্যাকগ্রা এবং ওয়াসিমের পারফর্মেন্স অনবদ্য; Image Source: Flickr

শচীন টেন্ডুলকারকে ওয়াসিম আউট করেছেন ২৪ ম্যাচে ৩ বার, আর ম্যাকগ্রা করেছেন ২৩ ম্যাচে ৭ বার। ব্রায়ান লারাকে ওয়াসিম আউট করেছেন ৩৩ ম্যাচে ৭ বার এবং ম্যাকগ্রা করেছেন ২৯ ম্যাচে ৩ বার। তার মানে, এই দুই গ্রেটকে ওয়াসিম ৫৭ বারের দেখায় ১০ বার আউট করেছেন এবং ম্যাকগ্রা ৫২ বারের দেখায় করেছেন ১০ বার। এখানেও পরিসংখ্যানে ম্যাকগ্রা এগিয়ে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ভালো ব্যাটসম্যানকে আউট করা মানেই কি সে ভালো বোলার? ওয়ানডেতে ওয়াসিমের পর ব্রায়ান লারাকে সবচেয়ে বেশি আউট করেছেন ক্রিস হ্যারিস, ১৯ ম্যাচে ৬ বার। এমনকি শচীন টেন্ডুলকারও লারাকে ২২ ম্যাচে ৪ বার আউট করেছেন, যা কিনা ম্যাকগ্রার চাইতেও রেশিওতে ভালো। এর দ্বারা কেউ নিশ্চয়ই দাবি করবেন না যে, ব্রায়ান লারা ম্যাকগ্রার চেয়ে শচীন টেন্ডুলকারের বল কম বুঝতেন। এমনকি টেস্টে ব্রায়ান লারাকে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আউট করেছেন আন্দ্রে নেল, ১২ ইনিংসে ৮ বার। সর্বোচ্চ সেখানে ম্যাকগ্রা, ৪৮ ইনিংসে ১৫ বার। 

তাহলে বিষয়টা আসলে কেমন?

সেটা ভালোভাবে বোঝার আগে শচীন বনাম ম্যাকগ্রার কয়েকটি দ্বৈরথ নিয়ে একটু বিশ্লেষণ করা যাক।

১৯৯৯ বিশ্বকাপ। অস্ট্রেলিয়া খাদের কিনারে দাঁড়িয়ে। টুর্নামেন্টে টিকে থাকতে হলে আর কোনো ম্যাচেই হারা যাবে না, এরকম পরিস্থিতিতে সুপার সিক্সে মুখোমুখি হলো ভারতের। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে শচীন টেন্ডুলকারের পারফরম্যান্স তার আগের কয়েকটি ম্যাচে দুর্দান্ত। শারজাহতে ৩ ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে করলেন যথাক্রমে ৮০ (৭২ বলে), ১৪৩ (১৩১ বলে) আর ১৩৪ (১৩১ বলে)। মোটামুটি একা হাতেই ভারতকে ফাইনালে তুললেন এবং ফাইনালেও জেতালেন। এরপর ঢাকায় নকআউট বিশ্বকাপেও অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে করলেন ১৪১ (১২৮ বলে)। এমন টানা ৪ টি ইনিংসের পর অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক স্টিভ ওয়াহ পর্যন্ত বলতে বাধ্য হলেন,

‘সর্বকালের সেরা ডন ব্র্যাডম্যান। কিন্তু এরপর অবশ্যই শচীন’।

তবে এসব দ্বৈরথের মাঝে একটা অপূর্ণতা ছিল। সেই সময় অস্ট্রেলিয়ার সফলতার পেছনে ম্যাকগ্রা নামক লিকলিকে বোলারটার বেশ বড় ধরণের অবদান। প্রথম স্পেলে উইকেট পাননি, এমন ইনিংস সম্ভবত হাতে গোনা কয়েকটা। শুরুতেই ব্যাটসম্যানদেরকে আউট করে চাপে ফেলতে ম্যাকগ্রার বিকল্প নেই। শচীন টেন্ডুলকারের এসব ইনিংসে ম্যাকগ্রা অনুপস্থিত ছিলেন ইনজুরির জন্য। এমন নয় যে, ম্যাকগ্রা থাকলে শচীন ব্যর্থ হতেন। তবে সেক্ষেত্রে লড়াইটা আরো বেশি উপভোগ্য হতো, তাতে সন্দেহ নেই। কাজেই খেলাপ্রেমীরা আগ্রহী ছিল সেরা ফর্মের শচীন আর ম্যাকগ্রার দ্বৈরথটা উপভোগ করতে। সেই দ্বৈরথের সূত্রপাত হলো সুপার সিক্স ম্যাচ দিয়েই।

অস্ট্রেলিয়া আগে ব্যাটিং করে করলো ২৮২ রানের একটা স্কোর। সেই সময়ের প্রেক্ষাপটে ২৮২ রান অবশ্যই ফাইটিং স্কোর, তবে শচীন-গাঙ্গুলী-দ্রাবিড়-আজহার-জাদেজার সমন্বয়ে গড়া শক্তিশালী ব্যাটিং লাইনআপের পক্ষে সম্ভব ছিল রানটাকে টপকানো। সবচেয়ে আগ্রহের বিষয় ছিল, ম্যাকগ্রা কীভাবে শচীনকে মোকাবেলা করেন। কিন্তু ম্যাকগ্রা প্রথম ওভারের ৫ম বলেই শচীনকে শূন্য রানে আউট করে ম্যাচটাকে একপেশে করে ফেলেন। প্রথম লড়াইয়ে ম্যাকগ্রাই জয়ী। এরপর আরো কয়েকটা ম্যাচে দুইজনের দেখা হলো। ম্যাকগ্রাও শচীনকে আউট করলেন, আবার শচীনও ম্যাকগ্রার বিপক্ষে ১টা সেঞ্চুরি করলেন। তবে বিগ ম্যাচে আবার দুইজন মুখোমুখি হলেন ২০০৩ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে। তবে এবারও শচীন টেন্ডুলকার হেরে গেলেন ম্যাকগ্রার কাছে, আবারও প্রথম ওভারেই মাত্র ৪ রানে আউট হলেন ম্যাকগ্রার বলেই। তার মানে বিশ্বকাপের মতো বিগ টুর্নামেন্টে দুইবারের মুখোমুখিতে দুইবারই ম্যাকগ্রা বিজয়ী।

তবে বিষয়টা আসলে এতটা সরলীকরণও নয়।   

পাকিস্তানের একমাত্র বিশ্বকাপ জয়ে ফাইনালের ম্যান অব দি ম্যাচ ছিলেন ওয়াসিম; Image Source: ESPNcricinfo.com

শারজাহ আর ঢাকার ম্যাচগুলোতে যেমন ম্যাকগ্রা না থাকার সুবিধাটা পেয়েছিলেন শচীন, ঠিক তেমনি দুই বিশ্বকাপেই কিছু সমস্যারও সম্মুখীন হয়েছিলেন তিনি। ‘৯৯ বিশ্বকাপে টুর্নামেন্ট চলাকালীন সময়েই শচীনের বাবা মারা যান। আর ২০০৩ বিশ্বকাপে প্রথম ইনিংসেই আসলে ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারিত হয়ে গিয়েছিলো। সেই সময়ে ৫০ ওভারে ৩৫৯ রান চেজ করে জেতা অসম্ভবের পর্যায়েই ছিল। শচীনকে ঝুঁকি নিতেই হতো। ম্যাকগ্রা দলীয় রানের কারণেই সুবিধাজনক পজিশনে ছিলেন। কাজেই এই প্রেক্ষাপটে শচীনকে ব্যক্তিগতভাবে ব্যর্থ মেনে নেওয়াটা আসলে যথাযথ বিচার নয়।

একজন বোলার কতবার ব্যাটসম্যানকে আউট করতে পেরেছেন, সেটা দিয়ে আসলে ব্যাটসম্যান-বোলারের লড়াইটা বুঝা যায় না। দেখা গেলো, এক প্রান্ত দিয়ে ম্যাকগ্রা দুর্দান্ত বল করছেন। অন্য প্রান্তের বোলারকে মারতে গিয়ে ব্যাটসম্যান আউট হয়ে গেলেন। দেখার বিষয়, চাপটা কে ক্রিয়েট করেছেন। আউট করার চাইতে পরিস্থিতি সৃষ্টি করাটাই মূল বিষয় একজন বোলারের। একজন বোলারের চেষ্টা থাকে ব্যাটসম্যানকে সর্বোচ্চ চাপে ফেলার। সেই চাপে পড়ার পর সেটা সহ্য করতে না পারলে ব্যাটসম্যান নিজেই আউট হবেন। 

২০০৭ বিশ্বকাপের ম্যান অব দি সিরিজ হয়েছিলেন ম্যাকগ্রা; Image Source: Wikipedia

সেরা ব্যাটসম্যনকে আউট করার ক্ষেত্রে ওয়াসিমও একেবারে পিছিয়ে ছিলেন না। শচীন আসার আগ পর্যন্ত যাকে সেরা ওপেনার মানা হতো, সেই ডেসমন্ড হেইন্সকে ৪১ বারের দেখায় আউট করেছেন ওয়াসিম ১২ বার। ওয়াসিমকে হেইন্স কেমন চোখে দেখতেন, সেই সম্পর্কে ব্রায়ান লারা দারুণ একটা মন্তব্য করেছিলেন। 

‘ওয়াসিমের বিরুদ্ধে একটা ম্যাচের আগে আমি ডেসমন্ডকে বলেছিলাম, ওভারটা যেন ও কাটিয়ে দেয়। ওয়াসিমকে আমি ফেইস করতে চাচ্ছিলাম না। ডেসমন্ডও মৌন সম্মতি দিল। কিন্তু ওভার শুরু হবার পরেই আমাকে বিস্মিত করে ডেসমন্ড ১ রান নিয়ে আমাকে স্ট্রাইক দিয়ে দিল। আমি হতভম্ব। পরে বুঝলাম, ডেসমন্ডও ওকে ফেইস করতে চাচ্ছে না।’ 

এই হচ্ছেন ওয়াসিম।

দলীয় সমর্থন পাওয়ার ক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে ম্যাকগ্রা এগিয়ে ছিলেন ওয়াসিমের চেয়ে। ম্যাকগ্রা খেলেছিলেন একটা অসাধারণ অস্ট্রেলিয়া দলে। অবশ্য অস্ট্রেলিয়া দলকে অসাধারণ বানানোর পেছনেও ম্যাকগ্রার বেশ বড় অবদান ছিল, সেটা ভুলে গেলে চলবে না। তবে সময়ের সেরা ব্যাটসম্যানদের অনেকেই অস্ট্রেলিয়া দলে থাকায় ম্যাকগ্রাকে অল্প রান ডিফেন্ড করতে হয়েছে খুব অল্প সময়েই। অন্যদিকে ওয়াসিমের পাকিস্তানের ব্যাটিং লাইন সবসময়ই ভঙ্গুর ছিল। দুই একজন স্পেশাল ব্যাটসম্যান থাকলেও ওভারঅল লাইনআপ বাজেই ছিল বলতে হয়। ওয়াসিমকে বেশিরভাগ সময়েই এমন পরিস্থিতিতে বোলিং করতে হয়েছে, যেখানে সে ম্যাকগ্রার চেয়ে সুবিধাজনক পজিশনে কমই ছিলেন। ২৫০+ স্কোর ডিফেন্ড করার চেয়ে ২০০+ স্কোর ডিফেন্ড করা অবশ্যই কঠিন।

ফিল্ডিংয়ে অস্ট্রেলিয়া সবসময়ই এগিয়ে ছিল; Image Source: Cricket Australia

আর একটা ফ্যাক্টর হচ্ছে ফিল্ডিং। ফিল্ডিংয়ে অস্ট্রেলিয়া দল তখন বিশ্বের সেরা দলগুলোর মাঝে একটা, আর পাকিস্তান সবচেয়ে বাজে দল গুলোর মাঝে একটা। ওয়াসিমের বলে যে কতগুলো ক্যাচ মিস হয়েছে সেটার হিসেবই নেই।

শুধুমাত্র এই ফ্যাক্টরগুলোর কারণে ম্যাকগ্রার চেয়ে ওয়াসিম সেরা হয়ে যায় না বটে, তবে পরিসংখ্যানে ওয়াসিমের পিছিয়ে থাকার জন্য এই ফ্যাক্টরগুলো কিছুটা হলেও দায়ী। 

এবার দেখা যাক, ফ্যাক্টরগুলো বাদ দিলে কেবল স্কিলের দিকে কে এগিয়ে?

ওয়াসিম আর ম্যাকগ্রা দুজনই ওয়াকার, শোয়েব কিংবা ব্রেট লি’র মতো এক্সপ্রেস বোলার নন। তবে দুইজনের শক্তির জায়গা ভিন্ন। ম্যাকগ্রা মূলত সুইং বোলার, সাথে বাউন্সটাকে ব্যবহার করেন। ভ্যারিয়েশনের চাইতে সঠিক জায়গায় বারবার বল ফেলাটাই তার মূল অস্ত্র। ম্যাকগ্রার বোলিং দর্শনটা খুবই সহজসরল, অফ স্ট্যাম্পের একটু বাইরে এমন জায়গায় বল ফেলা, যাতে ব্যাটসম্যান ছাড়বে না মারবে সেই সন্দিহান অবস্থাতে পড়ে হাঁসফাঁস করতে থাকে। গতি নিয়ে শোয়েব আর লি সম্পর্কে ম্যকগ্রা একবার বলেছিলেন,

‘শোয়েব হচ্ছে গতির রাজা। আমার তো সেই গতি নেই। আমি কেবল জানি, ১০০ বারের মধ্যে ৯০ বার একই জায়গায় বল ফেললে ব্যাটসম্যান ভুল করবেই।’

এবং কী অদ্ভুত ব্যাপার, ম্যাকগ্রার বিপক্ষে দাঁড়িয়ে ব্যাটসম্যানরা পুরোটা সময়জুড়েই সেই ভুল করেও গিয়েছেন! 

পুরনো বলে ওয়াসিম আকরাম ছিলেন ভয়ংকর; Image Source: theweek.in

ওয়াসিমের বিষয়টা ভিন্ন। তার মূল অস্ত্র সুইং, একই সাথে রিভার্স সুইং। পুরনো বলে যখন পেসারদের কিছু করার থাকে না, তখনও ওয়াসিম ভেলকি দেখাতেন। কথিত আছে যে, একই ভঙ্গিতে দৌঁড়ে এসে ছয়টি বল ছয়ভাবে করতে পারতেন ওয়াসিম। ওয়াসিম সম্পর্কে একটা সাক্ষাৎকারে আফ্রিদি একবার মজার কথা বলেছিলেন। ওয়াসিম নাকি প্র্যাকটিসে একবার আফ্রিদিকে বলেছিলেন,

‘সবাইকে তো মাঠে ছক্কা মারতে চাও। আমাকে মেরে দেখাও তো।’

ওয়াসিম ৬টা বল করেছিলেন। তিনটা বলে আফ্রিদি ব্যাটেই লাগাতে পারেননি, বাকি তিন বলে বোল্ড। এই ভ্যারিয়েশনের জন্যেই ওয়াসিমের চাহিদা আলাদারকমের। 

ম্যাকগ্রার মূল শক্তিটা নতুন বলে, তবে ওয়াসিম আকরামও এই ক্ষেত্রে খুব পিছিয়ে নেই। কিন্তু ম্যাকগ্রার চাইতে ওয়াসিম মূলত এগিয়ে যান পুরনো বলে দক্ষতার কারণেই। পুরনো বলে ওয়াসিম যতটা সাবলীল, ম্যাকগ্রা ঠিক ততটা ছিলেন না। ওয়ানডে ক্রিকেটে ইনিংসের শেষ দিকে ম্যাচের মোড় ঘুরানোর ক্ষেত্রেও অন্যান্য অনেক বোলারের চাইতে ওয়াসিম অনেকটা এগিয়ে।

বিষয়টা ভালোভাবে বোঝার জন্য আরো কয়েকটা বিষয় লক্ষ্য করা যাক।  

  • অন্তত ৫০ কিংবা তার চেয়ে বেশী রান করেছেন এমন ব্যাটসম্যানকে ওয়াসিম আউট করেছেন ৪৩ বার, প্রতি ৮.২৭ ইনিংসে তিনি একবার এই কাজটি করতে পেরেছেন। অন্যদিকে ম্যাকগ্রা এমন ব্যাটসম্যানকে আউট করতে পেরেছেন মাত্র ২১ বার, প্রতি ১১.৯০ ইনিংসে তিনি একবার ৫০+ রান করা ব্যাটসম্যানকে আউট করেছেন।

  • ম্যাচে ৫০+ রানের জুটি ওয়াসিম ভাঙতে পেরেছেন ৪৮ বার, অন্যদিকে ম্যাকগ্রা ভাঙ্গতে পেরেছেন ৩১ বার। 

  • ওয়াসিম আকরাম খেলেছেন এমন ম্যাচে সেঞ্চুরি হয়েছে ৩০টি। এর মাঝে ৭ বার তিনি সেঞ্চুরি করা ব্যাটসম্যানকে আউট করতে পেরেছেন, শতকরা হিসেবে যেটা দাঁড়ায় ২৩.৩৩। ম্যাকগ্রা খেলেছেন এমন ম্যাচে সেঞ্চুরি হয়েছে ২২টি, সেঞ্চুরী করা ব্যাটসম্যানকে আউট করতে পেরেছেন ৩ বার, শতকরা হিসেবে যেটা দাঁড়ায় ১৩.৬৩ এ।

অর্থাৎ সেট হয়ে যাওয়া ব্যাটসম্যানকে আউট করার দিক থেকেও ম্যাকগ্রার চেয়ে ওয়াসিম আকরাম এগিয়ে।

ওয়ানডে ক্রিকেটে শুরুতে উইকেট ফেলতে পারাটা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনিভাবে ইনিংসের শেষ মুহূর্তে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে উইকেট ফেলে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়াটাও গুরুত্বপূর্ণ। ইনিংসের শুরুর দিকের পারফরম্যান্সে ওয়াসিম এবং ম্যাকগ্রা সমানে সমান থাকলেও শেষের দিকের পারফরম্যান্সে নিঃসন্দেহে ওয়াসিম এগিয়ে। 

পাদটীকা

গ্লেন ম্যাকগ্রা এবং ওয়াসিম আকরাম – দু’জনেই গ্রেট বোলার, যেকোনো অধিনায়কই তার দলে এমন বোলার পেতে চাইবেন। অর্জনের তালিকাও এই দুই খেলোয়াড়ের বিশাল বড়। সরাসরি এই দুই খেলোয়াড়ের তুলনাও কখনো কোনো প্রতিষ্ঠান দ্বারা সেভাবে করা হয়নি। এজন্য এটা সরাসরি বলাটা উচিত হবে না যে, কোন খেলোয়াড়টা বেশি ভালো। তবে উপরের আলোচনার প্রেক্ষিতে আমরা একটা কথা বলতেই পারি যে, বেশিরভাগ বিশেষজ্ঞরাই ওয়ানডেতে ওয়াসিম আকরামকেই সেরা ভাবেন।

পাঠক, আপনার সেরা ওয়ানডে দলে যদি এই দু’জনের একজনকে বাছাই করতে বলা হয়, সেক্ষেত্রে আপনি কাকে রাখবেন?

This article is in Bangla language. This article is about the comparison between two great bowlers Wasim Akram and Glenn Mcgrath in ODI. References are hyperlinked inside the article.

Image Source: CricketCountry.com

Related Articles