প্রযুক্তির আকাশচুম্বী কল্যাণে আধুনিক মানুষের জীবন যাত্রার মান বেড়েছে বহুগুণে। আজ হাত বাড়ালেই হাতের মুঠোয় সবকিছু পাওয়া যায় সহজেই। সভ্যতার এই অগ্রগতি সর্বত্র লক্ষ্যনীয়। সভ্যতার তেমনই এক অভিনব আবিষ্কার গণনাযন্ত্র (বা সহজ কথায় বলতে গেলে ক্যালকুলেটর)। বর্তমান সভ্যতায় ক্যালকুলেটরের আবিষ্কার হিসাব-নিকাশের সমস্যা সমাধানকে করেছে দ্রুত ও নিশ্চিত। চাইলেই এখন অনেক বড় বড় জটিল গণনা খুব সহজেই এই গণকযন্ত্রের দ্বারা মুহূর্তে করে দেয়া সম্ভব। কিন্তু যদি একটু ফিরে তাকানো যায় কয়েক হাজার বছর বা কয়েক শতক আগে, সেই সময়ে যখন আধুনিক ক্যালকুলেটর আবিষ্কার হয় নি, কিভাবে তখনকার মানুষেরা গণনার কাজ করতো? কিভাবে করতো জটিল গণনার সমাধান? এই লেখায় থাকছে আধুনিক গণনাযন্ত্রের পূর্বপুরুষ এবং তাদের বিবর্তন নিয়েই কিছু কথা।

একসময় মানুষ হাতের আঙ্গুল গুণে হিসাবের কাজ চালাতো। বণিকেরা ছোট পাথরের টুকরা বা ফলের বীজ দিয়ে চালাতো তাদের গণনার কাজ এবং হিসাব নিকাশ। রাখাল তার পালের ভেড়ার হিসাব রাখতো কাঠি বা হাড় দিয়ে কিংবা পাথরের গায়ে দাগ কেটে। প্রাচীন চীনের অধিবাসীরা রড নিউমেরালস (Rod Numerals) নামক পদ্ধতি ব্যবহার করতো গণনার জন্য।

খাঁজযুক্ত হাড় (Notches Bone)

খাঁজযুক্ত হাড়

গণনার ক্ষেত্রে সবথেকে প্রাচীন সরঞ্জাম যেটি পাওয়া যায় সেটি খাঁজযুক্ত হাড়। গণনায় এই হাড়ের ব্যবহার পাওয়া যায় খ্রিষ্টপূর্ব প্রায় ৪৪,০০০ বছর পূর্বে (কার্বন ডেটিং পদ্ধতি অনুসারে) দক্ষিণ আফ্রিকার বোর্ডার কেভ অঞ্চলে।

মূলত এই হাড়গুলোর ব্যবহার দ্বারাই তখনকার মানুষদের গণনাকার্যের সক্ষমতা ও সাংকেতিক চিহ্ন আকারে এদের ব্যবহার সম্বন্ধে ধারণা পাওয়া যায়। হাড়গুলো বিশেষত্ব এদের নামেই প্রকাশ পায় যে, এদের গায়ে বিশেষ ধরণের খাঁজ ছিলো। ধারণা করা হয় তখনকার মানুষেরা হাড়ের এই খাঁজ দ্বারাই গণনা করতে পারতো।

ইসাঙ্গো হাড় (Ishango Bone)

ইসাঙ্গো হাড়

প্রাচীন গণনা ব্যবস্থার আরেকটি প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ছিলো ইসাঙ্গো হাড় যা পাওয়া যেত খ্রিষ্টপূর্ব প্রায় ৩০,০০০ বছর পূর্বে। পূর্বের হাড়ে সাথে এর পার্থক্য ছিলো এই যে এর গায়ে বিশেষ প্যাটার্নের খাঁজ দেখা যেত। অর্থাৎ কয়েকটি খাঁজের সেট, অনেকটা ট্যালীর মতো। যদিও অনেকের ধারণা যে এই হাড়গুলো চন্দ্রভিত্তিক দিনপঞ্জি (Lunar Calender) হিসেবে ব্যবহার করা হতো বা মহিলারা তাদের মাসিকের হিসাব রাখার কাজে ব্যবহার করতো।

অ্যাবাকাস (Abacus)

অ্যাবাকাস

ধারণা করা হয় খ্রিষ্টপূর্ব ২,৭০০ অব্দে সুমেরিয়া অঞ্চলে অ্যাবাকাস নামক গণনাযন্ত্রের উদ্ভব হয়। যদিও একে ঠিক যান্ত্রিক বলা চলে  না, কিন্তু বহু বছর ধরে মানুষ এই যন্ত্র দ্বারা গণনার কাজ করে এসেছে। এর ব্যবহার বিস্তৃতি পেলেও মূলত গণনার কাজেই যন্ত্রটি ব্যবহৃত হতো। কোনো গাণিতিক সমস্যা সমাধান এর দ্বারা করা যেত না। সাধারণত কাঠ বা প্লাস্টিকের অনেকগুলো পুঁতিকে একটি আয়াতাকার ফ্রেমে অনেকগুলো সমান্তরাল সারিতে বসিয়ে অ্যাবাকাস তৈরী করা হয়। প্রত্যেক সারিতে মোট সাত থেকে দশটির মতো পুঁতি বসানো হয়। এই পুঁতি গুণে গুণে তখনকার মানুষেরা কোনো বস্তুর গণনা বা দুইটি সংখ্যার যোগ বা বিয়োগ করত।

বিশেষত জাপান, ইন্ডিয়া, চীন এবং এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে এর ব্যাপক প্রচলন ছিলো। তাছাড়া পরবর্তীতে মিশর, পারস্য (বর্তমানে ইরান) এবং গ্রীসেও এর ব্যবহার শুরু হয়। খুব সহজেই এর দ্বারা গণনার কাজ করা যেত বিধায় এর জনপ্রিয়তা ছিলো যথেষ্ট। এখনো পৃথিবীর কিছু কিছু অঞ্চলে গণনার জন্য এর ব্যবহার পাওয়া যায়।

প্যাসকেলের ক্যালকুলেটর (Pascal’s Calculator)

প্যাসকেলের ক্যালকুলেটর

১৬৫২ সালে বিখ্যাত গণিতবিদ প্যাসকেল (Blaise Pascal) এই যন্ত্রের আবিষ্কার করেন। তার নাম অনুসারে এই যন্ত্রের নামকরণ করা হয় ‘প্যাসক্যালিন’ (Pascaline) বা প্যাসকেলের ক্যালকুলেটর। প্যাসকেলের বাবা ছিলেন একজন কর সংগ্রাহক। মূলত তিনি তাঁর বাবার গণনার খাঁটুনি দূর করে তাকে সাহায্য করার জন্য এই যন্ত্রটি তৈরী করেন।

এই যন্ত্রে সরাসরি যোগ ও বিয়োগ করা যেত। যদিও গুণ ও ভাগের বেলায় একটু সময় লাগতো। কারণ গুণ ও ভাগ করা হত অনুবর্তন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। অর্থাৎ গুণের ক্ষেত্রে পুনঃপুনঃ যোগ করা হতো, আর ভাগের ক্ষেত্রে পুনঃপুনঃ বিয়োগ। জনসমক্ষে প্রকাশ করার আগে প্যাসকেল তাঁর যন্ত্রের প্রায় ৫০টি প্রোটোটাইপ তৈরী করেন।

স্লাইড রুলস (Slide Rule)

স্লাইড রুল

স্কটিশ গণিতবিদ জন নেপিয়ার (John Napier) সর্বপ্রথম কতিপয় গাণিতিক সমস্যা সমাধানের শর্টকাট হিসেবে লাগারিদম আবিষ্কার করেন। তিনি তার এই পদ্ধতির সাহায্যে গণনার সুবিধার্থে তৈরী করেন ক্লাসিক টাইপের স্লাইড রুল যা তার নামানুসারে ‘নেপিয়ারস বোন’ (Napier’s Bone) নামে নামকরণ করা হয়।

পরবর্তীতে এডওয়ার্ড গুন্টার (Edward Gunter), উইলিয়াম অট্রেড (William Oughtred) সহ আরো অনেকে নেপিয়ারের এই লগারিদমিক পদ্ধতিকে কাজে লাগিয়ে এবং নেপিয়ার বোনের উন্নয়ন ঘটিয়ে নতুন ও উন্নত ধরণের স্লাইড রুলস তৈরী করেন। স্লাইড রুল মূলত স্লাইড স্টিক (Slide stick) (বা কখনো কখনো ডিস্ক) যার দ্বারা লগারিদমিক পদ্ধতি ব্যবহার করে সহজে ও খুব দ্রুত গুণ ও ভাগ করা সম্ভব হত। তাছাড়া এ যন্ত্রটি ত্রিকোণমিতিক, লগারিদমিক, এক্সপোনেন্সিয়াল এবং বর্গমূল করতে সক্ষম ছিলো। গণিতে এর প্রভাব এমন ভাবে পড়েছিলো যে, প্রায় ১৯৮০ সাল নাগাদ গণিতের মৌলিক একটি অংশ ছিলো যে কীভাবে স্লাইড রুল ব্যবহার করতে হয়।

স্লাইড রুল দৈর্ঘ্যে প্রায় ২ ফুট লম্বা, প্রস্থে ২ ইঞ্চি। যন্ত্রটি তিনটি অংশ নিয়ে গঠিত, (১) মূল লম্বা কাঠামো যা বিভিন্ন স্কেলে ভাগ করা হয়, (২) একটি স্লাইডিং অংশ যাকে স্কেল বরাবর আগে পিছে সরানো যায় এবং (৩) কার্সর বা নির্দেশক যা দ্বারা স্কেলের উপর একটি নির্দিষ্ট জায়গা চিহ্নিত করা যায়।

স্টেপড রেকনার (Stepped Reckoner)

স্টেপড রেকনার

গণিতবিদ লিবনিজ (Gottfried Von Leibniz) প্রথম স্টেপড রেকনার যন্ত্রের আবিষ্কার করেন। এটিই প্রথম গণকযন্ত্র যার দ্বারা যোগ, বিয়োগ, গুণ ও ভাগ সরাসরি করা যেত। তাছাড়া বাড়তি সুবিধা হিসেবে এই যন্ত্রে ছিলো কার্সর এবং মেমোরি যা প্রথম অপারেন্ডকে সংরক্ষণ করতে সক্ষম ছিলো। লিবনিজ ২টি স্টেপড রেকনার তৈরী করেছিলেন যার একটি তিনি University of Gottingen এর চিলেকোঠায় ভুলে রেখে আসেন। প্রায় ২৫০ বছর পরে সেই রেকনারটি পাওয়া যায়। মূলত এটিই ছিলো প্রথম সফল ক্যালকুলেটর।

অ্যারিথমোমিটার (Arithmometer)

অ্যারিথমোমিটার

থমাস কোল্মার (Thomas de Colmar) ১৮২০ সালে অ্যারিথমোমিটার যন্ত্রের আবিষ্কার করেন। এটিকে বলা হয় প্রথম সফল যান্ত্রিক ক্যালকুলেটর যা অফিসে ব্যবহার করার উপযোগী ছিলো। ১৮৫১ সাল থেকে ১৮৯০ সাল পর্যন্ত অ্যারিথমোমিটারই ছিলো গণনাকার্যের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত যন্ত্রসমূহের মধ্যে একচ্ছত্র অধিপতি। এই যন্ত্রে যোগ ও বিয়োগ করা যেত সরাসরি। পাশাপাশি বেশ বড় কিছু গুণ বা ভাগও করা যেত সহজেই।

কম্পটোমিটার এবং কম্পটোগ্রাফ (Comptometer and Comptograph)

কম্পটোমিটার

১৮৮৭ সালে প্রথম কীবোর্ড সংযোজিত যান্ত্রিক ক্যালকুলেটর আবিষ্কৃত হয় যার নাম ছিলো কম্পটোমিটার। এই যন্ত্রের কীবোর্ডে ৮ কলামে ৯ টি করে মোট ৭২ টি কী (key) সংযুক্ত ছিলো। যন্ত্রটি অনেকটাই প্যাসকেলের ক্যালকুলেটের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ ছিলো। কিন্তু সুসজ্জিত কী থাকায় কম্পটোমিটারে হিসাব করা যেত সহজে এবং তুলনামূলকভাবে অনেক দ্রুত। এই যন্ত্র দ্বারা সরাসরি এবং সহজে যেমন যোগ-বিয়োগ করা যেত, তেমনি বড় বড় গুণ-ভাগের সমাধানও করা যেত সহজে। তাছাড়া এই যন্ত্রে কিছু আলাদা সুবিধা যুক্ত করা হয়েছিলো। যেমন কিছু কী ছিলো যা প্রচলিত মুদ্রা এবং ওজন পরিমাপের হিসাব এবং এদের রূপান্তরে ব্যবহৃত হত।

পরে ১৮৮৯ সালে কম্পটোগ্রাফ তৈরী হয়। এটি ছিলো মূলত কম্পটোমিটারের পরিবর্তিত ও উন্নত সংস্করণ। এই যন্ত্রে হিসাবের পাশাপাশি প্রিন্ট প্রযুক্তি যুক্ত করা হয়েছিলো। ফলে গণনার পাশাপাশি গণনার ফলাফল প্রিন্ট করে নেয়া যেত। যদিও এটি কম্পটোমিটার থেকে উন্নত ছিলো তবুও এর কাজের গতি ছিলো কিছুটা ধীর।

ডিফারেন্স ইঞ্জিন (The Difference Engine)

ডিফারেন্স ইঞ্জিন

১৮২২ সালে চার্লস ব্যবেজ (Charles Babbage) ডিফারেন্স ইঞ্জিন আবিষ্কার করেন। এটি ছিলো প্রথম যন্ত্র যা ৩১ ডিজিটের সাতটি সংখ্যাকে আলাদা আলাদাভাবে ধারণ করতে সক্ষম ছিলো এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে পূর্বের ফলাফলকে পরবর্তী গণনায় ব্যবহার করতে পারতো। মূলত বহুপদী ফাংশনকে তালিকাবদ্ধ করার জন্য এই যন্ত্রের নকশা করা হয়েছিলো। কিন্তু শেষপর্যন্ত এই প্রকল্প সফলতার মুখ দেখে নি।

এনালিটিক্যাল ইঞ্জিন (Analytical Engine)

এনালিটিক্যাল ইঞ্জিন

ডিফারেন্স ইঞ্জিন প্রকল্প পরিত্যক্ত হওয়ার পরে ব্যাবেজ এনালিটিক্যাল ইঞ্জিন নিয়ে কাজ শুরু করেন। এই এনালিটিক্যাল ইঞ্জিনকেই আধুনিক কম্পিউটারের পূর্বপুরুষ হিসেবে গণ্য করা হয়। এনালিটিক্যাল ইঞ্জিনে ২টি আলাদা ইনপুট মডিউল এবং ৩টি আউটপুট মডিউল ছিলো। সাথে ছিলো কেন্দ্রীয় প্রক্রিয়াকরণ ইউনিট বা CPU এবং মেমোরি। এটি ছিলো প্রথম প্রোগ্রামভিত্তিক যন্ত্র যা প্রোগ্রামের নির্দেশ অনুযায়ী কাজ করতে পারতো। লেডি এডা (Lady Ada Lovelace) বার্নোলি সংখ্যা দ্বারা এই যন্ত্রের প্রোগ্রাম এলগরিদম লেখেন। অর্থাৎ তিনি ছিলেন প্রথম প্রোগ্রামার। যদিও অপর্যাপ্ত তহবিলের কারণে ব্যাবেজ এই প্রকল্পও সঠিকভাবে শেষ করতে পারেন নি।

মিলিওনেয়ার (The Millionaire)

মিলিওনেয়ার

১৮৯৩ সালে বোলে ( Léon Bollée) মিলিওনেয়ার যন্ত্র আবিষ্কার করেন। মিলিওনেয়ার প্রথম গণনাযন্ত্র যার দ্বারা সরাসরি গুণ করা যেত। পূর্বের সকল যন্ত্রে গুণের জন্য পুনঃপুনঃ যোগ করা হত। কিন্তু মিলিওনেয়ার যন্ত্রে গুণ করার জন্য কেবল এর ক্রাংক এবং হ্যান্ডল এর একবার ঘূর্ণনই ছিলো যথেষ্ট ছিলো। এই পদ্ধতিতে পুরো সংখ্যাটিকে এর গুণক দ্বারা সরাসরি গুণ করা যেত।

সভ্যতার অগ্রগতিতে আধুনিক সময়ে আমরা অনায়াসে যে ডিজিটাল ক্যালকুলেটর ব্যবহার করি সেটি অবশ্যই রাতারাতি আবিষ্কার হয়নি। সেই আদিম পদ্ধতির পর যান্ত্রিক পদ্ধতি এবং পরিশেষে এই ইলেক্ট্রনিক পদ্ধতি- সবই একটি পরম্পরা মেনে চলে আসছে। যার বর্তমান স্বরূপ আজকের আধুনিক ক্যালকুলেটর বা আরো আধুনিক কম্পিউটার।

তথ্যসূত্রঃ

১) mortgagecalculator.org/helpful-advice/abacus.php

২) mathandmultimedia.com/2013/07/24/mechanical-calculators/

৩) thecalculatorsite.com/articles/units/history-of-the-calculator.php

৪) meta-calculator.com/blog/what-was-used-before-calculators/

৫) mathtimeline.weebly.com/early-human-counting-tools.html