যেভাবে নভোচারীদের মহাকাশ যাত্রার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়

১৯৬১ সালের ১২ এপ্রিল। এই দিনটিতে মানবজাতি নতুন এক ইতিহাস সৃষ্টি করে। প্রথমবারের মতো কোনো মানুষ মহাকাশ যাত্রা করে। তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের পাইলট ইয়ুরি অ্যালেকসেভিচ গ্যাগারিন প্রথম মহাকাশচারী হওয়ার কৃতিত্ব অর্জন করেন। ভস্টক ১ নামক স্পেস ক্যাপসুলে করে তিনি প্রায় ৮৯ মিনিট পৃথিবীর কক্ষপথ পরিভ্রমণ করে এসেছিলেন।

পৃথিবীর প্রথম মহাশূন্যচারী ইউরি গ্যাগারিন; Image Source: wallpaperswide.com

আট বছর পরের কথা। ১৯৬৯ সালের ২০ জুলাই। এই দিনটি মানব জাতির অর্জনের খাতায় যোগ আরো একটি বিরাট সাফল্য। মানুষ প্রথমবারের মতো চাঁদে অভিযান করে। প্রায় তিন ঘণ্টার এই সফল অভিযান সমগ্র মানব সম্প্রদায়কে মনে করিয়ে দেয় যে, মানুষের দ্বারা কোনো কিছুই অসম্ভব নয়। যে চাঁদকে নিয়ে রূপকথার শেষ ছিল না, সেই রহস্যময় সুন্দর বস্তুটি মানুষের পায়ের স্পর্শে অলংকৃত হয়।

চন্দ্র বিজয়ের তিন কারিগর (বাম থেকে) নীল আর্মস্ট্রং, মাইকেল কলিন্স ও বাজ আলড্রিন; Image Source: flickr.com

একশো বছর আগেও মানুষ মহাকাশ যাত্রা নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামাতো না। মানুষের জ্ঞানের সীমা পৃথিবীর গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু বিজ্ঞানের আসলে কোনো নির্দিষ্ট সীমা নেই। সময়ের সাথে সাথে তা আমরা উপলব্ধি করতে থাকি। আর এভাবেই সকল জল্পনা কল্পনাকে বাস্তব রূপ দান করে আমরা মহাকাশের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমাতে সক্ষম হয়েছি। কিন্তু এই অভিযান আসলে কোনো সহজ কাজ নয়। একজন অভিযাত্রীর নিজেকে মহাকাশ ভ্রমণের উপযুক্ত হিসেবে তৈরি করতে অনেক ঝক্কি পোহাতে হয়। বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণ, শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধকতার সাথে যুদ্ধ করে অবশেষে নিজেকে যোগ্য প্রমাণ করতে হয়। প্রযুক্তির উৎকর্ষ সাধনের সাথে সাথে মহাকাশ যাত্রার প্রস্তুতিতেও ব্যাপক পরিবর্তন আসে। আজ তাই আমরা আলোচনা করবো কীভাবে একজন নভোচারী নিজেকে মহাকাশ ভ্রমণের জন্য প্রস্তুত করেন, সেই সম্পর্কে।

মানুষের জীবনের অন্যতম কঠিন চ্যালেঞ্জ হলো মহাশূন্যে যাত্রা; Image Source: theverge.com

কোন পেশার মানুষেরা মূলত মহাকাশ যাত্রা করে থাকেন?

মহাকাশ ভ্রমণের একেবারে শুরুর দিকে বিমান চালকেরা ছিলেন এমন অভিযানের জন্য সবচেয়ে বেশি উপযুক্ত। পৃথিবীর কক্ষপথের বাইরের পরিবেশ সম্পর্কে আমজনতার কোনো অভিজ্ঞতা না থাকায় এই পেশার মানুষদেরকেই প্রথমে প্রাধান্য দেওয়া হতো। উচ্চমানের মিলিটারি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সৈনিক, যাদের নানা প্রতিকূল পরিবেশের মুখোমুখি হওয়ার অভিজ্ঞতা রয়েছে, তাদের প্রাধান্য ছিল এখানে সবার থেকে বেশি। তবে সময়ের সাথে সাথে মহাকাশ অভিযাত্রীদের তালিকায় ভিন্ন ভিন্ন পেশার মানুষের প্রবেশ ঘটতে শুরু করে। সৈনিকদের পাশাপাশি ডাক্তার, বিজ্ঞানী, এমনকি শিক্ষকরাও এই দলে অংশ নেন। নানা রকম মিশনের উদ্দেশ্যে প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী, ডাক্তার ও সৈনিকদের নিয়ে একটি বহুমুখী কর্মশক্তি সম্পন্ন দল গঠন করে তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়।

প্রশিক্ষণরত অবস্থায় একদল অভিযাত্রী; Image Source: thoughtco.com

উপরোক্ত পেশার মানুষ ছাড়া অন্য কোনো পেশার মানুষ যে মহাকাশ ভ্রমণ করতে পারবে না এমনটি নয়। মূলত একজন দক্ষ বিমান চালকের দায়িত্ব থাকে নিরাপদে একটি মহাকাশযান বা স্পেস শাটল চালনা করা। একজন প্রকৌশলী নানা কারিগরি বিষয়াদি পর্যালোচনা করেন। কোনো ক্রু মেম্বার হঠাৎ অসুস্থ হয়ে গেলে ডাক্তার তার চিকিৎসা করেন। আর বিজ্ঞানী ও গবেষকদের পাঠানো হয় পর্যবেক্ষণের জন্য।

তবে মিশনের প্রয়োজন অনুযায়ী একটি দলে আরো ভিন্ন ভিন্ন পেশার সংমিশ্রণ ঘটতে পারে। বর্তমানে প্রযুক্তির আধুনিকীকরণের জন্য এমনটি সম্ভব হয়েছে। এই যেমন, দীর্ঘ সময় মহাকাশে থাকার কারণে কোনো নভোচারীর স্পেস সিকনেস তৈরি হতে পারে। এজন্য এখন মনোরোগ বিশেষজ্ঞদেরও মহাকাশে পাঠানো হয় নভোচারীদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখার জন্য। অনেক সময় জটিল কোনো অভিজানের জন্য স্বেচ্ছাসেবকও নিয়োগ দেওয়া হয়। পৃথিবীর সর্বাধিক বিখ্যাত মহাকাশ সংস্থা নাসার এমন বেশ কিছু নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ কর্মশালা রয়েছে। এই বহুমুখী প্রশিক্ষণ কর্মশালাগুলোর আবার নানা ধাপও রয়েছে। একেকটি ধাপে একজন উঠতি নভোচারীকে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়।

মহাকাশ সংস্থাগুলোর মাঝে নাসা সবচেয়ে বিখ্যাত; Image Source: ppcorn.com

নাসার নভোচারী বাছাই পদ্ধতি

নাসার তত্ত্বাবধানে চালিত জনসন স্পেস সেন্টার হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নভোচারী প্রশিক্ষণের প্রাণকেন্দ্র। যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে আসা অভিযাত্রীদের এখানে মহাকাশে থাকা ও কাজ করার উপর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। ১৯৫৯ সালে প্রথম এখানে মার্কিন নভোচারী নির্বাচন করা হয়েছিল। এরপর থেকে প্রায় ৩২১ জন মার্কিন নভোচারী ও অন্যান্য দেশের প্রায় ৫০ জন নভোচারীদের এখানে প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত হয়েছেন। বর্তমানে ২৪০ জন মার্কিন নারী ও পুরুষ এবং ১৩০ জন আন্তর্জাতিক অভিযাত্রীদের সমন্বয়ে নাসার অ্যাস্ট্রোনট কর্পস কাজ করছে। এই অভিযাত্রী দলের বেশির ভাগ মানুষ প্রকৌশলী, গবেষক এবং মিলিটারি ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে এসেছেন।

উড়ন্ত বিমান হতে পুরো সীমানা জুড়ে জনসন স্পেস সেন্টারের ছবি ধারণ করা হয়েছে ; Image Source: researchgate.com

জনসন স্পেস সেন্টারে নভোচারীদের বাছাই পদ্ধতি পৃথিবীর অন্যতম প্রতিযোগিতামূলক একটি পরীক্ষা হিসেবে দাবি করা হয়। নভোচারী হতে উৎসুক একজন ব্যক্তির সব রকম শারীরিক ও মানসিক কর্মক্ষমতা এখানে যাচাই করা হয়। তারা নিজ পেশায় কতটা দক্ষ, সেটি দ্বারা তাদের এখানে বিচার করা হয়ে থাকে। এভাবে বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাওয়ার পরই অভিযাত্রী হওয়ার জন্য মনোনীত হন কেউ। কিন্তু এতেই কাজ সমাপ্ত হয়ে যায় না। বরং নির্বাচিত সদস্যদের আসল প্রশিক্ষণ ঠিক এরপর থেকেই শুরু হয়। একটি মিশনে যাওয়ার আগে নভোচারীদের অত্যন্ত জটিল সব প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে যাওয়া লাগে। এভাবে মহাকাশ ভ্রমণের উপযুক্ত হিসেবে তৈরি হতে একজন উঠতি নভোচারীর প্রায় দুই বছর সময় লেগে যায়।

দুই বছর পর নভোচারীদের বিভিন্ন মিশন ভিত্তিক অ্যাসাইনমেন্ট দেওয়া হয়। তাদের জন্য বিশেষ বুট ক্যাম্পের ব্যবস্থা করা হয়ে থাকে। এখানে তারা সংশ্লিষ্ট মিশনের উপর পড়াশোনা করেন। তাদেরকে স্পেস শাটল ও আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের নানা সিস্টেম সম্পর্কে শিক্ষা দেওয়া হয়। পরিবেশ বিজ্ঞান, মিটিওরোলজি বা আবহবিদ্যা,জ্যোতির্বিদ্যা, প্রকৌশল ইত্যাদি বিষয়ে তাদের ক্লাস নেওয়া হয়ে থাকে। এছাড়াও তাদের বিভিন্ন প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকা, যেমন- পানির নিচে স্কুবা ডাইভিং, এয়ারক্রাফট অপারেশন ইত্যাদি বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। অবশেষে নতুন প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত নভোচারীদের ও অভিজ্ঞ নভোচারীদের একত্র করে নির্দিষ্ট মিশন ভিত্তিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়।

বিভিন্ন পেশার মানুষদের একত্র করে একটি অভিযাত্রী দল গঠন করা হয় ; Image Source: science.howstuffworks.com

মূলত নভোচারীদের দুই ভাগে ভাগ করা হয়। এরা হলেন পাইলট ও মিশন স্পেশালিস্ট। পাইলটদের কাজ হলো মহাকাশযান বা স্পেস শাটল যাতে নির্বিঘ্নে যাত্রা করতে পারে তা নিশ্চিত করা। আর মিশন স্পেশালিস্টরা যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণ, মহাকাশে নমুনা সংগ্রহ, বিভিন্ন রোবোটিক ও রোভার সম্পর্কিত কাজ পরিচালনা, বৈজ্ঞানিক গবেষণা ইত্যাদির দায়িত্ব নিয়ে থাকেন। এভাবেই একদল নভোচারীদের নাসায় কোনো নির্দিষ্ট অভিযানের জন্য বাছাই ও প্রস্তুত করা হয়।

যেরকম শারীরিক ও মানসিক দক্ষতা একজন নভোচারীর থাকা প্রয়োজন

নভোচারী হতে গেলে একজন ব্যক্তিকে শারীরিক দিক থেকে শতভাগ ফিট হতে হবে। অর্থাৎ দুর্বল শারীরিক গড়নের মানুষেরা মহাকাশে অভিযানের জন্য উপযুক্ত নন। যেকোনো পেশার একজন নভোচারীকে উচ্চতায় কমপক্ষে ১৪৭ সেন্টিমিটার লম্বা হতে হবে। তবে শারীরিক গড়নের ব্যাপারটা বিভিন্ন রাষ্ট্রভিত্তিক মহাকাশ সংস্থার ক্ষেত্রে ভিন্ন হতে পারে। কিছু কিছু বিষয়ে যদিও কর্মদক্ষতা যাচাই করার প্রক্রিয়া প্রায় একই রকম। এই যেমন প্রশিক্ষণরত অবস্থায় ব্যক্তির শারীরিক ও মানসিক ধৈর্য পরীক্ষা, তার দৃষ্টিশক্তি কেমন, শরীরের রক্তচাপ স্বাভাবিক কিনা ইত্যাদি অনুসারে যাচাই বাছাই করা হয়। দলগত কাজে প্রতিনিধিত্ব করা, অন্যান্য সদস্যদের সাথে সৌহার্দ্য বজায় রাখা ইত্যাদি বিষয়ও নির্বাচক কমিটি গুরুত্বের সাথে পর্যবেক্ষণ করে থাকেন। একজন ব্যক্তির নভোচারী হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার জন্য কোনো নির্দিষ্ট বয়স সীমা নেই। মূলত ২৫ থেকে ৪৬ বছর বয়সের নভোচারীদেরই বেশির ভাগ সময় মহাকাশ ভ্রমণ করতে দেখা যায়। তবে এর থেকেও বেশি বয়সের ব্যক্তিদের মহাকাশ ভ্রমণের উদাহরণ পাওয়া যায়।

ভর শূন্য পরিবেশে শারীরিক চর্চার একটি দৃশ্য ; Image Source: nasa.gov

কাজেই একজন নভোচারী হতে ইচ্ছুক ব্যক্তি যে পেশারই হোন না কেন, তাকে অবশ্যই সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হতে হবে। এখানে সুস্বাস্থ্য বলতে বোঝানো হচ্ছে, যার রোগ বালাই তুলনামূলক কম এবং যিনি বিভিন্ন ধরণের প্রতিকূলতা জয় করার সামর্থ্য রাখেন। সবল দেহ, দৃঢ় মনোবল, কষ্টসহিষ্ণুতা এবং নিজ পেশায় দক্ষতা থাকলে তবেই একজন নভোচারী হওয়ার স্বপ্ন দেখতে পারেন।

যে ধরণের প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে একজন নভোচারীকে যেতে হয়

একজন উঠতি নভোচারীকে মূলত দুই ধরণের প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। এই দুই ধরণের প্রশিক্ষণের ফলাফলের ভিত্তিতে অবশেষে তাদের মহাকাশ ভ্রমণের জন্য প্রস্তুত করা হয়ে থাকে।

শিক্ষাগত প্রশিক্ষণ

একজন নভোচারীর কী ধরণের শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে, তা তার পেশার উপর নির্ভর করে। একজন পাইলট বা বিমান চালক মহাকাশযান কীভাবে নিয়ন্ত্রন করতে হবে, তার উপর প্রশিক্ষণ নেন। পিএইচডি ডিগ্রিধারী বিজ্ঞানীরাও মহাকাশ যাত্রায় অংশ নেন। তাই তাদের নির্দিষ্ট বিষয়ের উপর বিস্তার গবেষণা করার দরকার হয়। এছাড়াও রয়েছেন বিভিন্ন প্রকৌশলীর দল, যারা মহাকাশ যাত্রার জন্য ব্যবহৃত নানা যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণ ও পর্যালোচনা করে থাকেন।

এসব একান্ত ব্যবহারিক কাজ ছাড়াও মহাকাশচারীদের শ্রেণীকক্ষে নানা তাত্ত্বিক বিষয়ে জ্ঞানার্জন করতে হয়। এই যেমন হাবল টেলিস্কোপের কাজ সম্পর্কে জানা, আন্তর্জাতিক স্পেস স্টেশনের বিভিন্ন অনুষঙ্গ সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা থাকা এবং অন্যান্য খুঁটিনাটি মহাকাশ সম্পর্কিত বিষয়, যা একজন নতুন নভোচারীর জন্য জানা অত্যাবশ্যকীয়।

শারীরিক চর্চা ছাড়াও প্রশিক্ষণরত ব্যক্তিদের পড়াশোনার ব্যবস্থা করা হয় ; Image Source: cnbc.com

শারীরিক প্রশিক্ষণ

এটি হলো মহাকাশচারীদের সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণের ধাপ। প্রথমত একজন শিক্ষানবিশ নভোচারীকে জিরো গ্রাভিটি বা ভর-শূন্য অবস্থায় কীভাবে মানিয়ে নিতে হবে, তা শেখানো হয়। প্রযুক্তির সহায়তায় বর্তমানে একটি কক্ষের মধ্যে মহাকাশের মতো ভর-শূন্য অবস্থা তৈরি করা যায়। তবে এখন একটি কক্ষকে ভর-শূন্য করার তুলনায় পানির তলদেশে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করানোকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। পানির নিচে ভর-শূন্য অবস্থা তৈরি হয় বলে এখানে নানা ধরণের নকল মিশন বা মক মিশন পরিচালনা করা হয়ে থাকে।

ভর শূন্য পরিবেশে মানিয়ে নেওয়ার প্রশিক্ষণ ; Image Source: gizmodo.co.uk

 মহাকাশের পরিবেশ একটা মানুষের জন্য সব দিক থেকে প্রতিকূল। তাই এর জন্য প্রস্তুত হতে অনেক দীর্ঘমেয়াদী প্রশিক্ষণ আবশ্যক। পৃথিবীর পরিবেশে ১জি গ্রাভিটির মধ্যে বেড়ে ওঠা একটি শরীরকে মহাকাশে প্রায় ভর শূন্য একটা পরিবেশের সাথে মানিয়ে নেওয়া অনেক কঠিন। দেহের অভ্যন্তরীণ নানা কর্মকাণ্ড এই নতুন পরিবেশের জন্য নতুন ভাবে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। একারণেই উঠতি নভোচারীদের জন্য নানা বহুমুখী প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়।

নাসার ‘ভমিট কমেট’ নামের এক বিশেষ এয়ারক্রাফট রয়েছে। এই এয়ারক্রাফটের মাধ্যমে নভোচারীদের ভর-শূন্য পরিবেশে ভেসে থাকার ও দৈনন্দিন কাজ করার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এছাড়াও নিউট্রাল বুওয়েন্সি ট্যাংক নামের এক সুইমিংপুল সদৃশ ট্যাংকে তাদের ভর শূন্য অবস্থায় নানা এক্সট্রাভেহিকুলার কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা শিখতে হয়। পানি ভর্তি এই ট্যাংকে যন্ত্রের সাহায্যে ব্যক্তির শরীরের ঘনত্বের সাথে পানির ঘনত্ব মিলিয়ে নেওয়া হয়। এতে কেউ ডুবে না গিয়ে বরং ভরহীন অবস্থায় ভাসতে পারে।

উড়ন্ত অবস্থায় নাসার ভমিট কমেট উড়োজাহাজ ; Image Source: vice.com
পানির নিচে জটিল প্রশিক্ষণের চিত্র ; Image Source: nasa.gov

ভার্চুয়াল রিয়ালিটি আসার পর তা মহাকাশ যাত্রার প্রশিক্ষণের আমূল পরিবর্তন করে দিয়েছে। নাসা ছাড়াও অন্যান্য মহাকাশ সংস্থাগুলো এটির প্রয়োগ ঘটিয়ে নানা প্রকার নকল স্পেস মিশন পরিচালনা করছে। এতে করে মহাকাশ সদৃশ পরিবেশে  নভোচারীরা বাস্তবের সমতুল্য অভিজ্ঞতা লাভ করতে পারছে। মহাকাশযানের সঠিকভাবে অবতরণ নিশ্চিত করার জন্য ও নানা প্রকার প্রতিকূল অবস্থা মোকাবেলার জন্য ভার্চুয়াল রিয়ালিটি ট্রেনিংয়ের কোনো বিকল্প নেই।

ভার্চুয়াল রিয়ালিটি  নভোচারীদের প্রশিক্ষণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে ; Image Source: inverse.com

মহাকাশ যাত্রার ভবিষ্যৎ

একশত বছর আগেও হয়তো আমরা কল্পনা করতে পারিনি যে, একদিন আমরা আমাদের অস্তিত্বের চিহ্ন মহাশূন্য পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারবো। নানা প্রকার কল্পনাকে বাস্তবে রূপান্তরিত করাই এখন মানবজাতির লক্ষ্য। তাই সময়ের সাথে সাথে মহাকাশ যাত্রা যে আরো সহজ হবে তা বাস্তবতারই অংশ। স্পেস টুরিজমকে তাই কোনো ভ্রান্ত ধারণা হিসেবে ফেলে দেওয়া যাবে না। দেশ-বিদেশ ভ্রমণের মতো মহাকাশে ভ্রমণও হয়ত একদিন সাধারণ জনগণের কাছে স্বাভাবিক একটা ব্যাপার হয়ে যাবে।

তবে একটা বিষয় আমাদের অবশ্যই মাথায় রাখতে হবে। মহাকাশ যাত্রা অনেক কঠিন একটা কাজ। টাকা-পয়সা, ভিসা, পাসপোর্ট থাকলেই যেমন সারা বিশ্বে ভ্রমণ করা যায়, এই ভ্রমণ ঠিক সেরকম নয়। একজন নভোচারীকে মহাকাশে যাওয়ার জন্য বছরের পর বছর প্রশিক্ষণ নিতে হয়। নিজের শরীর ও মনকে মহাকাশের সুন্দর কিন্তু একাকী ও প্রতিকূল সেই পরিবেশের জন্য প্রস্তুত করতে হয়। শুধু এমনি এমনি মহাকাশ ভ্রমণকে সর্বকালের সেরা চ্যালেঞ্জ বলা  হয় না। কারণ কেবল যোগ্যতা থাকলেই হয় না, এর জন্য একজন ব্যক্তিকে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়।

একদিন হয়ত আমরা আমজনতারাও এভাবে মহাশূন্যে ছবি তুলতে পারবো ; Image Source: wallpaperbetter.com

This article is about the selection and rigorous training of astronauts for space travelling. Necessary reference have been hyperlinked within the article. 

Feature Image Source: wallpaperswide.com

Related Articles