মিতসুবিশি আউটল্যান্ডার: অজানা রোমাঞ্চকর যাত্রার সঙ্গী

মিতসুবিশি আউটল্যান্ডার! নামটা হয়তো অনেকেরই নজর এড়িয়ে যেতে পারে, তবে এই ফ্যামিলি কারটির রয়েছে নিজস্ব অসাধারণ কিছু গুণ। ৭ আসন বিশিষ্ট এই কম্প্যাক্ট ক্রসওভার SUV গাড়িটির ভেতর বেশ বড় এবং দূরপাল্লার যেকোনো যাত্রার জন্যে যথেষ্ট আরামপ্রদ। এমনকি এবড়ো-থেবড়ো রাস্তায় আউটল্যান্ডার ছুটে চলে মসৃণ গতিতে।

গাড়িটির প্রথম দেখা মিলেছিল ২০০১ সালের জানুয়ারি মাসে উত্তর আমেরিকান অটো শোতে। সেখানে গাড়িটিকে প্রদর্শন করা হয় মিতসুবিশি ASX (Active Sports Crossover) নামে একটি কনসেপ্ট কার হিসেবে। তারপর সে বছরই এই সংস্করণের উপর ভিত্তি করে তৈরি আরেকটি গাড়ির মুখ দেখে জাপানের বাজার। মিতসুবিশির নির্মাতারাও যে সব মৌসুমে, সব ধরনের রাস্তায় চলতে পারার মতো গাড়ির শিল্পে পা রাখতে যাচ্ছেন, সেটা জানান দেয়ার লক্ষ্যেই মূলত The ASX গাড়িটিকে প্রদর্শন করা হয়েছিল মিতসুবিশির একটি প্রতিনিধি হিসেবে।

২০০১ মিতসুবিশি এয়ারটেক; Source: Wikimedia Commons

২০০১ সালের ২০ জুন জাপানী মার্কেটে প্রথমবারের মতো এই গাড়িটি নিয়ে আসা হয় ‘মিতসুবিশি এয়ারট্রেক’ নামে। Airtrek শব্দটি মূলত দুটো শব্দের সমন্বয়ে গঠিত; যার প্রথমাংশ অর্থাৎ Air অর্থ বাতাস, এবং Trek বলতে মূলত মুক্ত বিহঙ্গ সদৃশ রোমাঞ্চকর ভ্রমণ অভিজ্ঞতাকে বোঝায়। এ নামটি বেছে নেয়া হয়েছিলো, যাতে করে সহজেই বোঝানো যায় এই গাড়িটির রোমাঞ্চকর গতিতে ছুটে চলার ক্ষমতা, যা যাত্রীকে অনেকটা ‘পাখির মতো ওড়া’ ধারণাটির কথা বারবার মনে করিয়ে দিতে সক্ষম।

আউটল্যান্ডারের প্রথম গাড়িটির ছিল দুটি আলাদা সংস্করণ, এর একটির ছিল ১২৬ হর্সপাওয়ার বিশিষ্ট ফোরজিসিক্সটিথ্রি ২.০ লিটার ইঞ্জিন এবং অন্যটি ১৩৯ হর্সপাওয়ারের ফোরজিসিক্সটিফোর ২.৪ লিটার ইঞ্জিন। আর সাথে একটি আদর্শ মানের INVECS II ফোর-স্পিড সেমি অটোমেটিক ট্রান্সমিশন। ফ্রন্ট-হুইল কিংবা ফোর-হুইল, দুই ধরনের গাড়িই তখন বাজারে পাওয়া যাচ্ছিল। ফোর-হুইল ড্রাইভ সংস্করণটির সামনের ও পেছনের এক্সেলের জন্য ওপেন ডিফারেন্সিয়াল, সঙ্গে কেন্দ্রিক ডিফারেনশিয়ালের জন্যে একটি আঠালো কাপলিং ইউনিট ব্যবহার করা হয়েছিল। তারপর ২০০২ সালে টার্বো আর নামের উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন একটি গাড়ি বাজারে আসে, যাতে ব্যবহার করা ইঞ্জিনটি ছিল তখনকার ল্যান্সার ইভ্যুলেশন ফোরজিসিক্সটিথ্রি ২.০ লিটার আইফোর টার্বো খানিকটা পূর্বতন মানের। সব মিলিয়ে এই গাড়িটি অল্প দিনে ভালোই সুনাম কুড়িয়ে নিয়েছিল।

দ্বিতীয় প্রজন্মের গাড়ি বাজারে আসে ২০০৬ সালে। সেই সময়ই আন্তর্জাতিক বাজারে মিতসুবিশি আউটল্যান্ডার নামটির প্রচলন শুরু হয়। মিতসুবিশি আউটল্যান্ডারের ট্যাগলাইন ছিল “আগে কোনোদিনই পা ফেলা হয়নি এমন সুদূরভূমিতে রোমাঞ্চের খোঁজে পাড়ি দেবার মতো অসাধারণ সে অনুভূতি!” মিতসুবিশির দ্বারা নির্মিত বিভিন্ন ইঞ্জিন (ভোক্সওয়াগেন ও পিএসএ পিওগট কাইটোরন) ব্যবহার করে, কোম্পানির জিএস প্ল্যাটফর্মে গাড়িটি প্রস্তুত করা হয়। পিএসএ কাইটোরন সি-ক্রসওভার ও পিওগট ৪০০৭ জাপানে মিতসুবিশি দ্বারাই নির্মিত হয়েছিল। এগুলো ছিল মিতসুবিশি আউটল্যান্ডার সেকেন্ড জেনারেশনের ব্যাজ ইঞ্জিনিয়ার্ড সংস্করণ। ২০১৬ সালের অক্টোবরের দিকে গাড়িটির বিক্রিত ইউনিটের পরিমাণ ১.৫ মিলিয়নের ঘরে পৌঁছায়।

মিতসুবিশি আউটল্যান্ডার সেকেন্ড জেনারেশন; Source: Wikimedia Commons

ইউরো NCAP এর গাড়ি নিরাপত্তা সূচির পর্যালোচনায় মিতসুবিশির RISE সেইফটি বডি সম্বলিত দ্য আউটল্যান্ডারকে ৫ এর ভেতর ৪ তারকা মার্ক দেওয়া হয়। এই গাড়ির একটি বিশেষ গুণ হচ্ছে এর ফ্লিপ ফ্লপ টেইলগেইট। খুব সাবলীলভাবে ভারি মালামাল বা যাত্রী বোঝাইয়ের ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে এই বিশেষ ফিচার। ফলে ১৮০ কেজি ওজন পর্যন্ত যেকোনো মালামাল অনায়াসে বহন করে মাইলেই পর মাইল গাড়ি চালিয়ে আনা যায়।

মিতসুবিশি ২০১২ সালের জেনেভা মোটর শো’তে প্রথমবারের মতো প্রদর্শন করে তৃতীয় প্রজন্মের আউটল্যান্ডার। পুনর্সজ্জিত এই মডেলটি ওজনে পূর্বসূরিদের তুলনায় অন্তত ৯০ কিলোগ্রাম হালকা ছিল। এর ফলে গাড়িটির ‘ড্র্যাগ কোইফিশিয়েন্ট’ কমে দাঁড়ায় ০.৩৩, যার ফলে জ্বালানি ব্যয়ের পরিমাণ আগের তুলনায় অনেকটাই কমে আসে। গাড়ির অভ্যন্তরীন অংশে ড্যাশবোর্ড এবং বাইরে সামনের দরজাটা ‘সফট টাচ ম্যাটেরিয়াল’-এর প্রলেপ দেওয়া, সিটগুলো পুনর্সজ্জিত এবং কেবিনকে আগের তুলনায় আরো স্বাচ্ছন্দ্যকর করে তোলার উদ্দেশ্যে শব্দরোধী ব্যবস্থা রয়েছে।

আউটল্যান্ডার P-HEV; Source: Wikimedia Commons

তৃতীয় প্রজন্মের এই আউটল্যান্ডারে অংশ হিসেবে মিতসুবিশি একটি প্লাগ-ইন হাইব্রিড মডেল চালু করে যা আউটল্যান্ডার P-HEV নামে পরিচিত। সীমান্তবর্তী এলাকায় এটি ব্যাপক সাফল্য লাভ করে। বিশ্বব্যাপী ক্রমযোজিত বিক্রয় মার্চ ২০১৬ এর মধ্যে ১ লক্ষ ইউনিটের মাইলফলক অতিক্রম করে। ডিসেম্বর ২০১৬ অনুযায়ী, ইউরোপে বিক্রি হয়েছে প্রায় ৮০ হাজার ইউনিট এবং জাপানে ৩৫ হাজারের কাছাকাছি। ২০১৪ সালে ইউরোপে শীর্ষ বিক্রিত প্লাগ-ইন ইলেকট্রিক গাড়িটি ছিল আউটল্যান্ডার P-HEV। এমনকি ২০১৫ সালে ইউরোপের সবচেয়ে বিক্রি হওয়া প্লাগ-ইন হাইব্রিড কার হিসেবে শীর্ষস্থানে থাকার মাইলফলক ছুঁতে সক্ষম হয়। ২০১৬ সালের ডিসেম্বরের হিসেবে, বিশ্বব্যাপী ১ লক্ষ ২০ হাজার ইউনিট বিক্রি হওয়া আউটল্যান্ডার P-HEV, বিশ্বের সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বিক্রিত প্লাগ-ইন হাইব্রিড গাড়ির তালিকায় দ্বিতীয় এবং বিশ্বের সর্বকালের শীর্ষ প্লাগ-ইন বৈদ্যুতিক গাড়ির তালিকার চতুর্থ হতে সক্ষম হয়।

মিতসুবিশি আউটল্যান্ডার ২০১৮ © Mitshubishi Motors

২০১৮ সালে বাজারে এসেছে মিতসুবিশি আউটল্যান্ডারের নতুন মডেল। ২.৪ লিটারের ফোর সিলিন্ডার ইঞ্জিন বিশিষ্ট এই আউটল্যান্ডারের রয়েছে ১৬৬ অশ্বক্ষমতা। অ্যাক্সিলারেশন আরামসে ১০ সেকেন্ডের মধ্যে ০ থেকে ৬০ মাইল পর্যন্ত উঠতে পারে। এর রয়েছে ১২ কিলোওয়াট ঘণ্টার ইনলাইন-৪ ব্যাটারি ও প্লাগ-ইন হাইব্রিড ক্রসওভার ইলেকট্রিক মোটর। বাজারে খুব কম গাড়িই এই হাইব্রিড ক্রসওভার ব্যবহার করে থাকে। মিতসুবিশির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই আউটল্যান্ডার PHEV ইল্কট্রনের উপরেই ২২ মাইল পর্যন্ত চলতে পারে। ২০১৮ আউটল্যান্ডারে তিন সারিতে বসার ব্যবস্থা রয়েছে, যা কিনা পরিবার কিংবা বন্ধুবান্ধবদের নিয়ে ঘোরার জন্যে আদর্শ। আর বেশি জায়গার দরকার পড়লে সহজেই দ্বিতীয় ও তৃতীয় সারিকে ভাঁজ করে নিজের প্রয়োজনমত জায়গা করে নেওয়া যায়।

মিতসুবিশি আউটল্যান্ডার ২০১৮ © Mitshubishi Motors

বাজারজাত করার পর থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত মিতসুবিশি আউটল্যান্ডার তার স্বকীয়তা অক্ষুণ্ণ রেখেছে। সেই কার্যকারিতা, দারুণ ডিজাইন আর অসাধারণ পার্ফরমেন্স বজায় রেখেছে এতদিন ধরে বলেই নয়, বরং দিনে দিনে নিজেকে আরো শাণিত করে তুলেছে বলেও। ক্রমবর্ধমান বাজার আর হাইব্রিড মডেলে সহজলভ্য প্লাগইন এই গাড়িটিকে করে তুলেছে আরো আকর্ষণীয়। এই মুহূর্তে গাড়ির বাজারে হাজারো গাড়ির ভিড়ে আউটল্যান্ডারের স্থান তাই এখনো যথেষ্ট পাকাপোক্ত, আর তা খুব শিগগিরই যে পড়তির দিকে যাবে না, সেটি আশা করাই যায়!

ফিচার ইমেজ- Superstreetonline

Related Articles