কিম জং উনের মিসাইল রুখতে সম্পূর্ণ প্রতিশ্রুতিশীল প্রতিরক্ষক এখনও তৈরি হয়নি

‘লিটল রকেট ম্যান’ হিসেবে খ্যাত উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন। বিভিন্ন সময় তার নিজ দেশের প্রতিরক্ষা বিভাগের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে নেতৃত্ব প্রদান করার জন্য, তার দেয়া হুমকির জন্য, নিজের ব্যক্তিগত জীবনযাত্রার জন্য আলোচনায় আসেন এই ব্যক্তি। জাপানকে গুঁড়িয়ে দেয়া, আমেরিকাতে হামলা করা ইত্যাদি বিভিন্ন রকমের ঘোষণা তার কাছ থেকে পুরো বিশ্ববাসী পেয়েছে।

তার যেকোনো হুমকিতেই মিসাইল শব্দটি একটি অগ্রগণ্য স্থান পেয়ে থাকে। তিনি মিসাইল দিয়েই যেকোনো রাষ্ট্র গুঁড়িয়ে দিতে পারেন। তার দেশের প্রতিরক্ষা বাহিনীর হাতে সেই অস্ত্র আছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের পক্ষ থেকেও উত্তর কোরিয়াকে ধ্বংস করে দেয়ার অপ্রত্যক্ষ হুমকি এসেছে। তাই বিভিন্নভাবে গত কয়েক মাস থেকে মিসাইল শব্দটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এজন্য বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে উন্নত এবং উন্নয়নশীল কোন কোন দেশ কী পরিমাণ মিসাইল তৈরি করে রেখেছে, সেসবের শক্তি কী রকম এবং তাদের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হতে পারে বা ওই রাষ্ট্র থেকে তাদের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের কোনো নতুন বিল পাস হলো কিনা এসব নিয়ে চুল চেরা বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।

উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের প্রিয় শব্দ মিসাইল; Source: Business insider

এই বছরেই ট্রাম্পের সরকার থেকে  Missile Defence Agency (MDA)– এর ফান্ডিং নিয়ে ঘোষণা আসার কথা। ধারণা করা হচ্ছে, ২০১৮ এর জন্য এগারো বিলিয়ন ডলারের বেশী অর্থ ঘোষণা করা হতে পারে। মিসাইল ডিফেন্সের জরুরি কোনো বিশেষ কাজের জন্য পাঁচ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ করা হয়েছে গত বছরের নভেম্বরে।

ট্রাম্প যখন ক্ষমতায় আসেন, তখন যুক্তরাষ্ট্রের ইন্টেলিজেন্স থেকে তাকে নিশ্চিত করা হয়েছিলো যে কিমের হাতে Intercontinental Ballistic Missile (ICBM) ২০২২ সালের আগে কখনোই আসতে পারবে না। কিন্তু পরে দেখা যায় যে গত জুলাই মাসে উত্তর কোরিয়া দুটি এমন মিসাইল টেস্ট করে যেটা যুক্তরাষ্ট্রের শহরগুলোতে আঘাত হানতে সক্ষম। আবার একই বছরের সেপ্টেম্বর মাসে মাটির নিচে থার্মো-নিউক্লিয়ার বিস্ফোরণ টেস্ট করে তারা।

ট্রাম্প এবং কিম- দুই দেশের দুই নেতা। কেউ কাউকে দেখতে পারেন না; Source: alqabas.com

এরপরে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য তাদের জনগণকে বিশ্বাস করানো কঠিন হয়ে পড়ে যে যুক্তরাষ্ট্র উত্তর কোরিয়ার মিসাইল আক্রমণ থেকে নিরাপদ এবং যেকোনো ক্ষেপণাস্ত্র তাদের দিকে আসলে তা দমন করার মতো শক্তি এবং প্রযুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষাবাহিনীর আছে। এরই মধ্যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ফক্স নিউজে এসে বিবৃতি দেন যে তাদের কাছে এমন কিছু মিসাইল আছে যেগুলো ১০০ বারের মধ্যে ৯৭ বারই শত্রুর ছোড়া মিসাইলগুলোকে ধ্বংস করে ফেলতে সক্ষম। যদি তারা দুটি মিসাইল ছুড়ে দুটিই ধ্বংস হয়ে যাবে।

ট্রাম্পের এই ধরনের ঘোষণায় এবং বিবৃতিতে যারা মিসাইল এক্সপার্ট তারা বেজায় ঝামেলার মধ্যে পড়ে গিয়েছেন। ট্রাম্পের এমন কথা তাদেরকে আতংকিত করে ফেলেছে, কারণ ট্রাম্প যে মিসাইলের কথা বেশ হাসিখুশিভাবেই ঘোষণা দিয়ে ফেলেছেন সেটা হচ্ছে Ground-based Mid-course Defence (GMD)। এই মিসাইলগুলো বাইরে থেকে আসা কিছু নির্দিষ্ট সংখ্যক মিসাইলকে ধ্বংস করতে সক্ষম। এই মিসাইলগুলো এখনও আরও অনেক মিসাইলের মতো এতটা পরিপক্বতা লাভ করেনি। প্রাক্তন মিসাইল প্রকৌশলী মাইকেল এলম্যান বলেছেন যে, Patriot Missile, Ship based Aegis, THAAD (Terminal High Altitude Area Defence)– এই ধরনের অস্ত্রগুলো অনেক বেশী উন্নত। কিন্তু GMD-কে দূর থেকে অনেক দ্রুত গতিতে ছুটে চলা লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে হয়। তাই খুব নিখুঁতভাবে এই ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে এই ধরনের কাজ করাতে গেলে আরও অনেক গবেষণার প্রয়োজন।

ট্রাম্প যখন ক্ষমতায় আসেন, তখন যুক্তরাষ্ট্রের ইন্টেলিজেন্স থেকে তাকে নিশ্চিত করা হয়েছিলো যে কিমের হাতে Intercontinental Ballistic Missile (ICBM) ২০২২ সালের আগে কখনোই আসতে পারবে না; Source: pinterest.com

২০০১ সালের সেপ্টেম্বর মাসের ১১ তারিখের হামলার পরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের জন্য একটি নতুন দিকনির্দেশনা আসে ব্যলিস্টিক মিসাইল তৈরি এবং এটিকে আরও উন্নত করার। কারণ তখন যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য ছিল ইরান, ইরাক ইত্যাদি দেশগুলো। তখন এই GMD-গুলোর পুরনো এবং নতুন মডেলের প্রযুক্তি একত্রিত করা হয়। এখন আমরা যে GMD এর কথা জানি তাতে প্রায় ৪৪টি ইনটারসেপ্টর এবং সাতটি সেন্সর বসানো থাকে, তৈরি করতে খরচ পড়ে প্রায় ৭৫ মিলিয়ন ডলার। এখন এই মিসাইলগুলো আলাস্কা এবং ক্যালিফোর্নিয়াতে বসানো আছে। এখন যে GMD আছে সেগুলো দিয়ে বাইরে থেকে আসা মিসাইল শনাক্ত করা যাবে, ছুটে আসার মাঝপথে ধরে ফেলা যাবে, এমনকি পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের বাইরে ধ্বংসও করা যাবে।

সব মিলিয়ে এখনও পর্যন্ত প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলার খরচ করার পরও GMD পুরোপুরি নিখুঁতভাবে কাজ করতে ব্যর্থ। কারণ এর আগে যখন এই মিসাইলের ইনটারসেপ্টরের পরীক্ষা করা হয় তখন দেখা যায় যে ১৮ বারের মধ্যে ১০ বার ঠিকঠিকভাবে এটা লক্ষ্যবস্তুকে ধরতে পেরেছে। কিম জং উনের কাছে যে ধরনের মিসাইল আছে সেই ধরনের মিসাইল ৪ বারের মধ্যে মাত্র একবার শনাক্ত করতে পেরেছে GMD। তাই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যে বড় গলায় একটি ঘোষণা দিয়ে দিয়েছেন তাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের লোকজনদের আতংকিত হয়ে পড়ার কথা।

THAAD (Terminal High Altitude Area Defence); Source: The national interest

ট্রাম্পের যে ভুলটি হয়েছে সেটা ছিল Missile Defence Agency এর বীজগাণিতিক ভুল। GMD-র লক্ষ্যবস্তু ঠিকঠিকভাবে আঘাত করতে পারার সম্ভাব্যতা ছিল ৫৭%। যদি একসাথে চারটি মিসাইল ছোড়া হয় তাহলে অনেকগুলো লক্ষ্যবস্তু থাকলে তাতে ঠিকভাবে আঘাত করার সম্ভাব্যতা হচ্ছে ৯৭%। কারণ একটি মিসাইলের বিভিন্ন ধরনের সমস্যা থাকতে পারে।

একটি মিসাইলে যদি নকশায় কোনো ত্রুটি থেকে থাকে অথবা প্রস্তুত করার সময় যদি কোনো গলদ হয়ে থাকে তাহলে একটি যদি ঠিকভাবে কাজ করতে না পারে তাহলে বাকিগুলোও পারবে না। সেটাই স্বাভাবিক। আবার অনেক সময় মিসাইলে লিকেজ থাকতে পারে। এরকম অনেক ধরনের সমস্যার কথা মাথায় রেখে এরপর এই ধরনের প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করতে হয়। প্রেসিডেন্ট তো শুধু মুখে বলেই খালাস। কিন্তু আসল কাজ করতে হয় বিজ্ঞানী এবং প্রকৌশলীদের। এই ধরনের মিসাইল বানানো যে কী পরিমাণ ব্যয়সাপেক্ষ সেটা আগেই বলা হয়েছে। তাই বিজ্ঞানীরা এখন একটু ভিন্নভাবে ভাবার চেষ্টা করছেন।

Source: metro.com

GMD তে Multi-Object Kill Vehicle নামক প্রযুক্তি প্রয়োগ করা যেতে পারে যেখানে একটিমাত্র ইনটারসেপ্টর থেকে অনেকগুলো শট তৈরি করে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা যাবে। প্রযুক্তিবিদরা এটা নিয়ে কাজ করা শুরু করেও দিয়েছেন এবং ২০২৫ সাল নাগাদ এই ধরনের মিসাইল তৈরি হয়ে যাবে বলে ধারণা করছেন তারা। আরেকটি উপায়ের কথা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে জানা যায় যে, তারা সলিড স্টেট লেজার তৈরি করছেন যেগুলো ড্রোন নিজে বহন করবে এবং শত্রু দেশের সীমানার কাছাকছি গিয়ে আঘাত হানবে। কিন্তু এরকম প্রযুক্তি আনতে এখনও অনেক দেরী।

কিন্তু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে কারো বোঝানো উচিত যে নিকট ভবিষ্যতে যদি কোনো ব্যালিস্টিক মিসাইল যুক্তরাষ্ট্রের দিকে ছোড়া হয়, তাহলে সেটাকে পুরোপুরি রোধ করার মতো রসদ তাদের এখনও হয়ে উঠেনি। ভবিষ্যতে হয়তো হবে, কারণ কাজ শুরু হয়ে গিয়েছে। কিন্তু এখনকার মতো এই ধরনের কোনো ঘোষণা না দেয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ।

ফিচার ইমেজ সোর্স: Chiang Rai Times

তথ্যসূত্র:

The Economist, January, 2018, pp. 31

Related Articles