বাংলাদেশের মোট ১৭টি জাতীয় উদ্যানের অন্যতম ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান। ১৯৭৪ সাল থেকে কার্যক্রম শুরু হলেও একে জাতীয় উদ্যান হিসেবে প্রজ্ঞাপন জারী করা হয় ১৯৮২ সালের ১১ মে। অনিন্দ্য সুন্দর এই উদ্যানটি মূলত গ্রীষ্মমন্ডলীয় আর্দ্র পত্র পতনশীল বন। শাল বা গজারি এই উদ্যানের প্রধান বৃক্ষ। শাল বনের বৈচিত্রময় রুপমাধুরী আর জঙ্গলের স্বাদ অনুভবের জন্য প্রত্যেক বছর এখানে আসেন কয়েক লাখ পর্যটক। সৌন্দর্য, স্বতন্ত্র বৈশিষ্ঠ্য আর বৈচিত্রময়তার জন্য অনন্য এ উদ্যানের জুড়ি নেই। 

বনের নির্জনতা ও মোহনীয়তা মুগ্ধ করার মতো; Image Source: Wikimedia Commons/ Shimul Mohammad

ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানের অবস্থান

ঢাকার পাশের জেলা গাজীপুরের সদর ও শ্রীপুর উপজেলা জুড়ে ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানের অবস্থান। ঢাকা থেকে এর দূরত্ব মাত্র চল্লিশ কিলোমিটার। পুরো পরিকল্পনায় যদিও গাজীপুর সদর ও শ্রীপুর উপজেলার ৩৫টি মৌজা ও ১৩৬টি গ্রামের ৫০২২ হেক্টর জায়গাজুড়ে জাতীয় উদ্যানের অবস্থান, তবে মূল উদ্যানটি মূলত ঢাকা-ময়মনসিংহ সড়কের পাশে ৯৪০ হেক্টর জমির উপর অবস্থিত।

গাজীপুর সদর থেকে ১৩ কিলোমিটার দূরে এই উদ্যানটিতে ঢাকা থেকে আসতে সময় লাগে দুই ঘন্টার কাছাকাছি। ময়মনসিংহগামী যেকোনো বাসেই এখানে আসা যায়। উদ্যানে প্রবেশের জন্য আপনাকে গুনতে হবে মাত্র ১০ টাকা। তবে গাড়ি নিয়ে প্রবেশ করলে তার জন্য আলাদাভাবে নির্দিষ্ট হারে ভাড়া পরিশোধ করতে হয়। 

জাতীয় উদ্যানের প্রধান ফটক; Image Source: amadergazipur.চম

রুপ ও বৈচিত্রে অনন্য

ভাওয়াল গড়ের অংশ ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান একটি প্রাকৃতিক বনভূমি। রুপ, বৈচিত্র ও বহুমাত্রিক প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যের জন্য এই উদ্যানটি অনন্য। পাতা ঝরা বৃক্ষের এই বন সময়ে সময়ে পাল্টায়  তার রুপের বাহার। শালবৃক্ষের মায়ায় ঢাকা এই উদ্যানে গেলেই চোখে পড়বে ঘন বন, ঝোপ-জঙ্গল। শীতকালে যদিও পাতা পড়ে গিয়ে বনের রুপে শূন্যতার আবহ নিয়ে আসে, কিন্তু অন্যান্য মৌসুমগুলোতে চোখে পড়বে গাঢ় সবুজের মনলোভা সৌন্দর্য। উদ্যানের ভেতরে হাঁটার জন্য রয়েছে পরিকল্পিত রাস্তা ও হাইকিং ট্রেইল। উদ্যানের বুক চিরে সর্পিল ফসলি জমির অবস্থান। গহীন অরণ্যের মাঝ দিয়ে হেঁটে হেঁটে উপভোগ করা যায় নির্জনতার স্বাদ। 

এ উদ্যানের প্রধান বৃক্ষ শাল বা গজারি; Photographer: Noyon Asad

উদ্যানের মোহনীয়তাকে পূর্ণ করেছে কয়েক মাইল বিস্তৃত বিশালাকার কয়েকটি লেক, যার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে পদ্মপুকুর। এই লেকটিতে পদ্মফুলের নয়নাভিরাম সৌন্দর্য হৃদয়কাড়া। সেই সাথে অরণ্যের গাঢ় সবুজে জলের সমাহার এই উদ্যানের সৌন্দর্যকে করেছে অনন্য। লেকগুলোতে নৌকা ভ্রমণের স্বাদ নিতে পারবেন, আবার ইচ্ছে করলে বড়শি দিয়ে মাছ ধরার ব্যবস্থাও আছে, যদিও সেজন্য একটি নির্দিষ্ট অংকের অর্থ গুনতে হবে আপনাকে। 

শীতে ভাওয়াল বনে নেমে আসে শূন্যতা; Photographer: Noyon Asad

এখানকার মাটির রং ধূসর, যাকে বলা হয় লালমাটি। শুকনো অবস্থায় এই মাটি ইটের মতো শক্ত হলেও পানির সংস্পর্শে গা এলিয়ে দেয়। মাটির রং ধূসর হওয়ার কিন্তু বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা আছে। এই এলাকার মাটিতে অম্লত্বের পরিমাণ অনেক বেশি, প্রায় ৫.৫ পিএইচ। এই বনটি পত্র পতনশীল বন হওয়ার কারণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে ব্যাপারটি ঘটে তা হলো ঝরা পাতাগুলো মাটিতে পড়ে হিউমাস তৈরি করে ও মাটির ‍উর্বরতা বৃদ্ধি করে, ফলে খুব সহজেই এখানে জন্মায় নানাবিধ বৃক্ষ, লতাপাতা। 

জল ও জঙ্গলের অপরুপ সম্মিলন ঘটেছে এই উদ্যানে; Image Source: localguidesconnect.com

উদ্ভিদ ও প্রাণীবৈচিত্র

ভাওয়াল বনে একসময় ছিল বাঘ, চিতা, কালোচিতা, হাতি, মেছোবাঘ, ময়ূরসহ নানা বন্যপ্রাণীর অবাধ বিচরণ। কালের বিবর্তনে এখন এ প্রাণীগুলোর অস্তিত্ব বিলীন হয়ে গেছে। বিলীন হয়ে গেছে গহীন বনের অস্তিত্বও। তবে এখনো এই বনে দেখা মেলে অল্প কিছু হরিণ, বানর, বন্যশুকর, শজারু, বনবিড়াল, কাঠবিড়ালি সহ প্রায় ১৩২ প্রজাতির বন্যপ্রাণীর। যার মধ্যে ১৮ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ১৯ প্রজাতির সরীসৃপ, ৮৪ প্রজাতির পাখি ও ১১ প্রজাতির উভচর প্রাণী রয়েছে। 

উদ্যানের পদ্মপুকুরের মনোলোভা সৌন্দর্য; Image Source: Prothom Alo/Sadik Mridha

উদ্যানে শনাক্ত করা পাখিগুলোর মধ্যে  হিরগল, লালচিল, বক, দোয়েল, হটটিটি, মাছরাঙা, কুরা ঈগল, হাড়ি চাচা, বেনে বৌ, বুলবুল, নীলকন্ঠ, কাক, শালিক, চড়ুই, পেঁচা, টিয়া, মৌটুসী, পানকৌড়ি, মোহনচূড়া অন্যতম। নির্জন বনের মধ্যে হাঁটার সময় নানারকম পাখির কিচির-মিচির ডাকে পাওয়া যায় অপার্থিব অনুভূতির স্বাদ। 

এই উদ্যানের মূল বৃক্ষ শাল হলেও এখানে শনাক্ত করা হয়েছে ৫২টি পরিবার ও ১৪৭টি গোত্রের ৩৫৬ প্রজাতির উদ্ভিদ। এর মধ্যে জিগা, অর্জুন, আলই, মেহগনি, আকাশমনি, কড়ই, কাঠাল, আমলকি, হরিতকি, বহেরা ইত্যাদি বেশি পরিমাণে লক্ষ্য করা যায়। বর্তমানের শালগাছগুলো রোপন করা হয়নি। এগুলো প্রাকৃতিকভাবে পূর্বের গাছগুলোর কপিচ থেকে উৎপন্ন। বর্তমানে নতুন করে শালগাছ রোপন না হওয়ার পেছনে রয়েছে এশিয়ান উন্নয়ন ব্যাংক বা এডিবি। শাল বা গজারিকে তারা কম উৎপাদনশীল বিবেচনা করে এখানে ইউক্যালিপটাস ও এই ধরনের দ্রুত বর্ধনশীল বৃক্ষ রোপনে অর্থায়ন করে আসছে। 

বনের বুক চিড়ে রয়েছে ফসলের ক্ষেত, পরিদর্শন টাওয়ার থেকে তোলা ছবি; Image Source: adarbepari.com

কালের বিবর্তনে নানারকম প্রতিকূলতা আর অযত্ন-অবহেলায় জাতীয় উদ্যানের  বৈচিত্র, রং-রুপ ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসছে। তবে সাম্প্রতিককালে বনবিভাগ হারানো ঐতিহ্য ফিরে আনতে নানাবিধ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, উদ্যানের বেদখল হয়ে যাওয়া ভূমি উদ্ধারের পাশাপাশি বিভিন্ন সময় নানারকম বন্যপ্রাণী অবমুক্ত করা হচ্ছে ও উদ্যানের বিভিন্ন জায়গায় বট, তমাল, আগরসহ বিভিন্ন প্রজাতির বিলুপ্তপ্রায় উদ্ভিদ রোপন করে বনের পরিবেশ ঠিক রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু তা যে প্রয়োজনীতার তুলনায় নিতান্তই সামান্য তা এই উদ্যান ভ্রমণে গেলেই টের পাওয়া যায়।

পর্যটন সুবিধা

ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানে পর্যটকদের আকৃষ্ট করার জন্য নানা ধরনের উদ্যেগ নানা সময়ে নেওয়া হয়েছে। উদ্যানের ভেতর রয়েছে বেশ কয়েকটি কটেজ ও বিশ্রামাগার। কটেজগুলোর নামও কিন্তু বাহারী। যেমন- শ্রান্তি, শাপলা, জেসমিন, চম্পা, মাধবী, জুই, চামেলী ইত্যাদি। রয়েছে ত্রিশটিরও বেশি পিকনিক স্পট। বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, প্রত্যেক বছর প্রায় সাড়ে তিন লাখ পর্যটক অাসেন উদ্যানটিতে। 

ভ্রমনের জন্য রয়েছে হাইকিং ট্রেইল; Image Source: lonesome-traveler.de

বনভোজনের জন্য পিকনিক স্পটগুলো ভাড়া নিতে রয়েছে নানারকম ট্যারিফ। কটেজগুলো ভাড়া নিতেও বিভিন্ন ধরনের ট্যারিফ রয়েছে। তবে মনে রাখার বিষয় হচ্ছে, এখানে রাত্রি যাপনের অনুমতি প্রদান করা হয় না। তবে থাকার জন্য উদ্যানের সামান্য দূরত্বের মধ্যেই বেশ কয়েকটি ব্যক্তিমালিকানাধীন চমৎকার মানের হোটেল কিংবা রিসোর্ট অাছে। আছে সাধারণ মানের অসংখ্য হোটেলও।

আর যেকোনো কটেজ কিংবা পিকনিক স্পট বুকিংয়ের ক্ষেত্রে বনবিভাগের মহাখালী কার্যালয় থেকে আগাম বুকিং করতে হয়। তবে উদ্যানের সামান্য দূরেই অবস্থিত জাতীয় উদ্যান, রাজেন্দ্রপুর রেঞ্জ কার্যালয় থেকেও নির্ধারিত ফি জমা দিয়ে বুকিং নেওয়া যায়।

উদ্যানের গাইড ম্যাপ; Image Source: lonesome-traveler.de

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি উদ্যানের ভেতরে গড়ে তোলা হয়েছে মিনি চিড়িয়াখানা, সুউচ্চ পরিদর্শন টাওয়ার, প্রজাপতি বাগান, কচ্ছপ প্রজনন কেন্দ্র ও শিশুপার্ক সহ নানা কৃত্রিম স্থাপনা। তবে সৌন্দর্যের সাথে কদর্য দিকগুলোও ভুলে যাওয়ার নয়। বিভিন্ন রকম অপরাধমূলক কর্মকান্ডের জন্য গহীন জঙ্গলে যাওয়া থেকে নিরুৎসাহিত করে থাকে স্বয়ং উদ্যান কর্তৃপক্ষ নিজেই। কাজেই ঘুরতে গেলে সতর্ক থাকার প্রয়োজন আছে বৈকি।

যান্ত্রিক জীবনে দু'দন্ড প্রশান্তি দিতে পারে ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান; Image Source: wikimedia.com

ছুটি কিংবা শহুরে কর্মব্যস্ততার যান্ত্রিক জীবনের মধ্যে ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানে কাটাতে পারেন দু'দন্ড প্রশান্তিময় সময়। হারিয়ে যেতে পারেন পাখিদের মনোলোভা সুরে, কিংবা হৃদয়-কাড়া শালবনের মোহনীয় রুপের মূর্ছনায়।

ফিচার ইমেজ- wikivisually.com

তথ্যসূত্র: 

১) ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান পরিচিতি- বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ, বন অধিদপ্তর।

২) Wildlife Biodiversity in Bhawal National Park: Management Techniques and Drawbacks of Wildlife Management and Nature Conservation, Nature Conservation and Health Care Council.