ইতিহাসে মার্কো পোলোর অবস্থান অনন্য। মাত্র ১৭ বছর বয়সেই দুর্গম ও বিপজ্জনক পথে পৃথিবী চষে বেড়ানোর জন্য বের হয়ে যান তিনি। পায়ে হেঁটেই জয় করেছিলেন পৃথিবীর এক-তৃতীয়াংশ। তখন ইউরোপে কাগুজে মুদ্রার প্রচলন ছিল না। তিনিই চীন থেকে কাগজের মুদ্রার ধারণা নিয়ে আসেন ইউরোপে। ক্রিস্টোফার কলম্বাসের আমেরিকা জয় করার পেছনে আছে তার দুঃসাহসিক জীবনের অনুপ্রেরণা।

জন্ম ও পটভূমি

ঠিক কোন স্থানে এবং কত তারিখে মার্কো পোলো জন্মগ্রহণ করেছিলেন, সে সম্বন্ধে স্পষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। তবে ধারণা করা হয়, ১২৫৪ সালের কোনো এক সময় ইতালির ভেনিসের কোনো একটি অংশে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তৎকালে ভেনিস ছিল বাণিজ্যের রাজধানী। সে সময়ে বেশিরভাগ বাণিজ্যই হতো জাহাজের মাধ্যমে। এই শহরের সাথে নৌ যোগাযোগ সহজ হওয়াতে এটি সমস্ত পৃথিবীর বণিকদের কাছে বিখ্যাত হয়ে উঠে। ধন-সম্পদ ও প্রভাব-প্রতিপত্তিতে এই শহর ছিল খুব সমৃদ্ধ। এ অঞ্চলের মানুষেরাও যুক্ত ছিল বাণিজ্যে। পৃথিবীর এক অঞ্চল থেকে পণ্যদ্রব্য এনে তারা বিক্রি করতো অন্য অঞ্চলে।

চীন-ভারত তথা এশিয়া অঞ্চলে মশলাজাতীয় দ্রব্য পাওয়া যেতো প্রচুর। এ অঞ্চল থেকে মশলা কিনে ইউরোপে নিয়ে মোটা লাভে বিক্রি করতো বণিকেরা। মার্কো পোলোর বাবা নিকোলো পোলো এবং চাচা মাফিও পোলো ছিলেন এরকম বণিক। মার্কো পোলোর যখন জন্ম হয়, তখন তারা চীন অঞ্চলে বাণিজ্য করছিলেন। সে সময় রেশম ও মশলার জন্য চীন ছিল বিখ্যাত। রেশম ও মশলা উভয়ই লোভনীয় ও লাভজনক জিনিস, এজন্যই বণিকেরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চীন দেশে বাণিজ্য করতে যেতো। চীন দেশে বাণিজ্য করতে করতে মার্কো পোলোর বাবা ও চাচা একসময় সেখানকার সম্রাট কুবলাই খানের সাথে সখ্যতা গড়ে তোলেন এবং সম্রাটের দূত হিসেবেও কাজ করেন।

দূত হিসেবে বোখারায় ভ্রমণরত অবস্থায় নিকোলো ও মাফিও পোলো। ©  Gallica Digital Library/Wikimedia Commons

মার্কো পোলোর বয়স যখন পনের বছর, তখন তার বাবা ও চাচা ফিরে আসে চীন থেকে। ততদিনে তার মা মারা গেছেন। ভেনিসে নিজ বাড়িতে দুই বছর কাটান মার্কোর বাবা। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, আবারো পাড়ি দেবেন সেই দুঃসাহসিক পথ। তবে এবার সতেরো বছর বয়সী মার্কো পোলোকেও সফরের সঙ্গী করে নিলেন। এখান থেকেই মার্কো পোলোর পৃথিবী ভ্রমণের যাত্রা শুরু হয়। এই শুরুর মাধ্যমেই মার্কো পোলো পরবর্তীতে পৃথিবীর সবচেয়ে সেরা পর্যটকে পরিণত হন।

ভেনিস ত্যাগ করছেন মার্কো পোলো; source: Houston Chronicle

অ্যাড্রিয়াটিক সাগরের মধ্য দিয়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে তারা পৌঁছান আকর বন্দরে। জেরুজালেম শহরের কাছে এটি অবস্থিত। সেখানে একজন যাজকের সাথে দেখা করেন তারা। যাজকের সাথে দেখা করার পেছনে কারণ ছিল। চীন অঞ্চলে মোঙ্গল সম্রাট কুবলাই খান ছিলেন খুব জ্ঞানী। বাইরের জগৎ সম্বন্ধে খুব আগ্রহ ছিল তার। ইউরোপের সভ্যতা ও সংস্কৃতির ব্যাপারেও ছিল তার প্রবল আগ্রহ। মার্কোর বাবার কাছে সে অঞ্চলে প্রচলিত খ্রিস্ট ধর্ম সম্পর্কে শুনে এর প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করেন কুবলাই খান। তারা যখন চীন থেকে ইউরোপ ফিরে আসে, তখন তাদের কাছে একটি চিঠি দিয়ে দেন তিনি। এটি সেখানকার পোপকে দিতে বলেন কুবলাই খান। চিঠিতে ইউরোপ থেকে একশো জন শিক্ষিত যাজক পাঠানোর অনুরোধ করেন তিনি।

কিন্তু দেশে ফিরে এসে তারা দেখেন, সেখানকার পোপ মারা গেছে। নতুন পোপ নির্বাচন হলে তবে চিঠি দিতে হবে। কিন্তু দুই বছর পার হয়ে গেলেও পোপ আর নির্বাচন হয় না। তাই যাজক না নিয়েই রওনা হয়ে গেলেন তারা। পথে জেরুজালেমে থিউব্যাল্ডের কাছে চিঠি উপস্থাপন করেন। কিন্তু তিনিও যাজক দিয়ে কোনো সাহায্য করতে পারেননি। তবে জেরুজালেমে এসে অন্য একটি দিক থেকে সুবিধা হয়। জেরুজালেমের সেপলক্যার গির্জা থেকে বিশেষ এক তেল চেয়েছিলেন কুবলাই খান। তিনি শুনেছিলেন সেপলক্যার গির্জায় হাজার বছর ধরে একটি প্রদীপ জ্বলে চলছে, কখনো নিভছে না। এই প্রদীপকে বছরের পর বছর জ্বালিয়ে রাখছে যে তেল, তার এক বোতল নমুনা দেখতে চেয়েছিলেন তিনি।

কুবলাই খান; Source: Wikimedia Commons

তেল নিয়ে মার্কো পোলোরা রওনা দিলেন আয়াসের পথে। সেখান থেকে যেতে হবে চীন দেশে। তবে সেখানে গিয়ে শুনলেন নতুন পোপ নির্বাচিত হয়েছেন গ্রেগরি দশম। তাই তারা গেলেন তার কাছে। চিঠি পেয়ে পোপ খুব খুশি হলেন এবং সম্রাটের জন্য অনেক উপহার প্রদান করলেন। কিন্তু একশো জন যাজক দিতে পারেননি তিনি। কোনোক্রমে দুজনকে পাঠিয়েছিলেন তাদের সাথে। তা-ও মাঝপথে ভয়ে তারা পালিয়ে চলে আসে।

তখন স্থলপথে যান্ত্রিক কোনো বাহন ছিল না। পায়ে হেঁটে, খচ্চরের পিঠে, উটের পিঠে কিংবা ঘোড়ায় চড়ে পথ চলতে হতো। দূর ভ্রমণে পথিকদেরকে ঘুমাতে হতো খোলা আকাশের নীচে। সে অভিজ্ঞতা অবশ্যই কষ্টকর। তবে মার্কোর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল ভিন্ন। রুক্ষতার মাঝেও ফুলেল সৌন্দর্য খুঁজে নিতে পারতেন তিনি।

যে যে এলাকা ভ্রমণ করতেন মার্কো, তার সবকিছু নোট করে রাখতেন তিনি। পাশাপাশি যে এলাকায় যেতেন, সেখানকার স্থানীয়দের কাছ থেকে সেখানকার মানুষদের গল্প-উপকথা-বিশ্বাসও সংগ্রহ করে রাখতেন। তার ভাষায়, এক অদ্ভুত তরল ফোয়ারা তিনি দেখেছিলেন। সেই ফোয়ারা দিয়ে প্রতিনিয়ত তেল প্রস্রবণ হয়। সেই তেল আবার খাবার কাজে লাগে না, আগুন জ্বালানোর কাজে লাগে। আজকের যুগে মোটর গাড়িতে অহরহ এ ধরনের তেল ব্যবহার করা হয়। কিন্তু তখনকার সময় এ তেল ছিল অবাক করার মতো ব্যাপার। এক এলাকার মানুষের কাছ থেকে তিনি জানতে পারেন, সেখানকার মানুষ হযরত নূহ (আ:) এর নৌকাটি দেখেছে। এই এলাকার একটি পর্বতের উপর নৌকাটি গেঁথে আছে।

নৌকাটি এসে ঠেকেছিল পর্বতের এক চুড়ায়; source: Amazon

এরপর হেঁটে হেঁটে তারা এলেন বাগদাদ শহরে। সেকালে বাগদাদই ছিল বিশ্বের সেরা নগরী। বাগদাদের পর্ব শেষ করে তারা রওনা হলেন কেরমান শহরের দিকে। এ পথে আবার ডাকাত লুটেরাদের উৎপাত বেশি ছিল। সৌভাগ্যবশত তাদের সাথে যোগ দিলো ক্রীতদাসের বহর। তখন মানুষকে দাস হিসেবে আজীবনের জন্য কিনে নেওয়া যেত। প্রহরীরা সেসব মানুষদের পাহারা দিয়ে এক এলাকা থেকে আরেক এলাকায় নিয়ে যেতো। এরকমই একটি দল জুটে যায় মার্কো পোলো ও তার বাবা-চাচাদের। লোক বেশি থাকাতে ডাকাতের ভয় কমে যায়।

কেরমান থেকে চীন যাবার পথ দুটি। একটি গিয়েছে আফগানিস্তানের উপর দিয়ে, আরেকটি হরমুজের উপর দিয়ে। তারা হরমুজের পথ বেছে নিলেন। কিন্তু হরমুজে গিয়ে বাঁধলো বিপত্তি। তাদের হিসেবকৃত পথে কোনো জাহাজই যাবার উপযুক্ত নয়। যে যে জাহাজ ছিল, তাদের কোনোটিই দীর্ঘ ভ্রমণের উপযুক্ত নয়। যেগুলো ছিল, সেগুলো নিয়ে যাত্রা করলে যেকোনো সময় হয়ে যেতে পারে অকেজো। সামান্য আঘাতে হয়ে যেতে পারে চুরমার। এসব আশঙ্কায় তারা সিদ্ধান্ত নিলেন, অনিশ্চিত পথে দ্রুত যাবার চেয়ে নিশ্চিত পথে দেরিতে যাওয়া ভালো। তাই তারা ফিরে গেলেন কেরমানে, যেখানে চীন যাবার পথ দু’ভাগে ভাগ হয়েছিল।

সেখান থেকে যাত্রা করে তারা পাড়ি দেন পামির মালভূমি। বিস্তৃত এই মরুভূমি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে অনেক উঁচুতে অবস্থিত বলে একে পৃথিবীর ছাদ বলে ডাকা হয়। সেখানে পোলোরা শীতের কষ্টে পড়েন। পাশাপাশি তারা খেয়াল করেন, রান্নার জন্য খাবারগুলোকে সেদ্ধ করা যায় না সেখানে ভালোভাবে। তখন এর পেছনের কারণ জানা ছিল না তাদের। মার্কো পোলোরা এর পেছনে প্রচণ্ড শীতকে দায়ী করেছিলেন। তবে বিজ্ঞানের কল্যাণে এখন আমরা জানি, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে বেশি উঁচু স্থানে বায়ুর চাপ কম থাকে, ফলে পানি দ্রুত বাষ্পীভূত হয়ে যায়। অল্প তাপমাত্রাতেই পানি বাষ্প হয়ে যায় বলে খাবার সেদ্ধ হবার জন্য প্রয়োজনীয় তাপমাত্রা তৈরি হতে পারে না। এ কারণে খাবার কাঁচা থেকে যায়।

পৃথিবীর ছাদ পামির মালভূমি, মেঘ ভূমিকে ছুঁয়েছে যেখানে; source: Irene2005/Flickr/Wikimedia Commons

পামির মালভূমি পেরিয়ে তারা রওনা হন কাশ্মীরের দিকে। সুন্দরতম এই শহর শেষে তারা রওনা হন তাংগুত প্রদেশের উদ্দেশ্যে। সেখানে এসে হাঁপ ছেড়ে বাঁচলেন তারা। দ্রুত তাদের আগমনের খবর পাঠানো হলো কুবলাই খানের কাছে। তখন দ্রুত খবর পাঠানোর বিশেষ ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল। স্থানে স্থানে ডাকঘর বসানো থাকতো। সেখানে কেউ চিঠি প্রদান করলে একজন ঘোড়সওয়ার তা নিয়ে দ্রুত গতিতে পৌঁছে দিতেন পরবর্তী ডাকঘরে। সেখানে চিঠি দেওয়া মাত্র সেখানকার ঘোড়সওয়ার রওনা হতো চিঠি নিয়ে। এভাবে ধাপে ধাপে খুব দ্রুত সময়ে চিঠি বা বার্তা পৌঁছে দেয়া যেত। এতে করে বৃহৎ রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ খবর অল্প সময়ে চলে আসতো কেন্দ্রে।

কুবলাই খানের কাছে উপহার সামগ্রী ও বিশেষ তেল তুলে দিলেন তারা। তিনি বেশ খুশি হলেন তাতে। আর এদিকে মার্কোর জ্ঞান ও অসাধারণ দৃষ্টিভঙ্গির কারণে তাকে খুব পছন্দ করেন সম্রাট। ধীরে ধীরে ঘনিষ্ঠ হয়ে যায় তাদের সম্পর্ক। সম্রাট রাজ্য সংক্রান্ত নানা ধরনের কাজ দিতে থাকেন মার্কোকে। একসময় রাজ্যের কূটনৈতিক কাজের দায়িত্বও দিলেন তাকে। এসবের পেছনে অণুঘটক হিসেবে কাজ করেছে তার সততা ও বিশ্বস্ততা।

এখানেও তার ভাগ্য প্রসন্ন। এখানেও ছিল পৃথিবী ভ্রমণের সুযোগ। কূটনৈতিক প্রয়োজনে তাকে যেতে হতো অন্যান্য রাজ্যে। যেখানেই যেতেন, সেখানকার বিবরণ লিখে রাখতেন নোটবুকে। টানা সতেরো বছর তিনি থাকেন চীন মুলুকে। ততদিনে অনেক বয়স হয়ে যায় মার্কোর। অন্যদিকে তার পিতা ও চাচাও প্রায় বুড়ো হয়ে যায়। তাই বাড়ি ফিরে যাবার একটি টান তৈরি হয় তাদের। একসময় মার্কোর যখন ৩৮ বছর বয়স, তখন তিনি ফিরে যান ভেনিসে।

বলা হয়ে থাকে, এরপর কোনো একসময় ভেনিসের সাথে তার পার্শ্ববর্তী এক শহরের যুদ্ধ হয়েছিল। সে যুদ্ধে বন্দী হিসেবে জেলে আটকা পড়েছিলেন মার্কো। জেলে বসে সেখানের এক বন্ধুর সহায়তায় তার জীবনের ভ্রমণকাহিনী লিখে যান তিনি। এটিই পরবর্তীতে মার্কো পোলোর ভ্রমণকাহিনী নামে পরিচিত হয় পৃথিবীব্যাপী।

মার্কো পোলো; source: Biography.com

তবে তার এই ভ্রমণ ও অন্যান্য কাহিনী নিয়ে বিতর্ক আছে। যেমন- অনেক বিশেষজ্ঞ বলছেন, যেসব যুদ্ধের কথা প্রচলিত আছে সেরকম কোনো যুদ্ধই সংঘটিত হয়নি ইতিহাসে। তার উপর তিনি এমন কিছু ঘটনার বিবরণ দিয়েছেন, যার বাস্তব অস্তিত্ব কখনোই থাকতে পারে না। যেমন- তিনি নাকি এমন এক পাখি দেখেছিলেন, যেগুলো হাতিকে পর্যন্ত খেয়ে ফেলতে পারে। এরকম আরো বেশ কিছু ত্রুটি থেকে বোঝা যায়, মার্কো পোলো এসব বাড়িয়ে বাড়িয়ে বলেছেন। কোনো কোনো গবেষক এমনও দাবি করেন, মার্কো আসলে কখনো চীন ভ্রমণ করেননি, এর আগে যারা ভ্রমণ করেছিল তাদের কাছ থেকে বর্ণনা নিয়ে লিখেছিলেন এই বই। কেন, কীভাবে আর কোন যুক্তিতে গবেষকরা এসব কথা বলছেন, তার পেছনে যথেষ্ট কারণ আছে। সেগুলো তুলে ধরতে হলে স্বতন্ত্র একটি লেখার প্রয়োজন হবে। সেই লেখাটি শীঘ্রই প্রকাশ করা হবে Roar বাংলায়।

তথ্যসূত্র

  1. Ceserani, Gian Paolo (2008) Marco Polo (In Bangla) translated by Shariful Islam Bhuyan, Abosar, Dhaka.
  2. Komroff, Manuel (2002) The Travels of Marco Polo, W. W. Norton & Company, Inc., 500 Fifth Avenue, New York, NY 10110.
  3. Wood, Frances (1998) Did Marco Polo Go To China, Westview Press.
  4. National Geographic Mystery Files, Season 2 Episode 03, (Marco Polo).

ফিচার ইমেজ- Infobae