যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা। মহাকাশ সম্বন্ধীয় নানা ধরনের গবেষণা ও কর্মকাণ্ড এর মাধ্যমে সম্পাদিত হয়। আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন পরিচালনা, কক্ষপথে স্যাটেলাইট প্রেরণ, মহাকাশ থেকে আবহাওয়ার নজরদারি, সৌরজগতের বিভিন্ন গ্রহের তথ্য উদঘাটনে বিভিন্ন মহাকাশ মিশন পরিচালনা, চাঁদ, মঙ্গল বা ইউরোপায় বসবাসের সম্ভাবনা সম্পর্কে গবেষণা প্রভৃতি নানা ধরনের কাজ করে নাসা।

শুধু এতটুকু বললে নাসার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য পরিস্কার হয় না। নাসার মূল লক্ষ্য হলো, সকলের মঙ্গলের জন্য কাজ করা (Motto: For the Benefit of All)। যেমন- আকাশের দিকে সার্বক্ষণিক নজরদারি রাখা, কোনো গ্রহাণুর সংঘর্ষে যেন পৃথিবীতে নরক নেমে না আসে। কিংবা সৌরঝড় বা অন্য কোনো মহাকাশীয় চৌম্বক ক্ষেত্রের মধ্য দিয়ে পৃথিবী অতিক্রম করলে সে সম্বন্ধে সকলকে সতর্ক করা এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা। কারণ এমন পরিস্থিতিতে পৃথিবীর তড়িৎচুম্বকীয় সিগনালে গণ্ডগোল দেখা দিতে পারে। ফলে মোবাইল নেটওয়ার্ক ব্যবস্থা, টেলিভিশন ব্যবস্থা, উড়োজাহাজ প্রভৃতির সাথে যোগাযোগ ব্যবস্থায় বিপর্যয় দেখা দিতে পারে।

নাসার হেডকোয়ার্টার; source: Teen Vogue

পৃথিবীকে রক্ষা তথা পৃথিবীর মানবজাতিকে রক্ষার উদ্দেশ্যে নাসার একটি বিশেষায়িত কাজ আছে, কোনো বহির্জাগতিক জীবাণু যেন পৃথিবীতে ছড়িয়ে যেতে না পারে সেদিকে খেয়াল রাখা। এই কাজটি নাসার ‘প্ল্যানেটারি প্রটেকশন’ বিভাগের মাধ্যমে করা হয়। ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, ফাঙ্গাস প্রভৃতি জীবাণুকে নিয়ে এমনিতেই অনিশ্চয়তার মাঝে থাকতে হয় সবসময়। কখন কোন পরিস্থিতিতে কোন ধরনের জেনেটিক মিউটেশন ঘটিয়ে জীবাণুরা রোগের মহামারী লাগিয়ে মানবজাতির বারোটা বাজিয়ে ফেলে, সে সম্বন্ধে কোনো নিশ্চয়তা দিতে পারেন না বিজ্ঞানীরা। ক্ষুদ্র কিছু প্রাণ, কিন্তু সেরা সেরা বিজ্ঞানীরাও কেন তাদের ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে কিছু বলতে পারেন না, তার পেছনে যথেষ্ট কারণ আছে।

সেদিক থেকে সতর্ক হয়েই নাসা কর্তৃপক্ষ চাইছে, পৃথিবীর বাইরের কোনো জীবাণু যেন পৃথিবীতে এসে তাণ্ডব লাগাতে না পারে। পৃথিবীর অভ্যন্তরের জীবাণুদের সামলাতে গিয়েই তো বিজ্ঞানীদের দফারফা অবস্থা, আর বাইরের সম্পূর্ণ অপরিচিত জীবাণুরা এসে জুটলে তখন কী পরিস্থিতি হবে? এই বিষয়গুলো সতর্কতার সাথে বিবেচনা করে নাসার ‘প্ল্যানেটারি প্রটেকশন’ বিভাগ। এই বিভাগে কাজ করার জন্য গত জুলাই মাসে একটি চাকরির বিজ্ঞপ্তি প্রদান করে কর্তৃপক্ষ। বিজ্ঞপ্তিতে বেশ উচ্চতর ডিগ্রিধারী ও যোগ্যতাসম্পন্ন লোকদের আহ্বান করা হয়েছে, বিশেষ করে পৃথিবী সুরক্ষা সংক্রান্ত বিষয়ে জানাশোনা, গবেষণা ও অভিজ্ঞতা থাকতে হবে তাদের। বেতন পাবেন বছরে ১ লক্ষ ২৪ হাজার থেকে ১ লক্ষ ৮৭ হাজার ডলারের মধ্যে।

এতটুকু পর্যন্ত সবকিছু স্বাভাবিকই ছিল। অবাক করা ব্যাপার ঘটলো তখন, যখন কর্তৃপক্ষ দেখলো সেই বিজ্ঞপ্তিতে সাড়া দিয়ে চাকরির আবেদন করেছে নয় বছরের একটি বালক! বালকের নাম জ্যাক ডেভিস, পড়াশোনা করে ৪র্থ শ্রেণীতে।

নাসার কাছে জ্যাকের পাঠানো চিঠিটি; source: NASA/Business Insider

আনাড়ি হাতে জ্যাক নাসাকে যে চিঠিটি লিখে পাঠায় সেটি অনেকটা এরকম-

প্রিয় নাসা,

আমার নাম জ্যাক ডেভিস এবং আমি ‘প্ল্যানেটারি প্রটেকশন অফিসার’ পদে আবেদন করতে চাই। যদিও আমার বয়স মাত্র নয়, কিন্তু আমি মনে করি আমি এই কাজের জন্য উপযুক্ত। উপযুক্ত হবার পেছনে অনেকগুলো কারণ আছে। সেগুলোর মাঝে একটি হলো, আমার বোন সবসময় বলে আমি একটা এলিয়েন। তাছাড়াও আমি এলিয়েন ও মহাকাশ সম্বন্ধীয় প্রায় সকল মুভি দেখেছি। ‘মার্ভেল এজেন্ট অব শিল্ড’ও আমি দেখেছি এবং ‘ম্যান ইন ব্ল্যাক’ও দেখে ফেলবো। ভিডিও গেমেও আমি বেশ দক্ষ। আমি অল্পবয়সী মানুষ, তাই সহজেই আমি এলিয়েনের মতো করে চিন্তাভাবনা করা শিখে ফেলতে পারবো।

বিনীত,
জ্যাক ডেভিস
গার্ডিয়ান অব দ্য গ্যালাক্সি
৪র্থ শ্রেণী

এমন চিঠি পেয়ে কর্তৃপক্ষ এটাকে এড়িয়ে যেতে পারতো, হাসির ছলে পুরো ব্যাপারটাকে উড়িয়ে দিতে পারতো। একটি নয় বছরের শিশু, যে কিনা কয়েকটা মুভি দেখে আর ভিডিও গেম খেলে কী মনে করে নাসার মতো জায়গায় চিঠি পাঠিয়ে বসেছে, তার কথা আর তেমন গুরুত্বপূর্ণ কী? কিন্তু প্ল্যানেটারি প্রটেকশন বিভাগের ডিরেক্টর জেমস গ্রিন সিদ্ধান্ত নিলেন ছেলেটির চিঠির উত্তর দেবেন। নাসার প্যাডে তিনি চিঠি টাইপ করলেন, স্বাক্ষর দিলেন এবং সেটি ডাকযোগে পাঠিয়েও দিলেন জ্যাকের কাছে।

নাসার পক্ষ থেকে উত্তর দেয়া চিঠিটি; source: NASA/Business Insider

পরিচালক জেমস গ্রিনের দেয়া উত্তরটি ছিল অনেকটা এরকম-

প্রিয় জ্যাক,

আমি (তোমার চিঠির স্বাক্ষরে) দেখেছি তুমি এই গ্যালাক্সির একজন অভিভাবক (গার্ডিয়ান অব দ্য গ্যালাক্সি, মার্ভেল কমিকসের একটি বিশ্ববিখ্যাত মহাকাশ সায়েন্স ফিকশন চলচ্চিত্র)। তুমি নাসার প্ল্যানেটারি প্রটেকশন অফিসার হতে চাও। এটা খুবই চমৎকার!

আমাদের প্ল্যানেটারি প্রটেকশন অফিসারের চাকরির পদটি দারুণ এবং এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ। মঙ্গল গ্রহ, চাঁদ ও বিভিন্ন গ্রহাণু থেকে আমরা কিছু স্যাম্পল এনে থাকি পৃথিবীতে। এই পদের মূল কাজ হলো এসব উৎস থেকে আনা স্যাম্পলের ক্ষুদ্র অণুজীবের হাত থেকে পৃথিবীকে রক্ষা করা। আমরা যেহেতু সৌরজগতের বিভিন্ন স্থানে অনুসন্ধান চালাই, তাই এই পদের আরো একটি কাজ হলো পৃথিবীর জীবাণু থেকে চাঁদ সহ অন্যান্য গ্রহকে রক্ষা করা।

আমরা সবসময়ই উজ্জ্বল ভবিষ্যতের বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীদের খুঁজছি যারা আমাদেরকে সাহায্য করতে পারবে। তাই আশা করি তুমি খুব ভালোভাবে পড়াশোনা করবে আর চমৎকার ফলাফল অর্জন করবে। আমরা আশা রাখি একদিন তোমাকে নাসার কর্মী হিসেবে পাবো।

বিনীত,
ড. জেমস এল. গ্রিন
ডিরেক্টর, প্লানেটারি সায়েন্স বিভাগ

পরিচালক জেমস গ্রিন, জ্যাক ডেভিসকে বিশেষ ফোন কলও দিয়েছিলেন; source: NASA/ Aubrey Gemignani

নাসার এরকম চমৎকার কর্মকাণ্ড এবারই প্রথম নয়। আগেও এরকম দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়েছে এখানে কর্মরত বিজ্ঞানীরা। যেমন- ২০১৩ সালে ৭ বছরের একটি ছেলে চিঠি পাঠিয়েছিল নাসায় এই বলে-

Dear NASA, my name is Dexter. I heard that you are sending 2 people to Mars and I would like to come but I’m 7.

নাসা এই চিঠিরও উত্তর দিয়েছিল। এরকম অনেক চিঠির জবাব তারা দিয়ে থাকে। এমনকি কেউ যদি ‘পৃথিবী সমতল’ বলে চিঠি পাঠায়, তাহলেও সুন্দর করে উত্তর দেয় তারা।

এই ঘটনা আমাদেরকে কী শিক্ষা দেয়?

বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, নিজেকে নিয়ে ইতিবাচক ভবিষ্যদ্বাণী করলে বা অন্যকে ইতিবাচক ভবিষ্যদ্বাণী জানালে বাস্তবে তার সেই বিষয়ে প্রভূত অগ্রগতি হয়। বিজ্ঞানের প্রতি একটি ছেলে বা মেয়ের খুব আগ্রহ আছে, কেউ একজন যদি সুন্দর করে তাকে বিজ্ঞানের মাহাত্ম্য বুঝিয়ে দিতে পারে এবং বলতে পারে যে, তুমি একদিন বিজ্ঞানী হতে পারবে; তাহলে তার বিজ্ঞানী হবার পথ অনেকটা এগিয়ে যায়। কারণ এর মাধ্যমে সে মানসিকভাবে একটি বেগ পেয়েছে এবং সেই লক্ষ্যে কাজ করার জন্য আগ্রহীও হয়েছে। এদেরই কেউ কেউ হয়তো সত্যিকারের নামকরা বিজ্ঞানী হয়ে উঠবে।

খুব সহজভাবে বলা যায়, কেউ যদি কোনো শিশুকে বলে যে সে মেধাবী, তাহলে ভবিষ্যৎ জীবনে সে সত্যিই মেধার পরিচায়ক কিছু করে দেখাতে চেষ্টা করবে। কেউ যদি বলে, তার ভেতরে এমন কিছু আছে যা দিয়ে ইতিবাচক ও গুরুত্বপূর্ণ কিছু করা যাবে, তাহলেই তারা সেই ‘কিছু’টি করবে

মনে রাখতে হবে, শিশুরাই পৃথিবীর ভবিষ্যৎ। এটা কোনো ক্লিশে বক্তব্য নয়, এটাই বাস্তবতা। একদিন নাসার বর্তমান পরিচালক থাকবে না, বুড়ো হয়ে যাবে, আগের মতো নিখুঁতভাবে কাজ করতে পারবে না। তখন তার অবস্থানে আজকের ছোটরাই হাল ধরবে এবং পৃথিবী সম্বন্ধে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেবে।

একটি শিশুর কর্মকাণ্ডকে কম গুরুত্ব দিয়ে হেলাফেলা করা উচিৎ নয় কখনোই। তাদের আগ্রহ ও কৌতূহলকে মূল্য দিয়ে সে অনুসারে উত্তর বা প্রতিক্রিয়া জানানো উচিৎ। প্রয়োজন হলে উৎসাহ ও প্রণোদনা দেয়া উচিৎ। তাহলে দেখা যাবে ভবিষ্যতে একদিন তারা আমাদেরই উপকারে আসছে, আমাদের জীবনকেই সুন্দর করতে সাহায্য করছে।

গ্যালাক্সির গার্ডিয়ান ছেলেটির চিঠি এবং তাদের উত্তর নিয়ে নাসার টুইট

ফিচার ছবি- NASA