অনুবাদকের কথা: করোনাভাইরাসের কারণে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর একটি ইতালি। ২৯ মার্চের হিসেবে, কোভিড-১৯ এর কারণে দেশটিতে মৃতের সংখ্যা ইতোমধ্যেই ১০,০০০ ছাড়িয়ে গেছে। লকডাউনের কারণে রোম জনমানবশূন্য শহরে পরিণত হয়েছে। খ্যাতিমান ইতালীয় উপন্যাসিক ফ্রান্সেসকা মেলানদ্রি প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে আটকা পড়ে আছেন শহরটিতে। এই গৃহবন্দি দশা থেকেই ইউরোপিয়ানদের উদ্দেশ্যে তিনি একটি খোলা চিঠি লিখেছেন। যদিও বিশ্বায়নের কারণে দুনিয়াটা এতই ছোট হয়ে এসেছে যে, চিঠির মূল বক্তব্যটি আমাদের জন্যও অপ্রাসঙ্গিক নয়। তাই গত ২৭ মার্চ তারিখে দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকায় প্রথম প্রকাশিত চিঠিটি রোর বাংলার পাঠকদের জন্য অনুদিত হলো। চিঠিটি অনুবাদকের নজরে আনেন আকিব হাসান, তার প্রতি অনুবাদকের সবিশেষ কৃতজ্ঞতা।

ইতালি থেকে চিঠি

আপনার উদ্দেশ্যে এই চিঠি আমি ইতালি থেকে লিখছি, যার অর্থ হলো, আমি আপনার ভবিষ্যৎ থেকে লিখছি। আমরা সেখানে আছি, যেখানে আর কয়েকদিন পরেই, আপনারা থাকবেন। মহামারির তালিকাগুলো থেকে দেখা যাচ্ছে, আমরা একটা সমান্তরাল নাচের মধ্যে জড়িয়ে গেছি।

সময়ের পথে আমরা আপনাদের থেকে অল্প কয়েক কদমই এগিয়ে আছি, ঠিক যেমন উহান আমাদের থেকে এগিয়ে ছিলো কয়েক সপ্তাহ। আমরা দেখতে পাচ্ছি, আপনারা ঠিক তেমন আচরণটাই করছেন, যেমনটা করেছিলাম আমরা। আপনারা ঠিক সেই যুক্তিগুলোই দিচ্ছেন, যেগুলো কয়দিন আগে মাত্র আমরাও দিচ্ছিলাম। আমাদের মধ্যকার ব্যবধানটা সামান্যই: যারা বলে “সামান্য একটা ফ্লু নিয়ে এতো বিচলিত হবার কী আছে?” আর যারা বুঝতে পেরেছে সত্যিই কী আছে বিচলিত হবার মতো।

ইতালীয় আলোকচিত্রী লুসিয়া বুরিচেল্লি ক্যামেরাবন্দি করেছেন নিজের কোয়ারেন্টিনের দিনগুলো; Image Source: Lucia Buricelli for TIME

যেহেতু আমরা এখান থেকে, আপনাদের ভবিষ্যৎ থেকে, দেখতে পাচ্ছি আপনাদেরকে; আমরা জানি যে আপনাদের মধ্যে অনেকেই, যেহেতু আপনাদেরকে গৃহবন্দী থাকতে বলা হয়েছিলো, অরওয়েলকে উদ্ধৃত করছেন, কেউ কেউ হয়তো হবসকেও। কিন্তু দ্রুতই আপনারা এত ব্যস্ত হয়ে যাবেন যে, কাউকে উদ্ধৃত করার সময়টুকুও আর পাবেন না।

প্রথমত, আপনারা খাওয়াদাওয়া করবেন। আর তা শুধু এই কারণেই নয় যে, এটা সেই অল্প কয়েকটা কাজের মধ্যে একটা, যা করার থাকবে আপনাদের।

আপনার অবসর সময়টা কীভাবে অর্থবহভাবে কাটাবেন, সেই বিষয়ে টিউটোরিয়াল দিচ্ছে এমন বহু সামাজিক নেটওয়ার্কভিত্তিক দলের দেখা পাবেন আপনি। এর সবগুলোতেই আপনি অংশ নেবেন। কয়েকদিন পার হলেই সেগুলোকে পুরোপুরি উপেক্ষা করবেন।

আপনার বইয়ের তাকগুলো থেকে মহাপ্রলয়-পরবর্তী দুনিয়া নিয়ে লেখা বইপত্র আপনি সমানে নামাতে থাকবেন, কিন্তু দ্রুত আবিষ্কার করবেন, এসবের কোনোটিই আপনার পড়তে ইচ্ছে করছে না।

আপনি আবার খাওয়াদাওয়া করবেন। আপনার ভালো ঘুম হবে না। আপনি নিজেকে প্রশ্ন করবেন, কী হলো গণতন্ত্রের।

আপনার একটা অপ্রতিরোধ্য অনলাইন সামাজিক জীবন থাকবে – মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ, স্কাইপি, জুম...

আপনার প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদেরকেও আপনি এমনভাবে মিস করবেন, যেমনটা আর কখনো করেননি; আবার তাদের সাথে কবে দেখা হবে সেসম্পর্কে কোনো ধারণাই নেই আপনার, এই উপলব্ধিটা আপনার বুক ভেঙে দেবে।

ভেনিসের সেন্ট মার্কস স্কয়ারের এক জনশূন্য রেস্টুরেন্ট; Image Source: Manuel Silvestri/Reuters

পুরনো বিরক্তি আর বিবাদ অপ্রাসঙ্গিক মনে হবে। যাদের ব্যাপারে কসম খেয়েছিলেন যে জীবনে আর তাদের সাথে কথা বলবেন না, তাদেরকে জিজ্ঞেস করবেন, “কী অবস্থা?” বহু নারী তাদের নিজ গৃহে মার খাবেন।

আপনি অবাক বিস্ময়ে ভাববেন, ঘরই না থাকার কারণে যারা ঘরে থাকতে পারছে না, তাদের সাথে ঠিক কী হচ্ছে। কেনাকাটা করার জন্য খালি হয়ে যাওয়া সড়কগুলোতে গেলে আপনার নিজেকে বিপন্ন মনে হবে, বিশেষত যদি আপনি নারী হন। আপনারা নিজেদেরকে প্রশ্ন করা শুরু করবেন, সমাজ কী এভাবেই ভেঙে পড়ে। সবকিছু কি আসলেই এত দ্রুত ঘটে? আপনি এসব চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলবেন, এবং বাড়ি পৌঁছে, আপনি আবার খাওয়াদাওয়া করবেন।

আপনার ওজন বেড়ে যাবে। তখন আপনি অনলাইনে ফিটনেস প্রশিক্ষণ খোঁজা শুরু করবেন।

আপনি হাসবেন। অনেক হাসবেন আপনি। হাস্যরসের প্রতি এমন একটা ভালোবাসা আপনার ভেতরে দেখা যাবে, যা আগে কখনো দেখা যায়নি। এমনকি সেই মানুষেরাও, যারা জীবনকে সবসময়ই খুব সিরিয়াসলি নিয়েছিল; তারা জীবন, মহাবিশ্ব, এবং বাকি সব কিছুর নিরর্থকতা নিয়ে কথা বলা শুরু করবে।

বিপণিবিতানের দীর্ঘ লাইনগুলোতে দেখা করার জন্য বন্ধু আর প্রিয়তমদের সাথে তারিখ ঠিক করবেন আপনি, যাতে স্বল্প সময়ের জন্য হলেও তাদের সাথে শরীরী সাক্ষাৎ ঘটে, আর সেটা অন্যান্য সময় সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার নিয়ম মেনে চলেই।

আপনার কোন কোন জিনিসের প্রয়োজন নেই, আপনি তা গোণা শুরু করবেন।

আপনার আশেপাশের মানুষজনের আসল চরিত্র আপনার কাছে স্পষ্ট হয়ে যাবে। কারো কারো ব্যাপারে আপনার অনুমান নিশ্চিত হয়ে যাবে। অন্যরা আপনাকে চমকে দেবে।

খবরে যে সবজান্তা পণ্ডিত শ্রেণীকে দেখা যেত, তারা উধাও হয়ে যাবে, তাদের মতামত আচমকা অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়বে। কেউ কেউ সবকিছু যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করার শরণ নেবে, যাতে সহমর্মিতার এতটাই অভাব থাকবে যে, লোকজন তাদের কথা শোনা বন্ধ করে দেবে। যাদেরকে আপনি এতকাল ধরে উপেক্ষা করে এসেছেন, দেখা যাবে তারাই আপনাকে সান্ত্বনা দিচ্ছে, তারাই দয়ালু, তারাই বিশ্বস্ত, তারাই বাস্তবজ্ঞানসম্পন্ন, এবং তারাই দিব্যজ্ঞানসম্পন্ন।

কোয়ারেন্টিনের ১৫তম দিন, ইতালির ছোট্ট শহর সান ফিওরানো; Image Source: Marzio Toniolo via Reuters

যারা আপনাকে নিমন্ত্রণ জানাবে এই তালগোল পাকিয়ে যাওয়া পরিস্থিতিটাকে ধরিত্রীকে নবায়িত করে তোলার একটা সুযোগ হিসেবে দেখতে, তারা আপনাকে সবকিছু বৃহৎ প্রেক্ষিতে দেখতে সহায়তা করবে। কিন্তু আপনি একইসাথে আবিষ্কার করবেন, লোকগুলো যাচ্ছেতাই রকমের বিরক্তিকর! কার্বন ডাই অক্সাইড নিঃসরণ অর্ধেক হয়ে যাওয়ায় গ্রহটা ভালো করে নিঃশ্বাস নিতে পারছে, মহা আনন্দের কথা, কিন্তু আগামী মাসের বিলগুলো কীভাবে পরিশোধ করবো?

একটা নতুন পৃথিবী জন্ম নেবার সাক্ষী থাকাটা কি উৎসবের ব্যাপার না দুর্দশার, সেটা আপনি বুঝবেন না।

আপনি আপনার জানালা আর লন থেকে মিউজিক বাজাবেন। যখন আপনি আমাদেরকে আমাদের ব্যালকনি থেকে অপেরা গাইতে দেখছিলেন, তখন আপনি ভেবেছিলেন, “আহ, ইতালিয়ানগুলোকে নিয়ে আর পারা গেল না।” কিন্তু আমরা জানি, আপনারাও একজন আরেকজনকে চাঙ্গা করা গান গেয়ে শোনাবেন। আর যখন আপনারা উল্লাসে ফেটে পড়বেন, আমি আপনাদের জানালায় উঁকি মারবো, আমরা আপনাদেরকে দেখতে থাকবো, এবং মাথা নুইয়ে সংহতি জানাবো, ঠিক যেমনটা জানিয়েছিল উহানের মানুষেরা, আমাদেরকে গাইতে দেখে, যারা তাদের জানালা থেকে নিজেরাই গান গাইছিল ফেব্রুয়ারিতে।

আপনাদের অনেকেই এই শপথ নিতে নিতে ঘুমিয়ে পড়বেন যে, লকডাউন শেষ হওয়ার পর সবার আগে আপনি যেই কাজটা করবেন, সেটা হচ্ছে আপনার জীবনসঙ্গীকে ডিভোর্স দেওয়া।

অনেক শিশুই গর্ভে আসবে, এইসময়।

আপনাদের ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা চলবে অনলাইনে। এরা আপনাকে জ্বালিয়ে খাবে। কিন্তু আপনি এই জ্বালাতনটা ভালোবাসবেন।

করোনাভাইরাসের কারণে গাজায় আইসোলেশন চলাকালে অনলাইনে ক্লাস করছে এক ফিলিস্তিনি শিশু ; Image Source: Mohammed Abed / AFP / Getty 

মুরুব্বিরা একরোখা টিনএজারদের মতো আচরণ করা শুরু করবে। আপনার কথা অমান্য করা শুরু করবে। ঘরের বাইরে গিয়ে সংক্রমিত হয়ে মরে যাওয়ার হাত থেকে তাদেরকে বাঁচাতে আপনাকে রীতিমতো যুদ্ধ করতে হবে।

আপনারা চেষ্টা করতে থাকবেন আইসিইউর নিঃসঙ্গ মৃত্যুগুলোর কথা মাথায়ও না আনতে।

আসা যাওয়ার মাঝে যেকোনো স্বাস্থ্যকর্মীর গায়ে গোলাপের পাঁপড়ি ছিটিয়ে দিতে ইচ্ছে করবে আপনার।

আপনাদেরকে বলা হবে সমাজ সংঘবদ্ধ প্রয়াসের কারণেই বেঁচে থাকে, বলা হবে আপনারা সবাই একই নৌকার যাত্রী। এই বলাটা সত্য। অভিজ্ঞতাটা সমগ্রের এক ব্যক্তি অংশ হিসেবে আপনি নিজেকে কীভাবে দেখেন সেটা ইতিবাচকভাবে বদলে দেবে।

যা-ই হোক, শ্রেণী গড়ে দেবে সব পার্থক্য। একটা চমৎকার বাগানশোভিত বাড়িতে লক ডাউন হওয়া আর একটা ঘিঞ্জি আবাসন প্রকল্পে লক ডাউন হওয়া এক নয়। ঘর থেকে কাজ করতে সমর্থ হওয়া আর চাকরি চলে যেতে দেখাটাও তেমনিভাবে এক নয়। মহামারিটাকে হারিয়ে দিতে যে নৌকা বাইতে থাকবেন আপনি, সেটা সবার চোখে এক দেখাবে না, আর আসলেও সেটা সবার জন্য এক নয়: ছিল না কখনো।

এক পর্যায়ে, আপনি উপলব্ধি করবেন, পরিস্থিতিটা কঠিন। আপনি ভয় পাবেন। আপনি আপনার প্রিয়জনদের সাথে ভয়টা ভাগ করে নেবেন, অথবা তাদের বোঝা আর বাড়াতে না চাওয়ায়, কিছুই বলবেন না তাদেরকে।

ফ্রান্সেসকা মেলানদ্রি; Image Source: Samuel Kirszenbaum pour Libération

আপনি আবার খাওয়াদাওয়া করবেন।

আমরা ইতালিতে আছি, আর এই হচ্ছে তা-ই, যা আমরা আপনার ভবিষ্যৎ সম্পর্কে জানি। কিন্তু এটা খুব ছোটো মাপের একটা ভবিষ্যৎবাণী। গণক হিসেবে আমরা খুব একটা সুবিধার নই।

যখন আমরা আমাদের দৃষ্টিটা সম্প্রসারণ করি আরো দূরবর্তী ভবিষ্যতে, যেই ভবিষ্যৎ আপনার-আমার উভয়ের কাছেই অজানা, আমরা স্রেফ এটাই বলতে পারি আপনাদেরকে: যখন এই সবকিছু শেষ হয়ে যাবে, দুনিয়াটা আর আগের মতো থাকবে না।

This is a translation of a letter written by the Italian novelist Francesca Melandri, who has been under lockdown in Rome for almost three weeks due to the Covid-19 outbreak. 

Featured Image Source: MASSIMO PINCA/REUTERS